ভুরুঙ্গামারীতে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু ছিল নিরীহ মুসলমানেরা : আবদুর রহিম

শরণার্থীর খোজে: পর্ব-১৫

শাহজাদা এমরান শাহজাদা এমরান

কুমিল্লা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৮:৪০ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২০, ২০২০ | আপডেট: ৮:৪১:অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২০, ২০২০

শাহাজাদা এমরান, কুড়িগ্রাম থেকে ফিরে। কুড়িগ্রাম জেলার ভুরুঙ্গামারী উপজেলায় স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ও বিহারীদের মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল নিরীহ মুসলমানেরা। বিশেষ করে যে সকল পরিবারে যুবক ছেলে ছিল ঐ সকল পরিবার খুঁজে খুঁজে তাদের বাড়ি ঘরে হামলা চালানো হতো। মালামাল লুট করে নিয়ে যেতো। পরিবারের অন্য সদস্যদের শারীরিক নির্যাতন করত। এ এলাকায় তখন হিন্দু পরিবার কম ছিল। আর তাদের উপরও অত্যাচার হয়েছে তবে বেশী হয়েছে মুসলমান পরিবারের উপর। চোখের সামনে অনেক নিরীহ মানুষকে গুলি করে মারতে দেখেছি। কেরোসিন ঢেলে ঘর জ¦ালিয়ে দিতে দেখেছি এবং চুলের মুঠি ধরে অনেক মেয়েদের ধরে নিতেও দেখেছি। কিন্তু কিছু বলার সাহস ছিল না। পাকিস্তানী সৈন্যদের দেখে অনেক দিন আম গাছের উপর উঠেও পালিয়ে রয়েছি। স্বাধীনতা যুদ্ধের ঐ নয় মাস কতযে কষ্ট করেছি তা একমাত্র আল্লাহই ভাল জানেন। আবদুর রহিম, গত ৪ নভেম্বর কুড়িগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ সাহেবের বাসভবনে এই প্রতিবেদকের সাথে সাক্ষাতকারে এ কথা বলেন।

মো.আবদুর রহিম। বাবা মো.আবদুল মজিদ ও মা অহিতন নেছা। বাবা-মা’র পাঁচ ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে তার অবস্থান পঞ্চম। তিনি ১৯৪৩ সালে ভারতের উত্তরবঙ্গের ফুলবাড়িতে জন্ম গ্রহন করেন। পরে তার বয়স যখন পাঁচ বছর হয় তখন তারা সপরিবারে কুড়িগ্রাম জেলার ভুরুঙ্গামারী উপজেলার দক্ষিণ ধলডাঙ্গায় স্থায়ী ভাবে চলে আসেন।

শরণার্থী জীবন সম্পর্কে জানতে চাইলে মো.আবদুর রহিম বলেন,জেলার খবর জানি না। তবে ভুরুঙ্গামারী উপজেলায় আওয়ামীলীগ ও মুসলিমলীগ দুটি দলই শক্তিশালী ছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহের দিকে রংপুর থেকে পাকিস্তানী সেনা এসে স্থানীয় বিহারীদের নিয়ে মাটি খুঁড়ে বড় বড় সুরঙ্গ করতে লাগল। এলাকার নিরীহ কৃষকদের এ কাজে ব্যবহার করত। তবে কোন পয়সা দিত না। এক দিন সুরঙ্গ খুঁড়ে পরদিন এই কাজে না এলে তাদের বাড়িতে গিয়ে চালাত নির্মম নির্যাতন। মুক্তি বলেই জ¦ালিয়ে দেওয়া হতো তাদের ঘর বাড়ি। পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর এই অত্যাচারের সবচেয়ে বেশী শিকার হয়েছে স্থানীয় নিরীহ মুসলমানেরা।

তারিখটা মনে নেই। এপ্রিলের শেষ অথবা মে মাসের শুরুতে আমাদের ভুরুঙ্গামারীর দক্ষিণ ছাদ গোপালপুর গ্রামের আবদুল জব্বার, ব্যবসায়ী মোহর ও মিষ্টি ব্যবসায়ী ছাদেক আলীকে লাইনে দাঁড় করিয়ে প্রকাশ্যে ব্রাশফায়ার করে তাদের নির্মম ভাবে হত্যা করে। তাদের অপরাধ ছিল তারা নাকি মুক্তিবাহিনীদের সহযোগিতা করেছিল। এই তিনজনকে হত্যার পরেই মূলত গ্রামের হিন্দু পরিবার ও মুসলমান পরিবার গুলো গ্রাম ছাড়তে শুরু করে।

