পুলিশের কাছে ডা. মিতুর ‘কুকীর্তির স্বীকারোক্তি’

টিবিটি টিবিটি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ৭:১২ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২, ২০১৯ | আপডেট: ৭:১২:অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২, ২০১৯
ফাইল ছবি

অনেক অভিযোগ ডা. তানজিলা হক চৌধুরী মিতুর বিরুদ্ধে। বেপরোয়া জীবনে অনেক পুরুষকেই কাছে টেনেছেন। বিয়ের আগে-পরে কোনো পরিবর্তন হয়নি তার। স্বামীর অগোচরে অন্য পুরুষের সঙ্গী হয়েছেন দেশে-বিদেশে।

গ্রেপ্তারের পর এসব বিষয়েই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য দিয়েছেন আলোচিত এই নারী। পরকীয়া ও বেপরোয়া জীবনের অনেক কথাই স্বীকার করেছেন মিতু। এই নারীর আমলনামার অনেকটাই এখন পুলিশের হাতে। সেই সঙ্গে মিতুর ঘনিষ্ঠদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রয়োজনে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করবে পুলিশ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘গ্রেপ্তার হওয়ার পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মিতু উগ্র জীবনযাপনসহ নানা বিষয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে। এ সব তথ্য যাচাই বাছাই করা হচ্ছে।’

মিতু কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া উপজেলার আনিসুল হকের মেয়ে। মায়ের নাম সেলিনা শামীম। ছেলেমেয়েকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন মিতুর মা। বাবা থাকেন চট্টগ্রাম মহানগরীর পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকায়। ২০১৬ সালে ডা. তানজিলা হক চৌধুরী মিতুর সঙ্গে বিয়ে হয় ডা. মোস্তফা মোরশেদ আকাশের। এর আগে সাত বছর প্রেমের সম্পর্ক ছিল তাদের। আত্মহত্যার আগে নিজের ফেসবুক আইডির টাইমলাইনে মিতুর লাগামহীন জীবন সম্পর্কে লিখেছেন ডা. আকাশ। এমনকি বিভিন্ন ছেলেদের সঙ্গে ডা. মিতুর একান্ত মুহূর্তের কিছু ছবিও পোস্ট করেন তিনি। স্ত্রীর প্রতি আকাশের আবেগঘন স্ট্যাটাস এখন কাঁদাচ্ছে তার পরিবার, স্বজন থেকে শুরু করে পরিচিত-অপরিচিত অসংখ্য মানুষকে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তখন কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের ২০০৯-২০১০ সেশনের ছাত্রী তানজিলা চৌধুরী মিতু। ইন্টার্নশিপ করতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গেলে পরিচয় হয় আকাশের সঙ্গে। তারপর গড়ে ওঠে প্রেমের সম্পর্ক। ওই সময়ই একাধিক সম্পর্কে জড়িয়ে ছিলেন মিতু। বিয়ের পরও বিভিন্নজনের সাথে সেই সম্পর্ক অব্যাহত রাখেন। এমনকি পড়াশোনার জন্য বিদেশে অবস্থানকালেও একাধিক ব্যক্তির সাথে বিবাহবহির্ভুত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন মিতু।

এমনকি শুধু মিতু নন, তার পরিবারের বিরুদ্ধেও উঠছে নানান অভিযোগ। মিতুর উগ্র জীবনযাপনে সমর্থন, আকাশকে মানসিক নির্যাতনসহ নানা অভিযোগ উঠেছে মিতুর পরিবারের বিরুদ্ধে। আকাশের ছোট ভাইয়ের বন্ধু তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরী অভিযোগ করেন, আকাশের আত্মহত্যার জন্য যতকুটু মিতু দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী তার পরিবার। তাদের আমানুষিক নির্যাতনের কারণেই আকাশ আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন।

