বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ও করণীয়

প্রকাশিত: ৯:৪১ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৩, ২০১৮ | আপডেট: ৯:৪১:অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৩, ২০১৮

১৯৬০ সালের আগস্ট মাসে মেজর জিয়াউর রহমানের সাথে বেগম খালেদা খানম বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হন। পাঁচ বছর পর ১৯৬৫ সালে স্বামীর তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে পোস্টিং হলে খালেদা স্বামীর সাথে সেখানে চলে যান। কিছু দিনের মধ্যেই পাক-ভারত যুদ্ধ শুরু হয়। জিয়া ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি ব্যাটালিয়নে ‘আলফা কোম্পানির’ কমান্ডার হিসেবে বহুলালোচিত ‘খেমকারন’ রণাঙ্গনের বেদিয়ানে যুদ্ধে অংশ নেন।

সংসার জীবনের সাধারণ হিসাব-নিকাশের বাইরে পেশাগত দায়িত্ব পালনে অবিচল জিয়াউর রহমানের স্ত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া নিজে দেশের প্রয়োজনে ব্যক্তিগত জীবনের সুখ-শান্তি বিসর্জন দেয়া এরই মাধ্যমে শুরু করেছিলেন। যুদ্ধ চলাকালে তাদের খবর নেয়ার জন্য ঢাকা থেকে ফোন করা হলে ছোটবেলা থেকেই দৃঢ়চেতা খালেদা জবাবে বলতেন, ‘তোমরা অযথা ভেবো না’। অথচ সুদূর পশ্চিম পাকিস্তানে খালেদা জিয়া উৎকণ্ঠা নিয়ে বীরযোদ্ধা স্বামীর জন্য প্রতীক্ষার কঠিন পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়ে বহু বিনিদ্র রজনী পার করেছেন।

১৯৬৯ সালে স্বামীর পোস্টিংয়ের সুবাদে বেগম জিয়া ঢাকায় ফিরে এলেন। মেজর জিয়া ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অষ্টম ব্যাটালিয়নের দ্বিতীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেয়ায় বেগম খালেদা জিয়া দুই পুত্র তারেক রহমান (চার বছর) ও আরাফাত রহমানকে (দুই বছর) নিয়ে চট্টগ্রামের ষোলোশহর এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। বছর পার হতেই পরিস্থিতি বিস্ফোরণোন্মুখ হয়ে উঠতে থাকে। ২৫ মার্চ ১৯৭১-এ চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টের প্রশাসনে ব্যাপক রদবদল ঘটে। একপর্যায়ে শুরু হয় ২৫ মার্চের কাল রাত। ২৭ মার্চ ১৯৭১ সালে মেজর জিয়া চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে গিয়ে স্বাধীনতার ঐতিহাসিক সেই ঘোষণা দেন। বেগম জিয়া ও দুই শিশুসন্তানকে চট্টগ্রামে অরক্ষিত অবস্থায় রেখেই জিয়া স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এভাবে পুনরায় শুরু হলো বীরযোদ্ধা মেজর জিয়ার স্ত্রী খালেদা জিয়ার সংগ্রামী জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়। মেজর জিয়া মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ায় বেগম জিয়া দুই শিশুপুত্রকে নিয়ে চট্টগ্রামে চাচার বাসায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। শুরুতে কিছুু দিন যোগাযোগ থাকলেও একপর্যায়ে যোগাযোগ জিয়ার সাথে আর করা যায়নি। চাচার বাসায় আত্মগোপনে থাকা খালেদা জিয়া ও তার দুই সন্তানের জন্য চট্টগ্রাম নিরাপদ ছিল না বিধায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দুই অবুঝ শিশুকে বুকে আগলে ধরে ছদ্মবেশে নৌপথে নারায়ণগঞ্জ হয়ে তিনি ঢাকায় আসেন এবং এক আত্মীয়ের বাসায় গিয়ে আত্মগোপন করেন।

