সেদিন বৃদ্ধ লোকটির প্রশ্নের জবাব দিতে পারিনি

প্রকাশিত: 11:57 AM, November 15, 2019 | আপডেট: 11:58:AM, November 15, 2019
সংগৃহীত

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী: বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের কয়েকদিন পর কুষ্টিয়ায় গিয়েছিলাম তার পরিবারের সাথে দেখা করতে। এমন একটা শোকের ঘটনার পর সন্তানহারা বাবা-মাকে আর কী সান্ত্বনা দেয়া যায়? তবু মন চাইছিল তাদের সাথে দেখা করি। তাদের দুঃখটা ভাগ করে নেয়ার চেষ্টা করি। তাই নিজ উদ্যোগেই চলে গেলাম কুষ্টিয়ায়। সঙ্গী ছিলেন বেশ কয়েকজন।

এমন একটা পরিবারের সামনে হাজির হয়ে নিজেকেই অপরাধী মনে হয়েছিল। কী বলা উচিত বুঝে উঠতে পারছিলাম না। উচ্চশিক্ষার জন্য এক বুক স্বপ্ন নিয়ে ছেলেকে পড়তে পাঠিয়েছিলেন দেশের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠাতে। যেখানে পড়ার সুযোগ পায় দেশের সেরা মেধাবীরা; কিন্তু সেই স্বপ্নের শিক্ষাঙ্গনই কেড়ে নিল তার সন্তানকে। ‘বড়’ হয়ে, যোগ্য নাগরিক, যোগ্য সন্তান হয়ে যার মা-বাবার কোলে ফেরার কথা ছিল যার, সে ফিরলো লাশ হয়ে। ফেরত পাঠালো যারা তারা কেউ তার সহপাঠি, কেউ রুমমেট, কেউ বা আবার ক্যাম্পাসের বড় ভাই। বর্বর সেই হত্যাকাণ্ডে ঘটনা সবারই জানা।

যেভাবেই হোক তাদের সাথে কয়েক ঘণ্টা সময় পার করলাম। তারা যখন ভাত খাওয়ার অনুরোধ করলো- না করতে পারলাম না। মনে হলো খাওয়ার জন্য হলেও আরো কিছুক্ষণ তাদের পাশে থাকতে পারবো। তাদের ডাল-ভাত খাওয়ার আমন্ত্রণ ফেলতে ইচ্ছে হলো না। আক্ষরিক অর্থেই ছিল ডাল-ভাত। তবে সেটিই যেন আমার কাছে হয়ে উঠেছিল অমৃত। বয়স কিংবা শারীরিক অসুস্থতার কারণে এখন খাওয়া দাওয়া করতে হয় অনেক হিসাব করে। আবার চিকিৎসকের নানান বিধিনিষেধও মানতে হয় খেতে বসলে; কিন্তু সেদিন যেন সে সব ভুলে গেলাম। বহুদিন পর পরম তৃপ্তি নিয়ে ভাত খেলাম পেট ভরে।

এক পর্যায়ে তাদের কাছ থেকে বিদায় নিলাম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে আবরারের বাবা-মা বিদায় দিলেন। বারবার তাদের কথায়, চেহারায় ফুটে উঠছিল ন্যায় বিচারের আকুতি। জোর গলায় তাদের আশ্বাসও দিতে পারলাম না যে- ন্যায় বিচার পাবেনই। তবু আশার বাণী শোনালাম। পাশাপাশি আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে বলে বিদায় নিলাম।

ঢাকায় ফেরার পথে একটি জায়গায় আমাদের গাড়িতে কিছুটা গোলমাল দেখা দিল। কিছু সময়ের জন্য যাত্রা বিরতি দেয়া হলো। রাস্তার ওপর বাজারের মতো একটি জায়গায় গাড়ি থামলো। রাস্তার দুই পাশে কিছু দোকানপাট। গাড়ি থামতে দেখে স্থানীয় লোকজনের কেউ কেউ কৌতুহল নিয়ে এগিয়ে এলো। অনেকে আমাকে চিনতে পেরে সালাম দিয়ে কুশল জানতে চাইলো। আবার কেউ বা সামনে এসে চিনতে না পেরে নিজের কাজে চলে গেল।

