মোবাইল ফোন ক্লোনচক্রের ফাঁদে রাজশাহীর প্রশাসন

টিবিটি টিবিটি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ২:৪৯ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৪, ২০১৮ | আপডেট: ২:৪৯:পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৪, ২০১৮
সংগৃহীত ছবি

রাজশাহীতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে মোবাইল ফোন ক্লোনকারী চক্র। প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ফোন নম্বর ক্লোন করে চক্রটি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অধীন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ফেলছে তাদের ফাঁদে। আর একের পর এক জিডি করছেন কর্মকর্তারা।

প্রতারক চক্রটি ক্লোন করার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) মোবাইল ফোন নম্বর টার্গেট করছে বেশি। এ ছাড়া এসিল্যান্ড, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি), এমনকি সংসদ সদস্যের ফোন নম্বর শিকার হচ্ছে ক্লোনের।

গতকাল সোমবার (৩ সেপ্টেম্বর) তানোরের ইউএনও এ ধরনের ঘটনায় থানায় জিডি করেন। দুই দিন আগে জিডি করেন বাঘার ইউএনও। গত বছর তানোরের তৎকালীন ইউএনও জিডি করেছিলেন।

কিন্তু প্রতারক চক্রের একজনকেও আইনের আওতায় আনতে পারেনি পুলিশ। অথচ প্রশাসনকে ব্যবহার করে পাতা প্রতারণার ফাঁদে শিকার হচ্ছে প্রশাসনের লোকজন।

মোবাইল ফোনের সিম ক্লোন বলতে সিম হ্যাক করাকে বোঝায়। ব্যালেন্স হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়া অথবা সিমের একই নম্বর দুজন ব্যবহার করলে বুঝতে হবে সিম ক্লোন হয়েছে। মূল সিম ছাড়াই কম্পিউটারের মাধ্যমে মিসড কল দিয়ে সিম ক্লোন করা সম্ভব। কোনো গ্রাহক যদি অপরিচিত ফোন থেকে পাওয়া মিসড কল ব্যাক করেন তাহলে তার সিম ক্লোন হয়ে যেতে পারে বলে জানান প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।

আবার ভিন্ন দুটি অপারেটরের সিমের কোড ছাড়া অন্য সব ডিজিট একই রকম হলে যে কোনো একটি সিম থেকে ফোন করা হলে এবং কলগ্রহীতার মোবাইলে নাম সেভ করা থাকলে সেই ব্যক্তিরই নাম দেখাবে। তবে নম্বরটি সেভ না থাকলে কলগ্রহীতার কাছে আলাদা আলাদা নম্বর দেখাবে। তাই প্রতারকরা সব ডিজিট মিল রেখে শুধু ভিন্ন অপারেটরের সিম ব্যবহার করেও প্রতারণা করতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে শুধু সেই ব্যক্তিকেই টার্গেট করা হয়, যার মুঠোফোনে ঊর্ধ্বতন সেই কর্মকর্তার নম্বর সেভ করে রাখার সম্ভাবনা আছে।

ফোন ক্লোনচক্রের শিকার হয়েছিলেন রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনের সংসদ সদস্য আয়েন উদ্দিন।

সাংসদ বলেন, ‘জরুরি ভিত্তিতে কিছু টাকার দরকার’- তার ফোন নম্বর থেকে এমন ফোন পেয়ে দুই আত্মীয় ও কয়েকজন কর্মী একটি বিকাশ নম্বরে বেশ কয়েক হাজার টাকা পাঠান।

ক্লোনকারীরা শুধু টাকা চাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি জানিয়ে আয়েন উদ্দিন বলেন, ‘তার ফোন থেকে অন্য মানুষকে গালিগালাজও করা হয়। তাদের মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক উপাচার্যও পড়েছিলেন।’

সবচেয়ে বেশি ক্লোন করা হচ্ছে তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) মোবাইল ফোন। গত শুক্রবার তানোরের ইউএনও চৌধুরী মো. গোলাম রাব্বীর ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন ক্লোন করে ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) কয়েকজন সচিব ও কর্মচারীর কাছে চাঁদা দাবি করা হয়।

বিষয়টি জানতে পেরে ইউএনও তার পরিচালিত ‘উপজেলা প্রশাসন, তানোর, রাজশাহী’ নামের ফেসবুক আইডিতে একটি পোস্ট দিয়ে সবাইকে সতর্ক করেন। ওই পোস্টে ইউএনও তার ব্যক্তিগত নম্বরটি উল্লেখ করে লেখেন, ‘আমার ব্যক্তিগত নম্বরটি ক্লোন করে কে বা কারা বাধাইড়, কলমা ও তালন্দ ইউনিয়ন পরিষদের সচিবসহ অনেকের কাছে চাঁদা দাবি করছেন। বিষয়টিতে সবাইকে সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’

তানোরের বাঁধাইড় ইউপির সচিব মোমিনুল ইসলাম, কলমার মোস্তাফিজুর রহমান এবং তালন্দের সচিব রাসেল রহমান জানান, তাদের প্রত্যেককে ফোন দিয়ে ১২ হাজার টাকা করে চাওয়া হয়। এ জন্য তাদের একটি বিকাশ নম্বরও দেওয়া হয়। সচিবরা জানান, এ ধরনের ফোন পাওয়ার পর তাদের সন্দেহ হলে বিষয়টি বিষয়টি ইউএনওকে জানান তারা।

