পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মহাপ্রয়াণ ও কিছু কথা

প্রকাশিত: ৫:৩৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৭, ২০১৯ | আপডেট: ৫:৩৫:অপরাহ্ণ, জুলাই ১৭, ২০১৯
ছবি: টিবিটি

পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রয়াণে দেশের হাজার হাজার ভক্ত-অনুরাগী,‘জাতীয়পাটি’র নেতা-কর্মীসহ খোদ দাগ কেটেছে রাজনীতিকদেরও। তিনি জীবদ্দশায় রাজনৈতিক কারণে সবসময় ছিলেন আলোচিত।

সেনাপ্রধান থেকে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে টানা নয় বছর দেশ পরিচালনা করেছেন। বাস্তবতায় ৯০ এ ক্ষমতা হস্তান্তরের পর
তিনি এদেশের রাজনীতির প্রেক্ষাপট সমীকরণের বরপুত্র হয়ে ওঠেছিলেন।

দীর্ঘ নয় বছরের শাসনামলে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ দেশের উন্নয়নে উদ্ভাবনী অসংখ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করে রাজনীতিতে শীর্ষ আসনে সমাসীন হয়েছেন। উপজেলা পদ্ধতির প্রচলনসহ বিভিন্ন জনবান্ধব কাজের জন্য রাজনীতিতে এসেও তিনি গণমানুষের প্রশংসা কুঁড়িয়েেেছন।

বর্নাঢ্য জীবনে নানা কারণে আলোচিত-সমালোচিত এবং প্রশংসিতও হয়েছেন। তাঁর শাসনামলে কল্যাণকর কাজের জন্য ৬৮ হাজার গ্রাম-বাংলার মানুষের ভালবাসায় ছিলেন সিক্ত। পরবর্তীতে পেয়েছেন ‘পল্লীবন্ধু’ উপাধি।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ একটি রক্তপাতহীন অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ রাষ্ট্র ক্ষমতা গ্রহণ করেন। ১৯৮৪ সালে দেশের স্থানীয় সরকার অবকাঠামো’র আমুল পরিবর্তন ঘটিয়ে উপজেলা পদ্ধতির প্রচলন করেন। গণতন্ত্র পুনঃ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি ১৯৮৬ সালে ‘জাতীয়পার্টি’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং সংসদীয় নির্বাচন দেন। ১৯৮৮ সালে তিনি সংবিধানে এদেশের রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম সংযুক্ত করেন।

ফলশ্রুতিতে তৎকালে তিনি দেশের মানুষের কাছে অধিক জনপ্রিয় এবং ইসলামী বহির্বিশে^ বাংলাদেশকে একটি অকৃত্রিম বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে পরিগনিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। প্রচন্ড বাধা বিপত্তির মধ্যেও তিনি মধ্যপ্রাচ্য সঙ্কটের সময় রাষ্ট্রনায়কোচিত সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলেন।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকাকালে ব্রিটিশ আমলের ঘুনে ধরা প্রশাসনিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে দিয়ে প্রবর্তন করেন বিকেন্দ্রি করণ ও বিরাষ্ট্রী করণ ব্যবস্থা। তাছাড়া তিনি দীর্ঘ নয় বছরে এদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে উন্নয়নের অসংখ্য স্মৃতি চিহৃ উজ্জল করেছেন। সঙ্গত কারণেই তাঁর ‘কীর্তি অক্ষয়’ হয়ে থাকবে আগামীর বাংলাদেশে।

রাজনৈতিক কারণে হুসেইন মুহম্মদ এরশা কে স্বৈরশাসক হিসেবে বলা হলেও কার্যত তিনি দেশ ও জাতির ক্রান্তি লগ্নে অধিকন্ত একটি ব্যর্থ সরকার প্রধান কে সরিয়ে শান্তিপুর্ণ ভাবেই তিনি ক্ষমতা গ্রহণ করেন।

যার দৃষ্টান্ত জন আকাংখার নিমিত্তে ৯০ এ ক্ষমতা হস্তান্তরের পর ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি কারাগার থেকে অংশ গ্রহণ করেও পাঁচটি করে আসনে জয়ী হয়ে রাজনীতিতে জনপ্রিয়তার শীর্ষ আসনে উপনীত হয়েছেন।

গত ১৪ ই জুলাই সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পাড়ি জমিয়েছেন না ফেরার দেশে। এর পর থেকে সারা দেশের অধিকাংশ মানুষ তাঁর শোকে মুহ্যমান। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ, লাখ লাখ ভক্ত-অনুরাগী, দলীয় নেতা কর্মীরা আজ শোক ও সমবেদনায় কাতর হয়ে পড়েছেন। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোসহ বহির্বিশ্বের রাষ্ট্রপ্রধানরাও তাঁর মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত হয়েছেন।

পক্ষান্তরে দুই চার জন সেকুলারিষ্টদের বিরোধী বক্তব্যে আমাদের শুধু ব্যথিতই করছেনা একজন সফল রাজনীতিকের চলে যাওয়া ঘিরে তথাকথিত বুদ্ধিজীবিদের অবান্তর কথাবার্তায় মর্মাহতও হয়েছি। ভুল-ত্রæটি নিয়েই তো মানুষের চিরায়ত জীবন। সেখানে ক্ষমতার দ্ব›েদ্ব ইর্ষান্বিত হয়ে এবং রাজনৈতিক ফায়দার জন্য একজন সজ্জল রাজনীতিক কে নিয়ে মরনোত্তর কটুক্তি মোটেও সমচিন নয় বলে আমি মনে করি।

