রোজায় ডায়াবেটিস রোগীদের করণীয়

প্রকাশিত: ৬:৪৮ অপরাহ্ণ, মে ১২, ২০২০ | আপডেট: ৬:৪৮:অপরাহ্ণ, মে ১২, ২০২০

মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের কাছে রোজা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, তারা রোজা রাখতে চাইলে বেশ কিছু নিয়ম মানা জরুরি।

কারণ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়ম মেনে ও সময়মতো খাবার খেতে হয়। এ ছাড়া দিনের বিভিন্ন সময় তাদের ওষুধ নেয়ার প্রয়োজন হতে পারে। ফলে সেহরি ও ইফতারের মধ্যে দীর্ঘসময় না খেয়ে থাকার প্রভাব পড়তে পারে তাদের শরীরে।

রোজা নিয়ে ডায়াবেটিস রোগীদের নিয়ে নানা প্রশ্ন প্রায়ই শোনা যায়। অনেক রোজাদার ডায়াবেটিস রোগীদের মনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মনেও রয়েছে নানা প্রশ্ন। যেমন-

১. ডায়াবেটিসের রোগীরা কি রোজা রাখতে পারবে? কোন কোন ক্ষেত্রে পারবে না?

২. রোজা রাখলে কী কী উপকার হবে?

৩. কী কী ঝুঁকি থেকে যায়? কী করণীয় তখন?

৪. রোজা থাকা অবস্থায় রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা মাপা যাবে কি?

৫. কোন অবস্থায় রোজা অবশ্যই ভেঙে ফেলতে হবে?

৬. রোজাতে খাবার-দাবার কেমন হবে?

৭. রোজাতে শরীরচর্চা করতে হবে কীভাবে?

৮. ওষুধ/ইনসুলিন কীভাবে, কখন, কতোটুকু নিতে হবে?

মুসলিমদের জন্যে ইবাদাতের এক ভরা মৌসুম মাহে রমজান। কে না শরীক হতে চায় এই মহিমান্বিত মাসের রহমাতে-বারাকাহতে-মাগফিরাতে-নাজাতে! তবে কিছুটা বিপাকে পড়ে যান ডায়াবেটিসের রোগীরা। অনেকগুলো প্রশ্ন আর সংশয় তাদের মনে উঁকি দিতে থাকে।

ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের রোজা রাখার বিষয়ে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন ময়মনসিংহ মেডিকেলে চিকিৎসা বিদ্যায় উচ্চতর ডিগ্রিতে অধ্যয়নরত ডা. মারুফ রায়হান খান। চলুন জেনে নিই সেগুলো-

১. সারা বিশ্ব জুড়ে ৫০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ রোজা রাখেন। প্রচুর লিটারেচারে এসেছে যে, অধিকাংশ ডায়াবেটিক রোগীরাই রোজা রাখতে পারেন। তবে এটা নির্দিষ্ট ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে তার রোজা রাখতে পারা বা না পারা। সেজন্যে প্রয়োজন রোজা শুরু হবার বেশ কিছুদিন আগেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে যাচাই-বাছাই (Pre-Ramadan Assessment) করিয়ে নেয়া যে তিনি রোজা রাখতে সক্ষম কিনা, রোজাতে কী কী নিয়মকানুন মেনে চলবেন, ওষুধ/ইনসুলিন কীভাবে নেবেন ইত্যাদি। রোগীর বিগত দিনগুলোতে ডায়াবেটিসের অবস্থা, জটিলতা, অন্যান্য রোগ, রক্তে চর্বির পরিমাণ, রক্তচাপ ইত্যাদি সবকিছু বিবেচনা করে চিকিৎসক সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকেন রোগীটি রোজা রাখতে পারবে কি পারবে না।

