প্রবাসীর ‘কয়েন বক্স’ বিত্তান্ত

টিবিটি টিবিটি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ৭:৫১ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৬, ২০১৮ | আপডেট: ৭:৫১:পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৬, ২০১৮

গ্রামের মানুষদের স্বল্প আয়ে দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ করে খুব কম অর্থই বাঁচে জমানোর জন্য। নদী ভাঙনের পর আমাদের জীবনযাত্রা অনেকটা দিন এনে দিন খাওয়ার মতো অবস্থা ছিল।

আমার মা পাঁচ পয়সা, দশ পয়সা, চার আনা, আট আনা করে জমাতেন এতকিছুর পরও। এখন তো আর সেই মুদ্রাগুলো নাই, হয়তো জাদুঘরে গেলে দেখতে পাওয়া যাবে। কিন্তু তখনকার দিনে এই মুদ্রাগুলো দিয়ে অনেক কিছুই কিনে ফেলা যেত।

তখন এই খুচরা পয়সাগুলো রাখা হতো মাটি, ছন, বাঁশের তৈরি ঘরে খুঁটি হিসাবে বাঁশ ব্যবহার করা হতো। এই খুঁটিগুলার মধ্যে যে খুঁটিটা একটু হৃষ্ট-পুষ্ট, তার কোনো এক অংশকে নির্বাচন করা হতো ব্যাংক হিসাবে। তারপর দুই গিরার মাঝের অংশের উপরের দিকের অংশে যাতে শুধু পয়সা ঢোকে, এমন আকারের উপ-বৃত্তাকার ছিদ্র করা হতো। তারপর সেই ছিদ্র দিয়ে ভেতর পয়সা ফেলা হতো।

এভাবে ফেলতে ফেলতে একসময় সেটা ভরে যেত। আর সেটা বোঝা যেত পয়সা ফেলার পর তার শব্দের মাত্রা শুনে। কারণ উপর থেকে পয়সা পড়লে জোরে শব্দ হবে। আর যদি কাছাকাছি পড়ে, তাহলে কম শব্দ হবে। তবে ওই বয়সে তো আর সেটা বুঝতাম না, তাই মায়ের এই দক্ষতাটাকে আমার যাদুর শক্তি মনে হত।

এরপর সেই ব্যাংকের একেবারে তলার দিকে আবার ঠিক একই সাইজের একটা ছিদ্র করা হতো এবং কাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে পয়সাগুলো বের করে আনা হতো। কখনোই ছিদ্র দুইটা বড় করে তৈরি করা হতো না, কারণ তাতে আবার খুঁটির শক্তি কমে যাবে। এভাবে জমানো টাকা দিয়ে আমার মা সংসারের অনেক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতেন।

এর বাইরে ছিল মাটির তৈরি বেলুন আকৃতির পাত্র, যেটাকে গ্রামের ভাষায় ‘ব্যাংক’ বলা হতো। কখনোই মেলা বা কোনো হাটে গেলে আব্বা মায়ের জন্য একটা ব্যাংক কিনে আনতেন। ঠিক একইভাবে মা সেটাতে পয়সা জমাতেন। আর বিপদের দিনে সেটা ভেঙে সেই জমানো পয়সা দিয়ে উদ্ধার পেতেন।

আমার নিজের অবশ্য অন্য রকমের একটা ব্যাংক ছিলো, যেটার কথা শুধু আমিই জানতাম বা জানি। সেটা ছিলো ছনের চালের ছনের ভেতরে। সেখানে আমি টাকা বা পয়সা লুকিয়ে রাখতাম। আর পাশের কোনো একটা চিহ্ন ঠিক করে রাখতাম যাতে পরের বার খুঁজে পাই। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ওই লুকানো টাকাগুলো আর খুঁজে পেতাম না। বিশেষ করে তখন নতুন নতুন এক টাকা বা দুই টাকার নোটের প্রতি আমার আগ্রহ বেশি ছিল। এভাবে লুকাতে গিয়ে অনেক টাকা হারিয়েছি।

আমার মেয়ে তাহিয়া প্রতিদিন ওর নানার কাছ থেকে একটা করে দুই টাকার নোট নিতো। ওর নানা অফিস থেকে আসার পর মানিব্যাগটা পকেট থেকে বের করে রাখার সঙ্গে সঙ্গে সে ওখান থেকে একটা দুই টাকার নোট সরিয়ে রাখতো। তারপর সেই দুই টাকার নোট সে তার নিজস্ব পার্সে নিয়ে রাখে।

এভাবে তাহিয়ার বেশ টাকা জমা হল। এখানে একটা ব্যাপার লক্ষণীয়, সে কখনোই আমার কাছ থেকে টাকা নেয় না। একবার ওর নানা ওকে জিজ্ঞেস করেছিল, “তুমি তোমার বাবার কাছ থেকে টাকা নাও না কেন?” সে বলেছিল, “তাহলে বাবার টাকা কমে যাবে না?” আমার লক্ষ্মী মেয়ে।

