পবিত্র কোরআন শরীফের প্রথম বাংলা অনুবাদক গিরিশ চন্দ্রের বাড়ি নতুন রুপে

তারেক পাঠান তারেক পাঠান

পলাশ(নরসিংদী) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৪:১১ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৪, ২০১৯ | আপডেট: ৪:১১:অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৪, ২০১৯
ছবি: টিবিটি

পবিত্র কোরআন শরীফের বাংলা অনুবাদ করা গিরিশ চন্দ্র সেন শুধু নরসিংদী বা বাংলাদেশে নয় সমগ্র উপমহাদেশেই একটি অতি পরিচিত নাম। কিন্তু বর্তমানে স্থানীয় লোকজনই ভুলতে বসেছেন উপ-মহাদেশের প্রখ্যাত এই মানুষটিকে।

ভাই গিরিশচন্দ্র সেন নামে পরিচিত এ বিখ্যাত ব্যক্তি বর্তমান নরসিংদী জেলার পাঁচদোনা গ্রামে বিখ্যাত দেওয়ান বৈদ্যবংশে জন্মগ্রহণ করেন। ইতিহাস ঐতিহ্যের অন্বেষণে প্রতিবছর অসংখ্য লোক এ মহামানবের স্মৃতিচিহ্ন দেখতে আসে নরসিংদী তার নিজ বাড়িতে। বেশ কিছুদিন অযতœ-অবহেলায় তার বাড়িটি পড়ে থাকলেও বর্তমানে সরকার, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ স্থানীয় প্রশাসন মিলে ভাই গিরিশ চন্দ্র সেনের বাড়িটাকে দিয়েছে একটি নতুন রূপ। শুধু তাই নয়, তার বাড়ির পাশে গড়ে উঠেছে ভাই গিরিশ চন্দ্র সেন যাদুঘর।

১৮৩৪ সালে নরসিংদী সদর উপজেলার পাচঁদোনা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন গিরিশ চন্দ্র সেন। হিন্দু পরিবারে জন্ম হলেও তার সুনাম-সুখ্যাতির কেন্দ্র-বিন্দু ছিল আরবি-ফার্সি ভাষার পান্ডিত্য জ্ঞান। ১৮৭১ সালে গিরিশ চন্দ্র সেন সনাতন ধর্ম ত্যাগ করে ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করেন। ১৮৭৬ সালে ৪২ বছর বয়সে তিনি মৌলভী এহসান আলীর কাছে আরবি ব্যাকরণ শিখেন। ৩ বছর কঠোর সাধনার পর ব্রিটিশ ভারতের অবিভক্ত বাংলায় গিরিশ চন্দ্র সেনই সর্বপ্রথম ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে পবিত্র কোরআন শরীফের প্রথম পারা বাংলা অনুবাদ করেন, যা শেরপুর চারু চন্দ্র প্রেস থেকে ছাপা হয়।

পরবর্তী সময়ে ৩ বছর কঠোর পরিশ্রম করে ১৮৮৪ সালে তিনি সম্পূর্ণ কোরআন শরীফের বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করে বিশ্ববাসীকে চমৎকৃত করেন। তার প্রকাশিত ৩৫টি গ্রন্থের মধ্যে ২২টি ইসলাম ধর্ম বিষয়ক। ভাই গিরিশ চন্দ্র সেন ১৯১০ সালের ১৪ আগস্ট হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরে নরসিংদীর পাঁচদোনা গ্রামের বাড়িতে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে নরসিংদীর মেহেরপাড়ায় অবস্থিত ভাই গিরিশ চন্দ্র সেনের বাড়ি। সংস্কারের অভাবে আর দখলদারিত্বের চাপে ২০০ বছরের পুরোনো প্রাচীন এ বাড়িটি তার পুরনো ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলেছিল। ২০০৮ সালে বাড়িটির মূল কাঠামো অক্ষুণœ রেখে সংস্কারে অনুদান দিতে আগ্রহ প্রকাশ করে ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশন। পরে ২০১৫ সালে নরসিংদী জেলা প্রশাসন ও প্রতœতাত্তি¡বক গবেষণা কেন্দ্র ঐতিহ্য অন্বেষণের মধ্যে বাড়িটি সংরক্ষণ ও একটি প্রতœতাত্তি¡ক জাদুঘর নির্মাণের চুক্তি হয়।

এরপর সরকারের নিয়ন্ত্রণে ও দিক নির্দেশনায় ২০১৭ সালে এর সংরক্ষণের কাজ শুরু হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ভারতীয় হাইকমিশন থেকে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা অনুদানও পায় ঐতিহ্য অন্বেষণ। পুরোনো চেহারায় ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি ভাই গিরিশ চন্দ্র সেনের বাড়িতে করা হয়েছে একটি জাদুঘর। এখানে তুলে রাখা হয়েছে ভাই গিরিশ চন্দ্র সেনের ব্যবহৃত জিনিসপত্র ও তার লেখা বই।

তবে ভাই গিরিশ চন্দ্র সেনের জন্ম ও মৃত্যু বার্ষিকী কেউ পালন করে না এখানে। এমনকি সরকারিভাবেও ভাই গিরিশ চন্দ্র সেনের জন্ম ও মৃত্যু বার্ষিকী পালিত হয় না। স্থানীয়দের দাবি, উপ-মহাদেশের প্রখ্যাত ভাই গিরিশ চন্দ্র সেনের জন্ম ও মৃত্যু বার্ষিকী যেনো সরকারিভাবে পালন করা হয়। জানা গেছে, জমিদার মাধবরাম সেন রায় এর ৯ সন্তানের মধ্যে গিরিশ চন্দ্র সেন ছিল সবার ছোট।

১৮৫৬ সালে তিনি বর্তমান পলাশ উপজেলার বাগপাড়া গ্রামের জয়কালী দেবী নামে এক জমিদারের মেয়েকে বিবাহ করেন। সংসার জীবনে ১৮৬৯ সালে একটি কন্যা সন্তান জন্ম নিলেও তা জন্ম নেওয়ার ১৪ দিনের মাথায় সন্তানটি মারা যায়। এরপর এক বছরের ব্যবধানে স্ত্রী জয়কালী দেবীও মারা গেলে গিরিশ চন্দ্র সেন আর বিবাহ করেননি।

যার কারণে গিরিশ চন্দ্র সেনের কোন উত্ত¡রাধিকার রেখে যেতে পারেননি। জমিদারের সন্তান হিসেবে গিরিশ চন্দ্র সেনের গ্রামের বাড়িতে প্রচুর জায়গা-জমি থাকলেও উত্ত¡ধীকারী না থাকায় প্রাচীতম বাড়িটি ছাড়া সব সম্পত্তি বেদখলে চলে গেছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বর্তমানে বাড়িটি দেখবাল করছেন, ভাই গিরিশ চন্দ্র সেন যাদুঘরের পরিচালক কাউছারুল হক কানন।

তিনি জানান, উপ-মহাদেশের প্রখ্যাত ভাই গিরিশ চন্দ্র সেনের বর্তমানে ১.২২ শতাংশ নিয়ে বাড়িটি ছাড়া বাকি সম্পত্তি বেদখলে চলে গেছে। সরকার যদি বেদখল হয়ে যাওয়া সম্পত্তি গুলো উদ্ধার করে দেয়, তাহলে বাড়ির পাশে কিছু জায়গা সম্পসারিত করে সেখানে গিরিশ চন্দ্র সেন নামে একটি লাইব্রেরি, বাড়ির প্রধান ফটকসহ সীমানা প্রাচীর ও আরো কিছু প্রদর্শনী স্থাপন করা যেত।