ভিন্নতার শান্ত সৌম্য রূপে বাঙালির ঘরে এলো বৈশাখ

টিবিটি টিবিটি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ৯:১৯ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৪, ২০২১ | আপডেট: ৯:১৯:অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৪, ২০২১

খালিদ হোসেন মিলু: ভিন্নতার শান্ত সৌম্য রূপে বাঙালির ঘরে এলো পহেলা বৈশাখ। আজ পহেলা বৈশাখ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ প্রথম দিন। আজ স্বপ্ন দেখার দিন, আজ নতুন আলোয় হারিয়ে যাওয়ার দিন। পুরাতন ও জরাজীর্ণ কে পিছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার দিন। সমস্ত হতাশা, ক্ষোভ, দুঃখ ভুলে গিয়ে শপথ নেওয়ার দিন।

বাঙালির বৈশাখকে ধরাতলে আমন্ত্রণ জানিয়ে ছিলেন কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি লিখে ছিলেন এসো হে বৈশাখ এসো এসো…/ মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা, অগ্নি স্নানে শুচি হোক ধরা।

জীবনানন্দ দাশ বাংলা নববর্ষ কে আবাহন করে লিখে ছিলেন প্রভাত রবি উঠল জেগে,দিব্য পরশ পেয়ে, নাই গগনে মেঘের ছায়া, যেন স্বচ্ছ স্বর্গ কায়া,ভূবণ ভরা মুক্ত মায়া, মুগ্ধ হৃদয় চেয়ে। আজ বাংলার আকাশে উঠেছে নতুন বছরের নতুন সূর্য। পহেলা বৈশাখে বাঙালির উৎসব আয়োজন হাজার বছরের ঐতিহ্য। এটি বাঙালির বড় অসাম্প্রদায়িক উৎসব এটি একান্তই বাঙালির।

তবে এবারের উৎসব পালিত হচ্ছে ভিন্ন আঙ্গিকে। এক কথায় ঘরে বসে পরিবারের সঙ্গে বৈশাখ উৎযাপন। এতে আনন্দ সুখের রেশটা এবার একেবারেই কম। নেই পান্তা ভাত আর ইলিশ খাওয়ার ধুম, নেই সাজ সজ্জা। খোলা হচ্ছেনা বছরের নতুন হিসাব নিয়ে হালখাতা। আজ কোথাও নেই যেন উৎসবের আমেজ।
করোনা ভাইরাসের আগ্রাসনে নববর্ষের উৎসব যেন তার সর্বজনীন রূপ হারিয়ে লকডাউনে বাধা। হারিয়ে গেল আর একটি বর্ষ ১৪২৭ আর নতুন বর্ষ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ কে বরণ করতে ঘরে বসে বৈশাখী আয়োজন ।

আজ নেই যেন কোন ঢাকের বাদ্য, বাজে না করতাল- এবার বাঙালির ঘরে এলো অন্য এক বৈশাখ! করোনাভাইরাস বিপন্ন এ বিশ্ব জনপদে দৃশ্যত নেই তেমন কোন মানুষ। করোনার ঘোরে কাঁপছে পুরো বিশ্ব। সব যেন সুনসান নিরালা। একলা চলার প্রস্তুতি নিতে নিতে কখনো একলা ঘরে বসে ভাবি- করোনায় ভয় নয় সচেতনতায় হোক জয়।

হায়, তবুও থেমে থাকে না জীবন। থেমে থাকে না ক্ষুধা, থেমে নেই জন্ম। সেই সাথে চলমান থাকে সূর্যকে ঘিরে পৃথিবীর আবর্তন। প্রতিদিন ওঠে নতুন সূর্য। বছর ঘুরে সে নিয়ে আসে নতুন এক বর্ষ। বছরের পরিক্রমণে ফিরে আসে বৈশাখ। তবে এবারের বৈশাখ চির অচেনা। ভিন্ন তার শান্ত সৌম্য রূপ। কোথাও যেন নেই প্রাণের স্পন্দন। এ আমাদের বাঙালির ঘরে এলো যেন অন্য রকম বৈশাখ।

জীবনটা হঠাৎ করে একেবারে অন্যরকম হয়ে গেছে। বৈশাখের সাত সকালে তাড়াতাড়ি খোঁপায় বেলীফুল গুঁজে এবার আর দৌড়ানো হবে না বকুলতলায়। হাওয়াই মিঠাইয়ের মিহি রঙে গোলাপি হবে না ঠোঁট। মুড়ি-মুড়কি-বাতাসার ঠোঙা হাতে নিয়ে আমরা গানের তালে দুলে দুলে সঙ্গত দেব না। হায়, এ যেন নতুন রূপে বৈশাখ!!