পাকিস্তানি সেনারা তাকে খুঁজে পায় ২ জুলাই এবং সে দিনই গ্রেফতার করে চোখ বেঁধে ক্যান্টনমেন্টে আর্মি অফিসার্স মেসে নিয়ে যায়। চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছোট একটি কামরায় দুই শিশুসন্তানসহ দেশ মাতৃকা স্বাধীন হওয়ার আশায় নির্ঘুম প্রহর গুনতে থাকেন বেগম জিয়া। একদিন বোমা বিস্ফোরণে, যে কক্ষে তারা বাস করতেন তার এক অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। ভাগ্যক্রমে তারা বেঁচে গেলেন। প্রায় ছয় মাস দুই সন্তানসহ বন্দী অবস্থায় কাটালেন। শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার অবসান হয় ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে, লাখো মা-বোনের ইজ্জত ও শহীদের রক্তের বিনিময়ে যে দিন বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। বেগম জিয়া দুই অবুঝ শিশুপুত্র তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানকে বুকে আগলে রেখে আত্মগোপন ও বন্দিদশায় যে নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণা ও আতঙ্কে দিন অতিবাহিত এবং সন্তানদের রক্ষা করেছেন, এর মূল্য প্রত্যক্ষ রণাঙ্গনে অংশ নেয়া মুক্তিযোদ্ধার তুলনায় কম নয়।

১৯৮১ সালের ৩০ মে চক্রান্তকারীদের হাতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মর্মান্তিক শাহাদত বরণের মধ্য দিয়ে বেগম জিয়ার দীর্ঘ ২১ বছরের মধুর দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটে। দেশ ও জাতির এই সঙ্কটময় মুহূর্তে কোনো পূর্বপরিকল্পনা না থাকা সত্ত্বেও সংসারের করিডোর অতিক্রম করে জাতীয় রাজনীতিতে বেগম জিয়ার পদার্পণ ঘটে ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি। দলের প্রাথমিক সদস্য হওয়ার মাধ্যমে এটা হয়েছিল। ১৯৮৪ সালের ১০ মে নির্বাচনের মাধ্যমে দলের চেয়ারপারসন হলেন বেগম খালেদা জিয়া। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অসমাপ্ত কাজ ও পরিকল্পনাগুলো সমাপ্ত ও কার্যকর করার জন্যই তিনি জিয়া পরিবারের পরিসরকে আরো সম্প্রসারিত করে শহীদ জিয়ার বিহনে শোকগ্রস্ত লক্ষ কোটি বাংলাদেশী নাগরিককে নিজ পরিবারভুক্ত করতে সংকল্পবদ্ধ হন। পরম মমতায় জনগণের দায়িত্বভার গ্রহণ এবং শহীদ জিয়ার আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে কখনো রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে, কখনো সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নেত্রী বেগম জিয়া পর্যায়ক্রমে হয়ে উঠলেন দেশনেত্রী এবং জনগণের আস্থা ও ভরসার প্রতীক। ১৯৮২ সালের শুরু থেকে প্রতীক থেকে দীর্ঘ ৯ বছর জগদ্দল পাথরের মতো ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছিলেন সেনাশাসক এরশাদ। স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন করে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ‘আপসহীন’ নেত্রীর অভিধা অর্জন করেন জনগণ থেকে।

বেগম জিয়া সামরিকজান্তার জুলুম, নির্যাতনের জাঁতাকলে পিষ্ট জাতির ক্রান্তিলগ্নে ত্রাণকর্ত্রী হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনি দলের সভায় প্রথম আনুষ্ঠানিক বক্তৃতায় বলেছেন, ‘শহীদ জিয়ার আদর্শ ও পথনির্দেশনার সফল বাস্তবায়নই আমার জীবনের উদ্দেশ্য। দেশের সব দেশপ্রেমিক ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীর কাছে আহ্বান জানাচ্ছি, আসুন, বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে জনগণের গণতান্ত্রিক সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ি। ইনশা আল্লাহ, জয় আমাদের হবেই।’ দলের ভেতরের ষড়যন্ত্র, (এর হোতা এরশাদের সাথে গোপনে আঁতাতকারী ‘হুদা-মতিন’ চক্র) ও বাইরের ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করে বেগম জিয়া সাতদলীয় ঐক্যজোট গঠন করেন। ১৯৮৩ সালের ৪ ও ৫ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত ১৫ দলীয় জোটের সাথে তিনি বৈঠক এবং সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে পাঁচ দফা ঘোষণা করেন। ১৯৮৬ সালে সামরিক শাসক এরশাদ নিজের দুঃশাসনকে বৈধতা দেয়ার দুরভিসন্ধিমূলক কূটকচালের অংশ হিসেবে সংসদ নির্বাচনের ঘোষণা দিলে সাত দল ও ১৫ দল যৌথভাবে এত অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু আওয়ামী লীগ এরশাদের পাতানো নির্বাচনে অংশ নিয়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। পরে আওয়ামী লীগ এবং তার অনুগামী দলগুলো বিএনপির সাথে এসে আন্দোলনে যোগ দেয়।