তবে খুব সাধারণভাবে বলতে গেলে যেসব ডায়াবেটিস রোগীরা ডায়াবেটিস অনেক কমে গেলেও বুঝতে পারেন না, যাদের ডায়াবেটিস একেবারেই নিয়ন্ত্রণে থাকে না, সম্প্রতি ডায়াবেটিক কিটোএসিডোসিস হয়েছে–তাদেরকে রোজা না রাখতে বলা হয়। তাছাড়া যেসব ডায়াবেটিক রোগীদের কোনো অর্গান ফেইলিওর (যেমন : হার্ট ফেইলিওর, কিডনি ফেইলিওর, লিভার ফেইলিওর) আছে তাদেরও রোজা না রাখাই শ্রেয়। এছাড়াও যাদের মারাত্মক চোখের রেটিনায় সমস্যা, স্নায়ুতে সমস্যা, বড় ধরনের রক্তনালীতে সমস্যা, তীব্র পেপটিক আলসার, মারাত্মক ধরনের ফুসফুসে যক্ষ্ণা, মারাত্মক ইনফেকশান, মারাত্মক হাঁপানি, বারবার পাথর হওয়া, যেসব ক্যান্সার রোগীদের শারীরিক অবস্থা বেশ খারাপ, সম্প্রতি হার্ট এটাক/স্ট্রোক হয়েছে, লিভারে সমস্যা রয়েছে, অতি দুর্বল স্বাস্থ্যের বৃদ্ধ, পূর্ববর্তী গর্ভকালীন সময়ে ডায়াবেটিসের ইতিহাস, অনিয়ন্ত্রিত মৃগীরোগ এবং মারাত্মক মানসিক সমস্যা যাদের রয়েছে–তাদেরও রোজা রাখতে নিরুৎসাহিত করা হয়। গর্ভবতী এবং শিশুকে যারা বুকের দুধ পান করান তাদেরও রোজা রাখতে নিরুৎসাহিত করা হয়।

২. ডায়াবেটিস রোগীদেরও রোজা রাখলে বেশ কিছু উপকার হয়ে থাকে। যেমন :

  • রোজা শরীরের বিপাকীয় (Metabolic) কাজের উন্নতি ঘটায়।
  • শরীরের অতিরিক্ত ওজন কমাতে সাহায্য করে।
  • উচ্চ রক্তচাপের নিয়ন্ত্রণ ভালো হয়।
  • শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ দূর করে।
  • রোগ প্রতিরোধ-ক্ষমতা শক্তিশালী করে।
  • সর্বোপরি রোজাতে নিয়মানুবর্তিতার এক অনন্য চর্চা হয়। আর আমরা সবাই জানি নিয়মানুবর্তিতা ডায়াবেটিসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা।

৩. ডায়াবেটিস রোগীদের রোজা রাখলে যেসব ঝুঁকি থাকে :

  • রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ অতিরিক্ত কমে যাওয়া (হাইপোগ্লাইসেমিয়া)।
  • রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়া (হাইপারগ্লাইসেমিয়া)।
  • পানিশূন্যতা।
  • ওজনের তারতম্য ঘটা।

রোজায় ডায়াবেটিক রোগীর যে সমস্যাটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন থাকেন চিকিৎসকরা–তা হচ্ছে ‘হাইপোগ্লাইসেমিয়া’ (Hypoglycemia)। সহজ ভাষায় বলতে গেলে রক্তে গ্লুকোজ/সুগারের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কমে যাওয়া। হাইপোগ্লাইসেমিয়া এতো মারাত্মক হতে পারে যে রোগী কোমায় চলে যেতে পারে, মস্তিষ্কের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। তাই প্রতিজন ডায়াবেটিস রোগীর এবং তার পরিবার-পরিজনের হাইপোগ্লাইসেমিয়া হলে কী কী লক্ষণ প্রকাশ পায় এবং করণীয় কী তা জানা অবশ্যই প্রয়োজ

সচরাচর যে লক্ষণগুলো প্রকাশ পায় :

