ভারতে যাতায়াত বন্ধ, মে মাসের আগে টিকা আসছে না

ডয়চে ভেলের প্রতিবেদন

প্রকাশিত: ৯:১২ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২৬, ২০২১ | আপডেট: ৯:১২:অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২৬, ২০২১

স্থলপথে ভারত থেকে দুই সপ্তাহের জন্য যাত্রী আসা বন্ধ করছে বাংলাদেশ৷ দেশটিতে করোনা পরিস্থিতির অবনতির প্রেক্ষিত রোববার এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার৷

সোমবার থেকে ১৪ দিনের জন্য বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত যাত্রী যাতায়াতের জন্য বন্ধ থাকবে৷ মন্ত্রীসভায় এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে রোববার বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলোতে খবর বের হয়৷

অবশ্য বিভিন্ন গণমাধ্যমকে খবরটি নিশ্চিত করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন৷বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, ‘‘ভারতে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় আমাদের নাগরিকদের রক্ষায় সেখান থেকে আপাতত লোক আসা বন্ধ করছি আমরা৷ এটা দুই সপ্তাহের জন্য৷’’ তবে যাত্রীদের যাতায়াত বন্ধ হলেও পণ্যবাহী যান চলাচল এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে বলে জানান মন্ত্রী৷

লকডাউনের কারণে আগেই আকাশপথে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের যান চলাচল বন্ধ করা হয়৷ পরবর্তীতে প্রবাসীদের ফেরত পাঠাতে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের আটটি গন্তব্যে বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়৷ সেক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে এখন আকাশ ও স্থলপথ দুই ধরনের যাতায়াতের সুযোগই বন্ধ হচ্ছে৷

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে করোনা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি হয়েছে৷ প্রায় প্রতিদিনই রোগী শনাক্তের রেকর্ড হচ্ছে৷ একাধিকবার রূপ বদলানো করোনার নতুন ধরন শনাক্ত হয়েছে দেশটিতে৷ সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে একে অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞরা৷ এরিমধ্যে দেশটির সঙ্গে যাতায়াত বন্ধ ঘোষণা করেছে যুক্তরাজ্য, ক্যানাডা, ফ্রান্স, ইটালিসহ বিভিন্ন দেশ৷ যুক্তরাষ্ট্র তার নাগরিকদের দেশটিতে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছে৷ এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশও যাতায়াত বন্ধের সিদ্ধান্ত নিল৷

টিকার জন্য অপেক্ষা

বাংলাদেশে করোনার টিকার প্রথম ডোজ দেয়া আপাতত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ৷ ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট এর কাছ থেকে চুক্তি অনুযায়ী পাওয়া আস্ট্রাজেনেকার যে টিকা এখত মজুত আছে তাতে এক সপ্তাহর বেশি চলবে না৷ রপ্তানি বন্ধ করায় খুব শিগগিরই নতুন করেও টিকা আসছে না৷

অবশ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রোববার জানিয়েছেন, মে মাসের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশ ২১ লাখ ডোজ টিকা পাবে৷ এরমধ্যে ভারতের টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সেরামের কাছ থেকে বাংলাদেশের বেক্সিমকো আস্ট্রাজেনেকার ২০ লাখ টিকা আনবে৷ আর বৈশ্বিক উদ্যোগ কোভ্যাক্স থেকে ফাইজারের এক লাখ টিকা পওয়ার কথা রয়েছে৷