বৈশাখ আমাদের বাঙালিদের জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা স্থান দখল করে আছে। এপ্রিল মাসের ১৪ তারিখে শুরু হয় বাংলা বছরের প্রথম দিন। পহেলা বৈশাখ মানে নতুন দিনের শুরু। বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ এই দিনে উৎসবে আনন্দে মেতে ওঠে। আমাদের শৈশব পহেলা বৈশাখের সাথে স্মৃতিতে জড়িয়ে আছে। মায়ের আঁচলের কোণা ধরে আবদার শুরু করতাম কটা টাকার জন্য। পাড়ার আর অন্য সব ছেলেমেয়েদের সাথে হৈ চৈ করে মেলায় যেতাম। তখনকার মেলাগুলোতে হালের মেলার মতো এত জাঁকজমক ছিল না। কিন্তু কী এক মায়া ছিল! মেলায় গিয়েই প্রথমে একটা বাঁশের বাঁশি কিনতাম। সুর তুলতে না পারলে কী হবে, সেই প্যা পোঁ আওয়াজেই কী মায়া! মনে পড়ে যায় আরেকটা জিনিস মেলায় গেলে আমরা নিতাম সবাই । একটা টিনের জাহাজ। এই এতটুকু একটা টিনের জাহাজের ওপর লাল রঙ করা। কেরোসিনের তেল ঢেলে সলতেয় আগুন দেওয়ার কথা । বাড়ির পাশের ছোট্ট ডোবায় ছেড়ে দিলে ভটভট আওয়াজ তুলে তার সেকি দৌড় !

সংক্রান্তির আগেই একটা রঙিন জামা ধুয়েটুয়ে গুছিয়ে রাখতাম। আর মনে করে দেখ মেয়েরা, আলতায় ভরিয়ে দিতাম ছোট্ট দুটো পা আর হাতের আঙুল। একটু বড় হলে চুলে ফুল গোজিয়ে নানান রঙে রঙ্গিন সাজে যেতাম মেলার ভিড়ে। অনেকের বাড়িতে বৈশাখে পায়েস আর মুগডালের ভুনা খিচুরি রান্না হতো। বিকেলে মেলা থেকে ফেরার পথে ঝড় শুরু হতো। সেকি ঝড়! কালবৈশাখীর ঝড়। পায়ের কাছে উড়ে এসে আছড়ে পড়ে গাছের মরা ডাল। ভয়ে দুরু দুরু বুক, বাড়ি ফিরলে অবধারিত মায়ের বকুনি। কিন্তু হাতে ধরা থাকত সেই সুরেলা বাঁশি, সেই যে টিনের ছোট্র হাজাজ, হাতে মাটির বাঙ্ক, – তারা আমার সকল ভয় ভুলিয়ে দিত। আমার ছোট্ট দুহাতে বুকের খিঁচে ধরে রাখা খেলনাগুলো আমায় আশ্চর্য সাহস দিত।

বড় হতে হতে দৃশ্যপট বদলে গিয়েছিল। আমরা দলবেঁধে টিএসসি, চারুকলা, বকুলতলায় সারাদিন আনন্দে মেতেছি। কাগজের মুখোশে মুখ ঢেকে আনন্দে হেসেছি। বাঙালির বাঙালিয়ানায় কমতি রাখিনি কিছুই। অদুরে কোথাও গানের দল এসেছে, ছুটে গিয়ে গান ও শুনেছি। কিন্তু মেলা মূলত আমার শৈশবকেই ধারণ করে। আমার বৈশাখকে রাঙিয়ে দিতে প্রতি বছর আলতার শিশি কিনেছি। শুধু এ বছরটা অন্যরকম। শুধু এ বছরটাতেই যেন নেই কোন রঙ, নেই নাগর দোলার ঘুরনী, আজ বৈশাখ যেন অচেনা রূপে বাঙালির ঘরে।

