বাংলাদেশের ইতিহাসে নৃশংস সব ঘটনার একটি ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা

প্রকাশিত: ৪:৩৬ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৯, ২০২০ | আপডেট: ৪:৩৬:অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৯, ২০২০

মানব জাতি মানব সভ্যতার ধারাবাহিক ইতিহাসের ধারায় এমন কিছু দুঃখজনক ,বেদনাদায়ক, হৃদয় গ্রাহী ঘটনা সংযোজিত হয়েছে যা অধ্যায়ন করলে মন শুধু ব্যথিত ও মর্মহত হয়। এমনি একটি ঘটনা ২১ শে আগস্ট গ্রনেড হামলা। বাংলাদেশে এটা দ্বিতীয় কলঙ্কজনক অধ্যায়। প্রথমটি ছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু, সর্বকালের শ্রেষ্ট বাঙ্গালী শেখ মুজিব হত্যা।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে এক সমাবেশে জড়ো হয়েছিলেন সিনিয়র নেতারা। দলটির প্রধান এবং তখনকার বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা ছিলেন ওই সমাবেশের প্রধান অতিথি। আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে রাস্তায় একটি ট্রাকে অস্থায়ী মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল। বিকাল ৩টা থেকে দলটির কিছু মধ্যম সারির নেতা বক্তব্য দেয়া শুরু করেন। বিকাল ৪টার দিকে শুরু হয় আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের বক্তব্য দেয়ার পালা। দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা তখনও এসে পৌঁছাননি। দলের নেতাকর্মী এবং সমর্থকরা শেখ হাসিনার বক্তব্য শোনার অপেক্ষায় ছিলেন।

শেখ হাসিনার বক্তব্য শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দফায়-দফায় বিস্ফোরণের শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। সমাবেশে উপস্থিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা প্রথমে বুঝতে পারেননি যে এটি ছিল গ্রেনেড হামলা। অনেকেই ভেবেছিলেন বোমা হামলা। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা ঘটনার ভয়াবহতা সম্পর্কে আঁচ করেছিলেন।

যখন গ্রেনেড হামলা শুরু হয়, তখন মঞ্চে বসা আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা শেখ হাসিনার চারপাশে ঘিরে মানবঢাল তৈরি করেন, যাতে তার গায়ে কোনো আঘাত না লাগে। যেসব নেতা শেখ হাসিনাকে ঘিরে মানবঢাল তৈরি করেছিলেন, তাদের মধ্যে ছিলেন ঢাকার সাবেক মেয়র মোহাম্মদ হানিফ। তখন হানিফের মাথায় গ্রেনেডের আঘাত লেগেছিল। পরে ২০০৬ সালের শেষের দিকে তিনি মারা যান।

গ্রেনেড হামলায় আহত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভি রহমান, যিনি পরে মারা যান। ওই গ্রেনেড হামলায় ২৪ জন নিহত হন। এতে আহত হন আরও অনেকে।

গ্রেনেড হামলায় আহত অনেকেই এখনও শরীরে আঘাত নিয়ে বেঁচে আছেন। তার বর্তমান জীবন ছাড়াও জানিয়েছেন সেদিনের নৃশংস ঘটনার বিস্তারিত বর্ননা দেন। সেদিন মৃত ভেবে তাকে ফেলে রাখা হয়েছিল লাশের ট্রাকে। হাসপাতালে নিলে কেটে ফেলতে চেয়েছিল অসংখ্য স্প্লিন্টারে ক্ষত-বিক্ষত পা।

নাসিমা ফেরদৌস তখন ছিলেন ঢাকা মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। সে দিনের ঘটনার বর্ণনায় তিনি বলেন, আইভি আপাসহ আমরা ট্রাকের পাশেই দাঁড়ানো ছিলাম। আপার বক্তৃতা শেষ হয়েছে মাত্র। তখন সাংবাদিক গোর্কি বলেন, আপা একটু দাঁড়ান, আমি ছবি তুলতে পারিনি। এই কথা শোনার পরে আপা একটু দাঁড়ালেন, তখনই বিকট শব্দ।

আইভি আপার পিঠের সঙ্গে আমার বুকের অর্ধেকটা লাগানো। যখন শব্দটা হলো প্রথম কিছু বুঝে উঠতে পারিনি। আইভি আপা চিৎকার দিয়ে উঠলেন। আমি চেষ্টা করছিলাম তাকে ধরব। কিন্তু সেই শক্তি আমারও নেই। কিছুই করতে পারছি না। মঞ্চের দিকে তাকিয়ে দেখি নেত্রীকে (আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে) ঘিরে মানবঢাল তৈরি করা হয়েছে। আমি তখন তাকে দেখতে পারিনি। এরই মধ্যে আরেকটি শব্দ। দ্বিতীয়টাতে আমার পেটে অনেক স্প্লিন্টার লাগে। পায়ে কতগুলো লেগেছে বলতে পারব না।

