পলাশে সার কারখানার বিষাক্ত অ্যামোনিয়া গ্যাসে দিশাহারা শতশত পরিবার

টিবিটি টিবিটি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ৮:০৫ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৩০, ২০১৯ | আপডেট: ৮:০৫:অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৩০, ২০১৯
ছবি: টিবিটি

তারেক পাঠান পলাশ (নরসিংদী) প্রতিনিধিঃ শীত আসার সঙ্গে সঙ্গে পলাশ ও ঘোড়াশাল ইউরিয়া সার কারখানার বিষাক্ত অ্যামোনিয়া গ্যাসের তীব্রতা আরও বেশি বেড়ে যাওয়ায় জীবনমরণ সমস্যায় ভুগছে নরসিংদীর পলাশ উপজেলার ঘোড়াশাল পৌর এলাকার খানেপুরবাসী। গ্যাসের তীব্র ঝাঁঝের কারণে অনেকে গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে।

বিসিআইসি নিয়ন্ত্রণাধীন পলাশ ও ঘোড়াশাল ইউরিয়া সার কারখানা দুটি থেকে নিঃসৃত বিষাক্ত বর্জ্য এবং অ্যামোনিয়া গ্যাস খানেপুরের বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে গাছপালা ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। গৃহপালিত পশুপাখি ও মৎস্য খামারের মাছ মরে ভেসে উঠছে। গরু-ছাগল আক্রান্ত হচ্ছে নানা রোগে।

এ দিগে অ্যামোনিয়া গ্যাসের কারণে মানুষ বুকের ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, পেটের পীড়াসহ নানা রোগে ভুগছে। গ্যাসের ঝাঁঝে এখানকার কোনো গাছেই পাতা থাকে না । আবার যে পাতা গুলোতে থাকে তা আগামরা অথবা হলদে বর্ণের হয়ে যাচ্ছে। পলাশ সার কারখানার অ্যামোনিয়া গ্যাসের ঝাঁঝালো গন্ধ সহ্য করতে না পেরে স্থানীয় এলাকার হাজার হাজার বাসিন্দা বাড়ি ঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। এক্ষনি পদক্ষেপ নিয়ে বিষাক্ত অ্যামোনিয়াম গ্যাস বন্ধ করতে না পারলে এই গ্রামে মানুষ শূর্ণ হয়ে পরবে বলে ধারণা করা যাচ্ছে ।

জানা যায়, পলাশ ও ঘোড়াশাল ইউরিয়া সার কারখানার উত্তর পাশে ১৮ একর জমির ওপর করা হয়েছে লেগুন (পুকুর)। এ লেগুনের ১৫ থেকে ২০ গজ দূরে খানেপুরবাসীর অবস্থান। সার কারখানার পাশ দিয়ে খানেপুর গ্রামের রাস্তায় ঢুকলেই নাকে লাগে অ্যামোনিয়া গ্যাসের গন্ধ। এখানে নতুন কেউ গেলে পাঁচ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না। শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা। অথচ খানেপুরবাসী বছরের পর বছর অ্যামোনিয়ার বিষাক্ত ছোবলের মধ্যেই বসবাস করে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে শিশু ও বৃদ্ধদের।

এ সব বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের নেই কোন পদক্ষেপ। স্থানীয় প্রশাসন কেন জানি,দেখে ও না দেখার মত থাকছে। লেগুনের পাড়ে বসবাসকারী আলতাফ হোসেন জানান,সার কারখানার বিষাক্ত অ্যামোনিয়া গ্যাসের প্রভাবে তার পোলট্রি ফার্মের প্রায় আট শতাধিক মুরগি মরে গেছে। গ্রামের প্রতিটি পুকুরে মাছ মরে গিয়ে লক্ষ্যাধিক টাকার ক্ষতি হয়েছে। সার কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার এসব বিষয়ে অভিযোগ করেও এর কোনো স্থায়ী সমাধান পাচ্ছি না। বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে খানেপুর গ্রামে কোনো লোক আত্মীয়তা করতে চাচ্ছে না। ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অভিভাবকরা তাদের বিবাহযোগ্য ছেলেমেয়েদের নিয়ে নানা দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছে। ফৌজি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বললে তারা বলেন, স্কুলে যাওয়া- আসার সময় গ্যাসে তাদের চোখ-মুখ জ্বালা পোড়া করে।

খানেপুর গ্রামের আশিক মিয়া বলেন, ‘কারখানা চলার সময় সকাল-বিকাল গ্যাস ছাড়ে। আর তহন বাড়ি ছাইড়া যাওয়ার মতন অবস্থা অয়। একটা গাছ-গাছালিও লাগান যায় না। খালি মইরা যায়। হাঁস-মুরগি কিছুই পালন যায় না। খানেপুর গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র বসবাসকারী আজিজ মিয়া বলেন, নিজেরা যদি ঠিকঠাকমতো শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারতাম, তাহলেও বাপ-দাদার ভিটা ছাইরা যাইতাম না। ১৯৯৯ সালেও এ ধরণের গ্যাসে এলাকায় ব্যাপক ক্ষতি হয়। তখন কারখানা কর্তৃপক্ষ খানেপুর গ্রামের প্রায় একশ’ পরিবারের মধ্যে সাত লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়।

সার কারখানা কর্তৃপক্ষ ক্ষতিপূরণ দিয়ে গ্রামবাসীকে স্থায়ী সমাধান করার আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে গ্রামবাসীর সমস্যা সমাধান হচ্ছে না। এ বছর শীতে আবার গ্যাস ছাড়ার ফলে এলাকায় লোকজন নানামুখী সমস্যায় জড়ঝড়িত হচ্ছে। গ্রামবাসী ক্ষতিপূরণ চায় না, চায় স্থায়ী সমাধান। এ দিগে সম্প্রতি গত মঙ্গলবার মধ্য রাতে এক হাজার ৪২২ টন ক্ষমতা সম্পন্ন ঘোড়াশাল ও ৩০০ টন ক্ষমতা সম্পন্ন পলাশ ইউরিয়া সার কারখানা দুটির ক্ষতিকর অ্যামোনিয়া গ্যাস অতিমাত্রায় শীতলক্ষ্যা নদীতে ছাড়ার কারণে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণী মরে ভেসে উঠে।

এ ব্যাপারে ঘোড়াশাল সার কারখানার মহাব্যবস্থাপক রেজাউল করিম বলেন, যেহেতু কেমিক্যাল কারখানা, সেহেতু কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত তো হচ্ছেই। কারখানার গ্যাস পানির সঙ্গে নির্গত করা হয়, যার কারণে তা বেশি উড়ে যাওয়ার সুযোগ পায় না। যেটুকু যায়, সেটুকুর প্রভাব তো পড়ে। এটা আস্তে আস্তে সবার সয়ে যাবে। মঙ্গলবার রাতে গ্যাসের প্রভাবে শীতলক্ষ্যা নদীতে মাছ মারা যাওয়ার ঘটনায় কারখানার পাইপ ও অ্যামোনিয়ার গ্যাসের মাত্রা পরিক্ষা করা হয়েছে বলে তিনি জানান ।