মির্জাগঞ্জের খরস্রোতা বেড়েরধন নদী এখন মৃত প্রায়

নদীর বুকে চলছে হাল চাষ,

টিবিটি টিবিটি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ৬:৫১ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৩০, ২০১৯ | আপডেট: ৬:৫২:অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৩০, ২০১৯
ছবি: টিবিটি

উত্তম গোলদার মির্জাগঞ্জ(পটুয়াখালী): পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ ও বরগুনা জেলার বেতাগী উপজেলার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত একসময়ের খরস্রোতা বেড়েরধন নদীটি তার জৌলুস হারিয়ে কালের স্বাক্ষী হয়ে এখন মৃত প্রায়। দেড় যুগের অধিক সময় ধরে প্রয়োজনীয় খননের অভাব, শাখা খালগুলোতে সুইজগেট নির্মান না করে অপরিকল্পিত ভাবে বাঁধ নির্মান,পানির স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকা ও পলিমাটি জমে চর ভরাট হয়ে গেছে।

নদীর বুকে জলছে হালচাষ,আবার কোন কোন স্থানে সরকারি ভাবে আশ্রয়ন প্রকল্পের ঘর নির্মান করা হয়েছে। এদিকে দীর্ঘদিন যাবৎ কোন নৌযান চলাচল না করায় এক সময়ের কর্মচাঞ্চল্য সুবিদখালী লঞ্চ ঘাটটিতে শুধুই নিরবতা বিরাজ করছে। যাত্রী ওঠা নামার সিড়ি সহ পল্টুনটি অবস্থা খুবই নাজুক,এটি এখন আর কোন কাজে আসছেনা,মূল বেড়েরধন নদী থেকে ৫টি শাখা খালের মুখে বাঁধ দেওয়ায় পানি চলাচল বন্ধ থাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের বাধ্য হয়েই গোসল,ওজু সহ সকল কাজে ব্যবহার অনুপযোগী পানি ব্যবহার করতে হয়,এতে নানা ধরনের রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয় এলাকার মানুষ,তাই এসব খালের মুখের বাঁধ কেটে দিয়ে সুইজগেট নির্মান করা সহ মূল বেড়ের ধন নদীটি দ্রুত খনন করার জন্য সরকারের কাছে দাবী জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ও পানির স্তর না থাকায় পলি মাটি জমে চর পরে তার উপরে প্রাকৃতিক ভাবে বেড়ে ওঠা ছৈলা গাছ সহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ-গাছালিতে পরিপূর্ন হওয়ায় খরস্রোতা বেড়েরধন নদীটি সংকুচিত হয়ে বর্তমানে ৮-১০ ফুট দৈর্ঘের একটি সরু খালে পরিনত হয়েছে।এক সময় এ নদী দিয়ে যাত্রীবাহী লঞ্চ,পন্যবাহী ট্রলার সহ বিভিন্ন নৌযান নিয়মিত চলাচল করলেও বর্তমানে ছোট একটি ট্রলার যাতায়াত করতে সামান্য জোয়ারের পানির জন্য ৬-৭ ঘন্টা অপেক্ষা করতে হয়।

২০০৩ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অর্থায়নে এবং বেসরকারী সংস্থা ডানিডার কারিগরি সহায়তায় একবার খনন করা হয়, পরবর্তীতে এটিকে সচল করতে স্থানীয় কোন জনপ্রতিনিধি বা সরকার কোন পদক্ষেপ নেয়নি। ১২ কিঃমিঃ দৈর্ঘ্য, ৯৫ ফুট প্রস্থ ও ৯ ফুট গভীরের এই বেড়েরধন নদীটি একসময় ছিল বেশ খরস্রোতা,পটুয়াখালী জেলা থেকে বরগুনার পাথরঘাটা ও পিরোজপুর জেলা শহর পর্যন্ত ৬টি একতলা লঞ্চ যাত্রী নিয়ে এ নদীর বুক চিরে নিয়মিত যাতায়াত করতো, স্থানীয় ব্যবসায়ীরা পার্শ্ববর্তী জেলা ঝালকাঠী ও খুলনা মোকাম থেকে পন্য সামগ্রী কিনে ট্রলারে করে নিয়ে আসতেন এবং পটুয়াখালীর কলাপাড়া,গলাচিপা,বাউফল,দুমকি সহ বিভিন্ন উপজেলা থেকে ব্যবসায়ীরা ধান,তরমুজ ও বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কিনে ট্রলার বোঝাই দিয়ে এই নদী দিয়ে স্বরুপকাঠী এবং বানারীপাড়ায় নিয়ে যেতেন।