আমি দেখছিলাম আমার পা টুকরো টুকরো হয়ে ছুটে যাচ্ছে। আমি গুছিয়ে আনতে চেষ্টা করছি। কিন্তু পারছি না। আমি তাকিয়ে দেখছি আমার চারপাশে শুধু রক্ত এবং লাশ আর লাশ। তখন আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। আমার জ্ঞান ফিরলে দেখি, আমি একটা ট্রাকের মধ্যে। আমার ওপরে অনেক লাশ। জ্ঞান ফেরার পর আমি যন্ত্রণায় আবার চিৎকার করতে থাকি। তখন আমাকে কিছু মানুষ সেখান থেকে বের করে কাঁধে নিয়ে যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এক সাংবাদিক আমাকে বারবার বলছিলেন আপনার ফোন দেন। কিন্তু বারবার চেষ্টা করেও পারছিলাম না। অনেক চেষ্টার পর নম্বর বলতে পারি। সেই সাংবাদিকই আমার ছেলেকে ফোন করে জানান।

ভয়ঙ্কর সেই দিনের বর্ণনা করতে গিয়ে রুমা বলেন, তখন আমি তৎকালীন কোতোয়ালি থানা মহিলা লীগের সম্পাদক ছিলাম। সেই দিন ২১ আগস্ট সাঈদ খোকনের সঙ্গে আমরা সমাবেশস্থলে যাই। বেলা দেড়টার দিকে আমরা ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে পৌঁছায়।

সমাবেশস্থলে ট্রাকের পশ্চিম পাশে আইভি আন্টির সঙ্গে ছিলাম। দাঁড়িওয়ালা একটা ছেলেকে দেখে আন্টিকে বললাম ছেলেটি মহিলাদের দিকে কেন? ছেলেটি আমাদের পাশের মার্কেটের দিকে ইশারা করল। আমরা দুজনে সেদিকে তাকালাম। এর মধ্যে ছেলেটি আমার বাম দিক দিয়ে চলে গেছে। এ সময় আমি মাত্র ডান পা বাড়িয়েছি। তখনই প্রথম বিস্ফোরণটা হয়। পরে রাস্তায় পড়ে যাই।

এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগ সমাবেশে কয়েকটি মিলিটারি-গ্রেডের গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। সেই হামলায় আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের ২৪ জন নেতাকর্মী নিহত ও স্প্লিন্টারের আঘাতে ৩শ’র বেশি জন আহত হয়। নিহতদের মধ্যে ছিলেন মহিলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমান। আহতদের মধ্যে অনেকের জীবনযাপন দূর্বিষহ হয়ে উঠেছে। তখনকার বিরোধী দলীয় নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আক্রমণ থেকে রক্ষা পেলেও, কানে আঘাত পান, যার প্রভাবে আজ পর্যন্ত তিনি ভুগছেন।

আক্রমণের লক্ষ্যটি সহজ ছিল: শেখ হাসিনাকে হত্যা করে দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে নির্মূল করা। এটি বাংলাদেশের মাটিতে সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক সন্ত্রাসী হামলার একটি ছিল। এটি ছিল সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী হামলা, কারণ এটি রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট ছিল এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের নির্মূল করার জন্যই এই হামলা চালানো হয়।

সংক্ষেপে বলা যায়, হামলাটি চালায় হরকাতুল জিহাদ নামে একটি জঙ্গি সংগঠন (হুজি)। এরসাথে বিএনপি’র তৎকালীন যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান, সরকারের তৎকালীন মন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, বিএনপি’র উপ-শিক্ষামন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, জামায়াতে ইসলামের সমাজকল্যাণমন্ত্রী আলী আহসান মুজাহিদ, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিস চৌধুরী, গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই এবং এনএসআইয়ের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা এবং আইন প্রণয়নকারীরাও সন্ত্রাসী হামলার সাথে জড়িত ছিলো। এছাড়া, কাশ্মিরভিত্তিক বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন, হিজবুল মুজাহিদিন, তেহরিক জিহাদ-ই ইসলাম, লস্কর-ই-তৈয়বা এবং মিয়ানমার ভিত্তিক রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) সহ বেশ কয়েকটি বিদেশি গোষ্ঠি এর সাথে জড়িত ছিল। এই ভয়ঙ্কর অপরাধের বিচারকাজ এখন সম্পন্ন। ২০১৮ সালের ১০ই অক্টোবর রায় ঘোষণা হবে। আর এই ন্যায় বিচার পেতে পার হয়ে গেলো ১৪টি বছর।

হামলার মুল উদ্দেশ্য: চার্জশিট, বাদীদের সাক্ষ্য প্রমাণ, হরকাতুল জিহাদের (হুজি) প্রধান মুফতি হান্নান এবং খালেদা জিয়ার ভাগ্নে ও তৎকালীন এপিএস -১ সাইফুল ইসলাম ডিউকের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, এটি পরিষ্কার হয়ে গেছে যে এই আক্রমণের উদ্দেশ্য এমন ছিল-

খালেদা জিয়ার ছেলে ও বিএনপি’র তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রধান তারেক রহমান, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করে। এই কাজের জন্য হুজি সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করা হয়। অবশ্য, হুজিদের বিকৃত মতাদর্শের কারনে তাদের খুব বেশি জোরাজুরি করতে হয়নি। কারণ ধর্মনিরপেক্ষ নেতৃত্বের জন্য শেখ হাসিনাকে তারা ‘ইসলামের শত্রু’ বলে বিবেচিত করে।

