‘মাগনা ওষুধে রোগ ভালা অয় না’

প্রকাশিত: ১০:২০ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৮ | আপডেট: ১০:২০:অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৮

সপ্তাহে একদিন মাত্র ছুটির দিন, শুক্রবার। সেদিনই চেম্বারে যাই, নিজের জেলায়। রথ দেখা কলা বেচার মতো, নিজের এলাকার রোগ শোকের সাথে দেখা সাক্ষাৎ হলো, আবার নিজেকে প্রমাণের সুযোগও হলো। আর একটু মা লক্ষীর আগমন হলে তো সোনায় সোহাগা! যা হোক রোগী দেখতে বসলাম মাত্র। একটু পরেই বাইরে শোরগোলের মতো কিছু একটা। 

সহকারী মেয়েটা জানালো, ম্যাডাম কানু ডাক্তর, কোয়াক, সবাই হেরে ডাক্তর কয়, সিরিয়াল ভাইঙ্গা আগে ঢুকতে চায়, অন্য রোগীরা মানে না, লাগছে হাউকাউ।

– আচ্ছা, আসতে দাও।

খুব যত্ন করে একজনকে সাথে নিয়ে কানু ঢুকল। ডাবল যত্ন করে মিহি কন্ঠে বলল, ম্যাডাম এ হচ্ছে সালেহা, আমার কাছ থেকে ওষুধ পত্তর নিয়া খায়। কিন্তু এবার আমি কইলাম আপনারে দেখাই দেই। ম্যডাম ভালো করে দেইখা দেন। পরীক্ষা নিরীক্ষা যা লাগে দেন। আরেকটা কথা ম্যাডাম ভিজিট কিন্তু আপনারে কম দিমু আমি।

রোগী বুঝল, কানু ডাক্তর কত ভালো, কত তার খেয়াল রাখে, ভিজিটও কমায় দিলো। আমি আমার মতো রোগী দেখলাম। বললাম, শোন রোগীর যা লাগবে আমি তাই দিব, এর বাইরে একটা কথাও না।

আমার জন্য চমক অপেক্ষা করছিলো। পরে রোগীর ফলো আপে দেখি আমার এডভাইসের বাইরেও অনেকগুলো পরীক্ষা করা। ম্যানেজারকে প্রশ্ন করতেই চুপচাপ কিছুক্ষণ। তারপর বলল, ম্যাডাম এই দেখেন পরীক্ষার লিস্ট, কানু দিয়ে গেছে; আপনি তো দরকার ছাড়া একটাও লিখেন না। একটু বোঝার চেষ্টা করেন ম্যাডাম, কানুরা আমাগো রোগী পাঠায়, বিনিময়ে পরীক্ষা নীরিক্ষার ভাগ নেয়। গুনে গুনে চল্লিশ পারসেন্ট নিয়ে যায় রেফারেল ফি হিসাবে, এক টাকাও কম নেয় না।

তো আমারে যে ভিজিট কম দিল? এটাই তো টেকনিক। রোগী মনে করল, কানু কত্ত ভালো, কত্ত মহান! অথচ দেখেন…

ওহ আচ্ছা এই কাহিনী! তা আপনি তো কখনো আমাকে রেফারেল ফি দেন না। ম্যাডাম কী যে কন, আপনি তো এখানে চেম্বার করেন, এটাই তো আপনাদের ফি। চেম্বারের কোন ডাক্তারই তো রেফারেল ফি পায় না।

তাহলে আমরা এই পারসেন্টের দায় নিব কেন? এখানেই কবি নীরব। নীরবতার সুযোগে এই মধ্যস্বত্ত ভোগীরা গাছেরও খায়, তলারও কুড়ায়, অথচ নাম পড়ে ডাক্তারের।

বড় বড় শহর তো বাদ, খোদ গ্রামেই কোন ডাক্তার নিজস্ব চেম্বার খুলে বসার সাহস করে না। একটা চেম্বার, ডায়াগনস্টিক কিংবা হাসপাতাল খুলে বসা চাট্টিখানি কথা না। আর এত খরচই বা আসবে কোত্থেকে একজন নবীন কিংবা মিড লেভেলের ডাক্তারের। ফলে কারো না কারো ডায়াগনস্টিক, হাসপাতাল, ক্লিনিকে চেম্বারই তাদের ভরসা। চেম্বার করার জায়গা পেয়েই খুশি থাকে তারা।

আমি চুপিচুপি চিন্তা করতে লাগলাম, রোগীর মোট খরচ, ১৮০০ টাকা। রোগী ভাবছে ডাক্তার দেখাতে এসে কত্তগুলো টাকা গেলো! আসলেই তো তাই। আসুন তো এই টাকার ভাগ বাটোয়ারা দেখি। ভিজিট= ৩০০ টাকা, পাঁচশ টাকা থেকে দুইশত টাকা কম দিয়েছে। ইনভেস্টিগেশন করতে টাকা লেগেছে ১৫০০ টাকা, এর ৪০% = ৬০০ টাকা কানু নিয়েছে, এক টাকাও কম না। হায়রে ডাক্তার! পারিশ্রমিক পেলো অর্ধেকটা, উপাধি পেলো কসাই। বাহ, দারুণ তো!