এরই মধ্যে ষাটোর্ধ এক ব্যক্তি এগিয়ে এলেন আমার দিকে। চোখ দেখেই বুঝলাম তিনি আমাকে চিনতে পেরেছেন। সামনে এসে জানতে চাইলেন- ‘স্যার, চা খাবেন?’। ওই মুহূর্তে চা খাওয়ার ইচ্ছে ছিল না। তবু শত মাইল দূরের এই বৃদ্ধ লোকটির আন্তরিকতার কারণে না করতে পারলাম না। বললাম- খাওয়ান।

তিনি নিজেই চা নিয়ে এলেন। যতক্ষণ চা খেলাম আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তৃপ্তির সাথে চা শেষ করে কাপটা এগিয়ে দিলাম। উনি কাপ নিতে গিয়ে আমার হাতটা ধরে ফেললেন। ওনার দুই হাত দিয়ে আমার হাত জড়িয়ে ধরে মুখের দিকে চেয়ে বললেন, ‘স্যার, আমরা কি আর ভোট দিতে পারবো না?’

স্তম্ভিত হয়ে গেলাম বৃদ্ধের এই প্রশ্ন শুনে। পাড়া গাাঁয়ের এক বৃদ্ধ আমাকে কঠিন এক প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাল। মনে হলো সারাজীবনে এর চেয়ে কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হইনি। জবাব দিতে গিয়েও থেমে গেলাম। নিজেকে আগে প্রশ্ন করলাম- আমি কি এই প্রশ্নের উত্তর জানি? নিজে নিজেই উত্তর খুঁজে পেতে চেষ্টা করলাম। কী পেলাম জানি না। তবে নিজেকে সামলে নিয়ে বৃদ্ধকে বললাম- অবশ্যই পারবেন। আবার ভোট দিতে পারবেন।

বৃদ্ধ লোকটি চলে গেল। কী বুঝলো জানি না। তিনি চলে যাওয়ার পরও একই চিন্তা আমার মাথায় ঘুরপাক করতে লাগলো। আসলেই কি এদেশের মানুষ ভোট দিতে পারবে? নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে দাড়িয়ে বেছে নিতে পারবে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে?

সম্প্রতি ঢাকায় একটি সংবাদপত্রের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। অনুষ্ঠানের ফাঁকে একটি রুমে আড্ডা হচ্ছিল কয়েকজনের সাথে। সাংবাদিক আর রাজনীতি সংশ্লিষ্ট মানুষের আড্ডা হবে আর সেখানে ভোটের প্রসঙ্গ উঠবে না সেটা তো হয় না। কথায় কথায় উঠে এলো সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনের প্রসঙ্গ। নানান আলোচনার পর এক তরুণ সাংবাদিক আমাকে প্রশ্ন করে বসলেন- নির্বাচনটা কেমন হতে পারে সে ব্যাপারে আপনারা কি কোন ধারণাই করতে পারেননি?

বিএনপি চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইংয়ের এক কর্মকর্তাও ছিলেন ওই আড্ডায়। আমি জবাব দেয়ার আগেই তিনি আমার হয়ে বললেন, আমরা প্রস্তুত ছিলাম ভোট চলাকালীন কোন অনিয়ম করার চেষ্টা করলে প্রতিরোধ গড়ার জন্য; কিন্তু আসল কাজ যে রাতেই করে ফেলা হবে সেটি ভাবিনি।

এবার আরেকটি প্রশ্ন ছুটে এলো- আমরা কি তাহলে প্রতিপক্ষের কৌশল ধরতে ব্যর্থ হয়েছি?

সাংবাদিকদের কাছ থেকে এমন কঠিন প্রশ্ন আসবে সেটাই স্বাভাবিক। ধীরে সুস্থ্যে তাদেরকে বললাম- দেখুন, আমরা রাজনীতির মাঠে নেমেছিলাম। যেখানে ভোটের লড়াই হবে জনতার রায়ে, ব্যালটের বাক্সে। একটি গণতান্ত্রিক দেশে খেলার সময় হওয়ার আগেই যে অপজিশন গোল করে রাখবে সেটি সত্যিই চিন্তায় ছিল না। ভাবিনি এই একবিংশ শতাব্দিতে এসে গণতান্ত্রিক দেশে কেউ এমনটা করতে পারে।

লেখক:
স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য
জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ টুডে এবং বাংলাদেশ টুডে-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)