হামলার কয়েকদিন আগেই গুলশানে ‘হাওয়া ভবন’ নামে পরিচিত তারেক রহমানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে হামলার চূড়ান্ত পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছিলো। তারেক রহমান এবং তার অন্যান্য সহযোগীদের সাথে হুজি সন্ত্রাসীরা সেখানে সাক্ষাৎ করে নির্দেশনা গ্রহণ করে এবং সার্বিক প্রশাসনিক সহায়তা নিশ্চিত করে। এই সহযোগীদের যার মধ্যে রয়েছেন- তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিস চৌধুরী, জামায়াতে ইসলামীর মহাসচিব ও তৎকালীন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, এনএসআই এর মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুর রহিম ও ডিজিএফআই এর পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী। মুফতি হান্নানের স্বীকারোক্তিমূলক বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী মেজর নূর চৌধুরীও সেই হামলার ঘটনায় সক্রিয় অংশগ্রহণকারী ছিলেন।

তারেক রহমানের রাজনৈতিক কার্যালয় হাওয়া ভবনে বিএনপি’র সংসদ সদস্য শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ হুজি আক্রমণকারীদের এবং বিএনপি-জামায়াতের পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে বৈঠকের ব্যবস্থা করেন। হাওয়া ভবনে ছাড়াও মোহাম্মদপুরের হুজি’র আস্তানায় এবং ধানমন্ডিতে বিএনপি’র উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর বাসভবনে অন্যান্য পরিকল্পনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সময় তাজউদ্দীন নামের একজন হুজি সদস্য হত্যাকারীদের কাছে গ্রেনেড সরবরাহ করে। মুফতি হান্নানের স্বীকারোক্তিমূলক ভিডিও দেখা এই হামলায় আরো একজন অভিযুক্ত আসামি পাকিস্তানী সন্ত্রাসী আবু ইউসুফ এক স্বীকারোক্তিমূলক বিবৃতিতে বলেছে, পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-জিহাদি (টিজেআই) এর নেতা মুজফফর শাহ গ্রেনেডগুলো তাজউদ্দিকে সরবরাহ করে। কিভাবে হুজিরা বিএনপি সরকারের উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুর থেকে সমর্থন নিশ্চিত করে সে বিষয়েও কথা বলেন।

অপারেশন: ‘লাইট স্ন্যাক্স ফর শেখ হাসিনা’ হামলার একদিন আগে, ২০শে আগস্ট হুজি হত্যাকারীরা, কাজল এবং আবু জান্ডাল বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে হামলার স্থান পরিদর্শন করেন। অপারেশনটির নাম ছিল ‘লাইট স্ন্যাক্স ফর শেখ হাসিনা’ (শেখ হাসিনাকে নাশতা করানো)। ২১শে আগস্ট, তারা বাড্ডায় একটি পুর্বনির্ধারিত বাড়িতে সাক্ষাৎ করে। সেখানে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে হামলাকারী কাজল ও আবু জান্দালের নেতৃত্বাধীন মোট ১২ জন ওই ঘটনায় অংশ নেবে। তারপর তারা একসঙ্গে নামাজ পড়বে এবং মধ্যাহ্ন ভোজ করবে। চূড়ান্ত বৈঠকের পর মাওলানা সাঈদ জিহাদের বক্তৃতা দেন। এরপর মুফতি হান্নান ১২ জন হামলাকারীর কাছে ১৫টি গ্রেনেড হস্তান্তর করেন।

আলোচনা অনুযায়ী আসরের নামাজের পর তারা সবাই গোলাপ শাহ মাজারের কাছে ফিরে গেল। এরপর তারা ট্রাকের চারপাশে অবস্থান নেয় যেখানে আওয়ামী লীগ নেতারা সমাবেশে বক্তব্য রাখেন। শেখ হাসিনার বক্তব্য শুরু হলে আবু জানদাল প্রথম গ্রেনেডটি নিক্ষেপ করে। তারপর, প্রত্যেকে নিজের গ্রেনেড নিক্ষেপ করে ওই স্থান ত্যাগ করে। আগে থেকেই নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সহায়তা পাওয়ায় হামলাকারীরা দিবালোকে অপরাধ করে পালিয়ে যেতে পারে।

২০০৪-০৬: তদন্ত ও বিচারকাজে বাধা যেহেতু জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় সরকার ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা আক্রমণের পরিকল্পনার সাথে জড়িত ছিলো এ কারণেই ক্ষমতায় থাকাকালীন ২১ শে আগস্ট গ্রেনেড হামলায় জড়িতদের সঠিক তদন্ত না করার পক্ষে ছিলো। প্রকৃতপক্ষে, তারা প্রক্রিয়াটির বিপরীতে কাজ করে তদন্তটি অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিয়েছিলো এবং আক্রমণকারীদের বিচার থেকে মুক্তি পেতে সহায়তা করেছিল।

ওই হামলার সব ঘটনাগুলো একদমই স্পষ্ট ছিল। সাধারণত, স্বেচ্ছাসেবক ও ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ সব ধরনের সভা সমাবেশে আওয়ামী লীগের নিরাপত্তা বজায় রাখতে কাজ করতো। এমনকি নিকটবর্তী ভবনগুলোর ছাদ থেকেও তারা নিরাপত্তা রক্ষায় কাজ করতো। কিন্তু ২০০৪ সালের ২১ শে আগস্ট, স্বেচ্ছাসেবকদের আশপাশের ভবনের কোন ছাদে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়নি।

