রাইড শেয়ারিং:বর্তমান যেন এক আতঙ্কের নাম

টিবিটি টিবিটি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ৪:৫৭ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৮ | আপডেট: ৪:৫৭:অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৮

টিবিটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিঃঅভিযোগ করলে হুমকি পাচ্ছেন যাত্রীরা দ্রুত পরিবহন সঙ্কট নিরসনের দাবি নগরবাসীর।

রাজধানীর প্রেসক্লাব থেকে গুলশান-২ যাওয়ার জন্য ‘পাঠাও’ অ্যাপসে কল করেন সাংবাদিক আনিস আলমগীর। রুহুল আমিন নামে এক পাঠাও চালক কলটি রিসিভ করেন। চালক আসতে দেরি হবে বললে আনিস আলমগীর নিজেই কলটি বিচ্ছিন্ন করে দেন। দ্বিতীয়বার ওই চালক নিজেই কল করে কানেক্ট হয়ে ৩০ মিনিট সাংবাদিককে বসিয়ে রেখেও তাকে নিতে আসেনি।

পরে তিনি বাধ্য হয়ে অন্য উপায়ে নিজের কর্মস্থলে যান। পরবর্তীতে তিনি চালককে এসএমএস করে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হবে বলে জানালে চালক উল্টো তাকে কল করে হুমকি দেন। গত বুধবার নিজের ফেইসবুক পোস্টে ‘পাঠাও’য়ের বর্তমান সেবা নিয়ে এমন ভোগান্তি ও আতঙ্কের কথা লিখেছেন এই সাংবাদিক।

ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি আরও লিখেছেন, ‘এইসব আনাড়ি ছোটলোকের বাচ্চাদের দিয়ে সার্ভিস বেশি দিন চলে না। এমনিতে বানিয়েছ একটা জঘন্য অ্যাপ, বাইকে নেই সঠিক হেলমেট।’

একইভাবে ২৩ আগস্ট কাজী রোকসানা রুমা নামে এক নারীও নিজের ফেইসবুক পোস্টে ‘পাঠাও’ বাইকের এক চালকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে পোস্ট দিয়েছেন। ওই চালক তাকে হত্যার হুমকি দিয়েছিল। ভুক্তভোগী নারী লিখেছেন, ‘শুধু কল ক্যান্সেল করা না করা নিয়ে যে অসভ্যতা হলো আমার সাথে, এর একটা বিহিত না করা পর্যন্ত ঘুমাতে পারবোনা।

আমাকে দেখে নেয়ার হুমকির রেশ কাটতে না কাটতে আমি ড্রাইভারকে দেখতে চাই, তবে উপায় পাচ্ছিনা। আমি সিএনজিতে ঢুকে দরজাটা ততক্ষণে লক করেছিলাম, না হলে আজ তুলকালাম ঘটতো মগবাজার মোড়ে। ফাঁকা ঢাকা শহরে এইসব অসভ্যদের হাতে যখন পরিবহন তখন তা ভয়ংকর হয়ে ওঠে মেয়েদের জন্য।’

এমন একটি দুটি অভিযোগ নয়, প্রায় প্রতিনিয়ত বাড়ছে রাইড শেয়ারিং সেবাগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগের ফিরিস্তি। শুধু অনিয়ম আর ভোগান্তি নয়, অভিযোগ করলে পেতে হচ্ছে হত্যার হুমকি। এমন হত্যার হুমকিতে দিন দিন আতঙ্ক বাড়ছে এসব রাইডে আরোহনকারী যাত্রীদের মধ্যে। সব থেকে বেশি আতঙ্কে রয়েছেন নারীরা।

গত কয়েকদিন ধরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় রাইড শেয়ারিং সেবা গ্রহনকারী ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা হলে তারা নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে তুলে ধরেন নানা আতঙ্কের। ভুক্তভোগী আরোহীরা জানান, বাবা-মায়ের যেসব সন্তানগুলো দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্তির কারণে পরিবার ও সমাজের কাছে সব চেয়ে আতঙ্ক ছিল তারাই এখন মাদকের অর্থের যোগানে মোটরসাইকেল নিয়ে রাস্তায় নেমেছে।

