প্রধানমন্ত্রীর আদর্শে ও নির্দেশে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছি: আ জ ম নাছির উদ্দীন

একান্ত সাক্ষাৎকারে আ জ ম নাছির উদ্দীন

এস. এম. আকাশ এস. এম. আকাশ

ব্যুরো চিফ,চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ৭:০২ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৮, ২০২০ | আপডেট: ৭:০৩:অপরাহ্ণ, জুলাই ২৮, ২০২০

বীর প্রসবিনী ও দেশের বানিজ্যিক রাজধানী, বন্দর নগরী চট্টগ্রামের নির্বাচিত নগর পিতা হিসেবে সিটি মেয়র ও চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন দীর্ঘ পাঁচ বছরের মেয়র এর দায়িত্ব পালনের শেষ কর্মদিবস আগামী ৫ আগষ্ট। ২০১৫ সালের ৬ মে শপথ গ্রহণ করে ২৬ জুলাই আনুষ্ঠানিক দায়িত্বভার নেন এই নগর পিতা, যেহেতু প্রথম সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার তারিখ থেকে পাঁচ বছর মেয়াদকাল নথিভুক্ত করা হয়, সেই হিসেবে চসিক এর নির্বাচিত প্রথম সাধারণ সভা হয়েছিল একই বছরের ৬ আগষ্ট, সেই হিসেবে বর্তমান মেয়র এর মেয়াদ শেষ হবে চলতি বছরের ৫ আগষ্টে।

দীর্ঘ পাঁচ বছরের সফলতা ও ব্যার্থতা এবং জনগণের আস্থা নির্ভরতার জায়গায় কতটুকু নিজেকে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে তা নিয়ে একান্ত আলাপচারিতায় “দি বাংলাদেশ টুডে” কে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, ভূ-প্রকৃতিগত ভাবে চট্টগ্রাম হচ্ছে একটি প্রাকৃতিক জনপদ, প্রায় ৭০ লক্ষ জনঅধু্যষিত এই জনপদের কল্যাণ ও উন্নয়নে আমি আমার সামর্থ্য উজাড় করে দিয়েছি, নগরীর প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা, তা নিরসনে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় কিছু মেগা প্রকল্প সংযুক্ত হয়েছে। এগুলো বাস্তবায়নে কাজ চলমান রয়েছে। তবে জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএ, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ওয়াসাসহ যে সরকারি স্বায়ত্ব-শাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো আছে তার পারস্পরিক সমন্বয় প্রয়োজন। নগর উন্নয়নে একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে যেভাবে যা কিছু দরকার তা করতে আমি উদ্যোগী হয়েছি। আমি আশা করি এই প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতা থাকবে, এই প্রচেষ্টা বাস্তবায়নে পরবর্তীতে যারা দায়িত্ব পালন করবেন রাজনীতিক হিসেবে আমি যে অবস্থানে থাকি না কেন তাতে আমি একাত্ব হবো,

মেয়র বলেন, আমাদের এ নগরীর উপর প্রবাহিত ৩৬টি খাল পানি নিষ্কাশনের প্রধান নির্গমন পথ। এ নগরীতে যেগুলো পাহাড় পরিবেষ্টিত এলাকা রয়েছে তা থেকে যে মাটি নিচে নেমে আসে তার ফলে পানি নিষ্কাশন পথ বাধা গ্রস্থ হচ্ছে। এজন্য একটি সঠিক পরিকল্পনা আগেই গ্রহন করা উচিত ছিল। তবে এখন যা হয়েছে তার বাস্তবায়ন যদি সম্ভবপর হয় তাহলে একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমি সমন্বয়ের উপরেই গুরুত্ব দিই। চট্টগ্রামের উন্নয়নের সাথে সংশিস্নষ্ট সরকারি-বেসরকারি ও আধাসরকারি সংস্থার কর্তৃপক্ষগন সরকার নিযুক্ত ও নিয়োগকৃত। তবে জনপ্রতিনিধি হিসেবে মেয়র পদে থেকে জবাবদিহিতার সকল দায়ভার আমার স্কন্ধে চেপে বসেছে।

এই দায় বহন করে আমি কি করতে পেরেছি বা কি করতে পারিনি তার মূল্যায়ন নগরবাসীর উপর ছেড়ে দিলাম। তিনি আরো বলেন, পরিকল্পিত নগরায়নের ক্ষেত্রে যে কোন আবাসিক এলাকায় যুগোপযোগী যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত হলে যেখানে অধিবাসীদের জীবন স্বাচ্ছন্দ হবে। এই যোগাযোগ ব্যবস্থাপনাকে সক্রিয় রাখতেই যে প্রকল্প শুরু হলো তার সুষ্ঠু ও যথাযথ বাস্তবায়ন সম্ভব হলে সকলেই উপকৃত হবেন।

