ভারতে আশ্রয় নিয়েও পোড়া কপাল জোড়া লাগেনি: গণেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য

শরণার্থীর খোঁজে : পর্ব ০৬

শাহজাদা এমরান শাহজাদা এমরান

কুমিল্লা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৬:২৪ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৩, ২০২০ | আপডেট: ৬:২৫:অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৩, ২০২০

এলাকার মুসলমানরা একটা সময় পর্যন্ত আমাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে রেখেছে। কিন্তু যুদ্ধ যতই এগিয়ে যাচ্ছিল স্থানীয় রাজাকারদের দাপট ততই বাড়ছিল। কয়েক দিন পর পর বাড়িতে খবর পাঠাত, যে কোন সময় বাড়ি ঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিবে,গুলি করে হত্যা করবে এবং বোনদেরকে ধরে নিয়ে যাবে। আমাদের বাড়ির আশেপাশের মুসলমানেরা পালাক্রমে আমাদেরকে দেখাশুনা করে রেখেছে। যাতে কেউ আসলে তারা সামনে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে যখন সত্যিই চতুর্দিকে জ্বালাও পোড়াও,ধর্ষণ,হত্যা ও লুটতরাজ বেড়ে গেল তখন আমাদের মুসলিম প্রতিবেশীরা বলল,এখন তো আমরা নিজেরাই নিরাপদ না,তোমাদের আশ্রয় দিব কীভাবে? তোমরা যা ভাল মনে কর, তাই কর। তখন বাধ্য হয়ে সীমাহীন কষ্ট স্বীকার করে ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিই। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের। শিবিরে আশ্রয় নেওয়ার এক মাসের মধ্যে ভয়াবহ বন্যায় আমাদের পুরো শরণার্থী শিবির পানির নিচে তলিয়ে গেল। আমরা রাস্তায় গিয়ে আশ্রয় নিলাম। কাদা মাটি পানির সাথে একাকার হয়ে দিন যাপন করেছি। এর ওপর যখন বৃষ্টি আসছিল তখন তো নিজেদের মানুষ হিসেবেই ভাবিনি। বলেছি,ভগবান হয় নিয়ে যাও, নতুবা শান্তি দাও। দুর্ভাগ্য আমাদের। পাকিস্তানি আর্মি ও দেশীয় রাজাকারদের ভয়ে বাড়ি ঘর ছেড়ে পরদেশে এলাম সেখানেও বন্যার পানিতে আশ্রয়টুকুও নিয়ে গেল। এ কথা বলেই চোখের পানি ছেড়ে দিলেন শরণার্থী গণেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য।গত ১৬ অক্টোবর যশোরের মনিরামপুর উপজেলার ১৫নং কুলাটিয়া ইউনিয়নের আ¤্র ঝুটা গ্রামের নিজ বাড়িতে বসে এ প্রতিবেদকের সাথে এ কথাগুলো বলেন তিনি। এ সময় সাথে ছিলেন এপেক্স বাংলাদেশের এন এ ডি এপে.এড.শওকত আলী পিন্টু।

সুনীল চন্দ্র ভট্টাচার্য ও শান্তি লতা ভট্টাচার্যের তিন ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে গণেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য সবার বড়। তিনি ১৯৪০ সালে মনিরামপুর উপজেলার আ¤্র ঝুটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে একটু বুঝের হওয়ার পর থেকেই নেমে পড়েন বাবার সাথে কৃষি কাজে। তাই লেখাপড়া খুব একটা এগুতে পারেননি তিনি।

১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুর পর থেকে ভারতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এলাকার পরিস্থিতি জানতে চাইলে গণেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য বলেন, আমাদের গ্রামটি উপজেলার অন্যান্য গ্রাম থেকে কিছুটা অনগ্রসর ছিল। তাই রাজনীতি, সমাজ নীতি নিয়ে বেশি ভাবার লোক আমাদের গ্রামে কম ছিল। সবার অবস্থা ছিল এমন ,কাজ করলে অন্ন, কাজ না করলে ভিন্ন।কিন্তু আমাদের পার্শ্ববর্তী অভয়নগর ইউনিয়ন ছিল আবার কিছুটা সমৃদ্ধশালী। শিক্ষাদীক্ষা রাজনীতি সব কিছুতেই তারা আমাদের চেয়ে এগিয়ে ছিল। যার কারণে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হানাদার বাহিনীর প্রথম আক্রমণটাও হয় সেই ইউনিয়নের নোয়াবাজার নামক স্থানে।