নিজেরাই এখন নিজেদের মাদকের অর্থ জোগাড় করছে। এইসব মাদকসেবী নিজেরা যেমন সুস্থ নয়, তেমনি স্বাভাবিক নয় তাদের কাজকর্ম। সেখানে তাদের পেছনে সুস্থ-স্বভাবিক মানুষ ভ্রমণ করা কতটা নিরাপদ তা নিয়ে নগরবাসীদের মধ্যে রয়েছে চরম আতঙ্ক। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, আরোহীদের মধ্যে উদ্বেগ আতঙ্ক কাজ করলেও যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন নয় রাইড শেয়ারিং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।

অনেকে অভিযোগ করেছেন, অনেক তরুন-যুবক আছেন যারা এলাকায় বখাটে ও মাস্তান হিসেবে পরিচিত। এসব বখাটেরা নিজেরা চাদাবাাঁজি ও নানা ঝামেলায় অধিাকংশ সময় নিজেদের জড়িয়ে রাখে। তারাই আবার সময় পেলে পার্ট টাইমার হিসেবে চালাচ্ছে পাঠাওসহ অ্যাপসভিত্তিক রাইড। বখাটে-মাস্তানরা নিজেইরা যেখানে সব সময় ঝামেলার ভেতরে থাকে সেখানে তাদের পেছনে যাত্রী আরোহন কিভাবে নিরাপদ হয় সেই প্রশ্ন আরোহীদের।

আরোহীদের অভিযোগ, এসব বখাটে-মাস্তান টাইপ বাইকাররা নির্দিষ্ট সময়ে আসার কথা বললেও নির্দিষ্ট সময়ে আসে না। গন্তব্য একটু দুরবর্তী এলাকা বা গলির ভেতরে হলে যেতেও অনীহা প্রকাশ করে। এমনকি যাত্রীকে গালি দিয়ে বসে এসব অসুস্থ বাইকারারা।

ভুক্তভোগী যাত্রীদের অভিযোগ, রাইড শেয়ারিং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কল সেন্টারে কল করলেও মেলে না প্রতিকার। যার কারণে অভিযুক্তরা পরবর্তীতে আরও বড় ধরণের অপরাধ করতে সাহস পাচ্ছে।

যাত্রাবাড়ীর এক পিতা আক্ষেপ করে জানান, ‘তার সন্তান বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদক গ্রহন করতো। পরে তিনি হাত খরচের টাকা দেওয়া বন্ধ করে দেন। এখন সেই ছেলে নিজেই ‘পাঠাও’ বাইক চালিয়ে অর্থ উপার্জন করে মাদকের টাকা জোগাড় করছে। তিনি বলেন, যথাযথ তদারকি না থাকায় অনেক মাদকাসক্ত ও সন্ত্রাসীরা পাঠাওসহ বিভিন্ন রাইড শেয়ারিংয়ের রেজিস্ট্রেশন করতে পারছে। এতে তারা মাদক থেকে ফিরে না এসে আরও ভয়ঙ্কর মাদকসেবীতে পরিণত হচ্ছে।

ফার্মগেটে বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা ফাহিম আহমেদ বলেন, রাইড শেয়ারিং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে চালকের যোগ্যতা ও মাদকাসক্ত কিনা সেটি যাচাইয়ে কোন পদ্ধতি নেই। যার কারণে বাছ-বিচার ছাড়া যে কোন ব্যক্তি এখানে রেজিস্ট্রেশন করে যাত্রী বহনের অনুমতি পেতে পারে। তিনি বলেন, এলাকার উগ্র ও মাস্তান টাইপ লোকজন পার্ট টাইমার হিসেবে বাইক চালাতে এসে যাত্রীদের সাথে খারাপ আচরণ করে। যাত্রীরা প্রতিবাদ করলে অনেক চালক তেড়ে এসে যাত্রীদের মারতে যায়।

মোস্তাক আহমেদ নামে এক ব্যক্তি নিজের ফেইসবুক পোস্টে এক পাঠাও চালকের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘ধনমÐি থেকে পাঠাও গাড়ি কল দেই, শুয়োরছানাটি বহুক্ষণ বসিয়ে রেখে আসে। গাড়িতে তোলার পর বলে সে কোন ডিসকাউন্ট মানে না। রেট ২৪০ টাকা আসে সেটাই দিতে হবে, নইলে নামিয়ে দেবে। ৬০ টাকা বাড়তি দিতে রাজি না হওয়ায় তাই করলো।’ ক্ষুব্ধ ওই আরোহী ফেইসবুকে ওই চালকের ছবিসহ তার গাড়ির নম্বর উল্লেখ করেন।

