মুখ থুবড়ে পড়ছে মোদির হিন্দুত্ববাদ

প্রকাশিত: ১০:০৩ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০১৮ | আপডেট: ১০:০৩:অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০১৮

২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিশাল জয় অর্জনে দলটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ১৯৮৪ সালের পর ভারতের পার্লামেন্টে সেবারই প্রথম নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল দলটি। তখন মনে হয়েছিল যে, ভারতে জাত-পাত এবং আঞ্চলিক বিবেচনার ভিত্তিতে মানুষ ও গোষ্ঠীগুলোকে বিচার করার বহুদিনের প্রচলিত ধারার পরিবর্তন হয়েছে এবং ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের নতুন যুগের সূচনা হয়েছে।

২০১৪ সালের সেই নির্বাচনের আগে মোটামুটিভাবে ভারতের প্রায় অর্ধেক আসনে জয়ী হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করে বিজেপি জনগণের কাছে বুদ্ধিদীপ্ত উপায়ে ভোট প্রার্থনা করে। নির্বাচনী প্রচারাভিযানের সময় দলটি নিজেদের এজেন্ডা বাদ দিয়ে মোদির ব্যক্তিগত দক্ষতা ও নম্র স্বভাবের ব্যাপারটি প্রচারে বেশি মনোযোগী হয়। তা ছাড়া বিজেপির একটি বড় অংশ খুবই সতর্কভাবে ‘নিম্ন জাত-বর্ণের দলের’ সাথে আঞ্চলিক জোট গঠন করার বিষয়টি গোপন রাখে। নি¤œ এবং অতীতে ‘অস্পৃশ্য’ হিসেবে পরিচিত দলিত বলে পরিচিত নিম্নবর্ণের মানুষ ও উপজাতি জনগোষ্ঠীর সাথে কৌশলগত জোট গঠনের ফলে উত্তর ও পশ্চিম ভারতে বিজেপির সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও সমর্থন ধারণার চেয়েও বেড়ে যায়। এর ফলে ২০১৪ সালে যা হয়েছিল তা হলো, নির্বাচনে মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি বিশাল বিজয়। আর অন্য দিকে দ্রুত ও ব্যাপক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অর্জনের অঙ্গীকারের মধ্যেই আটকে যায় মোদির ভবিষ্যৎ। ২০১৪ সালে নির্বাচনী প্রচারাভিযানের সময় মোদির ‘মেক ইন্ডিয়া গ্রেট অ্যাগেইন’ স্লোগানের সাথে হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্ববাদ যুক্ত হয়ে যায়। নির্বাচনের পর মুসলমান ও খ্রিষ্টানদের সমালোচনা করা হয় এবং মৌখিক ও শারীরিকভাবে আক্রমণও করা হয়। কিন্তু হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা সব সময়ই একটি মৌলিক বাধার সম্মুখীন হয়েছে, আর তা হচ্ছে জাত বা বর্ণ।

হিন্দু জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে ইচ্ছুক ব্রাহ্মণ এবং অন্যান্য উচ্চ বর্ণের হিন্দুরা নি¤œ বর্ণের হিন্দুদের সাথে ক্ষমতা তো দূরের কথা নিজেদের খাবারও ভাগ করতে চায় না। প্রকৃতপক্ষে উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের বসতবাড়ির ভেতরে বর্ণ নিয়ে কথা বলাই নিষিদ্ধ। নিজেকে একজন চা বিক্রেতার সন্তান হিসেবে দাবি করা ও তেল উৎপাদনকারী সম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে দাবি করা নরেন্দ্র মোদি অবশ্য হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে এই ধরনের প্রথার প্রচলনকে অস্বীকার করেছেন। সহাবস্থান নিশ্চিত করতে উচ্চ বর্ণের হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের মোদি গণতন্ত্রমনা হওয়ার আহ্বান জানালেও ভারতজুড়ে বিভিন্ন বর্ণের হিন্দুদের মাঝে ভারসাম্য সৃষ্টি মোটেও সহজ কাজ নয়।

ঐতিহাসিকভাবে নিচু অবস্থানে থাকা হিন্দুদের উন্নতির ব্যাপারে ২০১৪ সাল থেকে আনা মোদির বিভিন্ন প্রস্তাব বিজেপির উচ্চবর্ণের হিন্দু ভোটব্যাংককে কেবল রাগান্বিতই করতে পেরেছে। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে বর্ণভিত্তিক বিভিন্ন সহিংস ঘটনার কারণে দলিত জনগোষ্ঠীও বিজেপির থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তা ছাড়া মোদির ভারসাম্যপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা ব্যর্থ করে দেয়ার পেছনে দেশটির ভৌগোলিক অবস্থারও দায় রয়েছে। এতদিন কেবল উত্তর ও পশ্চিম ভারতে কেন্দ্র করেই বিজেপির কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর দলটি জম্মু ও কাশ্মিরসহ ভারতের পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলে প্রভাব বিস্তারে মনোযোগ দেয়। দেশের যেখানে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন সম্ভব হয়নি সেখানেই বিজেপি আঞ্চলিক দলগুলোর সাথে জোট বেঁধেছে।

কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে প্রাথমিক সাফল্যের দেখা মিললেও একক জাতিরাষ্ট্র হিসেবে নয় বরং বিভক্ত ভারতের দৃশ্য ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। ভারতের রাজ্যগুলো ভাষাগতভাবে এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক আঞ্চলিক সীমানার ভিত্তিতে পুরোপুরি বিভক্ত, যা কি না হিন্দু জাতীয়তাবাদ অথবা আধুনিক ভারতের ধারণার সম্পূর্ণ উল্টো।
অন্য দিকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ব্যাপারে দেয়া প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করতে পারছে না মোদি সরকার। ভারতের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি আগের প্রবৃদ্ধিকে অতিক্রম করতে পারেনি এবং ২০১৪ সাল থেকে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টি কম বেশি অপরিবর্তনশীল রয়েছে।

এ দিকে বিজেপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেস পার্টিকে জোট মিত্রদের জন্য অবিশ্বস্ত দল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন মোদি। এর অর্থ এই যে, ২০১৯ সালের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন হওয়া নিয়ে সংশয়ে আছেন তিনি। যদিও বিজেপির কৌশল নির্ধারক ও পণ্ডিতরা ২০১৯ সালের নির্বাচনের কৌশল নির্ধারণে কাজ করছেন, তারপরও তাদের এটা চিন্তা করা উচিত যে, নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার পরও কেন এবং কিভাবে গত চার বছর ধরে ধীরে ধীরে হিন্দু জাতীয়তাবাদ ব্যর্থ হয়ে গেল। ভারতের মতো দরিদ্র ও বহুধাবিভক্ত একটি দেশের রাজনীতিকে ধর্মীয়করণের একটি সীমা রয়েছে।