নড়াইল সদর হাসপাতালের সেই হিসাব রক্ষকের বিরূদ্ধে এজহার দায়ের

প্রকাশিত: ৮:০৮ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৪, ২০২১ | আপডেট: ৮:১৩:অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৪, ২০২১

নড়াইল আধুনিক সদর হাসপাতালের হিসাব রক্ষক জাহানারা খাতুন লাকী’র বিরূদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে এজহার দায়ের হয়েছে।

প্রায় অর্ধ কোটি টাকা আত্মসাতের প্রাথমিক প্রমান পেয়ে সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আব্দুস শাকুর বুধবার (১৪ এপ্রিল) নড়াইল সদর থানায় এজহার দায়ের করেন।

এজহারটি নড়াইল সদর থানা কর্তৃপক্ষ দুদকে প্রেরন করেছেন বলে নিশ্চিত করেছেন সদর থানার ওসি ইলিয়াস হোসেন। জানা যায়, নড়াইল আধুনিক সদর হাসপাতালের ইউজার ফিস এর টাকা আত্মসাতের বিষয়টি বুঝতে পেরে এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক আব্দুস শাকুর একটি তদন্ত টিম গঠন করে দেন।

মঙ্গলবার (১৩ এপ্রিল) তদন্ত কমিটি নড়াইল সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আব্দুস শাকুরের নিকট তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, হাসপাতালের হিসাব রক্ষক জাহানারা খাতুন লাকী’র বিরূদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠায় হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আব্দুস শাকুর সার্জারী কনসালটেন্ট ডাঃ আকরাম হোসেনকে আহবায়ক করে ৫ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করে দেন।

ওই কমিটি তদন্ত করে ৪৮ লক্ষ ১৭ হাজার ৯শ ১২ টাকা আত্মসাৎ করার প্রমান পান। যদিও হিসাব রক্ষক লাকি’র বিরূদ্ধে ৭০ লক্ষাধিক টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, হাসপাতালের হিসাব রক্ষক জাহানারা খাতুন লাকী’র অফিসিয়াল কাজের মধ্যে অন্যতম দ্বায়িত্ব ছিল হাসপাতালের ইউজার ফিস এর টাকা সোনালী ব্যাংক লিঃ এর নড়াইল কর্পোরেট শাখায় জমা দেয়া। কিন্তু সেই টাকা ঠিকমত জমা না দিয়ে তিনি আত্মসাৎ করেছেন। অথচ প্রতি মাসের জমা ট্রেজারী চালান অফিসে সংরক্ষণ করেছেন। চালানগুলি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে নিয়ে পরীক্ষা করে জানতে পারেন ৩৪ টি চালান ভুয়া। নিজ হাতে সবকিছু লিখে জালিয়াতি সাক্ষর ও সিল দিয়েছেন। ব্যাংকের সিল ও সাক্ষরের সাথে ভুয়া চালানগুলির সিল সাক্ষরের কোন মিল নেই। সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ম্যানেজার সেলিম রেজা ভুয়া চালানগুলি সনাক্ত করে প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেন।

ওই ৩৪টি চালানে টাকার পরিমান ৪৮ লক্ষ ১৭ হাজার ৯শ ১২ টাকা। জানা যায় ২০১৯ সালের ১৮ জুলাই জাহানারা খাতুন লাকী নড়াইল সদর হাসপাতালের হিসাব রক্ষক পদে যোগদান করেন। ২০১৯ সালের জুলাই মাস থেকে ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত ইউজার ফিস’র সিংহভাগ টাকা তিনি ব্যাংকে জমা দেননি। অথচ ভুয়া বিল ভাউচার ও চালান কপি হাসপাতালে জমা দিয়েছেন। মাসের পর মাস টাকা জমা না দিয়ে নিজের আখের গুছিয়েছেন। হাতপাতালের তত্ত্বাবধায়ক গত ৫ এপ্রিল ব্যাংকে গিয়ে জানতে পারেন ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২১ মার্চ পর্যন্ত তেমন কোন টাকা ব্যাংকে জমা হয়নি। নীতিমালায় রয়েছে প্রতি মাসের টাকা পরের মাসের ১ম সপ্তাহে ট্রেজারী চালানের মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকে জমা করতে হবে। কিন্তু হিসাব রক্ষক জাহানারা খাতুন লাকী আদায়কৃত টাকা জমা দেননি।

সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাঃ মুশিউর রহমান বাবু বলেন,জাহানারা খাতুন লাকীর অর্থ আত্মসাতের ব্যাপারে অভ্যন্তরীন তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। তিনি তদন্ত কমিটি’র সদস্য সচিব হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করেছেন। তদন্তে অর্থ আত্মসাতের প্রমান মিলেছে। তদন্ত কমিটির আহবায়ক ডাঃ আকরাম হোসেন জানান,তদন্ত করতে গিয়ে হাসপাতালের হিসাব রক্ষক ও তত্ত্বাবধায়কের বক্তব্য সহ সংশ্লিষ্ট সকলের সাক্ষ্য প্রমান ও দলিলাদি পর্যবেক্ষন করা হয়েছে। তদন্তে অর্থ আত্মসাতের প্রমান পাওয়া গেছে। কর্তৃপক্ষের নিকট তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নিবেন। সংশ্লিষ্ট ব্যাংক শাখার ম্যানেজার সেলিম রেজা জানান,৩৪ টি চালানের সিল ও সাক্ষরের সাথে ব্যাংকের সিল সাক্ষরের কোন মিল নেই। আর ওই চালানগুলিতে উল্লেখিত টাকা আদৌ ব্যাংকে জমা করা হয়নি। চালানের উপর লাল কালি দিয়ে টাকার লেখাটিও ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা-কর্মচারীর নয়। সিল দেখলে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে ওই সিল কেউ ব্যক্তিগত ভাবে বানিয়েছেন।

এ ব্যাপারে তিনি কোন মামলা বা ব্যবস্থা নিবেন কি-না ? এমন প্রশ্নে ব্যাংক ম্যানেজার সেলিম রেজা বলেন,হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই তো ব্যবস্থা নিচ্ছেন। এদিকে স্থানীয় মহলে গুঞ্জণ উঠেছে দীর্ঘ সময় ধরে এতো বড় অংকের অর্থ আত্মসাতের সাথে নড়াইল সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ মোঃ আবদুস শাকুরের পরোক্ষ ভাবে হলেও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

তিনি এ হাসপাতালে যোগদানের পর হাসপাতালের ঠিকাদারী কাজ ভাগাভাগি করে দেয়া ও নামকাওয়াস্তে কাজ করে ঠিকাদার কর্তৃক মোটা অংকের বিল উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। শুধু তাই নয় অতি সামান্য বিষয়েও তিনি হাসপাতালের কর্মচারীদের নিকট হতে উৎকোচ নেন বলে প্রচার আছে। সে কারনে অনেকেই তাকেও এই মামলার আসামী করার দাবি জানিয়েছেন।

নড়াইল সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ মোঃ আবদুস শাকুর নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, হিসাব রক্ষক জাহানারা খাতুন লাকী’র বিরূদ্ধে অর্থ আত্মসাতের প্রমান পাওয়ায় তার বিরূদ্ধে এজহার দায়ের করা হয়েছে।