দুই.
আমি চেম্বারের শুরুতেই ঘোষণা দিয়েছিলাম, গরিব অসমর্থ রোগীর কাছ থেকে কোন ভিজিট নিব না। যারা স্বচ্ছল তারা নিশ্চয়ই পূর্ণ ভিজিট দিয়ে দেখাবে, তাহলেই হয়ে যাবে। এখন আমার প্রায় সব রোগীই গরিব আর কি! হা হা, গরিব ডাক্তারের রোগী কী বড়লোক হবে! যাহোক আমি আমার স্যাম্পল হিসাবে প্রাপ্য ওষুধগুলো নিজের আত্মীয় স্বজন এবং অসমর্থ রোগীদের দেয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু ফ্রি চিকিৎসা এবং ফ্রি ওষুধে মানুষের রোগ সারে না। একটা উদাহরণ দেই, এক আত্মীয় একটু অর্থনৈতিক ভাবে অসমর্থ। কিছু হলেই আমাদের কাছ থেকে ওষুধ নিয়ে খায়।

একদিন বলল, ‘বোঝছ বউ, মাগনা ওষুধে রোগ ভালা অয় না।’ ঠিক বলেছেন চাচী। সস্তার তিন অবস্থা। এই নেন, ওষুধের নাম লিখে দিলাম। কিনে খাবেন।

পরে খোঁজ নিয়ে জানলাম, চাচীর অসুখ একদম নাই। ফকফকা কিলিয়ার। কি চাচী, রোগ দেখি একদম নাই? ওষুধ ঠিকঠাক খেয়েছেন? কী কও বউ, পঁয়ত্রিশ টাকা করে একেকটা ওষুধ! এত্ত দামী ওষুধ, ঠিকঠাক খাবো না! একদম ঠিকঠাক খেয়েছি, দামী বলে কথা গো মা। রোগ সেরে গেছে।

মনে মনে ভাবলাম, সেই একই ওষুধ যখন ফ্রিতে দিয়েছিলাম। ঠিকঠাক খায়নি, মাগনা তো! ফলে রোগও যায়নি। মাগনা জিনিসের দাম থাকে না, এ কথাটা পৃথিবীর সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সেই থেকে ফ্রী চিকিৎসা দেয়ার আগে দ্বিতীয়বার ভাবি।

একটা গল্প বলে শেষ করছি, কিছু দিন আগে দুসাই নামক একটা রিসোর্টে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। দারুণ গাছপালা ছাওয়া মনোলোভা এক রিসোর্ট। নীল জলের সুইমিংপুল, মখমলের বিছানা, আহ! আমার তেমন ভালো লাগেনি।

একদিনের জন্য বারো তেরো হাজার টাকা শ্রেফ বিলাসিতা। আমি বিলাসিতা পছন্দ করি না, একদম না। এতে আমি সেকেলে হলে, হলাম। সবচেয়ে অবাক কান্ড, মামের বোতলে দুসাই লেখা একটা স্টিকার লাগানো। এই এক স্টিকারে দেড় লিটারের একটা মাম পানির বোতলের দাম হয়ে গেলো দুই শত টাকা! নরমালি যেটার দাম ত্রিশ টাকা।

বেটার হাফ বললেন, এটা ব্র্যান্ডের দাম, বুঝলা? বুঝলাম। বোতলটাও সাথে করে নিয়ে এসেছিলাম। অথচ কত আধখাওয়া বোতল ফেলে দেই। এটা ফেলিনি কিংবা ফেলতে পারিনি কেননা, বেশি দাম দিয়ে কিনেছি যে, টাকার দাম আছে না। সেই বোতলের সবটুকু পানি ইউজ করেছি, শেষ ড্রপ পর্যন্ত।

দেখলেন তো, জায়গা ভেদে ত্রিশ হয়ে যায় দুইশত? চাইনিজে বসে পঞ্চাশ টাকা টিপস না দিলে মান থাকে না, কিন্তু টং দোকানের চাওয়ালাকে পাঁচ টাকা দিতে বাধে। গড় পড়তা একটা ক্লিনিকে বিশ হাজারে ডেলিভারী করালেও, পাঁচ তারকা হাসপাতালে দেড় লাখ লাগে। আগে না বুঝলেও এখন বুঝি, সবই ব্র্যান্ডের খেলারে পাগলা, ব্র্যান্ডের খেলা। ওহ ভালো কথা, পাঁচ তারকা আর হোটেল সালাদিয়া, শেফ কিন্তু শেফই। মাস শেষে মাইনা পায় কিংবা দিন শেষে। দরদামে সে তেমন থাকে না, কাজ তার রান্না করা। ব্যাস এইটুকুই।

আচ্ছা হাসপাতালের শেফ কারা জানেন তো? আচ্ছা না জানলে আমি বলছি, কারা আবার, ডাক্তাররা! ব্যাপার কী জানেন, হোটেলের খাওয়া দাওয়া দর দামে শেফ বকা না খেলেও হাসপাতালের সব কিছুতেই ডাক্তাররা বকা খায়। কী মজা, নাহ! অথচ শুধুমাত্র চিকিৎসা ছাড়া হাসপাতাল রিলেটেড আর কিছুতেই ডাক্তাররা ইনভলভ থাকে না। যেটা আমাদের কাছে সেবা, সেটা ডাক্তারের কাছে পেশা। পেশা নিয়ে কেউ কখনো হেলাফেলা করে না। কাভি নেহি। এই কথাটা কবে বুঝব আমরা? যত তাড়াতাড়ি বুঝব ততই মঙ্গল, সবার জন্যই।

লেখক:
ডা. ছাবিকুন নাহার
মেডিকেল অফিসার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

-মেডিভয়েস।