যমুনা সেতুর পূর্ব দক্ষিণ পাড়ে বেড়িবাঁধ নির্মাণ

টিবিটি টিবিটি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ৯:১০ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২০ | আপডেট: ৯:১০:অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২০

মাসুম ফেরদৌস নান্নু: ছোটবেলায় একটা রচনা খুব কমণ ছিল। রচনা টি হল “বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ “-তেমনি আমাদের যমুনা তীরবর্তী মানুষের মাঝে এখন এ প্রশ্ন জেগেছে” যমুনা সেতু আশীর্বাদ না অভিশাপ”? প্রশ্নটি একারণেই করছে কারণ যমুনা সেতু নির্মাণের ফলে উত্তরবঙ্গের ২৬ টি জেলার সাথে যোগাযোগের যেমন সুব্যবস্থা হয়ে তাদের জন্য আশির্বাদ হয়েছে,তেমনি এই সেতু নির্মাণের ফলে যমুনা নদীর করাল গ্রাসে সেতুর পূর্ব দক্ষিণ পাড়ের মানুষ গুলোর জীবনে নেমে এসেছে অভিশাপ- দুঃস্বপ্ন। যমুনা সেতু নির্মাণ কালে এর পশ্চিম পাড় চমৎকার করে সংরক্ষণ করে যমুনার ভাঙন রোধ করা হয়েছে । এর ফলে যমুনার স্রোতধারা গতি পরিবর্তন করে সেতুর পূর্ব দক্ষিণপাড়া এলাকায় প্রচন্ড ভাঙ্গন সৃষ্টি করেছে। যে কারণে কাকুয়া,হুগড়া, কাতুলী, মামুদনগর সহ বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্রতি বর্ষা মৌসুমে ব্যাপক ভাঙ্গনের মুখে পড়ে।

এই ভাঙ্গনে মানুষ হারাচ্ছে তার চৌদ্দপুরুষের বসতভিটা, স্বপ্নের সোনালী ফসলের ক্ষেত, মসজিদ, মন্দির, মাদ্রাসা, স্কুল ,কলেজ সহ সকল স্থাপনা। সবচেয়ে করুন দৃশ্যের সৃষ্টি হয় যখন বহু পুরোনো কবরস্থান ভাঙ্গতে থাকে।পুর্ব পুরুষের অস্তিত্ব চোখের সামনে বিলিন হতে দেখে স্বজনদের বুক ফাটা আর্তনাদে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে যায়।জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই বিখ্যাত গানের মত” সকালবেলা আমীর রে ভাই ফকির সন্ধ্যা বেলা” । এই নদীর ভাঙ্গনে কত মানুষ যে রাতারাতি নি:স্ব ,রিক্ত হচ্ছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। নদীর কাছে মানুষ বড় অসহায়। রাতারাতি তার চোখের সামনে ভেঙে যায় তার ফসলের মাঠ ,মাথা গোঁজার ঠাঁই।

আমরা প্রকৃতির হাতে অসহায় আত্মসমর্পণ করে শুধু কপাল চাপড়াই। আমাদের নীতিনির্ধারকরাও এই সমস্ত বিষয়ে একেবারে নিস্পৃহ, নির্লিপ্ত ভূমিকা পালন করছেন ।নদী শাসন ,নদী খনন করার কোন পরিকল্পনা এদের চিন্তার বাইরে। বর্ষা মৌসুমে যখন শুরু হয় প্রচন্ড ভাঙ্গন- তখন লোক দেখানো কিছু জিআই ব্যাগ, স্ল্যাব দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে তাদের দায়িত্ব পালন করেন।

