‘মৃত ভেবে হানাদার বাহিনী আমাকে ফেলে চলে যায়’

শরণার্থীর খোঁজে

শাহজাদা এমরান শাহজাদা এমরান

কুমিল্লা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৮:০১ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২০ | আপডেট: ৮:০১:অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২০

পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর নির্যাতনের কথা বলতেই সদ্য মা হারা সন্তানের ন্যায় অঝোড়ধারায় কাঁদতে লাগলেন ৭৬ বছর বয়সের বৃদ্ধ আলী আহাম্মদ চৌধুরী।কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না তার কান্না।গায়ের পাঞ্জাবী খুলে শরীরের বিভিন্ন অংশে এখনো রয়ে যাওয়া পাকিস্থানী বর্বর বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের ক্ষত দেখিয়ে ফুপরে কেঁদে উঠেন এই প্রতিবেদকের সামনে। তার বোবা কান্না উপস্থিত সবার চোখ ছল ছল করে উঠে।কিছুটা সামলে নিয়ে ৭১ সালের নির্যাতিতা শরণার্থী আলী আহাম্মদ চৌধুরী বলেন,বাবারে কত ভাবে যে আমাকে মেরেছে,পায়ের বুট দিয়ে সারা শরীর পাড়া দিয়ে উল্লাস করেছে তার কোন হিসেব নেই।শুধু একটাই কথা,তোদের এখানে মুক্তি বাহিনী লুকিয়ে আছে। কোথায় আছে নাম বল। এক পর্যায়ে আমি অজ্ঞান হয়ে যাই।মুখ দিয়ে লালা বের হয়ে আসে। জানোয়ার পাঞ্জাবিরা ভেবেছে আমি মারা গেছি।পরে শুনেছি,যাওয়ার আগে আমাকে সজোরে লাথ্থি দিয়ে বলেছে, এবার কবরে যা।পরে পরিবারের লোকজন আমাকে উদ্ধার করে বাড়ি নিয়ে আসে। চিকিৎসার অভাবে যখন আমার অবস্থা আরো খারাপ হতে লাগল তখন শরণার্থী হয়ে ভারত গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হই। হানাদার বাহিনী আমার বাবাকেও অনেক নির্মম নির্যাতন করে। কথা গুলো বললেন, মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তবলছড়ি এলাকার আওয়ামীলীগ নেতা ও স্থানীয় ভাবে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মোহাম্মদ চৌধুরীর বড় ছেলে আলী আহাম্মদ চৌধুরী। গত ১৮ সেপ্টেম্বর সকালে খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলার তবলছড়ির চৌধুরীপাড়ার তার নিজ বাড়ি গিয়ে আমরা কথা বলি আলী আহাম্মদ চৌধুরীর সাথে। সাথে ছিলেন স্থানীয় তরুণ উদ্যোক্তা মো. মনির হোসেন।

মোহাম্মদ চৌধুরী ও আমেনা খাতুনের তিন ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে আলী আহাম্মদ চৌধুরী সবার বড়।১৯৫৪ সালের ১৫ অক্টোবর তিনি তবলছড়িতেই জন্ম গ্রহন করেন। ছোট বেলা থেকেই কৃষি কাজে সম্পৃক্ত হয়ে যান তিনি।

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় গুলোর কথা জানতে চাইলে কখনো রাগে,দু:খে,ক্ষোভে বিক্ষুদ্ধ হয়ে উঠেন আবার কখনো ছেড়ে দেন আপন মনে চোখের পানি। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে গোটা খাগড়াছড়ি জেলায় হানাদার বাহিনী ও দেশীয় রাজাকার চাকমাদের দ্বারা ৫ টি পরিবারের নাম বলেন তার মধ্যে আমাদের পরিবার একটি। আর যদি নির্মম নির্যাতনের শিকার মাত্র ২ থেকে ৩ জনের নাম বলেন তার মধ্যে আমি অন্যতম।আমার উপর একাধিক বার নির্যাতন করেছে।মারতে মারতে মরে গেছি ভেবে পথে ফেলে দিয়েছে, বাড়ি ঘর লুটপাট করেছে,গরু ছাগল হাঁস মুরগী সব নিয়ে গেছে তারপরেও মুক্তিযোদ্ধারা কোথায় আছে নাম বলিনি। অথচ স্বাধীনতার ৪৯ বছর গত হলেও আজো কোন সরকার আমার এই অবদানের কোন স্বীকৃতি দিল না। আপনি খাগড়াছড়ির যেখানেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস খুঁজতে যান আমার নাম শুনতে পাবেন কিন্তু সরকারী ভাবে আমি একেবারেই জিরো রয়ে গেলাম।

