মুসলিম ছেলের সঙ্গে বন্ধুত্বই কাল হলো শ্যামলী হাসদার

টিবিটি টিবিটি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ৫:৫৭ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১, ২০১৮ | আপডেট: ৫:৫৭:অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১, ২০১৮

টিবিটি দেশজুড়েঃ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পল্লীর মেয়ে শ্যামলী হাসদা (১৮)। ডিপ্লোমা নার্সিং শেষ করে ইচ্ছে ছিলো ভালো চাকরি করবে। আলো ফুটাবে পরিবারে। কিন্তু সে আশা আর পূর্ণ হলো না। মুসলিম এক ছেলের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার অপরাধে গ্রাম্য মাতব্বরা তাকে পিটিয়ে হত্যা করেছে।

ঘটনাটি ঘটে দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার হরিরামপুর ইউনিয়নের নিভৃত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পল্লীর লক্ষ্মী হোসেনপুর গ্রামে। মাতব্বরদের প্রহারে গুরুতর আহত শ্যামলী ৩ দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে ২৯ আগস্ট রাতে দিনাজপুর আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে।

স্থানীয় ও নিহতের পরিবারের দাবি, শ্যামলী বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসি পাস করে ডিপ্লোমা নার্সিংয়ে ভর্তি হয়। এরই মাঝে পরিচয় হয় পাশ্ববর্তী পলীপাড়া গ্রামের মোজাহার আলীর সঙ্গে। পরিচয় এক সময় রূপ নেয় বন্ধুত্বের। ২৬ আগস্ট সকালে শ্যামলীর বাড়িতে বেড়াতে যায় মোজাহার আলী। মোজাহার শ্যামলীর বাবা-মার সঙ্গে গল্প করছিলেন।

এ সময় ৭/৮ জন গুণ্ডাবাহিনী নিয়ে হানা দেয় গ্রামের মাতব্বর সোম হাসদা। শ্যামলী ও মোজাহার আলীকে বেঁধে নিয়ে যায় তার বাড়িতে। বেদড়ক পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হয় তাদের। ভেঙে দেয়া হয় হাত-পা। নির্যাতনের খবর শুনে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, মেম্বর ও পুলিশ কর্মকর্তারা উপস্থিত হলেও শ্যামলীকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন নি তারা।

শ্যামলীর বাবা শিব চরণ হাসদা ও ভাই মামুন হাসদা অভিযোগ করে বলেন, পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে কাউকে আটক করা তো দূরের কথা উল্টো নির্যাতনকারীদের সঙ্গে আমাদের মীমাংসা করে নেয়ার প্রস্তাব দিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। পরে রাত ৮টার দিকে আপোষ-মীমাংসা করে মোজাহারের কাছ থেকে মোটা টাকা নিয়ে তাকে ছেড়ে দেয়।

আর রাত সাড়ে ৮টার পুলিশ, চেয়ারম্যান ও মেম্বারগণ শ্যামলীকে গুরুর আহত অবস্থায় আমাদের কাছে হস্তান্তর করে। এ সময় আমরা শ্যামলীকে সরকারি হাসপাতালে নিয়ে ভালো চিকিৎসা করার দাবি জানালেও তারা বিষয়টি কর্ণপাত না করে স্থানীয় গ্রাম্য চিকিৎসকের মধ্যে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে রাত ১২টার দিকে আমাদের বাড়িতে পৌঁছে দেয়।

পরিদন সোমবার সকালে শ্যামলীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে পার্শ্ববর্তী ফুলবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানকার দায়িত্বরত চিকিৎসক শ্যামলীকে দ্রুত দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করেন। ২৯ আগস্ট রাতে দিনাজপুর আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

শ্যামলীর বড় ভাই মামুন হাসদা জানায়, হত্যাকারীরা তাদের পরিবারকে মামলা না করার জন্য হুমকি প্রদান করছে। এছাড়াও মেম্বার গোলজার হোসেনও হত্যাকারীদের পক্ষ নিয়ে মীমাংসা করার জন্য তাদেরকে প্ররোচিত করছে।

মধ্যপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের এএসআই মুকুল জানান, শ্যামলীকে নির্যাতনের ঘটনা শুনার পর তিনি তদন্ত কেন্দ্রের আইসি ইন্সপেক্টর মোসলেম উদ্দিনের নির্দেশে সেখানে গিয়ে শ্যামলীকে দেখতে পায়নি। তবে তার বন্ধু মোজাহারকে দেখতে পান।

নির্যাতনের ঘটনা স্বীকার করে তিনি বলেন, আমি তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ মোসলেম উদ্দিন ও পার্বতীপুর মডেল থানার ওসি সাহেবকে অবগত করে তাদের নির্দেশে সেখানে অবস্থানরত মেম্বারকে আপোষ মীমাংসা করে নেয়ার জন্য পরামর্শ দিয়ে স্থান ত্যাগ করি।

মেয়েটির বাবাকে উন্নত চিকিৎসা করার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা বললে তারা তা না করে গ্রাম্য চিকিৎসকদের মাধ্যমে চিকিৎসা করান। এর পরে জানতে পারি মেয়েটি দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা গেছেন।

মধ্যপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ মোসলেম উদ্দিনের বলেন, ঘটনার দিন আমি ছুটিতে থাকায় বিস্তারিত অবগত ছিলাম না। আমাকে বিষপান করে মেয়েটি আত্মহত্যা করেছে বলে এএসআই মুকুল জানিয়েছিল।

পার্বতীপুর মডেল থানার ওসি হাবিবুল হক প্রধান জানান, আমাকে এব্যাপারে কেউ কখনো অবগত করেনি। আমি কাউকে শ্যামলী নির্যাতনের বিষয়ে মীমাংসা করারও নির্দেশ দেইনি। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।