বাঙালির আচরণই বাংলার পরিচয়

টিবিটি টিবিটি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ৫:৫১ অপরাহ্ণ, মে ১৯, ২০২১ | আপডেট: ৬:০৬:অপরাহ্ণ, মে ১৯, ২০২১

রহমান মৃধা: প্রায় চল্লিশ বছর দেশ ছেড়েছি। পৃথিবীর ভালো-মন্দ সব কিছুর সঙ্গেই বেশ পরিচিত হয়েছি। মন চায় এটা করি সেটা করি, এখানে যাই সেখানে যাই, এটা খাই সেটা খাই, আরো কত কী! তারপরও সেই চল্লিশ বছর আগে যা করেছি, খেয়েছি, দেখেছি সেসব স্মৃতি হৃদয়ে প্রচণ্ডভাবে গেথে আছে। আমি সব সময় চেষ্টা করি বাংলাদেশের খাবার খেতে।

করোনার আগ পর্যন্ত অনেক পছন্দের খাবার লন্ডন থেকে অর্ডার দিয়ে এনেছি বা নিজে কিনেছি। বছরের বেশি সময় তা সম্ভব না হবার কারণে সুইডেনের যেসব বাংলা দোকান আছে সেসব দোকান থেকে মাঝে-মধ্যে শাকসব্জি, মাছ ইত্যাদি কিনি। দুঃখের বিষয় সব কিছুতেই সমস্যা। কোয়ালিটি যেমন খারাপ তারপর পচা। কোনকিছুই মনঃপূত পাওয়া দুঃসাধ্য। স্টকহোম ছেড়ে একটু গ্রামের দিকে মুভ করেছি। অনেক কিছু বাংলাদেশের সেই ছোটবেলার কথা মনে করে দিচ্ছে।

আজ মনে পড়ছে সেই যুদ্ধের সময়ের কথা। এমনিতেই পাক হানাদারের অত্যাচার, তারপর রাজাকার এবং রাতের বেলায় নকশালের আনাগোনা। কী ভয়ংকর জীবন পার করেছি, যা ভাবলে এখনও গা শিউরে উঠে। বাবা চাকরি করেছেন বটে তবে সংসার চলেছে মূলত কৃষির উপর। জমিজমা সব বর্গা ছিল। যারা আমাদের জমি চাষ করতো তারা কোনো এক সময় খুনের কেসের আসামি হয়ে জেল হাজতে চলে যায়। শীতের সব ফসল পাকতে শুরু করেছে। কোনো কাজের লোকও পাওয়া দুষ্ককর। কী করা! শেষে আমি সকালে পাড়ার সমবয়সীদের নিয়ে মাঠে গিয়ে ছোলা, মুশুরি, সরিষা তুলেছি। কষ্ট হলেও ভীষণ আনন্দ ছিল। ছাত্রানং অধ্যয়নং তপ, শিক্ষার্থীদের কাছে এসব কিতাবের কথা। বাস্তবে তারা লেখাপড়া বাদে সবকিছুতে আনন্দ পায়।

আমিও তার ব্যতিক্রম নই। সারা জীবন লেখাপড়া করার চেয়ে খেলাধুলা করতে, মাছ ধরতে আর সংসারের কাজ করতে মজা লাগতো। নিজের মধ্যে বাড়ির গার্জিয়ান গার্জিয়ান ভাব বিরাজ করতো। মেজাজ মর্জিও সেভাবে গড়ে উঠতো। কারণ বাবা এবং বড় ভাইয়েরা যুদ্ধে রত, মাকে সব বিষয়ে সাপোর্ট দেওয়া ছিল জীবনের চ্যালেঞ্জ যা আজো মনে পড়ে।

ছোটবেলার দিনগুলো যদিও অনেক দূরে, অনেক আগের কথা, তারপরও আজ সকালে মনে পড়ে গেল যখন সুইডেনের মাঠে কিছু কৃষিকাজে নেমে পড়ি। লাঙ্গল নেই গরু নেই ঠিকই, তবে জমিতে শাকসবজি রোপণ করার সময় অতীতের সেই অভিজ্ঞতা কাজে লেগে গেল। এখানকার যন্ত্রপাতি জমি চাষ করতে বেশ সহজ বলে মনে হলো এবং বেশ মিল খুঁজে পেলাম। সুইডেনে ইউরোপের অনেক দেশের মতো জমি লিজ পাওয়া যায়। বছরে খুব সামান্য কিছু অর্থের বিনিময়ে ছোট ছোট জমি লিজ নিয়ে সেখানে নানা ধরনের শাকসব্জি থেকে শুরু করে ফুল এবং ফলের চাষ করা সম্ভব।