আমরা জানি বাংলাদেশ এক সময় ছিল নদীমাতৃক দেশ।আমাদের শরীরের শিরা উপ শিরার মতো বাংলাদেশের শরীর জুড়ে বয়ে যেতো অসংখ্য নদ-নদী। ২৫ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ছিল একসময় ।সেই নৌপথ আজ কমতে কমতে ৪/৫ হাজার কি: মি: রে এসে দাঁড়িয়েছে। এটি আমাদের অবহেলা এবং দায়িত্ব হীনতার কারণেই। আমরা নদী গুলোর দিকে দৃষ্টি দিচ্ছিনা। নদীগুলো আজ আমাদের আপদে পরিণত হয়েছে। অথচ এই নদী হতে পারে আমাদের দেশের জন্য সম্পদ। ফারাক্কার প্রভাবে নদী গুলো শুকিয়ে গেছে। খাল বিলে পানি নেই। অথচ বর্ষা মৌসুমে বন্যায় ভাসিয়ে নেয় সমস্ত দেশ।কারন সেই পানি ধারণ করার ক্ষমতা নেই আমাদের হাজা-মজা নদী,খাল,বিলের। আমরা হা হুতাশ করতে থাকি।সরকার থেকে, বিদেশ থেকে বানভাসি অসহায় মানুষের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকা রিলিফ দেয়া হয়( তার অধিকাংশই লোপাট হয়ে যায়) কিন্তু এই সমস্ত কর্মকাণ্ডের ফলে আমরা দীর্ঘমেয়াদি কোন সুফল ভোগ করতে পারছিনা ।আমাদের এখন যা প্রয়োজন তা হলো:-

১ । দেশের সমস্ত শুকিয়ে যাওয়া নদ-নদী খাল-বিল খনন করে নাব্যতা বাড়াতে হবে।এতে শুষ্ক মৌসুমে বর্ষার পানি ধরে রাখা সম্ভব হবে। সেই পানি দিয়ে আমরা ফসলের জমি আবাদ করতে পারি।

২ । নদীপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা করতে পারলে অনেক সাশ্রয়ী ভাবে মানুষ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিরাপদে যাতায়াত করতে পারবে।

৩। নদী,খাল,বিলে পানি থাকলে মৎস্য সম্পদ বৃদ্ধি পাবে।

৪। প্রতিবছর ভাঙ্গনের ফলে কত হাজার লক্ষ কোটি টাকার ক্ষতি হয় তার কোন হিসাব আছে কিনা আমার জানা নেই ।তবে বিশাল অঙ্কের যে ক্ষতি হয় সাধারণ দৃষ্টিতে তা অনুমেয়। নদী শাসন এবং ভাঙ্গন রোধ করে আমরা এই বিশাল অপচয় থেকে রক্ষা পেতে পারি।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী- আপনার কাছে বিনীত ভাবে জানাতে চাই শামসুর রাহমানের কবিতার ভাষায় “দেশটা যেন অদ্ভূত উটের পিঠে চলেছে” । আমরা দেখতে পাচ্ছি রাষ্ট্রীয় সম্পদ কিভাবে অপচয় করা হচ্ছে‌। দুর্নীতির মাধ্যমে একজন সাধারণ ব্যক্তিও ১৫/২০ হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যাচ্ছে বলে জানা যায়(স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কম্পিউটার অপারেটর আফজাল হোসেন এবং তার স্ত্রীর কথা স্মরণযোগ্য। সাধারণ একজন কর্মচারীর যদি এতো টাকা হয় তবে উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা কি পরিমান টাকা লুট করেছে তা সহজেই অনুমেয়) । এছাড়া শাহেদ, পাপলু, সম্রাট, পাপিয়ারা অবৈধভাবে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক বনে আছে। অদ্ভুত অদ্ভুত প্রকল্পের সৃষ্টি করে হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বিদেশে প্রমোদ ভ্রমণের আয়োজন করা হচ্ছে। আলু চাষ দেখার জন্য, পুকুর খনন দেখার জন্য,বিল্ডিং দেখার জন্য, ইদানিং খিচুড়ি রান্না এবং হাত ধোয়ার প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য নাকি কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিদেশ প্রশিক্ষণ নেয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এসব কিসের আলামত ? প্রশিক্ষণ যদি নিতেই হয় “নদী শাসন”, “নদী খনন”, “নদীরপাড় সংরক্ষণ”- এই সমস্ত বিষয়ের উপর প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য বিদেশে পাঠানো যেতে পারে । তারা দেখে আসুক লন্ডনের টেমস নদী ,মিশরের নীলনদ, চীনের হোয়াংহো এবং ভেনিস শহরটাকে নদীর ব্যবহার করে তারা কত চমৎকারভাবে গড়ে তুলেছে। একসময় আপদ এখন তারা সম্পদে পরিণত করেছে। জনগণের টাকা এই ভাবে লুণ্ঠন করার অধিকার এই সমস্ত ব্যক্তিদের কে দিয়েছে? এর জবাব দিহিতা কি নেই? আমরা সাধারন মানুষ কি এতোটাই বোকা যে আমাদের ধোকা দিয়ে এই সমস্ত উদ্ভট প্রকল্পের জন্য আমাদের পকেট কাটা হবে?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী- বাহাদুরাবাদ ঘাট থেকে পদ্মা সেতু পর্যন্ত যমুনা নদীর পূর্বপাড়ের এই অংশটুকুতে বেড়ী বাঁধ (Marine Drive এর মতো River drive)দিতে কত টাকা খরচ হবে? ঐ সমস্ত লুন্ঠনকারীদের টাকা বাজেয়াপ্ত করে সেই টাকা দিয়েই এই জনকল্যানমুল এবং অতি প্রয়োজনীয় প্রকল্পের কাজ শেষ করা যাবে বলে আমার বিশ্বাস।সে টাকায়ও যদি সংকুলান না হয় তবে যমুনা সেতু নির্মাণের সময় যেমন “surcharge on jomuna” র মাধ্যমে তহবিল গঠন করা হয়েছিলো সে রকম ভাবে বেড়ি বাঁধ নির্মানের জন্য ও ” surcharge” এর মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ করা যেতে পারে।