চৈত্র সংক্রান্তির বিকেল বেলা বসে ভাবছিলাম, আগামীকালই বৈশাখ। বৈশাখ মানে কাঁচা আমের মন কেমন করা ঘ্রাণ! এবারও বৈশাখ ফিরে এসেছে। এবারের বৈশাখে মানুষের ঘরে ঘরে নীরবে চলে কান্নার উৎসব। এক ঘাতক ব্যাধি কেড়ে নিয়েছে আমাদের চৈত্র সংক্রান্তি, আমাদের বৈশাখ। পৃথিবীর সব মানুষ এক রোগের ভয়ে কাঁপছে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ঘরে থাকো- এতে তোমার মুক্তি। আমরা প্রকৃতির রুক্ষতার কাছে ম্রিয়মাণ হয়ে ঘরে থেকে ভালো থাকছি।

বিশ্বজগতে একমাত্র মানুষই পারে পরিবর্তনের সাথে নিজেকে মিলিয়ে নিতে। সহস্র প্রতিকূলতার মধ্যে তাই মানুষই টিকে থাকে শতাব্দীর পর শতাব্দী। এ বছর আমরা নতুন মাত্রায় নববর্ষ উদযাপন করব। আমরা ঘরে থাকব আর একে অন্যের জন্য সহমর্মিতায় নিমগ্ন হব। আমরা আমাদের এই অনভ্যস্ত জীবনে বসে স্বপ্ন দেখব- একটা রোগহীন নতুন ভোরের। যেখানে মৃতের জন্য নীরবে কান্না নেই। যেখানে দিনখাটা মজুরের অন্ন জোগাতে না পেরে ঘরের কোণে ক্ষুধা নেই। যেই ভোরে মানুষেদের পরস্পরকে ছুঁতে না পারার কষ্ট নেই।

মানুষ কখনো পরাজয় মেনে নেয়নি। অনাদিকালের ইতিহাস সাক্ষী, পৃথিবীতে কালে কালে, শতাব্দীতে শতাব্দীতে অনেক ধরনের বিপর্যয় এসেছে। কতশতবার মানবজাতি বিপাকে পড়েছে! কিন্তু কোনো কিছুই মানুষকে করতে পারেনি পরাভূত। যত জরা এসেছে, রোগ এসেছে, এসেছে মহামারি- মানুষ সেগুলো জয় করেছে। আমরা কিছুদিন ধৈর্য ধরে ঘরে আছি। আর কিছু মানুষ অক্লান্ত পরিশ্রম করে আবিষ্কার করে যাচ্ছে ভাইরাস নিরামূল ভ্যাকসিন। সেদিন হয়তো খুব দূরে না, আমাদের পেশী বিদীর্ণ করে শরীরে প্রবেশ করবে করোনার ভ্যাকসিন। আর আমরা হব করোনাব্যাধিমুক্ত। ততদিন পর্যন্ত শুধু নিজেরা নিজেদের কাছ থেকে দূরে থেকে অপেক্ষা করে যাওয়া। করোনাকে ভয় নয় সচেতনতায় হোক বাঙালির জয়।

প্রকৃতির সাথে মানুষের বিরোধ নেই কোন কালে। আমরা ঘুরে ফিরে প্রকৃতির সাথেই মিতালি করি। দিনের নিয়মে দিন যায়। বছর পেরুলে আবার ফিরে আসবে বৈশাখ আর সেদিন আমরা নিশ্চয়ই উৎসবে মেতে উঠব।

এবারের উৎসবটা হোক করোনা প্রতিরোধে নিজেদের সবাইকে ঘরে রেখে নিরাপদ ও সুস্থ থাকার প্রত্যয়। করোনার বিরুদ্ধে হবেই মোদের জয়, করোনাকে আর ভয় নয় সচেতনতায় হোক বাঙালির জয়।

বৈশাখের প্রথম দিনেই শুরু হয়েছে মহামারি করোনাভাইরাস সংক্রম প্রতিরোধে কঠোর লকডাউন। বৈশাখ এর এই দিনটি আমরা না হয় এবার ভার্চুয়াল এ রাখি।

সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন, মাস্ক পরিধান করি,স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন, প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাহিরে বের নয়, ঘরে থাকুন সুস্থ থাকুন।

লেখক: খালিদ হোসেন মিলু , সাংবাদিক ও কলাম লেখক
বদলগাছী,নওগাঁ।