এ কাজটি যারা করে তাদের কাছে অনেকটা কাইন্ড অফ হবিই বলা যেতে পারে। আমি অনেক দিন ধরে ভেবেছি কিন্তু সময় এবং সুযোগের অভাবে হয়ে উঠেনি যা এখন সম্ভব হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ শেষের পথে। নানা ধরণের ফুল থাকবে, থাকবে স্ট্রবেরি, পুঁইশাক, লালশাক, সবুজ শাক এবং চেষ্টা করবো লাউ গাঁজও লাগাতে। বাংলার ঐতিহ্য সুইডেনে তুলে ধরার মাঝে বেশ আনন্দ রয়েছে। আমাদের সব ধরণের গুণাগুণ বিশ্বে ছড়াতে হবে। নতুন প্রজন্ম যখন সুইডেনে ভিষার জন্য অ্যাপ্লাই করবে অ্যাম্বেসিতে, স্টাফদের স্মৃতিচারণে তখনই উঠে আসবে আজকের এ কর্মকাণ্ড। কী ভাববে জানেন? ভাববে আমার কথা, আমার মতো করে যারা নানা কাজে এদের সঙ্গে মিলেমিশে আছে তাদের কথা। এখন আমাদের সেই কাজগুলো যদি সত্যিকার ভাবে সুইডিশ জাতির হৃদয় ছুঁয়ে থাকে তবে ভিষা দিতে আপত্তি থাকবে বলে আমার মনে হয় না। এটা হচ্ছে জাতি হিসাবে আমাদের পরিচয় বিশ্বের দরবারে।

এখন দেশ থেকে ভেজাল খাবার যদি এখানে পাঠানো হয় এবং সেটা যদি ধরা পড়ে যেমন চিংড়ি মাছের মধ্যে লোহার পাথর, কী ধারণা হবে? আমি হাজার চেষ্টা করলেও পারবো না সুইডিশ জাতিকে মোটিভেট করতে। পারবো না আমার দেশের মর্যাদা রক্ষা করতে। বাংলার মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন আনতে হলে দেশের সব পণ্য থেকে শুরু করে আমাদের আচার ব্যবহার সব কিছুরই পরিবর্তন করতে হবে। গোটা বিশ্বে যে সব বাংলাদেশী রাষ্ট্রদূত রয়েছেন তাদের প্রধান কাজ হওয়া উচিত এসব বিষয়ের উপর নজর দেওয়া। তারা কি কখনও বাংলাদশি দোকানে যান না? তারা কি দেখেননা কীভাবে পচা মাছ ফ্রজেন করে দেশ থেকে বিদেশে পাঠানো হচ্ছে?

অনেক সময় চেষ্টা করেছি সুইডিশদের বাংলা মাছ খাওয়াতে, কী লজ্জা আর কী ঘৃণা লেগেছে যখন মুখে দিতেই দুর্গন্ধ! তাই ভেবেছি আর না, বাংলার সব্জি তৈরি হবে সরাসরি ইটালি, স্পেনের মতো সুইডেনেও।

ছোট বেলার স্মৃতি চারণে অনেক কথায় মনে পড়ছে, মনে পড়ছে আমেরিকার প্রথম প্রেসিডন্ট জর্জ ওয়াশিংটনের কথা। তিনি ছদ্মবেশে দেশের মানুষের কুশলদি জানতে চেষ্টা করতেন। একবার তিনি দেখেছিলেন সৈনিকরা কাঠ টানছে, কাঠ আনতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে অথচ প্রধান সেনাপতি দাড়িয়ে তামাশা দেখছেন। জর্জ ওয়াশিংটন প্রধান সেনাপতিকে একটু সাহায্যের হাত বাড়াতে বললেন।

প্রধান সেনাপতি উত্তরে বলেছিলেন আমি হলাম প্রধান সেনপিতি আমি কি কাঠ টানতে পারি? উত্তরে জর্জ ওয়াশিংটন বলেছিলেন, না আপনি পারেন না, তবে আমি জর্জ ওয়াশিংটন আমেরিকার প্রথম প্রেসিডন্ট, আমি কাঠ টানতে পারি।” গোটা বিশ্বে যে সব বাংলাদেশী রাষ্ট্রদূত রয়েছে তাঁরা ইচ্ছে করলে অনেক কিছুই করতে পারেন, কিন্তু না তাঁরা তা করবেন কেন? এটা কাটা চামচ দিয়ে খাওয়ার ট্রেনিং নিয়ে হঠাৎ বিদেশি বনে যাওয়া পররাষ্ট্র ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পক্ষে সম্ভব নয়, হয়ত সম্ভব আমার মতো অনেক গেও বাঙালির পক্ষে।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন।