বুলডোজার হেরে গেলেই কি আগুন লাগে বস্তিতে?

টিবিটি টিবিটি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ৫:৩৭ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৮, ২০১৯ | আপডেট: ৫:৩৭:অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৮, ২০১৯

আবদুল্লাহ মাহফুজ অভি : নন্দিত সাহিত্যিক সাদাত হাসান মান্টোর একটা অনুগল্প হচ্ছে এরকম- ‘আগুন লাগলে সারা মহল্লা জ্বলে গেল। শুধু একটি দোকান বাঁচলো আগুনের হাত থেকে। সেই দোকানের সাইনবোর্ডে লেখা- এখানে বাড়ি বানাবার সমস্ত রকম সরঞ্জাম পাওয়া যায়।’ এই অনুগল্পটির বার্তা খুবই স্পষ্ট।

গল্পটি পড়া শেষ। আমরা সাম্প্রতিক একটি সংবাদের সারাংশ জেনে নেই। রাজধানীর মিরপুরে রূপনগর এলাকার একটি বস্তিতে আগুন লেগে পুড়ে গেছে প্রায় দুই হাজার ঘর-বাড়ি। শুক্রবার সন্ধ্যা সোয়া সাতটার পর এ আগুন লাগে মিরপুর ৭ নম্বর সড়কের আরামবাগের ঝিলপাড় বস্তিতে।

এই বস্তিতে বসবাস করে অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ। আগুন সর্বস্বান্ত করে দিয়ে গেলো পরিবারগুলোকে। এদের ভেতর ৩ হাজার পরিবারের সব কিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। পোড়া বস্তির সামনে হাজার হাজার মানুষ কাঁদছে। তাদের চোখের জলেও নেভেনি এ আগুন।

এই আগুনে শুধু কান্না আর আহাজারিই ছিলো না, সেই সাথে যে আছে কতরকম ক্ষোভ চারিদিকে। আবারো উঠেছে সেই প্রশ্ন- বস্তিতে কেন এতো আগুন লাগে? এই প্রশ্নের ভেতর যে পরিমান নিন্দা, অবিশ্বাস, দ্বন্দ্ব আর ক্রোধ আছে তা কি টের পাবে এই লোভের সমাজ? এই প্রশ্নের উৎপত্তিই বা কেন হয়? এই প্রশ্নের স্পষ্ট সমাধান কি কখনো এসেছে? আমরা শুধু জানি, লোভের লকলকে জ্বিহবা ক্ষমতার পুষ্টি পেয়ে যখন আরো শক্তিশালী হয় তখন তা কত ভয়ঙ্কর হয়ে উঠে তা ভালো জানে মাটির সবচেয়ে কাছে বসবাসকারী মানুষেরা।

প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে ভাবতে কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করি। প্রথমে উল্লেখ করছি একটি সিনেমার কথা। ভারতের অন্যতম সুপারস্টার রজনীকান্তের একটি সিনেমা আছে যার নাম ‘কালা’। সিনেমার গল্পটি একটি বস্তি উচ্ছেদকে ঘিরে। মুম্বাইয়ের মতো মেগাসিটির প্রাণকেন্দ্রে বড় জায়গা নিয়ে গড়ে ওঠা বস্তির উপর কারো নজর পরবে না সেটাতো হতে পারে না। শহরের সবচেয়ে ক্ষমতাসীন ‘সফেদ’ ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক এক নেতার হাউজিং প্রকল্পের জন্য ওই জমিটা দরকার। একাধিকবার বস্তি উচ্ছেদের চেষ্টা করেও উচ্ছেদ করা যাচ্ছে না। বস্তির নেতা কালার (রজনীকান্ত) নেতৃত্বে বারবার উচ্ছেদ চেষ্টা রুখে দিচ্ছে বস্তিবাসী।

সেই সফেদ ব্যবসায়ী তার বক্তব্য দিতে গিয়ে জনগণর উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমি এই দেশের ভালো চাই, আমি চাই দেশকে পরিচ্ছন্ন দেশ হিসেবে নির্মাণ করতে। সরকারের ‘ডিজিটাল ও পিওর’ মুম্বাই তৈরির প্রচেষ্টাকে আমি সালাম জানাই। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি এই গরিবীকে বদলে দিতে হবে। কিন্তু এই প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করতে কিছু লোক উঠে পরে লেগেছে। ওই দেশদ্রোহীদের চিনতে হবে।’

কিন্তু বস্তিবাসী সেই উন্নয়নের ফাঁদে পা দেয় না। এরপর এক সময় পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দেয়া হয় বস্তির। তাতেও কাজ না হলে একদিন আগুন লাগিয়ে বস্তিবাসীদের উচ্ছেদের চেষ্টা চালায়।

বস্তি উচ্ছেদের সাথে আগুনের সম্পর্কটা এভাবেই উঠে এসেছে তামিল সুপারস্টারের সিনেমায়। ভারতের দক্ষিনী মুভিকে ‘এন্টারটেইনমেন্ট সিনেমা’ বা ভরপুর বিনোদনের সিনেমা হিসেবেই আমাদের দেশের অধিকাংশ তরুণরা পছন্দ করেন। এই ক্ষেত্রে রজনীকান্তের এই সিনেমার গল্প দিয়ে বাস্তব পরিস্থিতিকে বিশ্লেষন করাটা ঠিক হবে না। তাই আমরা এই সব গল্প দিয়ে বাস্তবতাকে বিচার না করে স্রেফ একটি সিনেমার গল্প হিসেবেই একটা ঘটনা জেনে রাখলাম। শুধু মনে রাখবো এই গল্পটির সারাংশ হলো- বস্তিবাসীকে উচ্ছেদ করতে না পেরে আগুন লাগিয়ে ছাই করে দেয়া হয় তাদের ঘর-বাড়ি।

এবার তাহলে সিনেমা থেকে আমাদের ঢাকার বাস্তবতায় ফিরে আসি। ঝিলপাড়ের চলন্তিকা বস্তির অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায়। যে সময় আগুন লেগেছে তখন ঈদের ছুটি কাটাতে অনেকেই বস্তি ঘর ছেড়ে গ্রামে গিয়েছেন। লোকজনও কম ছিলো। তেমনই এক শুক্রবারের সন্ধ্যায় লাগলো আগুন। নিমিষেই পুড়ে ছাই হলো ঘর-বাড়ি।

এই ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করছেন বস্তি খালি করে ‘বড় লোকের’ ভবন বানাতেই আগুন দেয়া হয়েছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের জমির ওপর গড়ে ওঠা চলন্তিকা বস্তিটি মিরপুরের সর্ববৃহৎ বস্তি। দীর্ঘদিন থেকেই বস্তির জমি খালি করার চেষ্টা করছে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। কিন্তু বস্তিবাসীর বাধায় সেটা সম্ভব হয়নি।

দেশ রূপান্তর পত্রিকার এক প্রতিবেদনে অগ্নিকাণ্ডের প্রতক্ষ্যদর্শী বস্তিবাসীর বরাত দিয়ে বলা হয়, ‘আগুন লাগার সময় তারা কেরোসিনের গন্ধ পেয়েছেন এবং বস্তির উত্তর-দক্ষিণ দুদিক থেকেই আগুন ছড়িয়ে পড়তে দেখেছেন’। এই ঘটনার জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা ও ওয়ার্ড কমিশনার রজ্জব আলীর দিকে অভিযোগের তীর ছুড়েন বস্তিবাসী। যদিও ওই জনপ্রতিনিধিরা এই ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এর আগেও কালশী বিহারী ক্যাম্পে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার মদদ দাতা হিসেবে ইলিয়াস মোল্লার নামে অভিযোগ উঠেছিলো।

সিনেমার গল্পের সাথে কিছু কিছু ঘটনা মিলে যাচ্ছে বোধহয় বস্তিবাসীর অভিযোগের সাথে। যাইহোক, ২০১৬ সালের আরেকটি ঘটনা। কল্যাণপুর পোড়া বস্তিতে হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের জমি পুনরুদ্ধারের জন্য উচ্ছেদ অভিযান চালায়। উচ্ছেদ অভিযানে বস্তিবাসীর বাধার মুখে পড়ে। তবুও বুলডোজার চলে। আদালতের নির্দেশে উচ্ছেদ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়। এর একদিন পরই বস্তির ৮ নম্বর ব্লকে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। বস্তিবাসী এই ঘটনার জন্য তৎকালীন স্থানীয় এমপি আসলামুল হকের অনুসারীদের দায়ী করেন। কিন্তু সেই সংসদ সদস্য সেটা অস্বীকার করে উল্টো গণমাধ্যমকে বলেছিলেন বস্তিবাসী নিজেরাই আগুন লাগিয়েছে। ( সূত্র: ২৩ জানুয়ারি ২০১৬, সমকাল)।

বস্তিতে আগুন লাগার ঘটনার বিষয়ে যে অভিযোগগুলো শোনা যায় তার মধ্যে রয়েছে উচ্ছেদ এবং দখল সন্ত্রাস। বস্তির নিয়ন্ত্রণ নিতে, বস্তি উচ্ছেদ করতে, বস্তি দখল করতে বিভিন্ন পক্ষ এইসব আগুন লাগার ঘটনা ঘটায় বলে অভিযোগ রয়েছে। উপরের আগুনের ঘটনার পেছনে অভিযোগ উঠেছিলো বস্তিবাসীদের বস্তি থেকে উচ্ছেদ করতে আগুন লাগানো হয়েছে। চট্টগ্রামের আরেকটি আগুন লাগার ঘটনার পেছনে অভিযোগ ওঠে বস্তির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে ‘আগুন দেয়া হয়েছে’।

চলতি বছর ১৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের ভেড়া মার্কেট বস্তিতে ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় ৯ জন মারা যায়। ছাই হয়ে যায় প্রায় আড়াইশ ঘর। এই অগ্নিকাণ্ডকে পরিকল্পিত নাশকতা হিসেবে অভিযোগ উঠে। এই ভেড়ামারা বস্তি ঘিরে প্রভাবশালীদের রয়েছে মাসে কোটি টাকার বাণিজ্য। বস্তির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার ছত্রছায়ায় সরকারি খাস জমিতে এই বস্তি গড়ে তোলা হয়েছিলো। সরকারের খাস জমি উদ্ধারের তালিকায় থাকা এই বস্তিটির দখল ধরে রাখতেই আগুন লাগানো হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। (সূত্র: কালের কণ্ঠ, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯)

রাজধানীতে যে বস্তিটিতে বারবার আগুন লাগে। তার নাম কড়াইল বস্তি। রাজধানীর মহাখালীতে বিটিসিএল এর জায়গায় গড়ে ওঠা এই বস্তিকে ঘিরে উচ্ছেদের জন্য একাধিকবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে সরকার ও সিটি কর্পোরেশন। যতবারই বুলডোজার এসেছে ততোবারই রুখে দাঁড়িয়েছে বস্তিবাসী। কিন্তু রাতের আধারে যে আগুন লাগে সে আগুনের কাছে সর্বস্বান্ত হতে হয় তাদের। বারবার আগুনে পুড়ে গেছে এখাকার মানুষের সহায় সম্বল সংসার। ১০ বছরে প্রায় ১৫ বার আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে এখানে। প্রায় প্রতিবারই অগ্নিকাণ্ডের পর অভিযোগ উঠে ‘আগুনা লাগানো হয়েছে’।

রাজধানীর বিভিন্ন বস্তিতে এমন আগুন লাগার ঘটনা নিয়মিত বিষয়। এখন কথা হলো এই বস্তিতে কারা থাকে? এই প্রশ্নের উত্তর সবার জানা। এই শহরের নিন্ম আয়ের মানুষেরা এখানে মাথা গোজার ঠাঁই হিসেবে আশ্রয় নেয়। গার্মেন্টস শ্রমিক, দিন মজুর, হকার, রিকশা চালক থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র আয়ের মানুষেরা এখানে আশ্রয় নেয়। যাদের সামর্থ নেই শহরের ফ্লাট-বাড়িতে ভাড়া দিয়ে থাকার তারাই নিরুপায় হয়ে তুলনামূলক কম টাকায় এখানে আশ্রয় নেয়। বস্তি নিশ্চই কোন আরাম দায়ক স্বর্গ না যে, এই আরাম আয়েশের জীবন ছেড়ে কেউ যেতে চাইছে না। যারা এখানে থাকে তারা বাধ্য হয়ে থাকে। কোন উপায় নেই বলেই এখানে থাকে।

এই বস্তিবাসীরা কিন্তু সমাজের বিভিন্ন স্তরের চালিকা শক্তি। তাদের শ্রমেই টিকে আছে নগরের যানবাহন ব্যবস্থা, গার্মেন্টস শিল্প-কলকারখানা, বাজার-হাট, গৃহকর্মীর সেবাসহ নানা ব্যবস্থা। এই ব্যয়বহুল শহর তো তাদের বসবাসের জন্য কোন জায়গা রাখেনি। তারা যেমন জীবিকার প্রয়োজনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসেছে এই শহরও তেমনি তাদের লুফে নেয় নিজেকে সচল রাখতে। অন্যদিকে তাদের আশ্রয় দেয়া বস্তিগুলো গড়ে ওঠে ক্ষমতার আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে। আর যখন বিভিন্ন প্রকল্পের প্রয়োজনে বস্তি উচ্ছেদের ডাক আসে তখন আইন-কানুন , বুলডোজার ইত্যাদি সামনে চলে আসে। কিন্তু কথা হলো উচ্ছেদ হওয়া মানুষগুলো তাহলে কোথায় যাবে, সেই উত্তর কেউ দেয় না। শুধু নোটিশ আসে- ‘তোমরা অবৈধ, বস্তি খালি করো…। বুলডোজার হেরে গেলেই নাকি আগুন লাগে বস্তিতে…!

প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের পরপরই তদন্ত কমিটি গঠন হয়। আর এইসব তদন্ত কমিটি না পারে আমাদের দুঃখের ক্ষততে মলম লাগাতে, না পারে ভাঙা স্বপ্ন জোড়া লাগাতে, না পারে ঘর ভাঙা মানুষের হৃদয় থেকে রক্ত ক্ষরণ থামাতে। এবারো চলন্তিকা বস্তিতে আগুন লাগার ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছে। তদন্ত চলুক। নিজ দেশেই ঘর হারা হয়ে শরণার্থী শিবিরের মতো এক আশ্রয় কেন্দ্রে ঢুকে পরতে কেমন লাগছে এই সর্বহারাদের? যুদ্ধ যেমন মানুষকে নিঃশেষ করে দিয়ে যায়, এ আগুনও তেমনই…। সন্তানকে বুকে চেপে বনপোড়া হরিনীর মতো ছুটছে মা…। পেছনে পুড়ছে সংসার।

শামসুর রাহমানের কবিতার সেই আর্তনাদ যেন প্রতিধ্বনি হচ্ছিলো চলন্তিকা বস্তিতেও-
‘দাউ দাউ পুড়ে যাচ্ছে নতুন বাজার,
আমাদের চৌদিকে আগুন,
গুলির ইস্পাতী শিলাবৃষ্টি অবিরাম।
তুমি বলেছিলে
আমাকে বাঁচাও।
অসহায় আমি তাও বলতে পারিনি।’

লেখক: সাংবাদিক এবং স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও তথ্যচিত্র নির্মাতা।