নড়াইলে ঘুষ ছাড়া মিলছে না বিদ্যুতের সংযোগ!

প্রকাশিত: ৫:৪৩ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৩১, ২০১৯ | আপডেট: ৫:৪৩:অপরাহ্ণ, আগস্ট ৩১, ২০১৯

নড়াইলের কালিয়া উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগ নিতে গ্রাহকদের ঘুষ দিতে হচ্ছে। পল্লী বিদ্যূতের কর্মকর্তারা স্থানীয় দালাল ও ওয়ারিং মিস্ত্রির মাধ্যমে উৎকোচ নিচ্ছেন বলে জোর অভিযোগ উঠেছে।

ঘুষ ছাড়া কারো ঘরে আলো জ্বলবে না, বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন মধ্যস্থতাকারি দালাল। নড়াইলের কালিয়া উপজেলার পুরুলিয়া ইউনিয়নের দু’টি গ্রামের ১’শ ২০টি পরিবারের পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ দিতে প্রত্যেক পরিবারের কাছ থেকে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা করে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের দালালদের হাতে এ অর্থ দিতে না পারলে কারো ঘরে আলো জ্বলবে না।

এমনকি যাদের বৈদ্যুতিক খুটি ও তার সংযোগ দেয়া হয়েছে, সেখান থেকে খুটি ও তার খুলে নেয়ার হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ ভূক্তভোগীদের। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নড়াইলের কালিয়ার পুরুলিয়া ইউনিয়নের মধ্য পুরুলিয়া ও দাড়িরপর পাড়ায় যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২, নড়াইল থেকে ১শ ২০জন গ্রাহকের মধ্যে নতুন বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য তাদের বাড়ির সামনে দিয়ে সম্প্রতি বৈদ্যুতিক খুটি এবং তার বসানো হয়েছে।

আবাসিক সংযোগের জন্য একজন গ্রাহক অফিসে জামানত বাবদ ৪শ টাকা এবং সমিতির সদস্য বাবদ ৫০ টাকা দিলে সংশ্লিষ্ট অফিস থেকে বৈদ্যুতিক খুটি, সার্ভিস তার (১শ৩০ ফুটের মধ্যে) এবং মিটার গ্রাহকের বাড়ির আঙ্গিনায় বসিয়ে দেওয়া হবে। এরপর বাকি খরচ গ্রাহকের।

অভিযোগ উঠেছে, চন্দ্রপুর গ্রামের রকিবুল ইসলাম ও চাচুড়ি এলাকার মিলনসহ কয়েক জন বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়ার কথা বলে পুরুলিয়া মধ্যপাড়ার পলি বেগম, ফিরোজা বেগম, ইবাদুল শেখ, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক রুহুল কুদ্দুস,চান মোল্যা, খাজা মিয়া, লিটন শেখ, গফুর শেখ, জান্নু মোল্যা, সালামত শেখ, আকছির বাকা মিনা, দাড়িরপর পাড়ার বাদল মোল্যা, সোহেল মোল্যা, সুরত গাজী, রবিউল ইসলাম, সাবু শেখসহ ১শ ২০টি পরিবারের প্রত্যেকের কাছ থেকে অর্থ নেয়ার অভিযোগ রয়েছে।

দাড়িরপর গ্রামের আকরাম সর্দার জানান, তার ছেলে ইমদাদুল সর্দার ৫হাজার টাকা দেয়ার পর তার বাড়িতে বিদ্যুতের সংযোগ দেয়া হয়েছে। আরেক ছেলে উবায়দুর সর্দার ২ হাজার টাকা দেয়ায় তার বাড়িতে বিদ্যুতের মিটার দেয়া হয়নি। আরও ৩ হাজার টাকা দিলে তবেই সংযোগ দেয়া হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।

বাদল মোল্যা জানান, তিনি সুদে ২ হাজার ৫শ টাকা এনে চাচুড়ি বাজারের মিলন নামে একজন ইলেকট্রনিক্স ব্যবসায়ীকে দিলেও তার ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। এখন স্থানীয় শুকুর মিয়া ও তুহিন বাকি টাকার জন্য চাপ দিচ্ছে। শারীরিক অসুস্থ বাবুল অন্যের জমিতে বসবাস করেন। তার কাছ থেকেও ৩ হাজার টাকা নিয়ে বিদ্যুতের মিটার লাগানো হয়েছে। বাবুলের ছেলে টাকা দিতে না পারায় তাকে মিটার দেয়া হয়নি।

