বাবার মৃত্যুর একদিন পরেই ক্যামেরার সামনে!

প্রকাশিত: ৪:০২ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৪, ২০১৮ | আপডেট: ৪:০২:অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৪, ২০১৮

অভিনেতা-অভিনেত্রী বা নির্মাতাদের অপেশাদারিত্ব নিয়ে কত অভিযোগই তো শোনা যায়, আমাদের দেশে ব্যপারটা বোধহয় একটু বেশিই ঘটে। মাঝেমধ্যেই তারকাদের বিরুদ্ধে শিডিউল ফাঁসানোর অভিযোগ আনেন পরিচালক-প্রযোজকেরা। আবার নির্ধারিত কলটাইমে শুটিং না করিয়ে বাড়তি সময় কাজ করানোর অভিযোগও শোনা যায় পরিচালকদের বিরুদ্ধে।

আমাদের অভিনেতা বা নির্মাতাদের মধ্যে পেশাদারিত্বের এই অভাবটা কখন বেশি চোখে পড়ে জানেন? যখন দেখি পাশের দেশ ভারতেই কোন একজন তারকা অভিনেতা নিজের বাবার মৃত্যুর মাত্র একদিন পরেই শেষকৃত্যের কাজ সম্পন্ন করে ভগ্নহৃদয় নিয়েই আবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে যান, কারণ তিনি বোঝেন, তার জন্যে সবকিছু থেমে আছে, সেটা প্রযোজক-পরিচালক বা অন্যান্য শিল্পীদের জন্যে ক্ষতিকর হতে পারে।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, বিস্ময়কর এই কাজটাই করে বসেছেন তেলুগু সিনেমার জনপ্রিয় নায়ক এনটিআর জুনিয়র। শুটিং চলছিল, পরবর্তী সিনেমা ‘অরভিন্দ সামিথা বীরা রাঘাভা’র কাজ নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত সময় পার করছিলেন তিনি। হুট করেই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতোই একদম অপ্রত্যাশিতভাবে দুঃসংবাদটা এসে হাজির হলো, সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন বাবা! পারিবারিক একটা গানের কিছু দৃশ্যের শুটিং চলছিল তখন, এরমধ্যেই ফোন মারফত দক্ষিণী সিনেমার জনপ্রিয় এই নায়ক জেনে গেছেন, নিজের পরিবারের সবচেয়ে আপন সদস্যটিকে তিনি হারিয়ে ফেলেছেন চিরতরে!

এনটিআরের বাবা নন্দামুরি হরিকৃষ্ণা ছিলেন হায়দ্রাবাদের জনপ্রিয় একজন অভিনেতা এবং রাজনীতিবিদ। রাজ্যসভার নির্বাচিত সদস্যও ছিলেন তিনি। এনটিআরের দাদা রমা রাও ছিলেন ছিলেন হায়দরাবাদের সাবেক মূখ্যমন্ত্রী, এর আগে অভিনয় আর পরিচালনা- দুটোতেই সমান বিখ্যাত হয়েছিলেন তিনি। অভিনয় আর রাজনীতি- দুটোই তাদের পরিবারের রক্তে মিশে আছে।

নন্দামুরি হরিকৃষ্ণা নিজে অভিনেতা ছিলেন, অভিনয়ের প্রতি এনটিআরের ভালোলাগার কারণটাও বাবা। বাবার সঙ্গে সিনেমার সেটে যেতে যেতেই লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশনের সঙ্গে তার পরিচয়, এই জগতটাকে ধীরে ধীরে তিনি আপন করে নিয়েছেন বাবার দেখাদেখি। সেই বাবা যখন হঠাৎ এভাবে পাড়ি জমালেন অজানার পথে, তখন শোকে স্তব্ধ হয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না জুনিয়র এনটিআরের।

একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গত ২৯শে আগস্ট সকালে হায়দরাবাদ থেকে পার্শ্ববর্তী তেলেঙ্গানা রাজ্যের নেলোরে যাচ্ছিলেন নন্দামুরি হরিকৃষ্ণা। টয়োটা এসইউভি গাড়িটা নিজেই চালাচ্ছিলেন তিনি, ড্রাইভার ছিল না সঙ্গে। পুলিশ জানিয়েছে, ফাঁকা হাইওয়েতে গাড়ির গতিবেগ প্রায় দেড়শো কিলোমিটার তুলেছিলেন নন্দামুরি, কিন্ত তাল সামলাতে পারেননি। রোড ডিভাইডারে ধাক্কা খেয়ে উলটে গিয়েছিল গাড়িটা, গাড়ি থেকে ছিটকে বেরিয়ে গিয়েছিল তার দেহটা। খুবই বাজেভাবে আঘাত পেয়েছিলেন মাথা আর ঘাড়ে।