গ্রেনেড বিস্ফোরণের পরপরই, পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে এবং যেসব নেতাকর্মীরা আহতদের উদ্ধার করছিলো তাদের ওপর লাঠিচার্জ করে। ওই সময়ই তারা হামলাকারীদের পালিয়ে যেতে সাহায্য করে। হামলার পরবর্তী সময়ে সেখানে থেকে ঘটনার আলামত ও প্রমাণ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ওই এলাকা বন্ধ করা হলেও সেখানকার প্রমাণ ধ্বংস করতে ওই এলাকা সাবানমিশ্রিত পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলা হয়। এমনকি উদ্ধারকৃত গ্রেনেডগুলোও সংরক্ষণ না করে ধ্বংস করা হয়।

শুধুমাত্র লোক দেখানোর জন্য, তখন বিএনপি-জামায়াত সরকার বিচারপতি জয়নাল আবেদীনের নেতৃত্বে এক ব্যক্তি দ্বারা জুডিশিয়াল কমিশন গঠন করে। অত্যন্ত হাস্যকরভাবে তদন্তকাজ শেষ করে এই কমিশন উপসংহার টেনেছিলো যে ‘বিদেশি ও স্থানীয় শত্রুরা’ এই হামলা চালিয়েছিল। দুই বছর পরে একই বিচারপতি জয়নাল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে উন্নীত হন, সম্ভবত তার ‘রিপোর্ট’ এর জন্যই তাকে পুরস্কৃত করা হয়।

বিএনপি-জামায়াত সরকারের বিচার প্রক্রিয়ার অবসান ঘটানোর মূল কৌশলগুলির মধ্যে একটি ছিল নির্দোষ ব্যক্তিদেরকে জড়িত করা। উদাহরণস্বরূপ, ক্ষুদ্র অপরাধী জজ মিয়া, ২১ শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার মিথ্যা অভিযোগে জড়িত ছিল। ২০০৫ সালের ১০ জুন ফৌজদারি তদন্ত বিভাগের কর্মকর্তারা জজ মিয়াকে তার নিজ বাড়ি গ্রেফতার করে। তিন বছর পর নির্দোষ প্রমাণিত হলে তাকে কারাগার থেকে মুক্তি দেয়া হয়। একই রকম আরেকজন ব্যক্তি ছিলেন যার নাম পার্থ, যাকে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে বলা হয়। ওই নির্যাতনের কারণে এখনও পোস্টট্রমাটিক বিষন্নতায় ভুগছেন তিনি।

হামলাকারীদের অন্যতম পরিকল্পনাকারী ও আক্রমণকারী সন্ত্রাসী তাজউদ্দিন ছিলেন বিএনপি’র উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ছোট ভাই। তারেক রহমানের নির্দেশে খালেদা জিয়ার ভাতিজা ও তার এপিএস -১ সাইফুল ইসলাম ডিউকসহ অন্যদের বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেন। এরা সবাই ডিজিএফআই এর মামলায় অভিযুক্ত ছিলেন।

ওই হামলার অন্যতম প্রধান আক্রমণকারী হুজি প্রধান মুফতি হান্নান। ২১শে আগস্ট হামলায় জড়িত থাকলেও বিএনপি-জামায়াত সরকারের ক্ষমতায় থাকায় হান্নান ও তার সহযোগী বিপুলকে গ্রেফতার করা হয়নি। কিন্তু, অন্য মামলায় গ্রেফতার হওয়ার পর তারা ২১শে আগস্ট হামলায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে।

২০০৬-২০১৮: বিচারের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা : ২০০৬-০৬ সালে দুই বছর ধরে সিআইডি মামলার চার্জশিট দাখিল করতে ব্যর্থ হয়েছিলো, তবে বিএনপি নেতারা বেশ কয়েকবার দাবি করেছিলেন যে তদন্ত শেষ হওয়ার পথে এবং সবকিছু প্রকাশ করা হবে। তদন্তকারীরা হামলার পেছনে থাকাদের খুঁজে বের করার পরিবর্তে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রকৃত অপরাধীদের রক্ষা করার জন্য তদন্তকে ভুল পথে নিয়ে যায়।

২০০৭ সালের জুলাই মাসে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনামলে ফৌজদারি তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) একটি নতুন তদন্ত শুরু করে। ২০০৮ সালের ১১ই জুন সিআইডি হুজি নেতা মুফতি হান্নান ও সাবেক বিএনপির উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে একটি চার্জশিট দাখিল করে। সেখানে বিএনপি-জামায়াত সরকারের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার ইঙ্গিত দেয়া হয়।

যাই হোক, তদন্তকারীরা হামলার মাস্টারমাইন্ড এবং আক্রমণে ব্যবহৃত গ্রেনেডের উৎস সনাক্ত করতে পারেনি। এরপর, ২০০৯ সালের ২২শে জুন, গ্রেনেড সরবরাহকারী এবং আক্রমণের পৃষ্ঠপোষকদের সনাক্ত করার জন্য প্রসিকিউশন আরও তদন্তের চেষ্টা করেছিল। ২০০৯ সালের ৩ আগস্ট, আদালত তদন্তের আদেশ দেন এবং নতুন একজন সিআইডি কর্মকর্তাকে এই মামলার দায়িত্ব দেয়া হয়।

অবশেষে ২০১১ সালের জুলাই মাসে সিআইডি একটি নতুন চার্জশিট জমা দেয়, যাতে দেখা যায় প্রভাবশালী বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী নেতা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র কর্মকর্তা, পুলিশ, ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স (ডিজিএফআই), জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (পিএমও) ২১শে আগষ্ট হামলায় জঙ্গি সংগঠন হুজির সাথে সম্পৃক্ত ছিলো।

তারেক রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর এবং সাবেক জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদসহ ৩০ আসামির বিরুদ্ধে সম্পূরক চার্জশিট জমা দেয়া হয়। ২০১২ সালের মার্চে, ট্রাইব্যুনালে তারেকসহ ৫২ জন আসামিকে হত্যা মামলার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়, যেখানে ৩৮ জনকে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের অধীনে দায়ের করা মামলায় অভিযুক্ত করা হয়।

হত্যার ঘটনায় ১১জন আসামি বিস্ফোরক মামলায় জড়িত ছিল না। এদের মধ্যে তিনজন সাবেক আইজিপি, সাবেক তিন সিআইডি কর্মকর্তা, সাবেক দুই সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা, খালেদা জিয়ার ভাগ্নে ডিউক এবং দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তা এটিএম আমিন ও সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার অন্তর্ভুক্ত।

মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকায় জামায়াত নেতা মুজাহিদের ইতিমধ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। একইসাথে সিলেটে সাবেক ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলার মামলায় মুফতি হান্নান ও আরেকজন হুজির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সুতরাং, তাদের নাম ওই মামলা থেকে দেয়া হয়।

গ্রেনেড হামলার ঘটনায় হত্যা ও বোমা বিস্ফোরণের দুই মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ বর্তমানে ৪৯ জন অভিযুক্ত এবং অনেকের বিচার হচ্ছে। আটজন এখন জামিনে আছেন, আর তারেক রহমানসহ ১৮ জন পলাতক, আর সাবেক বিএনপি মন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও আব্দুস সালাম পিন্টুসহ ২৩ জন কারাগারে।

মামলার কার্যধারা : ২০১২ সালের মার্চ মাসে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে। এর মধ্যে ২২৫ জন বাদী পক্ষের সাক্ষী এবং ২০ জন বিবাদী পক্ষের সাক্ষী কার্যধারার সময় সাক্ষ্য দেন। বাদী ও বিবাদী পক্ষ একসঙ্গে মোট ১১৩টি কার্যদিবসে যুক্তিতর্ক শেষ করে, যা গত বছরের ২৩ অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছিল। বাদী পক্ষ ২৫ দিন সময় নেয় আর বিবাদী পক্ষ ৮৮ দিন সময় নেয়।

দেড় দশক আগের এই দিনের বিকেলটা বাংলাদেশের মানুষের জন্য ছিল এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। সেদিন বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে মুহুর্মুহু গ্রেনেডের বিকট বিস্ফোরণ, রক্তাক্ত মানুষের কাতর কান্না, চোখের সামনে সহযোগীদের মৃত্যু—সব মিলিয়ে এক বিভীষিকাময় অবস্থার সৃষ্টি হয়। এ নৃশংসতায় পুরো জাতি স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল। আজ সেই ২১ আগস্ট, ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা দিবস। ‘ঘাতক চক্রের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বহীন করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে রুখে দেওয়া এবং দেশে স্বৈরশাসন ও জঙ্গিবাদ প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ তা হতে দেয়নি।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আয়োজিত সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদবিরোধী সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। দলের নিবেদিতপ্রাণ নেতা-কর্মীরা মানববর্ম সৃষ্টি করে তাঁকে রক্ষা করেন। আল্লাহর অশেষ রহমত ও জনগণের দোয়ায় তিনি অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান শেখ হাসিনা।

এ নারকীয় হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে বিচার করা ছিল সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে উল্টো হত্যাকারীদের রক্ষায় সব ধরনের ব্যবস্থা করেছিল। এমনকি হামলাকারীদের বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়। অনেক আলামত ধ্বংস করা হয়। রাষ্ট্রযন্ত্রকে অপব্যবহার করে জনগণকে ধোঁকা দিতে ‘জজ মিয়া’ নাটক সাজানোর মতো ঘৃণ্য কাজ করে সরকার। আগামীকাল ২১ আগস্ট। দেড় দশক আগে এই দিনে ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা ও হত্যাযজ্ঞ চালায় হরকাতুল জিহাদের একদল জঙ্গি, যা ছিল ছয় বছর ধরে এই জঙ্গিগোষ্ঠীর হামলা ও শেখ হাসিনাকে হত্যার ধারাবাহিক চেষ্টার এক চূড়ান্ত রূপ।

গ্রেনেড হামলার পর শেখ হাসিনা : ফাইল ছবিএকই সঙ্গে দেশি-বিদেশি যোগাযোগ এবং সরকারের উদাসীনতা ও ক্ষেত্রবিশেষে সহযোগিতা বা পৃষ্ঠপোষকতায় একটি উগ্রপন্থী গোপন সংগঠন কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে, সেটারও একটা বড় উদাহরণ হরকাতুল জিহাদ আল-ইসলামী (হুজি-বি)।

১৯৯৯ সালের মার্চ থেকে ২০০৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ছয় বছরে এই জঙ্গিগোষ্ঠী দেশে ১৩টি বোমা ও গ্রেনেড হামলা চালায়। এতে ১০৬ জন নিহত হন। আহত হন ৭০০–র বেশি মানুষ। আওয়ামী লীগ ও সিপিবির সমাবেশ, উদীচী ও ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও ব্রিটিশ হাইকমিশনারের ওপর এসব হামলা হয়। এই সময়ের মধ্যে আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনাকেই হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে অন্তত চার দফা।

কিন্তু তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ও এরপর বিএনপি সরকার এই জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে ২১ আগস্ট মামলার নতুন করে তদন্তের উদ্যোগ নেয়। এরপর বেরিয়ে আসতে থাকে অনেক অজানা তথ্য।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর এক বছরের মধ্যে হুজি–বির প্রায় সব শীর্ষস্থানীয় নেতা ও গুরুত্বপূর্ণ জঙ্গি গ্রেপ্তার হন। শীর্ষ জঙ্গিনেতা মুফতি হান্নানসহ তিনজনের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। দীর্ঘদিন এই জঙ্গিগোষ্ঠীর কোনো তৎ​পরতা দৃশ্যমান নেই। তবে দেশে জঙ্গি হামলার ঝুঁকি শেষ হয়ে যায়নি।

আইএস ও আল-কায়েদার মতো আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের মতাদর্শ অনুসরণকারী একাধিক জঙ্গিগোষ্ঠী নতুন মাত্রার ঝুঁকি তৈরি করেছে। ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানে হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার মধ্য দিয়ে সেটার ভয়ংকর রূপ দেখা গেছে। সম্প্রতি ঢাকায় কয়েকটি পুলিশ বক্সের কাছে বোমা পেতে রেখে এবং পুলিশের একটি গাড়িতে সময়নিয়ন্ত্রিত বোমা ফাটিয়ে আইএস মতাদর্শী জঙ্গিরা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দেশে এখন আলোচনায় রয়েছে প্রধানত তিনটি জঙ্গিগোষ্ঠী—জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি), আইএসপন্থী নব্য জেএমবি ও আল-কায়েদাপন্থী আনসার আল ইসলাম। হোলি আর্টিজানের হামলা বাদ দিলে এই তিনটি গোষ্ঠীর কেউই হুজি-বির মতো এত বেশিসংখ্যক বড় হামলা চালাতে পারেনি।

আফগানফেরত মুজাহিদদের গড়া সংগঠন হুজি-বি এ দেশে জঙ্গিবাদের গোড়াপত্তন করেছিল। বাংলাদেশ থেকে যেসব ব্যক্তি তৎকালীন সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধে অংশ নিতে গিয়েছিলেন, তাঁদের বেশির ভাগই এর সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁরা ছিলেন কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষিত। সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের অনেকে পাকিস্তানের বিভিন্ন মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেছিলেন। ১৯৯২ সালে ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ করার পর ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ছিল হুজি-বির বিস্তারপর্ব। শুরুতে তাদের লক্ষ্য ছিল ভারতের কাশ্মীরে এবং মিয়ানমারের আরাকানে স্বাধীনতাকামী মুসলমানদের হয়ে লড়াই করা। কাশ্মীরের ও রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্তও ছিল হুজি-বি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৯৮ সালের পর থেকে হুজি-বি রোহিঙ্গাদের থেকে মনোযোগ সরিয়ে এ দেশের ভেতরে নাশকতামূলক তৎপরতা শুরু করে। লক্ষ্যবস্তু করে প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল ও সংগঠনকে। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের (১৯৯৬-২০০১) শেষ তিন বছর হুজি-বির জঙ্গিরা আটটি বড় ধরনের বোমা হামলা চালিয়েছিল। তখন তিন দফা শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা চালায় এই জঙ্গিরা। এর মধ্যে প্রথম চেষ্টা হয়েছিল ২০০০ সালের জুলাইয়ে; গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় প্রধানমন্ত্রীর জনসভাস্থল ও হেলিপ্যাডের কাছে দূরনিয়ন্ত্রিত দুটি শক্তিশালী বোমা পুঁতে রেখে। কোটালীপাড়ায় হত্যার পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার পর ২০০১ সালের ৩০ মে খুলনায় রূপসা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল হুজি। কিন্তু তিন দিন আগে ২৭ মে সেতুর কাছাকাছি রূপসা নদী থেকে দুটি ইঞ্জিন নৌকাভর্তি ১৫ জঙ্গি ধরা পড়ে যাওয়ায় সেটিও আর সফল হয়নি। এই ১৫ জনের একজন মাসুম বিল্লাহ ওরফে মুফতি মইন ঢাকায় ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় অংশ নিয়েছিলেন। বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর এই মামলার কোনো অগ্রগতি হয়নি। গ্রেপ্তার হওয়া সবাই কিছুদিন পর জামিনে বেরিয়ে যান।