নদীর দুই পাড়ের কৃষকরা তাদের ফসলি জমিতে পানি তুলে সেচ কাজে লাগাতেন এবং স্থানীয় পরিবার গুলো তাদের দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করতেন,যা এখন শুধুই অতীত।নদীটির দুই পাড়ের স্থানীয় মানুষ দৈনন্দিন যাতায়াতের জন্য তৎকালীন সময়ে পর্যাপ্ত ব্রীজ না থাকায় নৌকা দিয়ে পারাপার হলেও বর্তমানে পায়ে হেঁটে নদী পার হচ্ছেন।নদীর দুই পাড়ের বসবাসরত সহস্রাধিক পরিবারের লোকজন মনের আনন্দে সাঁতার কেটে গোসল করা সহ দৈনন্দিন কাজে এই নদীর পানি ব্যবহার করলেও বর্তমানে বালতি বা মগ দিয়ে পানি তুলে গোসল করতে হয় এবং দৈনন্দিন কাজের জন্য বাঁধ দেয়া শাখা নদীর ময়লা পানি ও পুকুরের পানিই তাদের একমাত্র ভরসা।

নদী তীরবর্তী লেমুয়া গ্রামের প্রবীন বাসিন্দা কৃষক আঃ মোতালেব দরবেশ(৬৪) ও খালেক গাজী (৫২) বলেন,একসময় এ নদীটি খুব খরস্রোতা নদী ছিল,একপার্শ্ব দিয়ে সাতার কেটে অপরপ্রান্তে পৌছাঁনো খুব কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল,পটুয়াখালী থেকে বরগুনা ও পিরোজপুরে যাতায়াতকারী যাত্রীবাহী লঞ্চের সাইরেনের শব্দে আমাদের ঘুম ভাঙ্গতো,এখানকার ব্যবসায়ীরা ঝালকাঠী ও খুলনা থেকে বড় বড় ট্রলারে করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পন্য সামগ্রী আনতেন, পানির স্রোত না থাকা ও খনন না করায় কালের বিবর্তনে পলি মাটি জমে চর পরায় এখন লঞ্চ, ট্রলার কোন কিছুই চলাচল করতে পারছেনা,সামান্য জোয়ার হলে দু- একটি ট্রলার মাঝে মধ্যে নদীর মধ্যে ঢুকে পড়লেও পানির অভাবে আটকে থাকে এবং ৬-৭ ঘন্টা বসে থাকার পর পানি বাড়লে তার পর তারা যেতে পারেন।

নদীটিতে খননের দাবী করে তারা বলেন, খনন করা হলে নদীটি তার প্রান ফিরে পাবে,দুই পাড়ের দেড়শতাধিক কৃষকের ফসল উৎপাদনে প্রয়োজনীয় পানির অভাব পূরণকরাসহ বসবাসরত সহস্রাধিক পরিবারগুলোর পানির কষ্ট লাঘব হবে। উপজেলার দেউলী বাজারের ব্যবসায়ী মোঃ আফজাল হোসেন খাঁন (৫৫) বলেন, কালের বিবর্তনে চর পরে নদীটিতে নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমাদের ব্যবসায়ীদেরকে সড়ক পথে এখন মালামাল আনতে হচ্ছে, আর এতে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হিমসিম খাচ্ছি। যাতে আবার এই নদীতে লঞ্চ, ট্রলার সহ সকল প্রকার নৌযান চলাচল করতে পারে সে জন্য এ নদীটি খনন করা সহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছি।

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার আব্দুল্লাহ আল জাকী বলেন, খরস্রোতা এই বেড়ের ধন নদীটি দীর্ঘদিন যাবৎ সংস্কারের অভাবে বর্তমানে এটি খাল নামেও পরিচিত এবং নদীটি প্রায় মৃত,পুনঃখনন করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহন করা হলে এটির পানির স্বাভাবিক প্রবাহ অব্যাহত থাকবে,আর এখানকার জেলেদেরও একটি আয়ের উৎস হবে এবং নদীটি তার প্রাণ ফিরে পাবে। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে জেলা প্রশাসক মহোদয়ের কার্য্যালয়ে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক সভায় উপস্থিত এমপি মহোদয়দেরও দাবী ছিল যে-এরকম যেসকল নদী বা খাল আছে,যে গুলো পানির অভাবে শুকিয়ে গেছে বা চর পরে নৌযান চলাচল করতে পারে না সেগুলো যাতে আবারও যেন প্রাণ ফিরে পায় তার জন্য বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহন করা হয়।

এটি পুনঃরায় খনন করে কিছু কিছু স্থানে যদি সুইজগেট স্থাপন করা হয় তাহলে আমাদের এই নদীটি আবারও প্রাণ ফিরে পাবে, তার জন্য আমরা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। মির্জাগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান খাঁন মোঃ আবু বকর সিদ্দিকী বলেন, বেড়েরধন নদীটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন একটি নদী,একসময় এ নদী দিয়ে মানুষজন লঞ্চ সহ বিভিন্ন নৌযানের মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন উপজেলা-জেলা শহরে যাতায়াত করলেও বর্তমানে পলি মাটি জমে ভরাট হওয়ায় এবং পানির প্রবাহ না থাকায় কোন ছোট নৌকাও চলতে পারেনা। উপজেলা পরিষদের রেজুলিউশনে এনে নদীটিকে পুনঃখননের জন্য কর্তৃপক্ষের নিকট প্রস্তাব পাঠিয়েছি,পানি সম্পদ মন্ত্রনালয় এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলে আমার বিশ্বাস।