মানবতার ফেরিওয়ালা তায়েবুর রহমানের গল্প

শাহজাদা এমরান শাহজাদা এমরান

কুমিল্লা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৬:৩২ অপরাহ্ণ, মার্চ ৩০, ২০২১ | আপডেট: ৬:৩২:অপরাহ্ণ, মার্চ ৩০, ২০২১

তায়েবুর রহমান। মুক্তিযুদ্ধ দেখেননি। বড় হয়ে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধাদের গল্প শুনতে শুনতে তার চোখ ছল ছল করে উঠে। আপসোস করেন আহ! জীবনে যদি একবার দেশের জন্য যুদ্ধ করতে পারতাম তাহলে মরেও শান্তি পেতাম। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধতো আর বার বার হয় না। একটি জাতির জীবনে একবারই হয়। তাই তায়েবুর রহমানের স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেল। কিন্তু করোনা দেশের জন্য,দেশের মানুষের জন্য,অসহায়,নির্যাতিত,অবহেলিত,নিস্পেশিত দরিদ্র মানুষ গুলোর জন্য সেবা করার এক বিরাট সুযোগ এনে দিল তায়েবুর রহমানের জীবনে।

আমেরিকা প্রবাসী এই করোনা যুদ্ধা নিজের সর্বোচ্চটুকু বিলিয়ে দিলেন এলাকার দরিদ্র মানুষের কল্যাণে।করোনার দ্বিতীয় ঢেউ উঠার আগ মুতুর্তেই স্থানীয় জনগণকে জানিয়ে দিলেন,আপনাদের ভয় নেই। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন,নিরাপদে থাকুন আর আল্লাহর রহমতে দুমুঠো ভাতের জন্য আপনাদের চিন্তা করতে হবে না। ইনশাল্লাহ আমি আছি আপনাদের কল্যাণে।

বলছিলাম কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার বাঙ্গরাবাজার থানার বাঙ্গরা পশ্চিম ইউনিয়নের কোদালকাটা গ্রামের মৃত হাজি আব্বাস আলী ও নেহারা বেগমের ছেলে তায়েবুর রহমানের কথা। গত ১৬ বছর ধরে তিনি আমেরিকার নিউর্য়ক সিটিতে বসবাস করে আসছেন। সাত সমুদ্র ও তের নদীর দূরে অবস্থান করেও ভুলে যাননি মা মাটি ও তার প্রিয় মাতৃভূমিকে। দেশ যখন মহামারী করোনার কালো থাবায় বির্পযস্ত,সাধারণ ছুটির কারণে সাধারণ দরিদ্র মানুষ গুলো যখন নিজ ঘরে বন্দি তখন তিনি নিজকে আর সামলে রাখতে পারেননি। আমেরিকায় বসে একটি ছক আঁকলেন । সেই ছক অনুযায়ী নিজ এলাকার নিজস্ব লোকজন এবং একটি অনলাইন সংস্থার মাধ্যমে তিনি কাজ শুরু করেন।

গেল বছর পুরো সাধারণ ছুটিতে নিরবে নিবৃত্তে চালিয়ে গেলেন করোনার বিপরীতে দরিদ্র মানুষদের মুখে দুই মুঠো ভাত তুলে দেওয়ার সংগ্রাম। এ জন্য তাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে,স্বীকার করতে হয়েছে ত্যাগ।অতিক্রম করতে হয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। কারণ,সেই সময়ে বাংলাদেশের চেয়েও করোনায় বেশী বিপর্যস্ত ছিল আমেরিকা। তার স্টেটে করোনার প্রাদুর্ভাব ছিল বেশ লক্ষনীয়। কিন্তু নিজের ও পরিবারের জীবনের চেয়েও সে সময় তার কাছে বড় হয়ে উঠে মুরাদনগর উপজেলার সাধারণ মানুষের জীবন।
তার নিযুক্ত লোকেরা রাতের আধাঁরে দরিদ্র মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন চাউলসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য। বিশেষ করে সদ্য চাকুরী হারানো মধ্যবিত্ত পরিবার গুলোর প্রতি তার ছিল বিশেষ দৃষ্টি। সবাই যখন ঘুমে তখন তার লোকেরা মধ্যবিত্ত পরিবার গুলোর দড়জায় দড়জায় কড়া নেড়েছেন। সাবেক এমপি কায়বোদ ও তায়েবুর রহমানের সালাম দিয়ে বিভিন্ন নিত্য প্রয়োজনীয় পন্য সামগ্রীর বস্তা পৌঁছে দিয়েছেন অভাবীদের ঘরে ঘরে। এ গুলো পেয়ে এ সময় অনেকে চোখে পানি ধরে রাখতে পারেননি বলে জানান তিনি।