আলী আহাম্মদ চৌধুরী বলেন,আমাদের পরিবারসহ এই এলাকার চারটি পরিবার মূলত এখানে মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করেছে এবং স্থানীয় আওয়ামীলীগকে নেতৃত্ব দিয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই সারা দেশের মত পাহাড়ী এলাকাও যুদ্ব ক্ষেত্র হয়ে গেল। এখানে পাঞ্জাবিদের বড় ক্যাম্প ছিল পানছড়ি ও খাগড়াছড়িতে। বিশেষ করে আমাদের এলাকায় পাকিস্তান হানাদার বাহিনী সব সময় টহল দিত পানছড়ি থেকে এসে। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের এখানে জামায়াত ইসলামী ছিল কি না এই মুহুর্তে বলতে পারব না।তবে পাকিস্তানী বাহিনীকে সার্বিক সহযোগিতা করেছে চাকমারা।এই চাকমাদের রাজাকারী মনোভাবের কারণেই মূলত পাহাড়ে বেশী হত্যা,ধর্ষন ও লুন্টন হয়েছে। পাকিস্তানীদের সহযোগিতায় চাকমারা যে শুধু বাঙ্গালীদের উপর নির্যাতন করেছে তা কিন্তু নয় তারা পাহাড়ের অপরাপর জনগোষ্ঠীরর উপরও একই ভাবে অত্যাচার করেছে।