ঢাকা মেডিক্যালের সামনে হাসনা হেনা নামে এক নারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘রাইড শেয়ারিং সার্ভিসগুলো শুরুতে ভালো ছিল। এখন কোন বাছ-বিচার ছাড়া যাকে তাকে রাইড চালানোর রেজিস্ট্রেশন দেওয়ায় মাদকসেবী, বখাটে ও মাস্তানরা এসব রাইড চালানোর সুযোগ পাচ্ছে। তিনি বলেন, খারাপ লোকের স্বভাব বদল হওয়া ততটা সহজ নয়। তারা বরং সুযোগ পেলে নিজের প্রকৃত চেহারাটি ভালোভাবে তুলে ধরে। এসব লোক নারীদের সাথে সর্বদা বাজে ব্যবহার করে।’

এ বিষয়ে বিআরটিএ’র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, রাইড শেয়ারিং সেবাগুলোর ওপরে মনিটরিং বৃদ্ধি করা হয়েছে। মোবাইল কোর্ট বসিয়ে মোটরসাইকেল আটকানো হচ্ছে। এ ছাড়া চলতি বছর ২৮ ফেব্রæয়ারি রাইড শেয়ারিং সার্ভিসের মনিটরিং নিয়ে সরকারের তরফ থেকে নীতিমালা তৈরি করে গেজেট জারি করা হয়। এর আগে ১৫ জানুয়ারি রাইডশেয়ারিং সার্ভিস নীতিমালা অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। ওই নীতিমালায় রাইড শেয়রিং সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ও সেবাগ্রহীতাদের জন্য অনুসরনীয় গুরুত্বপূর্ণ ৮টি অনুচ্ছেদ এবং ১২টি শর্ত যুক্ত করা হয়েছে।

এ দিকে, নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্র আন্দোলনের পর ট্রাফিক পুলিশ ও নগরবাসী সচেতন ও সোচ্চার হওয়ায় রাস্তায় লাইসেন্স ও রুট পারমিটবিহীন গাড়ি নামানো বন্ধ করে দেয় মালিকরা। এতে নগরবাসীর ভোগান্তি বেড়েছে অনেক। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গণপরিবহনের সঙ্কটকে কাজে লাগিয়ে কাগজপত্র ঠিক থাকা কিছু বাস ও রাইড শেয়ারিং যানের স্বেচ্ছাচারিতা দিন দিন বাড়ছে।

এ ছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ ও ডাম্পিংয়ের কারণে সিএনজিচালিত অটোরিকসার অপর্যাপ্ততা, নগরীর মূল সড়কে লেগুন বন্ধ করে দেওয়া এবং মালিকপক্ষ নতুন বাস না নামানোয় এ সঙ্কট আরও দীর্ঘতর হচ্ছে। অতিদ্রæত এ সঙ্কট নিরসনের দাবি জনান ভুক্তভোগী নগরবাসী।

ঢাকা অটোরিকসা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হানিফ খান জানান, ঢাকায় যাত্রীর তুলনায় অটোরিকসা অনেক কম। এই সুযোগে মালিকরা যেমন একচোটিয়া ব্যবসা করছে তেমনি চালকরাও যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া নিচ্ছে। এ ছাড়া রাইড শেয়ারিং যানগুলোও দ্বিগুন ভাড়া আদায় করছে।

তিনি আরও জানান, সরকারের তরফ থেকে ২০০৮ সালে চালকদের জন্য ৫ হাজার অটোরিকসার অনুমোদন দেওয়া হলেও মালিকপক্ষ ও বিআরটিএ’র স্বার্থান্বেষী একটি মহলের কারণে সে উদ্যোগটি স্থগিত হয়ে যায়। আগের উদ্যোগটি বাস্তবায়ন হলে চলমান সঙ্কট অনেকটা কমবে বলে তিনি মনে করেন।

সূত্র: ইনকিলাব