এরপর ২০০১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সিলেটে নির্বাচনী জনসভায় হত্যার পরিকল্পনা করেন হুজির জঙ্গিরা। কিন্তু শেখ হাসিনা সিলেট পৌঁছান নির্ধারিত সময়ের অনেক পর। জনসভা ছিল সিলেট শহরের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে। তিনি সভাস্থলে পৌঁছার পর রাত আটটার দিকে কাছাকাছি এলাকায় একটি মেস ঘরে জঙ্গিদের তৈরি বোমা কোনো কারণে বিস্ফোরিত হয়ে যায়। শেখ হাসিনা তখন সভামঞ্চে ছিলেন। এ ঘটনায় ঘটনাস্থলে দুই জঙ্গি নিহত হন। আহত অবস্থায় হুজি-বির দুই সদস্য মাসুদ আহমেদ (শাকিল) ও আবু ওবায়দা গ্রেপ্তার হন। তখন আসামি মাসুদ আহমেদ আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে ঘটনার বিবরণ দিলেও কিছুদিন পর পুরো বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যায়। পরে ২০০৬ সালের ৫ অক্টোবর ও ১৯ নভেম্বর হুজির দুই গুরুত্বপূর্ণ নেতা মাওলানা আবু সাইদ ও মুফতি হান্নানের দেওয়া জবানবন্দিতে এই হত্যাচেষ্টার কথা বলেন। পরে এই ঘটনার নতুন করে তদন্ত শুরু হয়।

আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতে শেখ হাসিনাকে চার দফা হত্যার চেষ্টা করে হুজি-বি। সর্বশেষ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর ও রক্তক্ষয়ী।

এক সরকারের উপেক্ষা, আরেক সরকারের ধামাচাপা : ২০০০ সালে কোটালীপাড়ায় বোমা পুঁতে রাখার ঘটনার পর হুজি-বি ও এর অন্যতম নেতা মুফতি আবদুল হান্নানের নাম আলোচনায় আসে। কিন্তু তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার এবং এই জঙ্গিদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে এবং কার্যকর তদন্ত করতে সক্ষম হয়নি। এর আগের বছর যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলা মামলায়ও জঙ্গিদের বিষয়টি উপেক্ষা ক​রা হয় তদন্তে। বরং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপির নেতাদের আসামি করায় পুরো তদন্তই ভিন্ন খাতে চলে যায়। এরপর ২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি ঢাকার পল্টনে সিপিবির সমাবেশে, ১৪ এপ্রিল রমনার বটমূলে বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে, ৩ জুন গোপালগঞ্জের বানিয়ারচর ক্যাথলিক গির্জায়, ১৬ জুন নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে বোমা হামলা ও ব্যাপক প্রাণহানির পরও এই জঙ্গিদের আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হয়নি তখনকার সরকার।

২০০১ সালের অক্টোবরে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। তারাও এসব মামলার সুষ্ঠু তদন্তের উদ্যোগ নেয়নি। উল্টো ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করে। এই চেষ্টার শুরু থেকেই এ বিষয়সহ হুজি-বির তৎপরতার বিষয়ে প্রথম আলো টানা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ২০০৭ সালে এক-এগারোর পটপরিবর্তনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে ২১ আগস্ট মামলার নতুন করে তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দেয় এবং বিচার শুরু করে।

এদিকে যখন হুজি-বির বিষয়ে উদাসীনতা বা তাদের কার্যক্রম ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছিল, সেই সুযোগে দেশে আত্মপ্রকাশ করে নতুন এক জঙ্গিগোষ্ঠী জেএমবি। হুজি হানাফি মাজহাব হলেও জেএমবি সম্পূর্ণ সালাফি মতাদর্শী। এই গোষ্ঠীটি ২০০১ সাল থেকে বিভিন্ন এলাকায় সিনেমা হল, যাত্রা অনুষ্ঠান, মাজার ও বিভিন্ন এনজিওতে হামলা শুরু করে। ২০০৪-০৫ সালে এর মাত্রা অনেক বেড়ে যায়। তখনো এদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উপরন্তু ২০০৪ সালে রাজশাহীতে চরমপন্থী দমনের নামে বাংলা ভাইয়ের নেতৃত্বে জেএমবির (তখন ‘জাগ্রত মুসলিম জনতা’ নাম ব্যবহার করেছিল) তৎপরতায় স্থানীয় পুলিশের সহযোগিতা ছিল। তখন বিএনপির কয়েকজন মন্ত্রী ও সাংসদের বিরুদ্ধে এই জঙ্গিদের পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ ওঠে। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলার পর বিএনপি সরকার জেএমবি দমনে অভিযান শুরু করলেও হুজি-বির বিষয়ে শেষ পর্যন্ত নির্লিপ্তই থেকে যায়।

নেপথ্যে অন্য কোনো শক্তির অন্য কোনো উদ্দেশ্য? বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার আমলের (২০০১–০৬) প্রথম তিন বছর হুজি চুপচাপ ছিল। ২০০৪ সালের ২১ মে সিলেটে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের ওপর গ্রেনেড হামলার মধ্য দিয়ে আবার নাশকতা শুরু করে। তিন মাসের মাথায় ২১ আগস্ট ঢাকায় বঙ্গবন্ধু অ্যভিনিউতে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে তাঁর সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালায়। তিনি অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেলেও নিহত হন আইভী রহমানসহ দলের ২২ নেতা–কর্মী। আহত হন শেখ হাসিনাসহ কয়েক শ নেতা–কর্মী। ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা করে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ কিবরিয়াসহ পাঁচজনকে হত্যা করে।

জঙ্গিবাদবিষয়ক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভ্রান্ত হলেও প্রত্যেক জঙ্গিগোষ্ঠীর একটা মতাদর্শ থাকে। কিন্তু হুজি-বি সেখান থেকে দূরে সরে একপর্যায়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার ক্রীড়নকে পরিণত হয়। শেখ হাসিনাকে হত্যা করে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার পরিকল্পনাও সেই সূত্রে গাঁথা বলে ধারণা করা হয়।