সংকট তৈরি হওয়ায় সম্প্রতি এর বাইরেও নানা সূত্র থেকে টিকা পাওয়ার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ৷ এরমধ্যে রাশিয়ার সাথে যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশেই তাদের উদ্ভাবিত টিকা উৎপাদনের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে সরকার৷ তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করেছে সরকার, যার কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে৷ করোনা সংক্রান্ত জাতীয় টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘‘টিকা কূটনীতিতে বাংলাদেশ শুরু থেকেই ভুল পথে হেঁটেছে৷ আমরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিলে এখন আমাদের এখানেই করোনার টিকা উৎপাদিত হতো৷ চীন শুরুতেই সেই প্রস্তাব দিয়েছিলো৷ আর ভারত থেকে অক্সফোর্ডের টিকা আসা বন্ধ হওয়ার পর নতুন যে উদ্যোগগুলো নেয়া হচ্ছে তা এখনো কথার মধ্যেই আছে৷ ফলপ্রসূ কিছু নয়৷’’

সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে বাংলাদেশ বেক্সিমকোর মাধ্যমে তিন কোটি ডোজ টিকা কেনার চুক্তি করে৷ চুক্তি অনুযায়ী প্রথম চালানের ৫০ লাখ টিকা আসে গত জানুয়ারি মাসে৷ ফেব্রুয়ারি মাসে আসে ২০ লাখ৷ এরপর সেরাম আর কোনো টিকা পাঠায়নি৷ কথা ছিলো প্রতি মাসে ৫০ লাখ ডোজ টিকা পাঠাবে তারা৷ কিন্তু ফেব্রুয়ারি ও মার্চের ৮০ লাখ ডোজ টিকা এখনো আসেনি৷

শুধু একটি দেশের উপর নির্ভরশীল থাকার নীতি সঠিক ছিল না বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরীও৷ তিনি বলেন, ‘‘করোনার টিকার জন্য একক কোনো দেশের ওপর নির্ভর করা ঠিক হয়নি৷ তার ফল এখন আমরা পাচ্ছি৷ আমাদের এখন উচিত হবে খুব দ্রুত আরো কার্যকর উৎসের সাথে যোগাযোগ চূড়ান্ত করা৷’’

বাংলাদেশে চুক্তির বাইরে ভারত সরকারের কাছ থেকে শুরুতেই ২০ লাখ ডোজ টিকা উপহার হিসেবে পেয়েছে৷ এছাড়া নরেন্দ্র মোদীর ঢাকা সফরের সময় উপহার হিসেবে পেয়েছে আরো ১২ লাখ৷ ভারতের সেনা প্রধান বাংলাদেশের সেনা প্রধানকে উপহার দিয়েছেন এক লাখ৷ সব মিলিয়ে বাংলাদেশ টিকা পেয়েছে এক কোটি তিন লাখ৷ দুই ডোজ করে এই টিকা ৫১ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দেওয়া সম্ভব৷

বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে প্রথম ডোজ টিকা দেয়া শুরু হয় গত ৭ ফেব্রুয়ারি৷ এরপর দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেয়া শুরু হয় ৮ এপ্রিল থেকে৷ এ পর্যন্ত করোনার প্রথম এবং দ্বিতীয় ডোজ মিলিয়ে মোট টিকা দেয়া হয়েছে ৭৯ লাখ ৫৪ হাজার ১৭৬ জনকে৷ তার মধ্যে প্রথম ডোজ দেয়া হয়েছে ৫৭ লাখ ৯৮ হাজার ৮৮০, আর দ্বিতীয় ডোজ ২১ লাখ ৫৫ হাজার ২৯৬ জন৷ সেই হিসাবে এখন বাংলাদেশে করোনার টিকা মজুদ আছে ২৩ লাখ ৪৫ হাজার ডোজ৷
এই টিকা দিয়ে যারা প্রথম ডোজ নিয়েছেন তাদের সবাইকে দ্বিতীয় ডোজ দেয়া সম্ভব নয়৷ তাই সোববার থেকে প্রথম ডোজের টিকা আর দেয়া হচ্ছে না৷ প্রথম ধাপে এক কোটি ৭২ লাখ ৮০ হাজার মানুষকে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল সরকার৷

এদিকে বাংলাদেশে একদিনে করোনায় মৃত্যু আবারো ১০০ ছাড়িয়েছে৷ রোববার ২৪ ঘন্টায় ১০১ জন মারা গেছেন৷