তিনি অভিযোগ করেন, মিতুর ছোট ভাই আরমান লিউকোমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পর নিজেদের আর্থিক অবস্থা গোপন করে ৮০ লাখ টাকা উত্তোলন করে। মিতুদের আর্থিক অবস্থা না জেনে ওই সময় তিনিসহ কয়েকজন টাকা উত্তোলনের নেতৃত্ব দেন। দেশের বিভিন্ন স্কুল কলেজের ছাত্ররা এ টাকা উত্তোলন করে। কিন্তু আরমানের চিকিৎসার অর্ধেক টাকায় চিকিৎসা ব্যয় না করে নিজেরাই আত্মসাত করেন।

বৃহস্পতিবার ভোর থেকেই দেশব্যাপী আলোচনায় ডাক্তার দম্পতি মোস্তফা মোরশেদ আকাশ ও তানজিলা হক চৌধুরী মিতু। একদিকে, ডা. আকাশের জন্য সমবেদনা অন্যদিকে প্রকাশ পাচ্ছে মিতুর প্রতি মানুষের ক্ষোভ। আলোচনায় মিতুর বেপরোয়া জীবন। বিয়ের আগেই মিতু সম্পর্কে জেনেছিলেন আকাশ। কিন্তু সামাজিক কারণে বিয়েটা মেনে নেন। ভেবেছিলেন অতীত ভুলে স্বামী-সংসার ও কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকবেন মিতু। সবকিছু জানার পরও স্ত্রী মিতুকে ভালোবাসতেন আকাশ। চাইতেন মিতু ফিরুক সঠিক পথে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজ স্ত্রীকে বেপরোয়া জীবন থেকে ফেরাতে না পেরে আত্মহত্যা করেন আকাশ। আত্মহত্যার আগে নিজেই মিতুর আমলনামা বর্ণনা করে গেছেন।

পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার মিজানুর রহমান জানান, বছর তিনেক আগে প্রেম করে বিয়ে করেন ডা. মোস্তফা মোরশেদ আকাশ ও তানজিলা হক চৌধুরী মিতু। বিয়ের পরপরই মিতু তার মায়ের কাছে আমেরিকায় চলে যান। তখন থেকেই বিয়ে বহির্ভূত সম্পর্কের অভিযোগ নিয়ে দুজনের মধ্যে বিরোধ চলছিল। গত ১৩ই জানুয়ারি মিতু দেশে আসার পর এ নিয়ে বিরোধ আরও বেড়ে যায়। বুধবার রাতে এ নিয়ে তাদের মধ্যে ঝগড়া হয়। হাতাহাতিও হয় একপর্যায়ে। এরপর ফোনে খবর পেয়ে গাড়ি নিয়ে এসে মিতুকে নিয়ে যান তার বাবা আনিসুল হক। তার বাবা থাকেন নগরীর পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকায়। মিতু চলে যাওয়ার পরই আত্মহত্যা করেন আকাশ। মিতু বাবার বাসায় গেলেও পরে মিতুকে গ্রেপ্তার করা হয় নন্দনকানন এলাকায় খালাতো ভাইয়ের বাসা থেকে।

গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে মিতু তার বিরুদ্ধে স্বামীর পরকীয়ার সন্দেহের কথা স্বীকার করেন। এ নিয়ে বুধবার রাতে ঝগড়া ও হাতাহাতির কথাও স্বীকার করেন। কিন্তু হোটেলে রাত কাটানোসহ কিছু বিষয় নিয়ে রহস্যময় জবাব দিচ্ছেন। তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী আমানত শাহ (র.) মাজার এলাকা থেকে মিতুর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি জব্দ করেছে পুলিশ। এদিকে ডা. মোস্তফা মোরশেদ আকাশের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটিও পুলিশ জব্দ করেছে।