এমনিতে সব সময় কানাঘুষা চলত দেশে যে কোন সময় যুদ্ধ লেগে যেতে পারে। পশ্চিম পাকিস্তানিরা যে কোন সময় সেনাবাহিনী মাঠে নামিয়ে দিতে পারে। এ নিয়ে সর্বত্রই মার্চের শুরুতে এক ধরনের আতংক বিরাজ করত। তবে এ কথাও ঠিক, ২৬ মার্চের আগে স্থানীয় ছাত্রলীগের কয়েকটা ঝটিকা মিছিল ছাড়া আমাদের এলাকায় আর কোন প্রচার প্রচারণা আমরা শুনিনি। কিন্তু ২৬ মার্চ সকাল থেকে পুরো গ্রামের পরিস্থিতি পাল্টে যায়। আমাদের এলাকায় সব সময় আওয়ামী লীগ ও মুসলিম লীগ সমান শক্তিশালী দল ছিল। কেউ কারো থেকে কম নয়। আমার জানামতে, ৩১ মার্চ পর্যন্ত আমাদের গ্রামে কোন সমস্যা হয়নি। দুই দিন আগেও এলাকার যে মুসলিম লীগের পরিবারের সদস্যরা আমার বাবা চাচাকে দেখলে আদাব দিয়ে জানতে চাইতো মেসো কেমন আছেন। হঠাৎ করে তাদেরই লোলুপ দৃষ্টি পড়ে গেল আমাদের বিষয় সম্পদের ওপর। কুশলাদি জানতে চাওয়া তো দূরের কথা পরোক্ষ ভাবে হুমকি দেওয়া শুরু করল, যাতে আমরা এলাকা ছেড়ে চলে যাই। এরই মধ্যে আশেপাশের গ্রামগুলো থেকে প্রতিদিন খবর আসতেছে তাদের ছেলের বউকে ধরে নিয়ে গেছে, বিয়ের উপযুক্ত মেয়েকে নির্যাতন করছে, বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে,গরু,ছাগল , হাঁস-মুরগি লুট করে নিয়ে গেছে। আমাদের একেবারে প্রতিবেশী মুসলমানেরাও আমাদের আর সাহস দিতে পারছিল না। ইতিমধ্যে আশেপাশের গ্রামের সকল হিন্দু পরিবার গ্রাম শূন্য হয়ে গেল। হিন্দুদের পাশাপাশি মুসলিম পরিবারও ভয়ে এলাকা ছাড়া হতে লাগল। তাই বাধ্য হয়ে বাবা বললেন, আগামীকাল রাত ১২টার সময় আমরা ভারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবো। এ কথা শুনে মা দৌঁড় দিয়ে পূজোর ঘরে গিয়ে কেঁদে কেঁদে প্রার্থনা করল, ঈশ্বর যেন আমাদের বাড়ি ঘরটি রক্ষা করেন। কিছু চাল,ডাল আর কাপড় চোপড় নিয়ে আমরা ঠিক রাত ১২টায় রওয়ানা হলাম। বাবা বললেন, মেইন রাস্তা দিয়ে যাওয়া যাবে না। ফসলি জমি দিয়ে রওয়ানা হলাম আমরা পরিবারের সকলে। কয়েক মাইল হাঁটার পর দেখি আমাদের মত আরো ৫০/৬০টি পরিবারও রাস্তা ধরে হাঁটছে। কেউ কারো সাথে কথা বলছে না। যার যার মত করে হাঁটছে ।অনেকের হাতে টর্চ লাইট ছিল। শিশু মহিলা পুরুষ কোন ভেদাভেদ নেই। যার যখন প্রস্রাব পায়খানার বেগ হতো, রাস্তার পাশে কিংবা কিছুটা পানি আছে এমন খাল বিলে বসে যেতো। কেউ কারো দিকে তাকাবার সুযোগ পেত না। শিশুরা কাঁদতে চাইলে বাবা মা জোরে মুখ চেপে ধরত । যাতে কান্নার আওয়াজ হানাদার – রাজাকারদের কানে যেতে না পারে। রাত ২টার সময় হরিনা স্কুলে গিয়ে আমরা পৌঁছি। সেখানে গিয়ে দেখি শত শত পরিবারের কয়েক হাজার সদস্য। বিশ্রাম শেষে আগে আসারা ভারতের উদ্দেশ্যে আবার বের হয়ে যাচ্ছে, আর আমাদের মত নতুনরা ঢুকছে এই ছিল হরিনা স্কুল ক্যাম্পের কাজ। স্থানীয় গ্রাম সর্দার বাহাদুর চেয়ারম্যানের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এই ক্যাম্পটি চলছে। এখানে আমরা ২ দিন অবস্থান করে আবার ভারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিই। রাস্তায় নেমে দেখি আমাদের সামনে আরো প্রায় ৫ হাজার শরণার্থী পেছনেও তেমনি। পরে ঝিকরগাছা উপজেলার বপি আঁচড়া নামক বাজারে আমরা আশ্রয় নিয়ে রাত কাটাই। বপি আঁচড়া থেকে আবার আমরা হাঁটা শুরু করি ভারতের ভোমরা সীমান্তের উদ্দেশ্যে। ভোমরা সীমান্তে যাওয়ার আগেই আমি আর মা, বাবা ও অন্য ভাই বোনদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। কারণ এই সীমান্তে যাওয়ার একাধিক লিংক রোড রয়েছে। হাজার হাজার মানুষ। কোন কারণে একটু পিছিয়ে পড়লে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। আমি আর মা এক রোডে আর বাবা ও অন্য ভাই বোনেরা অন্য রোডে ঢুকে পড়েছে। অনেকক্ষণ বাবা ও অন্য ভাই বোনদের খুঁজলাম কিন্তু পেলাম না। আবার পেছন থেকে অনেকে বলতে লাগল, দ্রæত হাঁটেন পাঞ্জাবিরা আসছে। ভোমরা সীমান্ত গিয়ে আমি আর মা হাউ মাউ করে তাদের জন্য কাঁদতে লাগলাম। এরই মধ্যে বলাবলি করতেছে বপি আঁচড়া বাজার আমরা পাড় হওয়ার পর সেখানে পাঞ্জাবিরা এসে অপারেশন চালায়। ব্যাপক গোলাগুলি করে অসংখ্য মানুষকে হতাহত করে পুরো বাজারটিই জ্বালিয়ে দেয়। অপরাধ ছিল এই বাজারে আমাদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছে এবং মুক্তিযোদ্ধারা নাকি এ বাজার হতে গতকাল তাদের ওপর আক্রমণ করেছে। কিছুক্ষণ পর দেখি বাবা আমার অন্য ভাই বোনদের নিয়ে আসছে। তখন বাবাকে ধরে আমি অঝোরে কাঁদতে থাকি।