নির্যাতনের কাহিনী বলতে গিয়ে আলী আহম্মদ চৌধুরী বলেন,তখন আমার বাবা আওয়ামীলীগের লিডার ছিলেন। বাবাকে ধরতে প্রায় রাতেই হানাদার বাহিনী অভিযান চালাত। সম্ভবত তখন আষাড় মাস ছিল। এক দিকে বর্ষাকাল অন্যদিকে ঘুরি ঘুরি বৃষ্টি হচ্ছে।বর্ষাকাল হওয়াতে তখন ফেনী নদীতে উপচেপড়া পানি। যুদ্ধ শুরুর পর ভারতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত বাবা কখনো সন্ধ্যার পর বাড়িতে থাকতেন না। এক দিন কি কাজে যেন বাবা রাতে বাড়ি ছিলেন। স্থানীয় চাকমা রাজাকারদের মাধ্যমে খবরটি পৌঁছে যায় পানছড়ি হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে। ঐ রাতেই হানাদার বাহিনী আমাদের গ্রামে অভিযান চালায়।পানছড়ি থেকে রওয়ানা হয়ে যখন আমাদের গ্রামের একবারে কাছাকাছি চলে আসল ঠিক তখনি গ্রামে জুড়ে রব উঠল পাঞ্জাবীরা আসতেছে। তখন যে যে ভাবে পারছে পালাচ্ছে। বাবা,মা ছোট ভাই জাফরকে নিয়ে বাড়ি থেকে কিছু দূর একটি জঙ্গলের ভিতর গর্ত ছিল ঐ গর্তে গিয়ে পালাল। আমাকে বলল,বাবা পালাও। আমি গ্রামের উত্তর দক্ষিন দিকের একটি জঙ্গলে গিয়ে লুকিয়ে রইলাম। জঙ্গলে গিয়ে বুঝতে পারলাম এখানে আমি একা না। গ্রামের আরো অনেকে আাছে। এখানে আমাদের গ্রামের দর্জি নুরুজ্জামান, স্কুলের প্রধান শিক্ষক রফিকও লুকিয়ে ছিলেন। তবে কেউ কোন কথা বলছে না। গ্রামে তেমন কাউকে না পেয়ে চাকমাদের পরামর্শে বড় বড় টর্চ লাইট দিয়ে জঙ্গলে খুঁজতে লাগল। কারণ, চাকমারা স্থানীয় হিসেবে জানত, এই গ্রামের লোক গুলো কোথায় পালাতে পারে। এক পর্যায়ে জঙ্গলের ভিতর আমি ধরা পড়ি। গর্তের ভিতর থেকে আমার বাবাকেও ধরে ফেলে। অন্য জঙ্গল থেকে গ্রামের আবদুল বারেক,ওলি হাজী, সোজা মিয়া চৌধুরী,লাল মিয়া পাটোয়ারি,আবদুস সোবহান,সেরু ভূইয়া,মধু মিয়াসহ প্রায় ৩০ থেকে ৩২ জনকে ধরে ফেলে। সে দিন প্রায় শতাধিক পাকিস্তানী বাহিনীর সাথে অসংখ্য রাজাকার চাকমারা ছিল।তারা গ্রুপে গ্রুপে ভাগ হয়ে আমাদের আলাদা আলাদা করে মারতে শুরু করল। আমি তখন ১৭ থেকে ১৮ বছরের যুবক ছিলাম। বড় বড় চুলের সাথে মোছ ও গোফও ছিল,স্বাস্থ্যও ভাল ছিল। আমাকে ধরেই চুলের মুঠি ধরে বলল, তুই শালা মুক্তি হ্যায়।এই কথা বলেই বাঁশের লাঠি দিয়ে শুরু করল বেধরক মার।এক জনের লাঠি ভাঙ্গে আরেকজন নতুন লাঠি নিয়ে হাজির হয়।কত বার যে হাজার বার যে তাদের বাবা ডেকে আল্লাহর কসম থেয়ে বলেছি আমি মুক্তি না। কিন্তু তাদের কঠিন হৃদয় গলাতে পারিনি। আমার সমস্ত শরীর রক্তাত্ত হয়ে যায়।এক পর্যায়ে আমি মাঠিতে লুটিয়ে পড়ি।কিছুক্ষন পর আরো কয়েকজন এসে আমাকে জুতার বুট দিয়ে ফুটবলের মত খেলতে লাগল। পরে দুই হানাদার সদস্য আমাকে মাটি থেকে তুলে দাঁড় করিয়ে দুই দিকে ধরে রেখে অপরজনকে বলে শুট কর। তখন আমি বুঝে গেছি এখনি আমি শেষ হয়ে যাচ্ছি। কলেমাও পড়তে পারছিলাম না। শুধু আল্লাহ্ আল্লাহ্ বলে দুইবার চিৎকার দিয়েছিলাম। আমাকে শুট করবে এমন সময় পেছন থেকে এক হানাদার সদস্য তার হাতে টান দিয়ে বন্ধুকটা নামিয়ে বলল, এখানে না। ক্যাম্পে চল। উপর দিকে চেয়ে মনে মনে আল্লাহকে ধন্যবাদ দিয়ে বললাম, আল্লাহ তুমি মনে হয় নিজ হাতে সাক্ষাত মৃত্যুর হাত থেকে আমাকে এখন রক্ষা করেছ। তবলছড়ি বাজার সংলগ্ন যে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ছিল সেটি প্রথম অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধারা প্রশিক্ষন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করলেও এক সময় এটি হানাদার বাহিনী দখল করে নেয়। তখন গভীর রাত। হাটতে পারছিলাম আমাকে টেনে হেঁচরে হাসপাতালের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। হাসপাতালের সামনে যেতেই শুধু হাউ মাউ করে কান্নার আওয়াজ শুনছি।গিয়ে দেখি আমার আব্বাকে হাত পা বেঁধে মাটিতে ফেলে এলোপাতারী পেটাচ্ছে। আমাদের গ্রামের আরো ৭/৮জনকে এভাবেই পেটাচ্ছে। আব্বাকে বেশী মারার কারণ হচ্ছে,আমার জেঠা সুজা মিয়া চৌধুরী হল স্থানীয় আওয়ামীলীগের সবচেয়ে বড় লিডার। জেঠা কোথায় আছে তা জানতে চায়।আব্বা কিছুই বলতে পারছে না । শুধু জানি না জানি না বলছে। আমি আব্বা বলেও ডাক দিতে পারিনি। আমাকে অন্য রুমে নিয়ে গেল। রুমটিতে হারিকেন জ্বালানো ছিল। রুমে নেওয়ার সাথে সাথেই হানাদার বাহিনীর একজন বলল,শালা মুক্তি হ্যায়,আচ্ছা মার। শুরু হল আমার উপর দ্বিতীয় পর্যায়ের মার। শুধু মাথাটা ছাড়া শরীরের এমন কোন স্থান নেই যেখানে আমাকে মারেনি। এক সময় আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। আমি মারা গেছি ভেবে আমাকে তারা হাসপাতালের মাঠে ফেলে চলে যায়। পরে শুনেছি,আমার বাবাসহ অন্যদের নির্যাতন করে তাদের ছেড়ে দেয়। ভোরে যখন হানাদার বাহিনী হাসপাতালের ক্যাম্প ছেড়ে আবার পানছড়িতে চলে যায় তখন আমাকে খুঁজতে পরিবারের লোকজন এসে দেখে আমি অর্ধমৃতের মত হাসপাতালের মাঠে পড়ে আছি। পড়ে তারা বাড়ি নিয়ে স্থানীয় ভাবে চিকিৎসা করিয়ে আমাকে ভারতে যাওয়ার মত সুস্থ করে তুলে।