পুরুলিয়া গ্রামের ভ্যান চালক ফেরদৌস গাজী বলেন,তার বাড়ি নির্দিষ্ট আয়ত্বের বাইরে দেখিয়ে রকিবুল বৈদ্যুতিক খুটিসহ সংযোগের জন্য ১২ হাজার টাকা অথবা খুটি বাদে ৬ হাজার টাকা দাবি করেছে। দাবিকৃত টাকা হতে তার কাছ থেকে ১ হাজার টাকাও দিয়েছে। কিন্তু তার বাড়িতে এখনও খুটি ও তার পৌঁছায়নি।

গত ২৬ আগষ্ট সকালে রকিবুলের কাছে গেলে সে বলেছে ৬ হাজার টাকা ছাড়া বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হবে না। পুরুলিয়া মধ্যপাড়া গ্রামের শফিক মোল্যার স্ত্রী পলি বেগম অভিযোগে জানান, স্থানীয় চন্দ্রপুর গ্রামের রাকিবুল ইসলাম বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য তার কাছে ৫ হাজার টাকা দাবি করে। দাবিকৃত এ অর্থ দেয়নি বলে রকিবুল হুমকি দিয়ে বলেছে, টাকা না দিলে বাড়ির পাশের বৈদ্যুতিক খুটি ও তার খুলে নিবে।

টাকা ছাড়া কারো ঘরে আলো জ্বলবে না সাফ জানিয়ে দিয়েছে। তিনি টাকা চাওয়ার এ বিষয়টি পল্লী বিদ্যুতের এক অফিসারকে (নাম বলতে পারেননি) ওই গ্রাম পরিদর্শনের সময় জানিয়েছেন। একই গ্রামের বাবু কাজীর স্ত্রী ফিরোজা বেগম বলেন, নিজ হাতে দু’টি মিটারের জন্য রাকিবুলকে প্রাথমিকভাবে ২ হাজার টাকা দিয়েছেন।

রকিবুল আরও ৬ হাজার টাকা চেয়েছে। একই গ্রামের ইবাদুল শেখ বলেন, একটি মিটারের জন্য ৩ হাজার টাকা দিয়েছেন। এখনও তার বাড়িতে তার সংযোগ দেয়া হয়নি। যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২, কালিয়া উপজেলার চাঁচুড়ি বাজার শাখার লাইন টেকনিশিয়ান মেঘনাধ বিশ্বাস আমাদের নড়াইল প্রতিনিধি হুমায়ুন কবীর রিন্টুকে জানান, তিনি এ এলাকায় নতুন এসেছেন। তাই এ ব্যাপারে ভালো কিছু বলতে পারবেন না।

রকিবুল ইসলাম নিজেকে পল্লী বিদ্যুত সমিতির ইলেকট্রিশিয়ান দাবি করে বলেন, বিভিন্ন বাড়িতে ওয়ারিং করার জন্য সামান্য কিছু টাকা নিয়েছেন। তবে দাড়িরপর পাড়ায় অন্য লোক কিছু টাকা নিতে পারে বলে জানান।

যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ নড়াইলের কালিয়া উপজেলার সাব জোনাল অফিসের এজিএম রুবেল হোসেন বলেন, আবাসিক গ্রাহকের বাড়িতে বৈদ্যুতিক খুটি ও তার পৌঁছে দিতে সরকারিভাবে রশিদের মাধ্যমে জমা দিতে হবে ৪’শ ৫০ টাকা। এর বাইরে অফিসের আর কোনো খরচ নেই।

বাকিটা ব্যক্তিগত। এসব বিষয়ে ধারনা দিতে বিভিন্ন সময় মিটিং ও উঠান বৈঠক করা হয়েছে। তারপরও মানুষ কিভাবে দালালদের খপ্পরে পড়ে? খোঁজ নিয়ে দালালদের বিরূদ্ধে ব্যবস্থা নিবেন বলে জানান। আর চলতি বছরেই কালিয়া উপজেলা শতভাগ বিদ্যুতায়ন হবে বলেও জানান।