ভারত গিয়েও বাঁচাতে পারিনি বাবা-মা ও ছোট বোনকে : রাধা কান্ত বর্মণ

শরণার্থীর খোঁজে : পর্ব ১৩

শাহজাদা এমরান শাহজাদা এমরান

কুমিল্লা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৬:৫৯ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৬, ২০২০ | আপডেট: ৬:৫৯:অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৬, ২০২০

শাহাজাদা এমরান,কুড়িগ্রাম থেকে ফিরে, শরণার্থী জীবনের কথা বলতে গিয়েই ঢুকরে কেঁদে ফেললেন রাধা কান্ত বর্মণ। তার কান্নায় ভারী হয়ে উঠল এইড কুমিল্লার নাগেশ্বরের অফিস। এক পর্যায়ে নিজকে নিয়ন্ত্রণ করে জানালেন,বাবা যে কষ্ট ৪৯ বছর ধরে বুকে নিয়ে আছি সেই যন্ত্রণা আজ আপনি মনে করে দিলেন। এতেঠ দিন এই কষ্টের কথা কেউ জানতে চায়নি আমরাও বলিনি কারো সাথে।পাকিস্তান হানাদার বাহিনী,বিহারী ও এদেশের হায়েনা রাজাকার আল বদর আল শামসদের ভয়ে দেশের ভিটে মাটি ফেলে পাড়ি জমাই ভারত নামক বিদেশ বিভুইয়ে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি আমাদের। ভারতে গিয়ে শরণার্থী শিবিরে উঠি।

অস্বাস্থ্যকর,অব্যবস্থাপনা, স্যাঁতসেঁত ও নোংরা শরণার্থী শিবিরের খাবারের মান ছিল আরো খারাপ। কোন উপায় না পেয়ে বাধ্য হয়ে সেই খাবারগুলো খেয়ে শিবিরে যাওয়ার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই অসুস্থ হয়ে মারা গেলেন বাবা। বাবার পথ ধরে ১৫ দিনের মধ্যে একইভাবে মারা গেলেন মা । বাবা-মায়ের পথ ধরে তিন মাসের মধ্যে মারা গেল আমাদের আদরের প্রিয় ছোট বোনটি। মাত্র তিন মাসের মধ্যে বাবা মা ও বোনকে হারিয়ে এতিম হয়ে গেলাম আমরা দুই ভাই। বাবা-মা ও বোনকে ধর্মীয় মতে দাহ করতে পারিনি। নিজ হাতে মাটি চাপা দিয়েছি। যখন বোনকে মাটি চাপা দিয়ে শিবিরে আসলাম, তখন ছোট ভাই হাউ মাউ করে কেঁদে বললো দাদা,এরপর কি তুমি না আমি মারা যাব? তুমি আমার আগে মরিও না দাদা। তার কান্না শরণার্থী শিবিরের প্রতিটি মাটি কেঁদেছে। সেই সময়ে আমার অবস্থা যে কি ছিল একমাত্র সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আর কেউ বোঝার সাধ্য নেই। তখন আমার একটাই চিন্তা ছোট ভাইকে বাঁচাতে হবে। আমি ভেঙে পড়লে চলবে না। কথাগুলো বলেই আবারো কান্না শুরু করলেন রাধা কান্ত বর্মণ।

গত ২ নভেম্বর সোমবার বিকালে কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বর উপজেলার এইড কুমিল্লা কার্যালয়ে এই প্রতিবেদকের সাথে এক একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় সাথে ছিলেন এইড কুমিল্লা প্রজেক্ট ম্যানাজার মো. দেলোয়ার হোসেন।

রাধা কান্ত বর্মণ। পিতা শ্রী সেন্টু কান্ত বর্মণ ও মাতা শ্রী কাচু বালা বর্মণ। পিতামাতার দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে তিনি সবার বড়। তিনি নাগেশ্বর উপজেলার নাগেশ্বর ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের মলাভিটাড়ি গ্রামে ১৯৫৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৭০ সালের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন বলে জানান। এই নির্বাচনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের নাগেশ্বর মাঠে এক নির্বাচনী সভায় বক্তৃতা করতে আসেন। তার বক্তব্য শোনার জন্য সেদিন এলাকার পুরুষ মহিলা থেকে শুরু করে শিশুরা পর্যন্ত নাগেশ্বর স্কুল মাঠে জমায়েত হয়েছিলেন। বক্তব্য দিয়ে মানুষ ধরে রাখার এক ভাল গুণ ছিল বঙ্গবন্ধুর। আমাদের এলাকায় তখন আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন সফর হাজি আর মুসলিমলীগের প্রার্থী ছিলেন সাইফুর রহমান হাজি।