এই এলাকা গুলোর ভাঙ্গন রোধ করা হলে যে টাকার সাশ্রয় হবে তাতে রাষ্ট্রই লাভবান হবে ।এছাড়া এই বেড়িবাঁধ বহুবিধ কাজে ব্যবহার করা যাবে।যেমন পদ্মা সেতু থেকে বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব। এতে দক্ষিনাঞ্চল থেকে উত্তরান্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হবে।
বেরিবাঁধ নির্মানের ফলে নদি পাড়ের এই অঞ্চলগুলো বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। এতে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হবে যা আমাদের এই গরিব দেশের জন্য একটি বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

নদী শাসন এবং খনন করে নাব্যতা বৃদ্ধি করলে সারা বছর নদী পথে যাতায়াতের ব্যবস্থা সুগম হতে পারে। সারাবছর যদি এই সব নদীতে পানি থাকে তাহলে নদীর সুস্বাদু মাছ আমাদের দেশের চাহিদা মেটাবে ।

টাঙ্গাইলের ভুঞাপুরে যমুনার চরে ” অর্থনৈতিক জোন” তৈরি করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে চলছে ।এই প্রকল্প হলে এখানে নানা রকমের কলকারখানা স্থাপিত হবে। এই কলকারখানার উৎপাদিত পণ্য বিশেষ করে গার্মেন্টস সামগ্রী দ্রুত পরিবহন এবং”Shipment” করার জন্য নৌপথের ব্যবহার হলে অনেক সাশ্রয়ী মূল্যে করা যাবে।এর ফলে সড়ক পথের উপর বাড়তি চাপও কমবে।

আমি জানিনা আমার এই লেখাটা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দৃষ্টিগোচর হবে কিনা। এরপরেও অরণ্যে রোদন এর মতো করে বলতে চাই- মাননীয় প্রধানমন্ত্রী- আপনি দেশের উন্নয়নের কথা ভাবেন । বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বিনির্মাণে আপনি দিবারাত্রি কাজ করে যাচ্ছেন। আপনি একটু নদী গুলোর দিকে দৃষ্টি দিন ।এদেশের হাজা- মজা নদী, খাল বিল গুলো উদ্ধার করে এবং ভাঙ্গন প্রবন সমস্ত নদীর পাড়ে পর্যাক্রমে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে নদীপাড়ের মানুষগুলোর জীবনের স্বস্তি ও নিরাপত্তা বিধানের ব্যবস্থা করুন।

বঙ্গবন্ধু দু:খ করে বলেছিলেন”আমি বিদেশ থেকে গরীব মানুষের জন্য ভিক্ষা করে আনি আর চাটার দলেরা সব শেষ করে দেয়” । বঙ্গবন্ধুর মতো আপনাকেও যেন কোন দিন বলতে না হয় “লোটার দলেরা আমার সব অর্জন ধ্বংস করে দিয়েছে” ।

লেখক- সাংবাদিক,গীতিকার,কলাম লেখক।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ টুডে এবং বাংলাদেশ টুডে-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)