গত শুক্রবার গোদাগাড়ীর ইউএনও শিমুল আকতারের ফোন নম্বর ক্লোন করে উপজেলা পরিষদের অফিস সহকারী এমদাদুল হকের কাছে টাকা চাওয়া হয়। ইউএনও বলেন, যে অফিস সহকারীর কাছে তার ফোন থেকে টাকা চাওয়া হয় তিনি তখন সামনেই ছিলেন। এ জন্য সঙ্গে সঙ্গে তারা বিষয়টি ধরতে পারেন।

একই দিন বাঘার ইউএনও শাহিন রেজার মুঠোফোন ক্লোন করে আড়ানী, গড়গড়ি ও বাউসা ইউপির সচিবসহ অনেকের কাছে টাকা চাওয়া হয়। এ নিয়ে ইউএনও শাহিন রেজাও ফেসবুকে সতর্কতামূলক পোস্টে বলেন, যে তিনজন সচিবের কাছে টাকা চাওয়া হয়েছিল তারা তার কণ্ঠস্বর চেনেন। পরে এ নিয়ে তিনি থানায় জিডি করেন।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রচারণার সময় রাজশাহী মহানগরীর রাজপাড়া ও চন্দ্রিমা থানার ওসির সরকারি মুঠোফোন ক্লোন করা হয়। প্রতারকরা ওসির ফোন নম্বর ব্যবহার করে দুজন কাউন্সিলর প্রার্থীর কাছে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করে। প্রলোভন দেয় নির্বাচনে বিজয়ী করে দেওয়ার। কিন্তু পুলিশ এই প্রতারকদের শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়। পুলিশ বলছে, প্রতারকদের শনাক্ত করার মতো প্রযুক্তি জেলা পর্যায়ে নেই।

এর আগে গত জুনে তানোরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ আল মামুনের মোবাইল ফোন নম্বর ক্লোন করে বিভিন্ন ইউনিয়ন ভূমি অফিসের নাজির, নায়েবসহ অধীনদের কাছে টাকা চাওয়া হয়। প্রতারণার ফাঁদে পড়ে কামারগাঁও ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহশিলদার লুৎফর রহমান বিকাশের মাধ্যমে ১০ হাজার টাকাও দেন।

লুৎফর রহমান জানান, এসিল্যান্ডের পরিচয়ে তাকে ফোন করে অসুস্থতার কথা বলে ১০ হাজার টাকা চাওয়া হয়। তিনি বিকাশের মাধ্যমে টাকা দেন।

আর তানোর ভূমি অফিসের নাজির ফিরোজ সরকারের কাছে টাকা চাইলে তিনি অফিসে গিয়ে দেওয়ার কথা বলেন। তখন ফোনের লাইনটি কেটে দেওয়া হয়।

গত বছরের ৮ জুন তানোরের তৎকালীন ইউএনও শওকত আলীর মোবাইল ফোন ক্লোন করে সাত ইউপির চেয়ারম্যান ও দুই পৌরসভার মেয়রের কাছে টাকা চাওয়া হয়। প্রতারক চক্র বিভিন্ন বরাদ্দ দেয়ার কথা বলে টাকা দাবি করে। বিষয়টি জানতে পেরে ইউএনও শওকত রেজা তানোর থানায় জিডি করেন।

নগরীর দুটি থানার ওসির ফোন নম্বর ক্লোন করার বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) মুখপাত্র সিনিয়র সহকারী কমিশনার ইফতেখায়ের আলম বলেন, ‘আমরা প্রতারকদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছি।’

ক্লোন ফোনের প্রতারণা এড়াতে সিনিয়র সহকারী কমিশনার বলেন, ‘এ রকম ক্ষেত্রে ফোন কেটে দিয়ে ওই নম্বরে কল করতে হবে। যদি ওই নম্বরে ফোন না ঢোকে তাহলে বুঝতে হবে এটা প্রতারকের কাজ।’ তিনি বলেন, ‘নম্বরটি নতুন করে ফোনে টাইপ করে অথবা সংরক্ষিত থাকলে সেখান থেকে ফোন দিলে প্রকৃত ব্যক্তির কাছে ফোন যাবে।’

ইফতেখায়ের বলেন, এ ধরনের ঘটনার পর অর্থ লেনদেন হলে থানায় ডায়েরি করলে যে নম্বরে টাকা বিকাশ করা হয়েছে পুলিশ সেই নম্বর অনুসরণ করে প্রতারককে ধরতে পারে।

জেলা পুলিশের মুখপাত্র সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আবদুর রাজ্জাক খান বলেন, ‘ফোন ক্লোনকারী প্রতারকদের সরাসরি শনাক্ত করার জন্য যে প্রযুক্তি দরকার তা জেলা পর্যায়ে নেই। ক্লোনিংয়ের ঘটনায় যেসব জিডি হচ্ছে, সেগুলো আমরা পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠাচ্ছি। সেখান থেকে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের সচেতনতার জন্য তার পরামর্শ, যদি কোনো কারণ ছাড়াই কারও মোবাইল ফোনের ব্যালেন্স কমে যায় তাহলে সিমটি ক্লোন হয়েছে কি না তা যাচাই করতে হবে। এ জন্য ফোন বন্ধ করে অন্য নম্বর থেকে নিজের নম্বরে কল দিতে হবে। যদি কল ঢোকে তাহলে বুঝতে হবে সিমটি ক্লোন করা হয়েছে। তখন মোবাইল সিম অপারেটরের কাস্টমার কেয়ারে গিয়ে অভিযোগ করতে হবে।