ভোমরা সীমান্ত পার হয়ে আমরা জীবনে প্রথমবারের মতো ভারতে পৌঁছি। আমাদের কোন ক্যাম্পে পাঠানো হবে কর্তৃপক্ষ এ সিদ্ধান্ত নিতে নিতে রাত হয়ে যায়। পরে আমরা একটি আম বাগানে রাত কাটাই। সারাদিনের অভুক্ত থাকার পরেও কিছু খাবার পেলাম না। পরে কিছু শুকনা খাবার বাবা কিভাবে জানি সংগহ করেছিল, সেগুলো ভাগ করে খেয়েই আম বাগানে কাপড় বিছিয়ে শুয়ে পড়ি। সেখানে শুধু আমরা না। শত শত মানুষ যার যার মত করে শুয়ে পড়ছে। পর দিন আমাদের পাঁচকোটা ক্যাম্পে পাঠানো হয়। এই পাঁচকোটা শরণার্থী ক্যাম্পে আমাদের যে রুমটি বরাদ্দ দেওয়া হয় তা ছিল খুবই ছোট। বাবা ও আমরা ভাইয়েরা এবং মা ও বোনেরা আমরা পালাক্রমে ঘুমাতাম। এই ক্যাম্পে আসার দুই মাস পর ভারতের পশ্চিম বঙ্গের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বন্যা হয়। বন্যায় আমাদের পুরো শরণার্থী ক্যাম্প পানিতে ডুবে যায়। আমরা বাধ্য হয়ে ক্যাম্প সংলগ্ন রাস্তায় আশ্রয় নেই। এই সড়ক গুলোও শুকনা ছিল না। কাঁদা মাটি পানিতে স্যাত স্যাতে ছিল। মহিলারা গোসল করে কাপড় পাল্টানো আর প্রসাব পায়খানা করার দৃশ্যটি মনে হলো এখনো মনে হয় ভগবান তুমি বাঁচিয়ে রাখছ কেন?বন্যার পানি আমাদের ক্যাম্প থেকে নেমে যেতে প্রায় ১৪/১৫ দিন সময় লেগেছে। এ সময় বৃষ্টির সাথে একাধিক দিন ঝড় তুফানও হয়েছে। আহা ! সে কি হৃদয় বিদারক দৃশ্য। রাস্তার ওপর এক থেকে তিন/ চার মাসের ছোট ছোট বাচ্চা ছিল একশ’র বেশি। হায়রে এই শিশু গুলো বিজছে আর কান্না করছে। কি করবে বাবা মা’রা। তারাও তো ভিজে শেষ। ভিজা কাপড় দিয়েই মা তার প্রিয় সন্তানটিকে ধরে রাখার চেষ্টা করছে। এই ১৫ দিনের বন্যায় অর্ধ শতের বেশি শিশু মারা গেছে । কারো কপালেই দাহ কিংবা জানাযা জুটেনি। বন্যার পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া ছাড়া বিকল্প কোন ব্যবস্থা ছিল না কারোরই। বন্যার পানি নামার সাথে সাথে আবার আমরা ক্যাম্পে গিয়ে উঠি। কিন্তু এবার আমাদের ক্যাম্পে নতুন একটি সমস্যা দেখা দিল সেটা হলো খাবার সমস্যা। বন্যার আগে যে পরিমান চাল ডাল দিত হঠাৎ করে এর পরিমাণ কমানোর কারণে অভাবি দেশান্তরি মানুষগুলো মেনে নিতে পারেনি। তাদের বক্তব্য,সরকার ঠিকমতো খাবার দিচ্ছে কিন্তু নেতারা চুরি করছে। কয়েকদিন পর এ নিয়ে আন্দোলনে নামল পাঁচকোটা ক্যাম্পের শরণার্থীরা।এক পর্যায়ে তা সংঘর্ষে রূপ নিল। পড়ে ভারতের পুলিশ বাহিনী আন্দোলনকারী শরণার্থীদের ওপর ব্যাপক লাঠিচার্য করে এবং পরে গুলিও করে। এতে কয়েকজন মারা গেলেও পুলিশ স্বীকার করেছে একজন মারা গেছে। এই ঘটনার পর সরকার এই ক্যাম্পটিকে প্রত্যাহার করে নিয়ে বিভিন্ন ক্যাম্পে এখানকার লোকদেরকে পর্যায়ক্রমে স্থানান্তর করে । তবে আমরা আর ক্যাম্পে যাইনি। ছেট একটি বাসা ভাড়া নেই। আমি আর বাবা ভারতীয় মিষ্টির দোকানে চাকুরী করতাম এবং অবসর সময়ে বন থেকে কাঠ কেটে এনে বাজারে বিক্রি করে সংসার চালাতাম। আর কার্ড দিয়ে মাসে মাসে রিলিফের খাবারও সংগ্রহ করতাম।