এরপর ঈদে বেশ কিছু টাকা সালামিও পেল তাহিয়া, তখন সে বায়না ধরলো, “বাবা একটা ব্যাংক কিনে দাও।” আমি প্রায় প্রতিদিনই ভাবি অফিস থেকে ফেরার পথে ওর জন্য একটা ব্যাংক নিয়ে যাব এবং প্রতিদিনই ভুলে যাই। আর ওর কাছে বকাও খাই।

একদিন অনেক করে মনে রেখে ওর জন্য ব্যাংক কিনে আনলাম। তখন থেকে সে তার দুই টাকার নোটগুলো ওই ব্যাংকের মধ্যে রাখতো। হয়তো একদিন বেশ কিছু টাকা জমা হয়েও যাবে। তখন সেটা দিয়ে ওকে একটা কিছু কিনে দেওয়া যাবে। আমি শুধু চেয়েছিলাম, ওর একটা উপলব্ধি হোক যে এইভাবে সামান্য কিছু টাকা করে জমালেও একসময় অনেক টাকা হবে এবং সেটা দিয়ে একটা ভালো কিছু কেনা যাবে।

তারপর একসময় সবকিছু ছেড়ে যখন অস্ট্রেলিয়া চলে আসতে হল, তখন সঙ্গত কারণেই মাটির ব্যাংকটা সাথে নেওয়া সম্ভব হলো না। কিন্তু মনের মধ্যে একটা ইচ্ছা কাজ করছিল, যদি এখানেও তাহিয়াকে একটা ব্যাংক কিনে দিতে পারতাম, তাহলে ওর টাকা জমানোর অভ্যাসটা ধরে রাখা যেত।

একদিন একটা দোকানে গিয়েছি তাহিয়ার জন্য কিছু খাতাপত্র কিনতে। সেখানে দেখি টিনের কৌটা। যেগুলোকে অস্ট্রেলিয়ার ভাষায় ‘কয়েন বক্স’ বলে। কয়েন বক্সের উপরের পিঠে মাটির ব্যাংকের মতো একটা ছিদ্র করা যেটা দিয়ে ভেতরে পয়সা ফেলা যায়। আমি একটু দ্বিধা নিয়ে দোকানিকে এটা কী, জানতে চাইলাম। উইন বললেন যে এটাতে কয়েন জমাতে হয়।

এরপর থেকে তাহিয়া প্রতি বছর একটা কয়েন বক্সে কয়েন জমাতে শুরু করলো। আমি অফিস থেকে ফেরার সাথে সাথেই সে আমার মানিব্যাগ থেকে কয়েনগুলো নিয়ে তার কয়েন বক্সে ফেলে। এইভাবে প্রথম বছর শেষে ভাবলাম, এগুলো সত্যিকার ব্যাংকে জমা দিয়ে আসি। আমি, তাহিয়া আর রায়ান সাথে করে কয়েন বক্সটা নিয়ে একদিন ব্যাংকে হাজির হলাম।

ব্যাংকে কয়েন জমা দেব, কিন্তু সেটা কাটার ব্যবস্থা ব্যাংকে নেই। তাই পাশের দোকান থেকে একটা কাটার এনে সেটা দিয়ে কয়েন বক্সের উপরের অংশ কেটে কয়েন জমা দেওয়ার জায়গায় কয়েনগুলো ঢেলে দিলাম। মোট দুইবার ঢালতে হলো কয়েনের পরিমাণ বেশি হবার কারণে। ব্যাংক গুণে গুণে কয়েনগুলো নিয়ে অচল পয়সাগুলো ফেরত দিয়ে দিল।

টাকার পরিমাণ শুনে তাহিয়া খুবই খুশি এবং জমানোর ব্যাপারে উৎসাহী হল। ব্যাংকে দুজনের হিসাব খোলার পর ব্যাংক থেকে প্লাটিপাস আকৃতির আরও একটা করে কয়েন বক্স দুজনকে দিয়ে দিল। ফেরার পথে আমরা আবার একই দোকান থেকে আরও একটা কয়েন বক্স কিনে আনলাম।ৱ

এছাড়াও আমি বিভিন্ন উপলক্ষে তাহিয়াকে কয়েন বক্স উপহার দিই। এভাবে একসময় তাহিয়ার চারটা কয়েন বক্স হয়ে গেলো। এমনকি বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে তাহিয়াও আমাকে কয়েন বক্স উপহার দেওয়া শুরু করলো। তাই সবমিলিয়ে তাহিয়ার এখন পাঁচটা কয়েন বক্স।

গত বছরের জমানো কয়েনগুলো অবশ্য সময়ের অভাবে ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়নি এখনও। তাতে ভালোই হয়েছে, কারণ কিছুদিন আগে সংসারের প্রয়োজনে আমরা তাহিয়ার কয়েন বক্স কেটে সেখান থেকে খরচ করেছি। অবশ্য তাহিয়া হিসেব করে রেখেছে আমরা কত টাকা ওর কাছ থেকে ধার নিয়েছি।

লেখক: অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী

মেইল: [email protected]