আহত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে হায়দরাবাদের একটা হাসপাতালে নেয়া হয়, চিকিৎসাধীন অবস্থায় কিছুক্ষণ পরে সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন তিনি। এনটিআর জুনিয়র তখন হায়দরাবাদেই ছিলেন, শুটিঙের সেটে। খবর পেয়েই হাসপাতালে ছুটে আসেন তিনি। সেখানে বাবার মৃতদেহটাই অপেক্ষা করছিল তার জন্যে।

কাকতালীয় ব্যাপার কি জানেন? নন্দামুরি হরিকৃষ্ণার বড় ছেলে এবং এনটিআর জুনিয়রের বড়ভাই নন্দামুরি জানাকি রামের মৃত্যুও হয়েছিল সড়ক দুর্ঘটনায়। আর যে রাস্তায় দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে নন্দামুরি হরিকৃষ্ণা মারা গেছেন, সেই একই রাস্তায় কিছুদিন আগে এনটিআর জুনিয়রও রোড অ্যাক্সিডেন্টের শিকার হয়েছিলেন। তবে সামান্য চোটের ওপর দিয়েই বেঁচে গেছেন তিনি।

নিয়ম অনুযায়ী পরদিন বাবার শেষকৃত্য পালন করেছেন এনটিআর জুনিয়র। শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানে নিজের কান্না চেপে রাখার অনেক চেষ্টাই করেছেন তিনি, ক্যামেরার চোখে ধরা পড়েছে পিতৃহারা পুত্রের শোকে স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার দৃশ্যগুলো। ছবিগুলো দেখে মন খারাপ হবে যে কারোই।

তবে এনটিআর জুনিয়র বিস্ময় উপহার দিয়েছেন পরদিন। বাবার মৃত্যুর একদিন পরেই আবার হাজির হয়েছেন শুটিঙের সেটে, শেষ করেছেন অসমাপ্ত সেই গানের শুটিং। তাঁকে সেটে হাজির হতে দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন শিল্পী-কলাকূশলী সবাই। পরিচালক আর সেটের দুয়েকজনই শুধু জানতেন এনটিআর জুনিয়রের আসার খবরটা, তাই বাবার মৃত্যুর একদিন পরেই ক্যামেরার সামনে তাঁকে দাঁড়াতে দেখে সবাই বেশ বড়সড় একটা ধাক্কা খেয়েছেন।

জানা গেছে, সেদিনের শুটিঙে বারবার আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন এই নায়ক, কয়েকটা শট বারবার রিটেক নিতে হয়েছে। মানসিকভাবে বেশ ভেঙে পড়েছিলেন তিনি, বোঝাই যাচ্ছিল। তবে তার জন্যে প্রযোজক-পরিচালকের ক্ষতি হোক, বা সহশিল্পীদের ভোগান্তি হোক, তেমনটা হতে দিতে চাননি তিনি। এনটিআরের বাবা নন্দামুরি হরিকৃষ্ণা বিখ্যাত ছিলেন তার ‘এক কথার মানুষ’ ইমেজের জন্যে। একটা কাজ করে দেবেন বলে কারো কাছে প্রতিজ্ঞা করলে, সেটা যতো কষ্টই হোক, শেষ করে ছাড়তেন তিনি। এজন্যে সবাই অন্যরকম সম্মানের চোখে দেখতো তাঁকে।

সেই বাবার ছেলে হয়ে এনটিআর জুনিয়র ভেবেছেন, বাবার মৃত্যুকে ইস্যু না বানিয়ে সময়মতো সিনেমার কাজটা শেষ করতে পারলেই বাবার আত্মাকে সম্মান জানানো হবে। সহশিল্পীরাও দারুণ সমর্থন যুগিয়েছেন তাঁকে, প্রতিটা দৃশ্যধারণ শেষ হবার পরেই সবাই বারবার তালি দিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন তাঁকে।

পেশাদারিত্বের জায়গাটায় ঠিক না থাকলে কোন কাজই আপনি ভালোভাবে করতে পারবেন না, এটা চরম সত্যি একটা কথা। শাকিব খান বা জয়া আহসানের মতো আমাদের দেশের যেসব শিল্পী কলকাতায় কাজ করেছেন, তারা সবসময়ই টলিউড ইন্ডাস্ট্রির পেশাদারিত্বের দারুণ প্রশংসা করেন। পেশাদারিত্ব না থাকলে আসলে কোন কাজ ভালো হওয়া সম্ভব নয়, সেটা অভিনয় হোক, নির্মাণ হোক, চিকিৎসা বা প্রকৌশল যাই হোক না কেন। এজন্যেই হয়তো ভারতের প্রাদেশিক সিনেমাগুলোও আমাদের চেয়ে আলোকবর্ষের চেয়েও বেশী দূরত্বে এগিয়ে।

-এগিয়ে চলো।