  • অতিরিক্ত ঘাম
  • হাত-পা কাঁপা
  • বুক ধড়ফড় করা
  • বেশি ক্ষুধা লাগা
  • উদ্বিগ্নতা
  • ঝিমাতে থাকা
  • কথা জড়িয়ে যাওয়া
  • মনোযোগ প্রদানে বিঘ্ন ঘটা
  • অল্পতে রেগে যাওয়া
  • বমি বমি ভাব
  • মাথা ব্যথা/ মাথা ঘোরা ইত্যাদি।

রোগীর হাইপোগ্লাইসেমিয়া হলে সঙ্গে সঙ্গে রোজা ভেঙে ফেলতে হবে। তা যদি ইফতারের ১০ মিনিট আগেও হয়। এক গ্লাস পানিতে ৪-৬ চামচ চিনি মিশিয়ে খেয়ে নিতে হবে অথবা অন্য কোনো শর্করাযুক্ত খাবার।

৪. বিশেষজ্ঞ আলেমদের মতে, শরীয়াহগত দিক থেকে রোজা রেখে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা পরীক্ষা করতে কোনো বাধা নেই। ডায়াবেটিস রোগীদের রোজা থাকা অবস্থায় নিয়মিত রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ পরীক্ষা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে সেহরির ঘণ্টা দুয়েক পর এবং ইফতারের ঘণ্টাখানেক আগে গ্লুকোজের মাত্রা দেখা উচিত। এছাড়া অন্যান্য সময়েও পরীক্ষা করা যেতে পারে।

৫. যেকোনো সময় রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ৩.৯ মিলিমোল/লিটারের নিচে নেমে গেলে রোজা ভেঙে ফেলতে হবে। মনে রাখার সুবিধার্থে “৪” বলা হয়। রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ১৬.৬ মিলিমোল/লিটারের বেশি বেড়ে গেলেও রোজা ত্যাগ করতে হবে।

৬. ক্যালোরি এবং খাবারের গঠনগত দিক থেকে রমাদানের আগে যেমন স্বাস্থ্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ খাবার খেতেন, রমাদানেও তেমনটাই চলবে। সেহরির সময় অপেক্ষাকৃত জটিল শর্করা যেগুলো হজম ও শোষণ ধীরে ধীরে হয় তেমন খাবার খেতে হবে। সেহরির সময় ভাত, রুটি, নান, সবজি, ডাল, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ফল ইত্যাদি খাওয়া যেতে পারে।

ইফতারের ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে :

  • অনেক বেশি পরিমাণ শর্করা ও চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়া যাবে না।
  • মিষ্টিজাতীয় খাবার কম খেতে হবে।
  • মিষ্টি পানীয় পরিহার করতে হবে। মিষ্টি শরবতের বদলে আল্লাহর দেওয়া ‘প্রাকৃতিক শরবত’ ডাবের পানি খাওয়া যেতে পারে।
  • ইফতার থেকে সেহরির মধ্যবর্তী সময়ে প্রচুর পানি খেতে হবে।

আরেকটি বিষয় খুবই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। সেহরি যতোটা সম্ভব দেরিতে খেতে হবে আর ইফতার যতোটা সম্ভব তাড়াতাড়ি করতে হবে। আমাদের ধর্মীয় বিধানও তা-ই শিক্ষা দেয়। হাইপোগ্লাইসেমিয়া প্রতিরোধে এটি একটি খুবই কার্যকরী উপায়।

৭. রোজাতে প্রাত্যহিক জীবনের স্বাভাবিক কাজগুলো করতে কোনো বাধা নেই। তবে অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম হাইপোগ্লাইসেমিয়া করতে পারে। তাই দিনের বেলায় অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম না করাই ভালো। ইফতার এবং সেহরির মধ্যবর্তী সময়ে ঘণ্টাখানেকের জন্যে শরীরচর্চা করা যেতে পারে। তারাবীহ, তাহাজ্জুদ ইত্যাদি অতিরিক্ত নামাজও শরীরচর্চা হিসেবে বিবেচনায় রাখা উচিত।