নেতৃত্বের অসাধারণ দক্ষতা ও আপসহীন মনোভাব প্রদর্শন করে বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠেন। হরতাল, সচিবালয় ঘেরাও প্রভৃতি কর্মসূচিসহ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তিনি লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাসে আহত হয়েছেন। কিন্তু কোনো নির্যাতন তাকে রুখতে পারেনি। দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের জনক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সুযোগ্য উত্তরসূরি বেগম জিয়া অগণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা দখলকারীদের কোনো চাপ কিংবা ষড়যন্ত্রের কাছে মাথা নত করেননি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নেতাকর্মীদের সাহস ও অনুপ্রেরণার মধ্যমণি হয়ে, সব বাধা অতিক্রম করে স্বৈরাচারী এরশাদের কবল থেকে ১৯৯০-এর ৬ ডিসেম্বর দেশবাসীকে মুক্ত করেছেন। নিরন্তর আপসহীন নেতৃত্বের মাধ্যমে তিনি বিএনপিকে মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের প্রত্যয়দীপ্ত বিশাল এক অংশ নিয়ে গঠিত জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলকে আত্মবিশ্বাসে পরিপূর্ণ এবং অধিকার আদায়ে লড়াকু সংগঠনে রূপান্তরিত করেন। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বরের গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী সরকারের পতনে এই লড়াকু ছাত্রদের ভূমিকা মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রসমাজের ভূমিকাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

১৯৯১-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিয়ে খালেদা জিয়ার আপসহীন নেতৃত্বের প্রতিদানস্বরূপ বিএনপি বিজয় অর্জন করেছিল। ঘোর সমালোচকেরাও জিয়ার ১৯৯১-৯৬ শাসন আমলের প্রশংসা করে থাকে। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে শত প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত রাখার স্বার্থে তার নেতৃত্বে বিএনপি নির্বাচনে গিয়ে ১১৬ আসন পেয়ে বিরোধী দলের ভূমিকা সক্রিয়ভাবে পালন করেছিল। ১৯৯৬-২০০১ সালের আওয়ামী লীগের শাসনামলে জনগণ কেমন ছিল, তা ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের ফলাফলে প্রমাণিত হয়েছে। সে নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয় অর্জন করে। বেগম জিয়ার বিরোধীদলীয় নেত্রীর ভূমিকা এবং আওয়ামী দুঃশাসনের যন্ত্রণা এ বিজয়ের পেছনে ছিল মূল নিয়ামক। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি কিছু সেনা কর্মকর্তাসহ সেনাপ্রধান মইনউদ্দিন ক্ষমতা দখল করেন এবং ২২ জানুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য সংসদ নির্বাচন বাতিল করে দেন। ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে অসাংবিধানিকভাবে সেনা সমর্থিত এক সরকার প্রতিষ্ঠা করে, দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হলো। ক্ষমতা কুক্ষিগত করে বেগম খালেদা জিয়া ও তার পরিবার এবং বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে কল্পকাহিনী প্রচার শুরু করা হয়।
Add Image
এরই ধারাবাহিকতায় যৌথবাহিনী গঠন করে ২০০৭ সালে ৭ মার্চ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে এবং ১৬ এপ্রিল আরাফাত রহমানকে গ্রেফতার করা হলো। বেগম খালেদা জিয়াকে সন্তান ও নেতাকর্মীসহ সবার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ৩ সেপ্টেম্বর কারাবন্দী করা হয়। একই সাথে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনাকে ঘুষ গ্রহণের মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছিল। সবাই ধারণা করেছিলেন, এটি মইন উ. গংয়ের ‘মাইনাস-টু-ফরমুলা’ বাস্তবায়নের একটি অপকৌশল। কিন্তু ঘটনার পরম্পরায় দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠল যে, তা ছিল মূলত মাইনাস ওয়ান ফরমুলা। অর্থাৎ, উদ্দেশ্য ছিল বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে চিরতরে উৎখাত করা। প্রবল জনমতের কারণে ১১ সেপ্টেম্বর ২০০৮ সালে তাকে সেনাসমর্থিত সরকার মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। মুক্ত খালেদা অসাংবিধানিক সরকারের অবসান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার লড়াই শুরু করেন। চাপের মুখে সরকার জরুরি অবস্থা বহাল রেখে নির্বাচন দেয়ার প্রস্তাব করলে বেগম জিয়া তা প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে সাত দল ও ১৫ দলীয় জোটের অভিন্ন সিদ্ধান্তকে পাশ কাটিয়ে যে প্রক্রিয়ায় শেষ মুহূর্তে অংশগ্রহণ করেছিল সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করল।

