বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের জন্য মানসিক চাপ!

প্রকাশিত: ৮:২৭ অপরাহ্ণ, মে ১০, ২০২১ | আপডেট: ৮:২৭:অপরাহ্ণ, মে ১০, ২০২১

আলী আশরাফ: ইউজিসির সর্বশেষ সভা শেষে জানা গেছে, শিক্ষার্থীরা চাইলে অনলাইনে পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে পারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ইউজিসির সিদ্ধান্ত অনেকেই মনে করতে পারে, ইউজিসি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সঠিক।

আমাদের দেশের ইন্টারনেট অপারেটর বা নেটওয়ার্ক সুবিধা এত নিম্নমানের ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। যদিও আমরা বলি যে ফোর জি বাংলাদেশ, কিন্তু এর অর্ধেক সুবিধা পায় না এমন এলাকার অভাব নাই। দেশের নেটওয়ার্কিং সুবিধা ও ইন্টারনেট সুবিধা বলতে মোবাইল ডাটার মূল্য সামর্থ্যের মধ্যে আনতে হবে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীর মধ্যে চার তৃতীয়াংশই গরিব বা মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসেছে। এর মধ্যে আবার বেশির ভাগ শিক্ষার্থী গ্রাম এলাকার। যেখানে শহরে বসবাসকারী শিক্ষার্থী সংখ্যা অতিনগণ্য।

বিগত একবছর বিশ্বের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে যার ব্যতিক্রম বাংলাদেশও নয়। এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় মুঞ্জরী কমিশন সিদ্ধান্তে আসেন অনলাইনে পরীক্ষার মাধ্যমে সেশনজট মুক্ত করবে। কিন্তু গত একবছর অনলাইনের মাধ্যমে ক্লাস চালু করেছিল। যা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা মধ্যে রাখার জন্য যুগোপযুগী ছিল। অনলাইনে ক্লাস শুরু হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অর্থ সংকটের দেখা দেয়। ক্লাসগুলো করার জন্য মোবাইল, নেটওয়ার্কি সুবিধা ও ডাটা সংকট দেখা দেয়। ক্লাসগুলো নেওয়ার জন্য যেসকল এপস ব্যবহার করতে হয় সেজন্য মানসম্মত স্মার্টফোন প্রয়োজন যা অধিকাংশ পরিবারের পক্ষে সম্ভব নয়।

আহার জোটে না, অনলাইন ক্লাস করা বিলাসিতা!

পাবলিক ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যেখানে চার তৃতীয়াংশই গরিব বা মধ্যবিত্ত পরিবারের। একটা পরিবারের অভিভাবক যদি কাজে না যেতে পারে তাহলে দেখা যায় সেদিন না খেয়ে দিন পাড় করতে হয় এমন অনেক পরিবারের শিক্ষার্থী রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন অনেক শিক্ষার্থী আছে টিউশন করিয়ে পরিবারের অর্থ-সংকট দূর করে থাকে। যার ফলে দেখা গেছে প্রথম দিকে শিক্ষার্থী উপস্থিতি ৬০-৭০ শতাংশ থাকলেও একটা সময় ২০-২৫ শতাংশে নেমে যায়। সি আর নিয়মিত ক্লাস রুটিন দিয়ে যেত কিন্তু উপস্থিতি সন্তুষ্টজনক না হওয়ায় একাধিক সময় অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিনের জন্য পাঠদান বন্ধ করতে হয়েছে।

অনলাইন পরীক্ষা কি আসলেই মুক্তি?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেটকনোলজি অনুষদের ডিন অধ্যাপক মো. হাসানুজ্জামান বলেন, করোনার কারণে সেশন জটের শঙ্কায় ডিনস কমিটির জরুরি বৈঠকে অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জুলাই মাসের মধ্যে যদি সশরীরে পরীক্ষা নেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয় তাহলে অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়া হবে। সেক্ষেত্রে তিনঘন্টার পরীক্ষা এক ঘন্টা বা দেড় ঘন্টা নেওয়া হবে।

বাংলাদেশের ইন্টারনেটের যে অবস্থা কিভাবে শিক্ষার্থীরা এত অল্প সময় পরীক্ষা সম্পূর্ণ করবে? যেখানে গরিব বা মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীগুলো নিয়মিত পাঠদান করতে হিমশিমে পড়তে হতো সেখানে অনলাইন পরীক্ষা কতটুকু সঠিক সিদ্ধান্ত।

সেশন জটের চিন্তা করেই যদি অনলাইন পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন ইউজিসি তাহলে পরীক্ষা শেষে অধিকাংশ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহন করতে অনেক কাঠখড় পোহাতে হতে পারে।

কিছু শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষার বদলে পড়াশোনা বন্ধ করতে হতে পারে। দেখা যেতে পারে পারিবারিক চাপের পাশাপাশি অনলাইন পরীক্ষার চাপ নিতে পেরে মেধাবি শিক্ষার্থী হারাতে হতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই রকম সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্যতা পায় তাহলে দেশের বাকিবিশ্ববিদ্যালয়গুলোও একই পথে হাটবে। এখনও দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রকাশ্যে আদর্শ না মানলেও ঢাবির অনেক নিয়ম ও সিদ্ধান্ত পরে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিতে দেখা যায়।

শিক্ষার্থীরা কি প্রথমবারের মত সেশনজটে পড়ছে?

বাংলাদেশ বলতে ১৯৭১ সালের পর থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত কোন বর্ষের শিক্ষার্থীরা অনার্স বা সম্মান পাশ করতে চার(৪) বছরের অধিক সময় নেয় নি। সেই সময় তো করোনা ভাইরাসের মত মহামারি ছিল না। তাহলে তখনকার শিক্ষার্থীদের কেন ৭-৮ বছর সময় অনার্স বা সম্মান পাশ করতে লেগেছিল?

আধুনিকতার অভাব, না রাজনৈতিক কারণ? সমস্যা দুইটাই ছিল তবে যতটা আধুনিকতা দায়ী তার থেকে রাজনৈতিক কারণই মুখ্য ছিল। যখন যে দল বিরোধী দল হিসেবে থাকতো তারা প্রতি নিয়ত হরতাল হাঙ্গামা চালত সারা দেশ জুড়ে । রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য প্রান দিতে হয়েছে কত সাধারণ মানুষকে বলতে পারবেন। তখন তো শিক্ষার্থীরা সেশনজটে পরে থাকত। তখন ইউজিসি বা শিক্ষক মহলের এরকম চিন্তা করতে পারতেন শিক্ষার্থীদের প্রটোকল দিয়ে তাদের সেশনজট থেকে মুক্তি দিবো। সেই সময় তো সারাদেশস্তব্ধ থাকত যদিও এরকম সিদ্ধান্ত নিতে সাহস পেতেন না।

২০২১ সালে এসে দেশের সবকিছু চলছে কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলতে পারছি না। তাহলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শুধু ব্যয় করে থাকে কোন প্রকার আয় নেই। আপনারা একটু চিন্তা করুণ দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখে এমন কোন প্রতিষ্ঠান এত সময় বন্ধ রয়েছে।

অনার্স বা সম্মান পাশ করে কি বেকারত্বের গ্লানি টানবে? সেশনজট মুক্তের জন্য সিদ্ধান্ত অনলাইন পরীক্ষা। তবে ঠিক আছে! শিক্ষার্থীরা সম্মান পাশ করবে সেশনজট মুক্ত হবেন । কিন্তু পাশ করে কি করবেন বেকার হয়ে ঘরে বসে থাকবেন। যারা অনার্স, মাস্টার্স পর্যন্ত পড়াশোনা করেন তাদের ১০শতাংশ ব্যবসায়ী, ৫-১০ শতাংশ উচ্চ শিক্ষা, ৫-১০ শতাংশ আউটসোর্সিং, বাকি সবারই লক্ষ্য থাকে বিসিএস ক্যাডার, সরকারি চাকুরি, মাল্টিন্যাশনাল চাকুরি করবেন বলে পরিবার ও নিজের পরিকল্পনা থাকে।

তাহলে পাশ করে কি করবেন এসকল শিক্ষার্থীরা। এখন ব্যবসায়ী বা উদোক্তা হতে হলে লাগে লক্ষ-লক্ষ টাকা, আউটসোর্সিং করতে লাগে ইন্টারনেট সুবিধা এগুলো নিশ্চিত কে করবেন? বাকিগুলোর মধ্যে বিসিএস ও সরকারি চাকুরির নিয়োগ পরীক্ষাগুলো কি অনলাইনে হবে?

বর্তমানে সরকারি মানেই অর্থের ঝনঝনানি। যেখানে অনলাইনে ক্লাসের জন্য অর্থ বা টাকা নিশ্চিত করতে হিমশিম খায়। পরিবারগুলো সেখানে ব্যবসা বা সরকারি চাকুরির জন্য অর্থ বা টাকা না পেয়ে দেশে করোনাজনিত কারণে না মরে, বেকারত্বে গ্লানি টানতে টানতে একসময় মৃতুর পথ বেছে নিবে অধিকাংশ মানুষ।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ টুডে এবং বাংলাদেশ টুডে-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)