পুরনো ভীড় ফিরেছে গণপরিবহনে, ভাড়াও দ্বিগুণ!

প্রকাশিত: ১২:০৫ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৪, ২০২০ | আপডেট: ১২:০৫:অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৪, ২০২০
ছবি: সংগৃহীত

বাসচালকের সহকারী রহিমের সঙ্গে ভীষণ বাগ্‌বিতণ্ডা চলছে আবদুস সালামের। আর বাসের সবাই তাকিয়ে আছেন তাঁদের দুজনের দিকে। বেশির ভাগ যাত্রীই অবস্থান নিয়েছেন সালামের পক্ষে। অন্যদিকে, রহিমের পক্ষে শুধু কথা বলছেন বাসের চালক মো. জহির। একপর্যায়ে বাগ্‌বিতণ্ডা রূপ নেয় হাতাহাতির পর্যায়ে। পরে সবাই মিলে সামলান এ দুজনকে।

বাগ্‌বিতণ্ডার বিষয়ে আবদুস সালামের যুক্তি, তিনি ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ের সাইনবোর্ডসংলগ্ন সাদ্দাম মার্কেটের সামনে থেকে লাব্বাইক বাসে উঠেছেন। নামবেন রাজধানীর কারওয়ান বাজারে। করোনাকালের নির্ধারিত ভাড়া মেনেই তিনি দুই সিটের ভাড়া দিয়েছেন ৫৫ টাকা। তাহলে কেন তিনি পাশের সিটে আরেকজন যাত্রী বসতে দেবেন? যদি বসতেই দিতে হয়, তাহলে সবাই করোনাকালের আগের নির্ধারিত ৩৫ টাকা ভাড়া দেবেন। নিয়ম ভেঙে সব সিটে দুজনই যদি বসানো হয়, তাহলে কেন বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে?

রহিমের পাল্টা যুক্তি, ভাড়া বেশি তো সরকারই নির্ধারণ করেছে। মানুষকে বাসে উঠতে না দিয়ে তিনি গন্তব্যে পৌঁছাবেন কীভাবে? বাসে উঠতে দিলে তাঁদের দোষ, না নিলেও দোষ। সামনের স্ট্যান্ডে একজন নেমে যাবেন, তাই আরেকজনকে তুলেছেন তিনি। সামনের স্ট্যান্ডে যে লোক পাওয়া যাবে, তার গ্যারান্টি কী?

তবে সবার সামনে যখন রহিমের যুক্তি টিকল না, তখন রহিম উচ্চ স্বরে বলে উঠলেন, ‘পাবলিক বাসে উঠে এত গ্যাঞ্জাম করা যাবে না। ভালো না লাগলে নেমে যান। বাসে ওঠার লোকের অভাব নাই।’

আবদুস সালাম এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘পাশাপাশি যদি দুজনকেই বসতে হয়, তাহলে ভাড়া ৩৫ টাকা দেব। এই সিস্টেমই উঠিয়ে দেওয়া উচিত। কারণ, বাসের লোকজন নিয়ম মানছেন না। না হলে পরিবহনে সঠিক নির্দেশনা ও তা বাস্তবায়নে তাগিদ থাকা দরকার।’

গত কয়েকদিন নগরীর বিভিন্ন এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, অফিস শুরু ও শেষ হওয়ার সময় গণপরিবহনে কোনও স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। দিনের অন্যান্য সময় কিছুটা আসন ফাঁকা থাকলেও এই সময়ে বাসের প্রতিটি আসনেই যাত্রী নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া দূর পাল্লার বাসের অবস্থা আরও খারাপ। ঈদের পর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসা প্রতিটি পরিবহনই সবকটি আসন ভর্তি করে যাত্রী বহন করেছে। আসনের বাইরে চালকের পাশে অবস্থিত ইঞ্জিন কভারের ওপরে বসিয়েও যাত্রী বহন করা হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত নগরীর রামপুরা ব্রিজ, মালিবাগ, খিলগাঁও রেলগেট, বাসাবো, সায়েদাবাদ, আরামবাগ, ফকিরাপুল, গুলিস্তান, পল্টন, শাহবাগ, বাংলামোটরসহ বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে— প্রায় প্রতিটি বাসেই সবগুলো আসনে যাত্রী বহন করা হচ্ছে। যাত্রীদের মাঝেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা বা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার লক্ষণ দেখা যায়নি। পরিবহন চালক ও তাদের হেলপাররাও বাসে অতিরিক্ত যাত্রী ওঠায় বাধা দিচ্ছেন না, বরং তারাই ডেকে ডেকে যাত্রীদের পরিবহনে ওঠাচ্ছেন।