শরণার্থী জীবনের আর কোন কষ্ট আছে কি না জানতে চাইলে গণেষ চন্দ্র ভট্টাচার্য বলেন, কষ্ট তো পুরো ৯মাসই ছিল । তবে আমি অহংকারের কাজও করেছি। ভারতের চব্বিশ পরগনার বনগ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে গিয়ে বিভিন্ন সময় আমরা তাদের সেবা যতœ করেছি। যখন যেটা হুকুম দিত সেটা করে দিতাম। তারা ভাত খেত, পানি এনে দিতাম। অনেকের কাপড়ও পরিষ্কার করে দিয়েছি। এভাবে শরণার্থী হয়েও মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছি।

কবে দেশে ফিরছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, দেশ স্বাধীনের কয়েক দিনের মধ্যেই আমরা দেশে ফিরে আসি। বাড়ি এসে আমাদের বাড়ি আমরা চিনতে পারিনি। আমাদের ঘর ভেঙ্গে লুট করে সব নিয়ে গেছে। ঘরের চর্তুদিকে শুধু মরুভুমির মত লাগছে।

সরকারের কাছে কোন দাবি দাওয়া আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বেশি কিছু চাই না। যতটুকু করেছি সরকার যেন আমাদের ততটুকু অবদানের স্বীকৃতি দেয়।