৮. সবশেষে আসা যাক ওষুধ/ইনসুলিন কীভাবে নিতে হবে। প্রত্যেকটা রোগীকে চিকিৎসকই ঠিক করে দেবেন এটা। তবে খুব সাধারণভাবে সচরচার ব্যবহার হওয়া কিছু ওষুধ নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক।

যারা নিয়মিত Sulfonylureas (Glipizide, Gliclazide, Glimeperide –ওষুধের প্যাকেটের গায়ে ছোট্ট করে ওষুধের এই জেনেরিক নেইম লেখা থাকে) প্রতিদিন সকালে খেতেন, তারা একই ডোজে ইফতারের সময় সেটা খাবেন। আর যারা এ ওষুধটি দুবেলা খেতেন, সকালে ও রাতে–তারা সকালের ডোজের পুরোটা ইফতারের সময় খাবেন। তবে রাতের ডোজের কেবল ‘অর্ধেকটা’ সেহরির সময় খাবেন।

যারা Metformin (Oramet, Comet, Metfo, Met, Informet ইত্যাদি নামে পাওয়া যায়) দিনে ১ বেলা খেতেন সেটি ইফতারের পর খাবেন। যারা দিনে দুবেলা ওষুধটি খেতেন তারা একটি ইফতারের পর এবং একটি সেহরির পর খাবেন। আর যারা ৩ বেলা ৫০০ মিলিগ্রামের একটি করে ট্যাবলেট খেতেন, তারা ইফতারে একসঙ্গে সঙ্গে দুটো ট্যাবলেট অর্থাৎ মোট ১০০০ মিলিগ্রাম খাবেন। আর সেহরিতে ৫০০ মিলিগ্রামের ১টি ট্যাবলেট খাবেন।

যারা Linagliptin (যেমন : Lijenta/Linatab/Linita) জাতীয় ওষুধ খেতেন তাদের ডোজের পরিবর্তন হবে না। একই ওষুধটি একই ডোজে ইফতারে/সেহরিতে খাবেন।

যারা Empagliflozin (যেমন : Empa/Empatab/Jardiance) জাতীয় ওষুধ খান তারা একই ওষুধ একই ডোজে ইফতারে খাবেন৷ তবে এই ওষুধ যারা খান তারা অবশ্যই বেশি বেশি পানি পান করবেন।

যারা দুবেলা ইনসুলিন নিয়ে থাকেন, সকালের ডোজটা সমপরিমাণ ইফতারের আগে নেবেন। আর রাতের ডোজের ‘অর্ধেক’ পরিমাণ সেহরির সময় নেবেন। ধরা যাক, কেউ সকালে ৩০ ইউনিট এবং

রাতে ২০ ইউনিট ইনসুলিন পেতেন। রমাদানে তিনি ইফতারের আগে সকালের ডোজের পুরোটা অর্থাৎ ৩০ ইউনিট ইনসুলিনই নেবেন। আর সেহরির সময় রাতের ডোজের অর্ধেক (২০/২=১০) অর্থাৎ ১০ ইউনিট ইনসুলিন পাবেন।

আপনি ডায়াবেটিক হোন কিংবা নন-ডায়াবেটিক, সুস্থ অবস্থায় সুষ্ঠুভাবে যেন সবগুলো রোজা রাখতে পারেন সে দু’আই করি। তবে মারাত্মক শারীরিক অসুবিধার কারণে চিকিৎসকের পরামর্শে যদি একান্তই রোজা রাখতে না পারেন, তাহলে দয়া করে মন খারাপ করবেন না। আপনার নিয়্যাত তো নিষ্কলুষ ছিল, আর আল্লাহ তো অন্তরের খবরও জানেন। পরবর্তী সময়ে সে রোজাগুলো কাজা আদায় করা যাবে।

সুত্র: যুগান্তর।