এদিকে মিতুর একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ২৬ সেকেন্টের ওই ভিডিওতে মিতু নিজের মুখে স্বীকার করেছেন নিজের বিবাহবহির্ভূত একাধিক সম্পর্কের কথা। একজনের জেরার মুখে তিনি বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কথা স্বীকার করেন। ওই ভিডিওতে দেখা যায় মিতু অনেকটা অস্বাভাবিক অবস্থায় ছিলেন। তার মুখের এক কোণে ছিল রক্তের দাগ এবং মারধরের চিহ্ন। ভাইরাল হওয়া ভিডিওটিতে মিতুকে বলতে শোনা যায়, ‘প্যাটেলের সাথে এক্সট্রা ম্যারিটাল অ্যাফায়ার ছিল, আমি শোভনের সাথে, মাহবুবের সাথে হোটেলে গেছি বিয়ের আগে। আকাশের সাথে আমার সম্পর্ক থাকা অবস্থায়। এরপর পুরুষ কণ্ঠে একজনকে বলতে শোনা যায়, আকাশের সাথে তোমার কয় বছরের সম্পর্ক? জবাবে মিতু বলেন, আকাশের সাথে আমার ২০১০ থেকে সম্পর্ক। বিয়ে হয়েছে কত সালে? মিতু বলেন, ২০১৬ সালে। প্যাটেলের সাথে………. করছো? মিতু জবাব দেন, করছি।

অন্যদিকে আত্মহত্যার আগে আকাশ তার ফেসবুকে স্ত্রী তানজিলা হক চৌধুরী মিতুর বিরুদ্ধে পরকীয়ার অভিযোগ ও বিভিন্ন ছবি সম্বলিত যে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন তা ডিলিট করে দেয়া হয়েছে। এটি কে বা কারা করেছে, এ বিষয়টিও তদন্ত করছে পুলিশ। মোবাইলফোন দুটির ফরেনসিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। সেইসঙ্গে মিতুর কললিস্টসহ বিভিন্ন তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে তদন্ত করা হবে চাঞ্চল্যকর এই আত্মহত্যার।

চান্দগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল বাশার জানান, ডা. আকাশ ইনজেকশনের মাধ্যমে শরীরে বিষ প্রয়োগ করে আত্মহত্যা করেছেন। তার শরীরের কোথাও বড় ধরনের আঘাতের চিহ্ন নেই। তবে বাম হাতে ইনজেকশনের সুইয়ের কয়েকটি দাগ রয়েছে। স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করার পর ডা. আকাশ আত্মহত্যা করেন। এর আগে তিনি ফেসবুকে স্ত্রীর বিরুদ্ধে পরকীয়ার অভিযোগ এনে স্ট্যাটাস দেন। পর পুরুষের সঙ্গে স্ত্রীর অন্তরঙ্গ মুহূর্তের কিছু ছবিও ছিল তার ফেসবুক টাইমলাইনে। এসব তথ্য সংগ্রহ করেছে পুলিশ।

নিহত ডা. মোস্তফা মোরশেদ আকাশের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, ছেলের পোশাক, ফ্রেমে বন্দি ছবি বুকে নিয়ে কাঁদছেন আকাশের মা জোবাইদা। সামনে যাকে পাচ্ছেন তাকে জড়িয়ে ধরে ছেলে হত্যার বিচার চাচ্ছেন। তিনি বিলাপ করতে করতে মানবজমিনকে বলেন, দিনের পর দিন আমার ছেলেকে মানসিক অত্যাচর করে আসছিল মিতু। আমার ছেলে আত্মহত্যা করেনি, তাকে অত্যাচার করে হত্যা করা হয়েছে। আমি ছেলে হত্যার বিচার চাই। জোবাইদা বলেন, মিতুর মাও জড়িত, সে সবসময় মিতুকে খারাপ পরামর্শ দিতো। বিয়ের পর থেকে তাদের ঘরে অশান্তি। ওই মাইয়্যার (মিতু) অনেক ছেলের লগে সম্পর্ক ছিল। আমার আকাশ জেনেও বুকে কষ্ট নিয়ে ঘর করেছে।