করোনা মোকাবেলায় মেয়র হিসেবে তার অবস্থান ও বিভিন্ন উদ্যোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মেয়র নাছির বলেন, আমি বরাবরই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনার আদর্শে ও নির্দেশে নিজেকে পরিচালিত করেছি, কোথাও হার মানিনি এবং অন্যায়ে মাথা নত করিনি, নগরবাসীর সুরক্ষা ও কল্যাণে বদ্ধপরিকর ছিলাম ও আছি।

ত্রাণসামগ্রী বিতরণের প্রসঙ্গে সিটি মেয়র বলেন, জননেত্রী শেখ হাসিনা, মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগে লুটেরাদের দর্পচূর্ণ করবে, দুর্যোগকালীন দুর্বিপাকে যারা মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগে দুর্বৃত্তপনার মাধ্যমে লুটপাট করছে তারা যতই ক্ষমতাধর এবং তাদের খুঁটিরজোর থাকুক না কেন আইনের আওতায় এনে তাদের দর্পচূর্ণ করা হবে। তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা কোন গড-ফাদারও রেহায় পাবেন না। কারণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্যোগকালীন পরিস্থিতি মোকাবেলার বিষয়টি নিজেই মনিটরিং করছেন এবং তার ডিকশনারীতে দুর্বৃত্তদের ক্ষমা বা ছাড় দেয়ার মত কোন শব্দার্থ নেই। একমাত্র শেখ হাসিনার সরকারের পক্ষেই সম্ভব জনগণের যে কোন পরিস্থিতিতে ভাগ্য বিনির্মান করা।

নির্বাচনে জনগণকে দেয়া ৩৬ দফা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রশ্নে মেয়র নাছির উদ্দীন বলেন, পাঁচ বছর দায়িত্ব পালনে চট্টগ্রাম নগরবাসীর অর্জিত ভালোবাসা আর বিশ্বাসই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া, আমি মেয়র হিসেবে নয় একজন সেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি এবং জনগণের পাশে ছিলাম ও থাকবো ইনশাআল্লাহ।
নিয়মনীতির মধ্যে থেকে নিজের সর্বোচ্চ সম্ভব সবটুকু করেছি এবং যথেষ্ট সাফল্য আছে যার বিশ্লেষণের দায়িত্ব নগরবাসীর উপর ছেড়ে দিলাম। নগরবাসীর যে ভালোবাসা ও বিশ্বাস তৈরি হয়েছে তা ধরে রাখতে আজীবন সক্রিয় থাকবো, এবং এই ভালোবাসা আমার জন্য বড় পাওয়া।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু আদর্শ ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নীতি কে ধারণ করে আওয়ামী রাজনীতি তে আমার পথ চলা, আমার জীবনের লক্ষ্য ছিল চট্টগ্রামের জন্য কল্যাণময় কিছু করা এবং সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা। পদ পদবীর মোহ কোন কালেই আমার ছিল না, প্রিয় জননেত্রীর আস্থা ও স্নেহময় মমতায় রাজনীতি করতে করতে এ সমস্ত কিছু পেয়েছি যার সবটুকু অর্জনের পেছনে চট্টগ্রামবাসির অবদান অনস্বীকার্য। চট্টগ্রাম সিটি মেয়র হয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি সমৃদ্ধ শহর ও আধুনিক সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করণে, প্রতিটি স্তরের নাগরিকদের জন্য নিশ্চিত বাসযোগ্য শহরে রুপান্তর করার স্বপ্নে দিনরাত পরিশ্রম করেছি এবং গৃহীত কিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে ও কিছু প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

গত পাঁচ বছরে ৬ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করেছি এর মধ্যে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ শেষ হয়েছে। যদি পরিসংখ্যান দেখেন তবে বুঝতে পারবে নগরবাসী, গত ১৯৯৫ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত চট্টগ্রাম সিটিতে উন্নয়ন কাজে ব্যায় হয়েছে মাত্র আড়াই হাজার কোটি টাকার। আর আমার ৩৬ দফার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কতটুকু পেরেছি তার মূল্যয়ন চট্টগ্রাম নগরবাসীর উপর রইল।

মেয়র হিসেবে আমি সব প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছি, ক্লিন সিটি ও গ্রিন সিটি রুপান্তরে দৃশ্যমান পরিবর্তন এনেছি, গোটা চট্টগ্রাম মহানগর আজ সবুজে রুপ নিয়েছে, জলাবদ্ধতার ক্ষেত্রে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। বিগত বছরগুলোতে শহরের ৫০ শতাংশ এলাকায় সড়ক বাতি ছিল না, সেই জায়গায় চট্টগ্রাম নগরীকে শতভাগ আলোকায়ন করা হয়েছে, ইতিমধ্যে ৮৬ কিলোমিটার সড়কে এলইডি লাইট লাগানো সম্পন্ন হয়েছে, এবং চলমান রয়েছে আরও ৭৮ কিলোমিটার সড়কে এলইডি স্থাপনের কাজ।

