পতাকা হাতে ২০০ দেশ ভ্রমণ করতে চায় রাবির ‘ফ্লাগ গার্ল’

মুজাহিদ হোসেন মুজাহিদ হোসেন

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৪:৫০ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১২, ২০১৯ | আপডেট: ৪:৫০:অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১২, ২০১৯
ছবি: টিবিটি

ব্যক্তিজীবন থেকে কর্মজীবন দেশ থেকে দেশান্তরে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের অবদান কম কোথায়? এরই এক অন্যতম উদহারণ রাবির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী নাজমুন নাহার। লাল-সবুজের পতাকা হাতে একের পর এক দেশ জয় করছেন নারী পরিব্রাজক নাজমুন নাহার।

গত ১৯ বছরে বিশ্বের বিভিন্ন পথে প্রান্তে পায়ের চিহ্ন রেখে এসেছেন তিনি। সর্বশেষ ১২৫ তম দেশ হিসেবে নাইজেরিয়াতে ভ্রমণ করেছেন। স্বাধীনতার ৫০ বছর পুর্তিতে ২০০ টি দেশ ভ্রমণ করবেন বলে পণ করেছেন নাজমুন। তিনি একজন নারী পরিব্রাজক হিসেবে বিশ্ব ভ্রমণের মাধ্যমে তাক লাগিয়েছেন বিশ্বকে। দেশের পতাকা নিয়ে শততম দেশ হিসেবে জিম্বাবুয়েতে পা রাখার পর জাম্বিয়া সরকারের গভর্ণর তাঁকে ‘ফ্ল্যাগ গার্ল’ উপাধীতে ভূষিত করেন।

বিশ্বভ্রমণে অসমান্য কৃতিত্ব রাখায় গত ২৩ মার্চ আলোকিত নারী, তারুণ্যের আইকন হয়ে নারীদের সবচেয়ে সম্মানিত ‘অনন্যা সম্মাননা’ পুরষ্কার অর্জন করেছেন তিনি।

ঐতিহাসিক বিশ্বভ্রমণের রেকর্ড ছুঁয়েছেন নাজমুন নাহার। এখন পর্যন্ত লাল সবুজের পতাকা উড়িয়েছেন বিশ্বের ১২৫ টি দেশে! বাংলাদেশের ইতিহাসে নাজমুনই প্রথম যিনি এতো গুলো দেশ ভ্রমণ করেছেন। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন বাংলাদেশের পতাকা হাতে ঘুরবেন সারাবিশ্ব- আজ তার সেই বিশ্বজয়ের স্বপ্ন পূরণ হতে চলছে।

মধ্যবিত্ত পরিবারের বেড়ে ওঠা নাজমুন নাহার তিন ভাই, পাঁচ বোনের মধ্যে সবার ছোট। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভের পর ২০০৬ সালে শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে সুইডেনের লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করেন। এখন স্বপ্ন একটাই ‘বিশ্বভ্রমণ’। পৃথিবীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার জন্য বহু প্রতিক‚লতাকে জয় করে এগিয়ে চলেছেন নাজমুন। দিন-রাতের তোয়াক্কা না করে পর্বত, সমুদ্রের তলদেশ, দুর্গম জঙ্গল, বন্যপ্রাণীময় পাহাড় কিংবা অজানা আদিবাসীদের এলাকা-কোথাও যেতে ভয় পাননি তিনি।

মৃত্যুর মুখোমুখি হলেও পিছিয়ে আসেননি। বন্যপ্রাণীতে ভরা জঙ্গলে রাত কাটিয়েছেন, তীব্র ক্ষুধায় গরুর কাঁচা মাংস খেয়ে জীবন বাঁচিয়েছেন, মৃত্যুর আশঙ্কা থাকার পরও ছুটেছেন উচ্চ পর্বতশৃঙ্গের দিকে। অনেক পাহাড়ি অঞ্চলেই তাকে থাকতে হয়েছে না খেয়ে।

১৪ হাজার ২শ’ ফুট উচ্চতায় পেরুর রেইনবো মাউন্টেনে অভিযাত্রার সময় আল্টিটিউড সমস্যায় মৃত্যুর দুয়ারে গিয়েও বেঁচে যান তিনি। অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের সমুদ্রে স্নোর্কেলিংয়ের সময় মুখ থেকে পাইপ ছিঁড়ে যায় তার। সমুদ্রের লবণাক্ত পানি পেটে যাওয়ার তিক্ততা টের পান তিনি। কিউবায় আখের রস খেয়ে দিনের পর দিন কাটান তিনি। আমেরিকার ইয়েলো স্টোনের জঙ্গলে প্রচণ্ড শীতে দুটো সোয়েটার ও দুটো জ্যাকেট পরে তাঁবুতে ঘুমানো, আইসল্যান্ডের ল্যান্ড মান্নালুগারের উঁচু পাথরের উপত্যকায় হারিয়ে যাওয়া, বলিভিয়ার দ্বীপে অন্ধকার রাতে পথ খুঁজে বেড়ানো, মধ্যরাতে ইন্দোনেশীয় ইজেন কার্টারের ভয়ঙ্কর ভলকানিক অভিযানে যাওয়ার মতো দুর্দান্ত সব অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।

বিশ্বভ্রমণ সম্পর্কে তিনি বলেন, কোটি প্রাণের লাল সবুজের পতাকা নিয়ে ১২৫ টি দেশের সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশের পতাকাকে নিয়েছি সর্বোচ্চ উচ্চতায়। গত তিন মাসের সড়ক পথের কঠিন সফর শেষ করে ১৩ জানুয়ারী নাইজেরিয়ায় উড়াই বাংলাদেশের পতাকা।

বিশ্¦ ভ্রমন অনেক কষ্ট হলেও আছে অনেক আনন্দ, দেখেছি অনেক, শিখেছি অনেক! বিশ্বভ্রমণ করতে গিয়ে কখনও ৪৮ ডিগ্রি তাপমাত্রায় পুড়েছি, কখন টানা ২৬ ঘন্টা না খেয়ে ছিলাম, মাটিতে, জঙ্গলে আদিবাসীদের সাথে ঘুমিয়েছি! কখনো ইয়াম আলু, কখন হোয়াইট অরেঞ্জ খেয়েও থেকেছি!

পশ্চিম আফ্রিকার পথে পথে আমাকে অনেক কঠিন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে! কিন্তু আমি সবই আমার মানসিক শক্তি আর ইতিবাচক চিন্তা দিয়ে মোকাবেলা করেছি। সকল ধরণের প্রতিবন্ধকতায় এই পতাকা আমাকে ছায়া দিয়েছে! বাংলাদেশের এই লাল সবুজের পতাকা বহন করার জন্য আমি সব কষ্টকে মাথা পেতে নিয়েছি।

নাজমুন মনে করেন, ‘স্বপ্ন দেখলে আর সে লক্ষ্যে কাজ করলে সফলতা নিশ্চিত।’