ভালবাসার কাছে হার মানলো করোনা

প্রতিদিন সীমান্তে এসে দেখা করেন দু’দেশের দুই বৃদ্ধ প্রেমিক-প্রেমিকা

টিবিটি টিবিটি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ৭:৩৬ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১, ২০২০ | আপডেট: ৭:৩৬:অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১, ২০২০

ভালবাসা নাকি সর্বজয়ী! সে নাকি কোনও প্রতিকূলতা মানে না! ভয়াবহ করোনা পরিস্থিতিতেও দুই বয়স্ক মানুষকে দেখে এই কথা ফের একবার প্রমাণ করা যেতে পারে এই দূরত্বের দুঃসময়ে। তাঁদের এক জন থাকেন ডেনমার্কে, অন্য জন জার্মানিতে। পরস্পরকে ভালবাসেন তাঁরা। আর সেই ভালবাসা দু’জনের মাঝের সীমান্তের বাধা ভেঙে দিয়েছে অনায়াসে। জয় করেছে করোনার ভয়কেও।

ডেনমার্কের বাসিন্দা ৮৫ বছরের ইনগা রাসমুসেন ও জার্মান নাগরিক ৮৯ বছর বয়সি কার্স্টেন টুচসেন হ্যানসেন একাই থাকতেন দীর্ঘ দিন। বছর দুয়েক আগে পরিচয় হয় তাঁদের, তার পরে গড়ে ওঠে বন্ধুত্বেক সম্পর্ক। একলা থাকা এই দু’জনের বন্ধুত্বের বন্ধন কখন যেন পরিণত হয় ভালবাসায়। তাই প্রায়ই তাঁরা দেখা করতে শুরু করেন। তাঁরা গল্প করতেন, ঘুরে বেড়াতেন, ভাগ করে নিতেন পরস্পরের সুখ-দুঃখ। বয়সকালে এক অনাবিল সম্পর্কের স্বাদ পেয়েছিলেন তাঁরা। তবে সব ওলোটপালোট হয়ে গেল করোনার দাপটে।

জার্মানিতে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৬৩ হাজার। ডেনমার্কে এই সংখ্যা ২ হাজার ৫০০। দু’টি দেশই লকডাউন। সীমান্তও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে দু’সপ্তাহের বেশি সময় হয়ে গেল, একসঙ্গে দেখা করা, ঘোরা-ফেরা সব বন্ধ হয়ে গেছে এই প্রবীণ যুগলের। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে এমনিতে ভিসা ছাড়াই যাওয়া আসার ব্যবস্থা রয়েছে। তাই জার্মানি ও ডেনমার্ক– এই দুই প্রতিবেশী দেশের সীমান্ত তাঁদের প্রেমে বাধা হয়নি কখনও। তবে করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে সেই সীমান্তই বাধা হয়েছে এখন।

তার উপরে চলছে লকডাউন। এতে বিপাকে পড়েন এই প্রবীণ যুগল। কীভাবে দেখা করা যায়, সে উপায় খুঁজতে থাকেন তাঁরা। আর অল্প সময়ের মধ্যেই একটা উপায় বের করে ফেলেন। ডেনমার্কের শহর গেলেহাসের বাসিন্দা রাসমুসেন এবং জার্মান শহর সাডারলাগামের বাসিন্দা হ্যানসেন রোজই খানিকটা করে পথ পেরিয়ে চলে আসেন সীমান্ত শহর আভেনটফটে। জার্মানি থেকে ই-বাইক চালিয়ে আসেন হ্যানসেন। রাসমুসেন আসেন গাড়ি চালিয়ে।

এসে পৌঁছনোর পরে একজন থাকেন নিজের দেশের সীমান্তের পারে, অপরজন থাকেন অন্য পারে। চেয়ার পেতে বসেন তাঁরা, দূরত্ব মেনে, নিয়ম মেনে। জড়িয়ে ধরা, চুমু খাওয়া, নিদেনপক্ষে একটু হাত মেলানো– কিছুই সম্ভব হয় না। তাতে কী! দেখা তো হয়। কয়েক ঘণ্টা গল্প করেন দুজন।

প্রতিদিনই কিছু না কিছু থাকে হ্যানসেনের হাতে। কখনো এক বোতল লেমনেড, টুকটাক খাবার। অবশ্য রাসমুসেন কফিতেই আসক্ত বেশি। কারণ, তাঁকে গাড়ি চালিয়ে সেখানে আসতে হয়। এভাবে কফি-লেমোনেড পান করতে করতে চলে তাঁদের আড্ডা। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেও, নিজের নিজের দেশের সীমান্তের মধ্যে থেকেও দু’জন দু’জনের মুখোমুখি সময় কাটান রোজ। তাঁরা আগে একসঙ্গে বেড়াতেও গেছেন। পরিস্থিতি যখন স্বাভাবিক হবে, তখন তাঁরা আবার একসঙ্গে বেড়াতে যাবেন বলে পরিকল্পনা করছেন।

এই বৃদ্ধ যুগলকে প্রথম দেখতে পান নিকটবর্তী শহর টন্ডেরের মেয়র। দিন কয়েক আগে বাইক চালিয়ে ওই পথ দিয়েই যাচ্ছিলেন তিনি করোনা-পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে। তখনই সীমান্তের দু’পাশে দুই বৃদ্ধ-বৃদ্ধাকে এভাবে বসে থাকতে দেখে কৌতূহল হয় তাঁর। তার পরে কথা বলে সবটা জানার পরে, সোশ্যাল মিডিআয় আপলোড করেন তিনি ঘটনাটি। তাঁর মাধ্যমে এ প্রেমের কাহিনি জানার পরে চমকে গেছে সারা বিশ্ববাসী। এ যেন এই অস্থির ও থমথমে সময়ে এক ঝলক ঠান্ডা হাওয়ার মতো নির্মল।

পরে একটি সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে রাসমুসেন বলেন, “জানি না আমরা ঠিক করছি কিনা, কিন্তু আমরা তো এটা বদলাতে পারব না, কারণ আমরা পরস্পরকে না দেখে থাকতে পারি না।” সীমান্তের দু’দিকের দুই দেশ থেকে এভাবে প্রতিদিন তাঁদের এই দেখা করার ঘটনা ছড়িয়ে পড়তেই রীতিমতো সেলিব্রিটি হয়ে গেছেন তাঁরা। বিশ্বজুড়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন যেখানে স্তব্ধ হয়ে গেছে, এই প্রবীণ যুগল নিজেদের সম্পর্ক ও ভালবাসাকে বাঁচিয়ে রাখার উপায় খুঁজে নিয়েছেন অভিনব ভাবে।

রাসমুসেন এবং হ্যানসেন এইটুকুতেই খুশি। এই কঠিন সময়ে প্রিয় মানুষটির সঙ্গে একটু দেখা তো হচ্ছে, কথা তো হচ্ছে! তাই বা কম কী!