অর্থাৎ, জরুরি অবস্থার মধ্যেই নির্বাচন করার প্রস্তাব মেনে নেয়। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনর্বহাল করার স্বার্থে খালেদা জিয়া সরকারের (যারা জিয়া পরিবারকে ধ্বংস করার জন্য বিরতিহীনভাবে সব ধরনের নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছিল) অধীনে জরুরি অবস্থার মধ্যে নির্বাচনে অংশ নিতে রাজি হননি। পরে জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করা হলে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলেও ষড়যন্ত্রের মুখে পরাজয় বরণ করে। নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। এরপর, আজ পর্যন্ত যা ঘটে যাচ্ছে তা সবার জানা। ২০১৪ সালে ভোটারবিহীন নির্বাচন করে আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করেছে। ইতোমধ্যে বেগম জিয়াকে বাড়ি ছাড়া করেই তারা ক্ষান্ত হননি, গত ৮ ফেব্রুয়ারি সরকার তাকে বানোয়াট মামলায় সাজা দিয়ে কারাগারে নিক্ষেপ করেছে। তিনি এখন জেলে। সেখানেও রেহাই নেই।

অসুস্থ বেগম জিয়াকে চিকিৎসা সুবিধা না দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। মানুষের মৌলিক চাহিদার মধ্যে পড়ে চিকিৎসাসেবা, সেটি আদায় করতেও আইনি লড়াই করতে হচ্ছে। যে মামলায় তিনি সাজা ভোগ করছেন, এতে তিনি জামিন পেলেও নানা অজুহাতে এবং একটির পর আরেকটি মিথ্যা মামলা চালু করে তাকে কারাগার থেকে বের হতে বাধা দেয়া হচ্ছে। এর কারণ একটাই, তিনি নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন চান, যা দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার মূল উপায়। এই দাবি গণতন্ত্রকামী দেশবাসী সবার প্রাণের দাবি। বেগম জিয়া কারামুক্ত হলে জনগণ তার আপসহীন নেতৃত্বে এই দাবি আদায় করবে আতঙ্কে সরকার তার ওপর মিথ্যা মামলা ও নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে।

ভিত্তিহীন মামলায় পাঁচ বছরের কারাভোগ করছেন বেগম খালেদা জিয়া। তা বৃদ্ধি করে ১০ বছর করা হলো। এর সাথে যুক্ত করা হলো জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার সাত বছর সাজা। অথচ জনগণ জানে, দেশের ব্যাংকগুলো থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়ে যাচ্ছে। জনগণের আমানতের বিপুল অর্থ তসরুফকারীদের বিচার হচ্ছে না। বেগম খালেদা জিয়ার পাঁচ বছরের সাজা ১০ বছর করার জন্য প্রাণপণ লড়ে গেলেন দুদকের আইনজীবীরা। অথচ ব্যাংক লুটেরারা আজো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেল। এরশাদের বিরুদ্ধে অনেক দুর্নীতির মামলা দায়ের করা হয়েছে বিগত বছরগুলোতে। বর্তমান সরকার কিংবা দুদক সেই মামলাগুলো নিয়ে লড়ছে না কেন? এর কারণ বুঝতে জনগণের অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। স্বৈরাচারী এরশাদের দলকে কর্তৃত্ববাদী বর্তমান সরকার ব্যবহারের জন্য এই অন্যায্য সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে।

ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার বিরুদ্ধে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে করা ঘুষ ও দুর্র্নীতির তিনটি মামলা রয়েছে। হাইকোর্টের দেয়া একটি রায় চূড়ান্ত করা হলেও রহস্যজনকভাবে বিচারিক আদালতে সেই রায় পৌঁছায়নি। তাই তাকে আত্মসমর্পণও করতে হচ্ছে না। অথচ স্বাভাবিক নিয়মে তার এখন থাকার কথা জেলে। অনুমান করতে কারো অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে, তিনি এই সুবিধা পেয়েছেন বিএনপির বিরুদ্ধে একজন ‘বিশিষ্ট’ বিষোদগারকারী হিসেবে।

অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে খালেদা জিয়ার আপসহীন সংগ্রামী চরিত্র নেতাকর্মীদের দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছে ৯০-এর দশকেই। দেশবাসীও তাকে ভালোবাসে। অসংখ্য নেতাকর্মী যখন ‘আমার নেত্রী আমার মা, জেলে যেতে এেবা না’ বলে গগনবিদারী স্লোগান দেন, তখন আমার মনে ভাবনা জাগে নেত্রীকে ‘মা’ বলে সম্বোধন আবেগের বহিঃপ্রকাশ নাকি এর পেছনে কোনো বাস্তবতা বা যুক্তি রয়েছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মেজর জিয়া যখন স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তানকে রেখে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তখন বেগম খালেদা জিয়া পরম মমতায় তার দুই সন্তানকে দীর্ঘ ৯ মাস কখনো আত্মগোপন, কখনো বন্দিদশায় থেকে যেভাবে আগলে রেখেছেন, তার জন্য প্রয়োজন এমন একজন মা যিনি শুধু জন্ম দেন না; বরং জীবনের সবটুকু দিয়ে সন্তানকে আগলে রাখেন। খালেদা সেই অর্থে একজন আদর্শ মাতা।

নেতাকর্মীদের এই ‘মা’ স্লোগান কেবল আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়; এর সুনির্দিষ্ট উপযুক্ত কারণ রয়েছে। কারণগুলোর মধ্যে দু’টি হলো : ১/১১-এর সময় যখন সেনাসমর্থিত সরকার তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানকে গ্রেফতার করে বলেছিল খালেদা জিয়া তার সন্তানদের নিরাপদ রাখতে চাইলে দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে। তখন জবাবে তিনি বলেছিলেন : ‘এ দেশ ছাড়া আমার কোনো ঠিকানা নেই। বাঁচতে হলে এ দেশেই বাঁচব এবং মরতে হলে এ দেশেই মরব। জনগণকে ফেলে আমি কোথাও যাবো না।’

ওই সরকারের শর্ত না মানার পেছনে একটা বড় কারণ হলো : তিনি যদি দেশ ছেড়ে চলে যান তা হলে তার দলের নেতাকর্মীদের জীবনে নেমে আসবে সীমাহীন নিপীড়ন-নির্যাতন এবং দেশে গণতন্ত্রের চর্চা অনির্দিষ্টকালের জন্য রহিত হবে। নেতাকর্মীদের যদি ঔরসজাত সন্তান থেকে আলাদা ভাবতেন তাহলে তিনি তারেক ও আরাফাতের জীবনের ঝুঁকি না নিয়ে শর্ত মেনে নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি।

ফলে বেগম খালেদা জিয়ার দুই সন্তানকেই শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম নির্যাতন ও নিপীড়ন করা হলো। প্রাণ বাঁচাতে তারা চিকিৎসা গ্রহণের জন্য বাধ্য হয়ে দেশান্তরী হলেন। একজন চিরতরে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। অন্যজন সুদূর বিলাতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। বৃদ্ধ বয়সে স্বামীহারা এই নেত্রী রক্তে মাংসে গড়া একজন মানুষও বটে। তারও বেদনায় বক্ষ বিদীর্ণ হয়েছে স্বাভাবিকভাবে। তবুও অন্যান্য সাধারণ মাতার ন্যায় আচরণ করেননি বলেই তিনি লক্ষ কোটি নেতাকর্মীর ‘মা’।