এর ২ দিন পরেই আব্বা বলেন, আর দেশে নয় চল আমরাও ভারতে চলে যাই। এরপর সপরিবারে আমরা সব কিছু রেখে শুধু কাপড় চোপড় কিছু নিয়ে ভারতের শোলাছড়িতে চলে যাই। ভারতে যাওয়ার পর আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। স্বাধীনতার ৪৯ বছর পার হলেও এখনো হানাদার বাহিনীর সেই নির্যাতনের ক্ষত নিয়ে এখনো আমি বেঁচে আছি।

আমরা ভারতে যাওয়ার পর কোথায় থাকব এই নিয়ে বেশ চিন্তায় পড়ে গেল বাবা। কারণ,বাবা ও জেঠা আওয়ামীলীগের নেতা হওয়াতে তাদের কিছু দায়িত্ব ছিল। বাবা আমাদের হেফাজত না করে তো আর কাজ করতে পারেন না। এমন সময় এক হিন্দু পরিবার থেকে প্রস্তাব দেওয়া হলো আপনাদের আপত্তি না থাকলে আমাদের এই ঘরে থাকতে পারেন। ঘরটি দুই রুম বিশিষ্ট। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জ্ঞাপন করে বাবা এই হিন্দু বাড়িতে আমাদের নিয়ে উঠলেন। বাবা সব সময় বলতেন, আমি সারা জীবন এই হিন্দু পরিবারটির কাছে কৃতজ্ঞ থাকব।

শরণার্থী জীবন শুধু আমার জন্য না। কারো জন্যই খুব যে ভাল ছিল তা বলা যাবে না। দেশ ছেড়ে বাড়ি ঘর ছেড়ে কার ভাল লাগে। সেখানে খাওয়া দাওয়াও ছিল লিমিটেড।অনেক দু:খ কষ্টে জীবন পাড় করেছি। দেশ স্বাধীন হওয়ার ৫ দিন পর আমরা দেশে আসি। এসে তো আমাদের বাড়ি চিনতেই পারি নাই। বড় বড় আগাছা হয়ে এক বড় জঙ্গলে পরিনত হয়েছে বাড়ি। ঘর দড়জা যা ছিল সব লুট হয়ে গেছে। তারপর আবার জীবন শুরু হয়।

সরকারের কাছে অনুরোধ, মুক্তিযুদ্ধ না করলেও দেশের জন্য আমি কম নির্যাতিত হইনি। সরকার যেন আমাকে একজন বীর শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এটাই আমার শেষ জীবনে চাওয়া।