তায়েবুর রহমান সম্প্রতি আমেরিকা থেকে টেলিফোনে কথা বলেন এই প্রতিবেদকের সাথে। তিনি বলেন, মহামারী করোনার কারণে দেশ যখন লকডাউনে চলে গেল তখন আমেরিকার অবস্থাও খুব খারাপ। তখন আমাদের মুরাদনগর থেকে খবর আসতে লাগল,মানুষের কাজ কর্ম নেই।অর্ধ হারে অনাহারে মানুষের জীবন চলছে। তখন আমি সাথে সাথে সিদ্ধান্ত নিলাম,না এবার আমার সুযোগ হয়েছে মানুষের কল্যাণে নিজকে বিলিয়ে দেওয়া।কারণ , আমার নেতা ও মুরাদনগরের উন্নয়নের রূপকার একাধিকবার নির্বাচিত সাবেক এমপি ও সাবেক মন্ত্রী আলহাজ¦ শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ সব সময় একটি কথা বলতেন, মানুষের সেবার চেয়ে বড় ইবাদত আর কিছুই নেই। তাই এলাকার ছোট ভাইদের দিয়ে একাধিক গ্রুপ করে মুরাদনগরের হাজারো অতিদরিদ্র মানুষের একটি তালিকা তৈরী করি। আমি বিএনপি করলেও তালিকা তৈরীতে আমি কে আওয়ামীলীগ আর কে বিএনপি সেই বিবেচনা করিনি। দলমত নির্বিশেষে লোকের তালিকা করে পুরো লকডাউনের সময়কাল পর্যায়ক্রমে আমি তাদের ঘরে ঘরে খাদ্য,নগদ পয়সা পৌঁছে দিয়েছি।

মুরাদনগর উপজেলার বিভিন্ন পর্যায়ের একাধিক ব্যক্তির সাথে কথা বলে জানা গেছে, তায়েবুর রহমান সাহেব শুধু করোনাকালীন সময়ই নয় তিনি সব সময়ই এলাকার মানুষের সুখে দু:খে পাশে থাকেন। তায়েবুর রহমান সাহেব, এলাকার মসজিদ,মাদরাসা,এতিমখানাসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সব সময়ই তার সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করে আসছেন।

মুরাদনগর উপজেলার বাঙ্গরা পশ্চিম ইউনিয়নের কোদাল কাটা ও দীঘির পাড় গ্রামের নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কলেজ শিক্ষক ও এক ব্যবসায়ী বলেন, যেহেতু তিনি একটি রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত তাই আমরা নাম প্রকাশ করলাম না। শুধু এতটুকু বলব, পরোপকারী ও গরীবের বন্ধু বলতে যা বুঝায় তায়েবুর রহমান নি:সন্দেহে তাদের একজন। তাকে এলাকার যে কোন প্রয়োজনে কোন কিছু জানালে তিনি কখনো কাউকে না করেন না। কারো মেয়ের বিবাহ দিতে হবে, স্কুল কলেজের লেখা পড়ার খরচ চালাতে হবে সব কিছুতেই সবার আগে ছুটে আসেন তায়েবুর রহমান। আর করোনাকালীন সময়ে তিনি যা করেছেন তা তো এখন ইতিহাস। তায়েবুর রহমান সাহেবকে মুরাদনগরের মানুৃষ করোনা যোদ্ধা হিসেবে মনে করে।

আপনার ভবিষ্যত স্বপ্ন কি জানতে চাইলে করোনা যোদ্ধা তায়েবুর রহমান বলেন, আমার খুব বেশী স্বপ্ন নেই। মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া তিনি আমাকে অনেক কিছু দিয়েছেন। জীবনের এই পর্যায়ে এসে আমার এখন একটিই মাত্র স্বপ্ন আর তা হলো , জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত যেন মুরাদনগরের অসহায় এবং অবহেলিত মানুষের কল্যাণে কাজ করে যেতে পারি।