গত বুধবার (১২ আগস্ট) বিকালে নগরীর কাওরান বাজার এলাকায় দেখা গেছে, প্রতিটি পরিবহনের সবকটি আসন ভর্তি। দাঁড়িয়েও যাত্রী বহন করা হচ্ছে। পরিবহন চালকরা বর্ধিত ভাড়া আদায় করছেন। এ নিয়ে চালক, হেলপার ও যাত্রীদের সঙ্গে বাক-বিতণ্ডাও হতে দেখা যায়।

জানতে চাইলে এম এম লাভলি পরিবহনের হেলপার আকরাম উদ্দিন বলেন, ‘এই যে দেখেন, সবাই সবার মতো করে বাসে উঠে যাচ্ছে। কেউ কারও কথা শুনছে না। আমরা যাত্রীদের অনেক বাধা দেই। তারা আমাদের কথা শুনে না। সবাই বাসে উঠে পড়ে। এখন যাত্রীরাও স্বাস্থ্যবিধি মানতে চায় না।’

মহিউদ্দিন নামে এক যাত্রী বলেন, ‘সকালের অফিস আওয়ার ও বিকালে অফিস ছুটির সময় যাত্রীদের অনেক চাপ থাকে। তাছাড়া এখন সব অফিস আদালত খুলে দেওয়া হয়েছে। বাসায় বসে অফিস করার কোনও সুযোগ নেই। যে কারণে যাত্রীর সংখ্যা অনেক বেশি। কিন্তু সড়কে সেই তুলনায় গণপরিবহন কম। মালিকরা ইচ্ছে করেই পরিবহনের সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছে। যাতে আমরা যারা যাত্রী, তারা আসন না থাকলেও বাধ্য হয়ে যেন বাসে উঠি।’

এদিকে দূর পাল্লার কোনও পরিবহনে সরকার ঘোষিত ৫০ শতাংশ আসন ফাঁকা না রেখেই যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। এসব পরিবহনে সরকার নির্ধারিত ৬০ শতাংশ বর্ধিত ভাড়ার চেয়েও বেশি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ সাধারণ যাত্রীদের।

এসব অভিযোগ স্বীকার করেছে পরিবহন মালিক সমিতি। তবে তারা বলছেন, বিকালে অফিস ছুটি হলে তখন সবার বাসায় ফেরার তাড়া থাকে। কেউ স্বাস্থ্যবিধি মানতে চায় না। আর পরিবহন মালিকরাও সচেতন হয়নি। তবে দূর পাল্লার স্টেশনগুলোতে মোটামুটি স্বাস্থ্যবিধি পালন করা হয় বলে দাবি করেন তারা।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সহ-সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘মানুষ করোনাকে এখন আর পাত্তা দিচ্ছে না। কেউ স্বাস্থ্যবিধিও মানতে চায় না। সবাই যার যার মতো করে পরিবহনে উঠে পড়ে। দুই-একটি পরিবহনে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করা হলেও অধিকাংশ পরিবহনই তা মানছে না। আই আমরাও চাই পরিবহন ব্যবস্থা পূর্বের নিয়মে ফিরিয়ে নেওয়া হোক। তখন আর কেউ বেশি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ করতে পারবে না।’

বুয়েটের অধ্যাপক ও গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. শামছুল হক বলেন, ‘স্বাস্থ্যবিধি কী জিনিস সেটাই জানেন না গণপরিবহন মালিকরা। এই সেক্টরটিকে যেভাবে জিম্মি করে রাখা হয়েছে, সেখানে মালিক-শ্রমিকদের বাইরে যাওয়ার কোনও সুযোগ নেই। তারা গণপরিবহনের সংজ্ঞাটাই পাল্টে দিয়েছে। সরকারের উচিত হবে এখনই এর লাগাম টেনে ধরা।’

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, ‘করোনার শুরু থেকেই অনেক গণপরিবহন স্বাস্থ্যবিধি মানেনি। সেই ধারাবাহিকতায় পরিস্থিতি এখন দ্রুত খারাপের দিকে যাচ্ছে। বর্তমানে অধিকাংশ গণপরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। যেসব শর্ত অনুসরণ করে বর্ধিত ভাড়া আদায়ের কথা বলা হয়েছিল, তার কোনোটিই মানা হচ্ছে না। গাদাগাদি করে যাত্রী বহন করা হচ্ছে। এমনকি সরকারের বর্ধিত ৬০ শতাংশের বেশি ভাড়াও আদায় করা হচ্ছে অনেক রুটে, বহু পরিবহনে। ফলে করোনা সংকটে কর্মহীন হয়ে পড়া ও আয়-রোজগার কমে যাওয়া সাধারণ মানুষের যাতায়াত দুর্বিসহ হয়ে পড়েছে।