এসব হামলার প্রধান আসামি মুফতি হান্নানকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন, তদন্ত–সংশ্লিষ্ট সিআইডির এমন একজন পদস্থ কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে এই জঙ্গিনেতা বলেছেন, শেখ হাসিনাকে হত্যা করার পরিকল্পনা অনেক বড় জায়গা থেকে এসেছে। তিনি কেবল তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন। ‘বড় জায়গা’ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদে বিস্তারিত বলেননি। আদালতে দেওয়া তাঁর জবানবন্দিতেও এ বিষয়টি পরিষ্কার হয়নি। তবে আদালতে তিনি বলেছেন, ২০০০ সালের জুলাই মাসে হুজির কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে শেখ হাসিনাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। আর, ২১ আগস্ট হামলার ঘটনায় তৎকালীন উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর প্রত্যক্ষ সহযোগিতা এবং স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও বিএনপির নেতা তারেক রহমানের সহযোগিতার আশ্বাস পেয়েছেন বলেও উল্লেখ করেছেন।

দীর্ঘদিন জঙ্গিগোষ্ঠীর তৎপরতা পর্যবেক্ষণ করছেন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মো. নুর খান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, হুজির সব হামলা ছিল অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের ওপর। তারা মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করে দেশে অস্থিতিশীল একটা পরিস্থিতি তৈরি এবং রাষ্ট্রকাঠামোকে দুর্বল করে এখানে একটা যুদ্ধক্ষেত্র বানাতে চেয়েছিল। এর পেছনে অন্য কোনো শক্তির অন্য কোনো উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টাও ছিল বলে মনে হয়।

অস্ত্রের চালান ও গোয়েন্দা যোগাযোগ : হুজি-বি জঙ্গিদের একটা অংশ ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সক্রিয় জঙ্গিগোষ্ঠীর জন্য অস্ত্র-গ্রেনেড পাঠানোর কাজেও যুক্ত হয়। এতে যুক্ত ছিলেন বিএনপি সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন, মুফতি হান্নান, কাশ্মীরের হিজবুল মুজাহিদীনের নেতা ইউসুফ ওরেফ মাজেদ বাটসহ অনেকে। মুফতি হান্নান ও মাজেদ বাটসহ গ্রেপ্তার হওয়া অন্যান্য জঙ্গির জবানবন্দিতে এটা এসেছে। কাশ্মীরি জঙ্গিদের জন্য পাকিস্তান থেকে আসা আর্জেস গ্রেনেডের একটা অংশ ২১ আগস্ট শেখ হাসিনার ওপর হামলাসহ বিভিন্ন হামলায় ব্যবহৃত হয়েছে বলেও তাঁরা আদালতকে জানান।

হুজি–বি বিএনপি সরকার আমলে গোয়েন্দা সংস্থার একটা অংশের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা পেয়েছে, সেটা পরে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। এ জন্য ডিজিএফআই ও এনএসআইয়ের তৎকালীন কয়েকজন উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তার সাজাও হয়েছে এই মামলার রায়ে। গোয়েন্দা সংস্থার তৎকালীন গুরুত্বপূর্ণ কিছু কর্মকর্তার পরামর্শে বিএনপি সরকারের শেষ দিকে ও পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নতুন নামে প্রকাশ্যে রাজনীতিতে আসার চেষ্টা করে হুজি-বি।

জঙ্গিরা নিয়ন্ত্রণে, তবে ঝুঁকি রয়ে গেছে : হুজি–বির ছোট একটা অংশ নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। তারা অর্থ সংগ্রহের জন্য ডাকাতিতেও যুক্ত হয়েছে বলে সম্প্রতি খবর বেরিয়েছে। যদিও পুলিশের​ উচ্চপর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, হুজির পর্ব আপাতত শেষ। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এখন দুটি গোষ্ঠী হুমকি হয়ে আছে, তারা হলো আইএস ও আল–কায়েদা। এই দুটিরই অনুসারী এখানে আছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটিজ স্টাডিজের রিসার্চ ফেলো শাফকাত মুনীর প্রথম আলোকে বলেন, হুজি–বির কার্যক্রম এখন অনেকটাই স্তিমিত। তবে হুজি–বির সদস্য বর্তমানে কী অবস্থায় আছে; তারা অন্য কোনো সংগঠনে যোগদান বা নতুন কোনো সংগঠনের সঙ্গে যোগসাজশ গড়ে তুলেছে কি না বা নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে কি না; সেটা খতিয়ে দেখতে হবে। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বলিষ্ঠ পদক্ষেপের মাধ্যমে এ দেশে জঙ্গিবাদের হুমকি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। তবে ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করে যেতে হবে। জঙ্গি বা সহিংস উগ্রবাদের ঝুঁকিকে কোনো অংশেই খাটো করে দেখার অবকাশ নেই।

 

লেখক : মোঃ হায়দার আলী
সভাপতি, জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা।
সাধারণ সম্পাদক, গোদাগাড়ী প্রেস ক্লাব।
প্রধান শিক্ষক, মহিশালবাড়ী মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়
গোদাগাড়ী, রাজশাহী।