০২. মুক্তিকামী বাংলাদেশী জনগণের ভরসার নির্ভরযোগ্য উপায় হলো গণতন্ত্রের অব্যাহত সুষ্ঠু চর্চা। জনগণের মতপ্রকাশের স্বাধীন উপায়, বহুদলীয় গণতন্ত্রের চর্চা যতবার ব্যাহত হয়েছে ততবারই বেগম জিয়া একমাত্র ভরসার কাণ্ডারি হিসেবে হয়েছেন আবির্ভূত। সব দুঃশাসনের বিরুদ্ধে দুর্বার আপসহীন আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে শহীদ জিয়ার হাতে সূচিত বহুদলীয় গণতন্ত্র চর্চার পরিবেশ ফিরিয়ে এনেছেন তিনি।

কোনো ষড়যন্ত্র কিংবা নির্যাতন তাকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম থেকে বিরত রাখতে পারেনি। আজো কোনো নির্যাতন, জুলুম বা ষড়যন্ত্র তাকে এই ব্রত থেকে বিরত রাখতে পারবে না। মা যেমন সন্তানের জন্য নির্ভরযোগ্য ও নিরাপদ আশ্রয়, ইতিহাস প্রমাণ করেছে- বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র ও এর অবাধ চর্চা তেমনি বেগম খালেদা জিয়ার হাতেই নিরাপদ। সঙ্গত কারণে বেগম জিয়াকে নেতাকর্মী ও দেশবাসী যখন ‘গণতন্ত্রের মা’ (গড়ঃযবৎ ড়ভ উবসড়পৎধপু) বলে আখ্যায়িত করেন, তখন তা যথার্থ বলেই প্রতীয়মান হয়।

আমরা লক্ষ করেছি, বেগম খালেদা জিয়া ’৭১ সালে প্রথমে আত্মগোপনে ছিলেন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাত থেকে শিশুসন্তানদের রক্ষার জন্য। পরে বন্দিদশায় ছয় মাস কাটিয়েছেন হানাদার বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। পরে তিনি সেনাসমর্থিত সরকার কর্তৃক কারাবন্দী ছিলেন। আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনাও কারাবন্দী ছিলেন একই বাহিনীর হাতে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বেগম খালেদা জিয়া এখন কোন বাহিনীর হাতে কারাবন্দী? মনে রাখা উচিত, নিপীড়ন-নির্যাতন করে ক্ষমতায় চিরকাল টেকা যায় না। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পারেনি, স্বৈরাচারী এরশাদ পারেননি, মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের অসাংবিধানিক সরকারও ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেনি। জুলুমবাজ বাহিনীর কিংবা সরকারের পতনের নেতৃত্ব দিয়েছেন শহীদ জিয়া এবং তার আদর্শপুষ্ট আপসহীন দেশনেত্রী বেগম জিয়া। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে বেগম জিয়াই দেশবাসীর ভরসার প্রতীক। এবার বিএনপির নেতাকর্মী ও দেশবাসীর ঋণ শোধ করার পালা। কারাবন্দী ‘মা’কে মুক্ত করার সংগ্রামের নেতৃত্ব দেয়ার দায়িত্ব দেশবাসীকে নিতে হবে।

ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে সম্প্রতি গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বিরাজমান সঙ্কট নিরসনে দক্ষতার সাথে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে উত্থাপন করা হয়েছে ১১টি লক্ষ্য অর্জনের জন্য সাত দফা দাবি। প্রথম দাবিটি হলো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় আপসহীন সংগ্রামী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কারামুক্তি। এই দাবি বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। কারণ সংগ্রামে বিজয়ের জন্য প্রয়োজন আপসহীন নেতৃত্ব। বাংলাদেশের ইতিহাস প্রমাণ করে, এ ধরনের নেতৃত্বের ক্ষেত্রে বেগম খালেদা জিয়া তুলনাহীন। অতীতের মতো তার আপসহীন নেতৃত্বেই দাবি আদায় করে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব। এর মাধ্যমেই বাংলাদেশে গণতন্ত্রের চর্চা পুনর্বহাল করাসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ১১ দফা লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে। চলুন সবাই ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্বে বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার মাধ্যমে এ স্বপ্ন পূরণের সংগ্রামে মুক্তিকামী দেশবাসীর সহযাত্রী হই।

লেখক : অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

 

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ টুডে এবং বাংলাদেশ টুডে-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)