বাড়ি ঘর ছেড়ে কেন শরণার্থী হয়ে ভারত গেলেন জানতে চাইলে রাধা কান্ত বর্মণ বলেন, আমরা কৃষক ছিলাম। হাল চাষ করে খেতাম। বাবার ইচ্ছে ছিল কষ্ট হলেও বাড়ি থাকার। যার কারণে আমাদের এলাকার সকল হিন্দু পরিবার ভারতে চলে গেলেও আমরা যাইনি। কিন্তু যখন বাবা দেখল, গ্রামের একমাত্র হিন্দু পরিবার হিসেবে যেকোন সময় আমাদের ওপর আক্রমণটা হয়ে যেতে পাওে, তখন আর তিনি দেরি করেননি। এমনকি আমাদের গ্রামের অনেক মুসলমান পরিবারও বাড়ি ঘর ফেলে ভারতে চলে গিয়েছিল জীবন বাঁচানোর জন্য। এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে তারিখটা মনে নেই। একদিন বিকালে বাবা বললেন, আর নয় এখনই ওপারে (ভারত) চল। তখন মা জানতে চাইলেন কোন রাজাকার কিছু বলছে কি-না। বাবা শুধু বললেন, এতো কথা দরকার নেই। আর বাড়ি থাকব না। ঠিক বিকাল ৫টায় বাড়ি থেকে কাঁদতে কাঁদতে আমরা বের হয়ে গেলাম। মানুষ মরে গেলে যেভাবে কাঁদে ঠিক এভাবেই আমরা কাঁদলাম। বাড়ি থেকে রাস্তায় এসে দেখি, শুধু আমরা না, আরো অসংখ্য মানুষ। কেউ কারো সাথে কথা বলছে না। সবার চোখে মুকে বিশাল আতঙ্কের ছাপ। সবাই হাঁটছে তো হাঁটছে। উদ্দেশ্যে সন্ধ্যার ্আগে ভারতে পৌঁছতে হবে। আমরা আমাদের রামখানা হয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কুচিবিহার জেলার বামন হাটে দু:সম্পর্কের এক দাদুর বাড়িতে যাই। এখানে ৮/১০ দিন থাকার পর আসাম প্রদেশের চৌতারা যাই মামার বাড়িতে। এক মাস মামার বাড়িতে থাকার পর বাবা আবার বামন হাট যান শরণার্থী শিবিরে কথা বলার জন্য। কিন্তু এবারো তারা জানাল জায়গা নেই। পরে মামাদের মাধ্যমে আমরা গোসাইনগাঁও শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় পাই। এই গোসাইগাঁও শরণার্থী শিবির ছিল আমাদের জন্য মরণ শিবির। এই শিবিরে থেকেই মাত্র তিন মাসের মাথায় মা-বাবা ও বোনকে হারিয়ে আমরা দুই ভাই এতিম হয়ে গেলাম।

কান্না জর্জরিত কণ্টে রাধা কান্ত বর্মণ বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমাদের জন্য ভারতে যতগুলো শরণার্থী শিবির ছিল, আমার মনে হয় তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি লোক মারা গেছে এই গোসাইনগাঁও শরণার্থী শিবিরে। বিশেষ করে এই শিবিরে অব্যবস্থাপনা,নানা অনিয়ম,অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার অনুপোযোগী খাদ্য বিতরণের কারণে শত শত লোক মারা গেছে। বাবা,মা ও বোনকে হারিয়ে আমরা সারাদিন কাঁদতে লাগলাম। দুই দিন পর খবর পেয়ে বামন হাট থেকে আমার এক পিসি মা এসে এই শিবিরে আমাদের সাথে থাকে। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত পিসি মা আমাদের ছেড়ে কোথায়ও যাননি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি আমাদের বাড়িতে উঠিয়ে দিয়ে কিছু দিন থেকে তারপর নিজের বাড়ি গেছেন। পিসি মায়ের সেই অবদান আমরা দুই ভাই আজও ভুলতে পারি না।

দেশ স্বাধীন হয় ১৬ ডিসেম্বর। খবর আমরা সাথে সাথে পেয়ে যাই। শিবির জুড়ে ছিল উল্লাস আর উল্লাস। তবে আমরা বাড়িতে আসছি ১৫ দিন পর। কারণ, শিবিরের লোকজনকে একদিনে যেতে দেননি। নিয়ম করে বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরের সাথে যোগাযোগ করে পর্যায়ক্রমে আমাদের ছেড়েছে। তবে দেশ স্বাধীন হয়েছে শুনেই অনেকে চলে গেছে পালিয়ে। তবে আমরা যাইনি। কারণ, গিয়ে আমরা কার কাছে উঠব।বাবা,মা, বোন কেউ তো নেই। এর মধ্যে পিসি মা জানাল, তোমরা চিন্তা করবা না। আমি তোমাদের বাড়িতে দিয়ে কয়েকদিন থেকে তারপর এখানে আসব। পরে দেশ স্বাধীনের ১৫ দিন পর দেশে এসে দেখি, ঘরের চাল আর কয়েকটি বেড়া আছে, কোন মালামাল নেই। সব নিয়ে গেছে। যাক যেদিন গিয়েছি সেই দিনই কোনমতে ঘরটি ঠিক করে পিসি মা আর ছোট ভাইকে নিয়ে মা-বাবাহীন ঘরে উঠি। আমার বাবা-মাকে না পেয়ে আমাদের এলাকার মানুষও অনেক কেঁদেছে।

রাধা কান্ত বর্মণ ক্ষোভের সাথে বলেন, সাংবাদিক স্যার,সরকারের কাছে আমার আর্তিটা একটু লেখবেন । দেশে যদি যুদ্ধ না লাগত তাহলে কি আমরা দুই ভাই বাবা-মা ও সাত বছর বয়সের বোনকে হারাতাম কি না। এই দেশের জন্য আমরা অকালে এতিম হয়েছি। সরকার যেন আমাদের সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেয় যে, এই দেশ স্ব্ধাীনে শরণার্থীদেরও ভূমিকা আছে।