স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে আজোবধি যাঁরাই ক্ষমতার মসনদে আরোহন করেছেন, সকলের শাসনামলের নানা কর্মকান্ড নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কোনো না কোনো ভাবে কম বেশী রক্তে রঞ্জিত হয়েছে রাজপথ নানা পথ-প্রান্তর।

রাজনীতিতে এমন দৃশ্যপট সচরাচর আমরা দেখতে পাই। তাই বলে একজন রাজনীতি বেত্তার চলে যাওয়া পরই তাঁকে নিয়ে দ্বন্দ্বে মেতে ওঠা কিংবা বিভ্রান্তিকর তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করা ভদ্রতার বর্হিভুত বলে মনে হচ্ছে। তাঁর করে যাওয়া ভাল কাজগুলো এবং জনবান্ধব, আদর্শিক বিষয়গুলোর কারণে আমরা তাঁকে মনে রাখতে পারি।

বলাই বাহুল্য যে, রাজনীতিতে পৃথিবীর কোনো স্বৈরশাসকই ক্ষমতাচ্যুত হবার পর ঠিকে থাকতে পারেনি অথবা ক্ষমতায় ঠিকে থাকার কোনো নজির নেই। পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এর ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হতোনা।

তিনি যদি অন্যায় ভাবে রক্তপাতের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসতেন। একটি রক্তপাতহীন অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে তিনি সেনাপ্রধান থেকে রাষ্ট্রভার গ্রহণ করেছিলেন। আর সঙ্গত কারণেই ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার পর আমৃত্যু তিনি নানা চড়াই-উৎরাই ও বাধা-বিপত্তির পথ কাটিয়ে রাজনীতিতে ছিলেন বহাল তবিয়তে।

অপর দিকে তিনিই যে এদেশের একজন সামরিক সরকার প্রধান ছিলেন তা কিন্ত নয়। সামরিক সরকারের রাষ্ট্রপতি হয়ে এর অভিষেক করেছিলেন জাতীয়তাবাদী দলের প্রতিষ্ঠাতা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউর রহমান বীরবিক্রম। তাঁর ক্ষমতা গ্রহণ নিয়েও এদেশের রাজনীতিতে বিতর্ক বিদ্যমান।

বলা হয়ে থাকে সিপাহী আন্দোলনের নামে রক্তপাতের মধ্য দিয়েই জেনারেল জিয়া ক্ষমতায় এসেছিলেন। কিন্ত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ একই ভাবে রক্তপাতহীন প্রক্রিয়ায় সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আমরা হয়তো এমন বিতর্কে নাই গেলাম।

বলতে দ্বিধা নেই, আসলে পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এদেশের মানুষের কাছে অধিক জনপ্রিয় একজন রাজনীতিক ছিলেন। আমৃত্যু ছিলেন তিনি রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত এবং ক্ষমতার কাছাকাছি। আর সবই সম্ভব হয়েছে তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ ও উদ্ভাবনী প্রকিয়ার কারণে। জনগণের মন জয় করার মতো কর্মকান্ডের কারণেই এদেশে এক অনবদ্য ইতিহাস রচনা করেছেন পল্লী বন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ছিলেন ধর্মীয় মূল্যবোধ ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রবর্তক এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অকুণ্ঠ একজন সমর্থক। এই আদর্শের ভিত্তিতেই তিনি নিজে রাজনৈতিক দল হিসেবে জাতীয়পার্টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

আমি পল্লীবন্ধুর একজন ভক্ত হিসেবে জীবদ্দশায় খুব কাছাকাছি যেতে পেরেছি। তাঁর হাতেগড়া রাজনৈতিক দল জাতীয়পার্টির ছত্রছায়ায় থেকে অনেক কিছুই জানার সুযোগ হয়েছে। দেখেছি তিনি কতটা জনবান্ধব একজন নেতা ছিলেন। সেনাপ্রধান থেকে রাষ্ট্র নায়ক হওয়ার পেছনের ইতিহাস নিয়ে অনেক ভেবেছি। খুঁজে বেরিয়েছি স্বৈরশাসকের কথিত তকমা, রাজনৈতিক নির্মমতার মধ্যেও কিভাবে তিনি রাজনীতিতে সফল হয়েছেন।

কিভাবে রাজনীতিতে সমীকরণের কেন্দ্রবিন্দুতে আরোহন করেছিলেন। তাঁর কৃত কর্মের জন্যই তিনি গণমানুষের ভালবাসায় আজীবন জনপ্রিয়তার শীর্ষে ওঠেছিলেন। আল্লাহ পাক পল্লীবন্ধু’র মহাপ্রয়ানে আমাদের দৈর্য্য ধারণ করার তোফিক দিন। জবিদ্দশার ভুল ত্রুটি ক্ষমা করে দিয়ে তাঁকে জান্নাতের উচ্চ আসনে সমাসীন করুন। আমীন। ১৬.০৭.২০১৯


মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ হেলালী

লেখক ও সাংবাদিক
সুনামগঞ্জ।