পরিচ্ছন্ন সেবার প্রশ্নে মেয়র নাছির বলেন, এ সাইডেও দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে, বিগত বছরগুলোতে খোলা জায়গায় ১৩৫০ টি ডাস্টবিন ও ড্যাম্পিং স্টেশন ছিল, যা ৩৫০ এ নামিয়ে আনা হয়েছে, তখনকার সময়ে দিন ব্যাপী অন স্পটে ময়লা পড়ে থাকতো যেটা এখন আর নেই। এটা অনেক অর্জন কর্পোরেশনের, দিনের বেলায় ময়লা আবর্জনা অপসারণ প্রথা পরিবর্তন করে আমি সেটা রাতে নিয়ে এসেছি এবং ডোর টু ডোর ময়লা আবর্জনা অপসারণ ও সংগ্রহ কর্যক্রমের মাধ্যমে নগরে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।

বিগত পাঁচ বছরের সফলতার প্রশ্নে আ জ ম নাছির আরও বলেন, গোটা শহর জুড়ে বিলবোর্ড অপসারণ কর্যক্রম ছিল আমার অন্যতম সাফল্য, প্রাকৃতিক মেলবন্ধনের চট্টগ্রাম আজ প্রকৃত সৌন্দর্যে রুপ নিয়েছে, শত প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে এ অর্জন হয়েছে, আশা করছি এর ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে। এবং
undp এর LIUPC কতৃক প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৪ লক্ষ ২০ হাজার পরিবারে স্যানিটেশন ভাতা প্রদান করা, ২০১৪৮ পরিবারে ১৫০০ টাকা করে করোনাকালিন সুরক্ষা ভাতা প্রদান এবং ৩৮৪ টি হ্যান্ড ওয়াশ পয়েন্ট স্থাপন করা হয়েছে, বিশেষ করে রবীন্দ্র নজরুল একাডেমি, আউটার স্টেডিয়াম এর মুক্ত মঞ্চ নির্মাণ, স্কুল কাম সাইক্লোন সেন্টার নির্মাণ অন্যতম ছিল আমার কর্মযজ্ঞে। পাশাপাশি ১৩০৯ টি পরিচ্ছন্ন কর্মীর পরিবারের জন্য ৭ টি ভবন এর কাজ চলমান রয়েছে।

এছাড়াও শহর জুড়ে আলোকায়ন এবং মোড় গুলোতে ও সড়কের আইল্যান্ডে,পরিত্যক্ত খোলা জায়গা, সড়ক দ্বীপে দৃষ্টিনন্দন ও সবুজ বাগানে রুপান্তর করা হয়েছে যা সৌন্দর্যের পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় কাজ করছে।

অত্যন্ত তৃপ্তির ঢেঁকুরে সিটি মেয়র বলেন, সিটি করপোরেশনের সবকটি বিভাগের আমুল পরিবর্তন এসেছে যা অতীতের তুলনায় বিরল দৃষ্টান্ত। কর্পোরেশন সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও সকল কর্মকর্তা কর্মচারী, প্রকৌশলী, ডাক্তার- নার্স, শিক্ষক সহ সকল স্তরের কর্মকর্তা গন যথেষ্ট নিষ্ঠার সাথে একযোগে আমার পাশে থেকে নগর উন্নয়নে সহযোগিতা করেছে যার দরুন আমি গোটা কর্পোরেশন সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে কৃতজ্ঞ। সৃষ্টি কর্তার কাছে ধন্যবাদ জানায় যে, আমার মেয়াদ কালে সর্বোচ্চ কর আদায় করতে পেরেছি, সেই সাথে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে প্রচুর পরিমাণ ভর্তুকি দিয়েও এই জন কল্যাণ মূলক প্রতিষ্ঠানে সেবা নিশ্চিত করণে সার্বক্ষণিক নিয়োজিত ছিলাম, প্রতিষ্ঠানের উর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ ও সংস্কার এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মান অক্ষুন্ন রেখে উন্নয়ন অব্যাহত রাখাটাই ছিল আমার বড় চ্যালেঞ্জ ও পুরস্কার।

পরিশেষে মেয়র নাছির বলেন, আরও অনেক ইচ্ছে ছিল নগরবাসির সেবায় আরও কিছু পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার, যদি কখনো সুযোগ পাই তবে চট্টগ্রাম বাসির জন্য আমার কিছু অপূর্ণ ইচ্ছের বাস্তবায়ন করবো ইনশাআল্লাহ্।