তাদের এক নিকটত্মীয় বলেন, বাবার মৃত্যুর পর আকাশ গ্রামের বাড়িতে বলেছিল ‘মা তোমাকে শহরে নিয়ে যাব। দরকার হলে ভিক্ষা করে ডাক্তারি পড়ব।’ টিউশনি করে ডাক্তারি পাস করেছে আকাশ। দুই ভাইকে লেখাপড়া করিয়েছে। এক ভাইকে ডাক্তার বানিয়েছে। আরেক ভাইকে প্রকৌশলী। চান্দগাঁও আবাসিকের বি-ব্লকের ২ নম্বর রোডের ২০ নম্বর বাড়ির তিন তলার ফ্ল্যাটে মা, ছোটভাইকে নিয়ে থাকতেন আকাশ। ফ্ল্যাটটিতে আছে তিন বেড, কিচেন, ড্রইং ও ডাইনিং রুম। ড্রইং রুমের পাশের বেডরুমে স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন আকাশ।

চারপাশের দেয়ালে টাঙানো আছে চিকিৎসক দম্পতির কাঠের ফ্রেমে বন্দি একাধিক ছবি। তিনটি বেডরুমের প্রতিটিতেই আছে দামি আলমিরা, সোফা ও শোকেস। এসবে থরে থরে শোভা পাচ্ছে নানা রকমের শো-পিস।

আকাশের মা বলেন, এসব আমার ছেলের কেনা জিনিস। তিলে তিলে সংসার গড়েছে আমার ছেলে। এমবিবিএস পাশের সনদ এনে আমার গলায় ঝুলিয়ে দিয়ে আকাশ বলেছিল ‘মা এ সনদ তোমার। তুমি এটির হকদার’ যেভাবে হোক না কেন এফসিপিএস ডিগ্রি অর্জন করার ইচ্ছা ছিল তার। বাপরে ডিগ্রি তো আর তোমাকে নিতে দিল না। কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন আকাশের মা জোবাইদা।

তিনি বলেন, বউয়ে এত কিছু করলেও ইজ্জতের ভয়ে আমার ছেলে সব সহ্য করে নিয়েছে। ভেবেছিল বউ একদিন ভালো হয়ে যাবে। এ কারণে কাউকে কিছু খুলে বলত না। বাবার রেখে যাওয়া অভাবের সংসারের হাল ধরেছিল সে। ছোট ভাইদের লেখাপড়ার খরচ জুগিয়েছে। সবই করেছে আকাশ। আমার ছেলের সাজানো সংসার তছনছ করে দিয়েছে বউ। আমি ন্যায়বিচার চাই।

তিনি বলেন, মিতু যেটা চেয়েছে সেটা আমার ছেলে এনে দিয়েছে। তার কিছুই অপূরণ রাখেনি। আমার সোনার মানিককে কেমনে ভুলে থাকব।

প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবার ভোর ছয়টা ২০ মিনিটে নগরীর চান্দগাঁও আবাসিকের বি-ব্লকের ২ নম্বর সড়কের ২০ নম্বর বাসা থেকে ডা. মোস্তফা মোরশেদ আকাশের লাশ উদ্ধার করে চান্দগাঁও থানা পুলিশ। ময়নাতদন্ত শেষে রাতে তার লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেছে বলে জানান চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জহিরুল হক ভুঁইয়া।

এ ঘটনায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে তার স্ত্রী চিকিৎসক তানজিলা হক চৌধুরী মিতু ও তার বাবা-মা, বোন ও দুই প্রেমিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁও থানায় মৃত আকাশের মা জোবেদা খানম বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, আসামিরা মানসিক যন্ত্রণা ও উত্তেজনা সৃষ্টির মাধ্যমে আকাশকে আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মৃত্যুরমুখে পতিত করে। এতে অভিযোগ করা হয়, আকাশের সঙ্গে বিয়ের আগে মিতুর অবৈধ সম্পর্ক ছিল তার বন্ধু মাহবুবের সঙ্গে। বিয়ের পর আমেরিকায় গিয়ে অনৈতিক সম্পর্কে জড়ান প্যাটেলের সঙ্গেও। মিতুকে বারবার শোধরানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে আসামিদের চাপে পড়ে আত্মহত্যা করেন আকাশ।