আমরা মে মাসের ১০ তারিখ বিকাল ৪টায় বাড়ি থেকে বের হয়ে যাই। আমাদের সাথে আরো ৭/৮টি পরিবার ছিল। আমাদের বাড়িটি ছিল ভারতের একেবারে সীমান্তবর্তী এলাকা। আমাদের বাড়ি থেকে ভারতের সীমান্তে যেতে ১৫/২০ মিনিট সময় লাগত। আমরা ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার জেলার ছোট গারোধরা গ্রামে আশ্রয় নেই। এখানে একটি বিশাল মাঠ আছে। এই মাঠে শতাধিক পরিবার নিজেদের মত করে ঘর বানিয়ে আশ্রয় নেয়। আমরা হাছান চান্দার বাড়ির পাশে ঘর তুলি। যেহেতু আমাদের বাড়ি থেকে ভারতের এই এলাকাটি খুবই কাছে তাই আমরা পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর অবস্থান বুঝে সব সময় বাড়িতে আশা যাওয়া করতাম। বাড়ি থেকে টিন, বাঁশসহ সব কিছু নিয়ে এসে ঘর উঠাই। আমাদের আর্থিক অবস্থা মোটামোটি ভাল ছিল। তাই বাড়ি থেকেই আমরা শাক সবজি থেকে শুরু করে পুকুরের মাছ, চাল সব কিছু আনতাম। যেহেতু আমরা শরণার্থী শিবিরে ছিলাম না সেহেতু শিবিরের কষ্ট গুলো আমরা বুঝতে পারব না। তবে একটি বিষয় ছিল আর তা হলো, চিকিৎসার অভাব ছিল সবারই কমন একটি অভিযোগ। এখানে চিকিৎসার অভাবে অসহায় ভাবে মারা গেছে আমার শ^শুর। তিনি কলেরা না ডায়রিয়ায় মারা গেছেন এই মুহুর্তে তা বলতে পারব না। তবে এটা আমার খুব মনে আছে, অসংখ্য জায়গায় ঘুরাঘুরি করেও কোন ডাক্তার সেদিন পাইনি। এই একটি কষ্টই আমাদের সারা জীবনের কান্না হয়ে আকাশে ভেসে বেড়ায়।

আমরা যেই মাঠে ছিলাম, সেই মাঠ থেকে কিছুটা দূরে মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাংকার ছিল। এই ব্যাংকার থেকে মুক্তি বাহিনী ও মিত্র বাহিনী আমাদের ভুরাঙ্গামারীতে গুলি ও বোমা ছুঁড়ত। আমরা নানা ভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করতাম। বিশেষ করে তাদের ব্যাংকারে খাবার ও পানি নিয়ে যেতাম। সময় সময় তাদের সাথে খাবার খাওয়ারও সুযোগ হয়েছে। তাদের নানা কাজে সহায়তা করতাম বলে মুক্তিযোদ্ধারা আমাকে আদর করত। পরিবারের বড় ছেলে বলে আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেই নি তাদের দেখাশুনা করার জন্য। কিন্তু ছোট ভাই খাদেমুল ইসলাম আমার প্রেরণায় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে। আল্লাহর রহমতে সে অনেক বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধে অংশ নিয়ে সফল হয়েছে।

দেশ স্বাধীনের পর কবে দেশে আসলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ৬ ডিসেম্বর কুড়িগ্রাম মুক্ত হওয়ার পরেই আমরা স্বাভাবিক ভাবে দেশে আসা যাওয়া করেছি। কিন্তু একেবারে আসিনি। কারণ, মুক্তিযোদ্ধা ছোট ভাই খাদেম বলেছে, এখন যাওয়া ঠিক হবে না। আশা করি দ্রুত দেশ স্বাধীন হতে পারে। ভারত প্রকাশ্যে নেমে গেছে। আর কিছুদিন অপেক্ষা করেন। পরে ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমরা ১৭ ডিসেম্বর সকালেই বাড়ি চলে আসি।

আপনার আর কোন বক্তব্য আছে কিনা জানতে চাইলে মো.আবদুর রহিম বলেন, বক্তব্য আমার একটাই। মুক্তিযোদ্ধারা জীবনবাজী রেখে যুদ্ধ করেছে আর আমরা যুদ্ধের কারণে দেশ ত্যাগ করে শরণার্থী হয়েও মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন ভাবে সাহায্য করেছি। বিনা চিকিৎসায় অবহেলায় মারা গেছে আমার শ^শুর। এ ছাড়া কত কষ্ট করেছি তার তো কোন হিসেব নেই। এই কষ্টের বিনিময়ে হলেও ইতিহাসের পাতায় আমাদের নাম থাকা উচিত। সরকারের কাছে শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি চাই। যাতে আগামী প্রজন্ম জানে এই দেশের জন্মের ইতিহাসের সাথে আমাদেরও অবদান আছে।