রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এনজিও”র কাজে কড়া নজরদারি

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাধা সৃষ্টির অভিযোগ

টিবিটি টিবিটি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ৭:৪৫ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৩০, ২০১৯ | আপডেট: ৭:৪৫:অপরাহ্ণ, আগস্ট ৩০, ২০১৯

রোহিঙ্গাদের জন্য এ পর্যন্ত বিদেশ থেকে ২ হাজার ৮শ’ কোটি টাকা পেয়েছে দেশি-বিদেশি ১৮৯টি এনজিও (বেসরকারি সেবা সংস্থা)। তবে সম্প্রতি এসব এনজিওর বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাধা সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে।

তাই এনজিওগুলোর কাজে কড়া নজরদারি শুরু করেছে সরকার। কারা রোহিঙ্গাদের ফেরত যেতে নিরুৎসাহিত করছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে বুধবার জরুরি বৈঠক করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন।

বৈঠকে এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে এনজিওগুলোর ব্যাপারে কড়া বার্তা দেয়া হয়েছে। এর আগে এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর পরামর্শে সরকারের শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন (ট্রিপল আরসি) এবং কক্সবাজারের জেলা প্রশাসন তাদের তৎপরতা বাড়িয়েছে। এছাড়াও গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতা রয়েছে।

জানতে চাইলে এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক কেএম আবদুস সালাম বুধবার বলেন, আমরা এনজিওগুলোর কার্যক্রমে নজরদারি বাড়িয়েছি। কে কী করছে আমরা ভালোভাবে দেখছি। এ ছাড়াও এনজিওগুলোর কার্যক্রমের ওপর ট্রিপল আরসি এবং জেলা প্রশাসনকে রিপোর্ট পাঠাতে বলেছি। খুব দ্রুতই তারা রিপোর্ট দেবে। রিপোর্ট পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এনজিওবিষয়ক ব্যুরো সূত্র জানায়, রোহিঙ্গাদের নিয়ে মোট ১৮৯টি এনজিও কাজ করছে। এসব এনজিও বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে এ পর্যন্ত মোট ১ হাজার ২১টি প্রকল্পে ২ হাজার ৭৪৮ কোটি ৯১ লাখ টাকা বিদেশি সহায়তা নিয়েছে।

এর মধ্যে দেশের ১৩৪টি এনজিওর বিপরীতে ছাড় হয়েছে ১ হাজার ৩২৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকা এবং বিদেশি ৫৫টি এনজিওর প্রকল্পে ছাড় হয়েছে ১ হাজার ৪৬৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয় স্বাস্থ্য খাতে।

এ খাতে এ পর্যন্ত ব্যয় ২৩৯ কোটি টাকা। এ ছাড়া খাদ্য খাতে ১৭৮ কোটি এবং বস্ত্র খাতে ৮০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এনজিওগুলোর মাধ্যমে ১৬ হাজার টয়লেট এবং ২২ হাজার টিউবওয়েলসহ স্যানিটেশনের বেশকিছু উপকরণ দেয়া হয়েছে। তবে রোহিঙ্গা এলাকায় এ পর্যন্ত ৬টি এনজিওর তহবিল ছাড় বন্ধ রেখেছে এনজিও ব্যুরো।

এগুলো হল- মুসলিম এইড ইউকে, ইসলামিক রিলিফ, ইসলামিক এইড, স্মল কাইন্ডনেস বিডি, নমিজন আফতাবি ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ চাষী কল্যাণ সমিতি।

দাতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশই জাতিসংঘ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপকেন্দ্রিক। এ ছাড়া আরব দেশগুলো থেকেও এনজিওদের কিছু সহায়তা দেয়া হচ্ছে। তবে বিদেশি সহায়তার বড় অংশই সরকারিভাবে আসে। এনজিওদের মাধ্যমে যে সহায়তা আসে, সেটিও সরকারের নজরদারি মধ্যে ব্যয় হয়। তবে কোনো কোনো এনজিও শর্ত লঙ্ঘন করছে, এমন তথ্য পেয়েছে সরকার।

জানতে চাইলে কক্সবাজারের শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম এনডিসি বুধবার বলেন, এনজিওদের ব্যাপারে ঢালাওভাবে বেশ কিছু অভিযোগ এসেছে। সুনির্দিষ্টভাবে কেউ তথ্য দেয়নি। তবে আমরা এসব খতিয়ে দেখছি। নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

কোনো এনজিওর এ ধরনের তৎপরতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। জানা গেছে, রোহিঙ্গাদের দেশে পাঠানোর কথা থাকলেও কয়েক দফা চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। সর্বশেষ গত ২২ আগস্ট রোহিঙ্গাদের একটি অংশকে মিয়ানমার ফেরত পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু তা সফল হয়নি।

এরপর বাংলাদেশে আসার দু’বছর পূর্তি উপলক্ষে কুতুপালংয়ে লক্ষাধিক লোক নিয়ে সমাবেশ করে রোহিঙ্গারা। সমাবেশে রোহিঙ্গা নেতারা বলেন, নিজেদের নাগরিকত্ব, মানবাধিকার, নিরাপত্তা, ক্ষতিপূরণ, কাজের নিশ্চয়তা এবং মর্যাদা ফিরে পেলেই তারা নিজ দেশে ফিরে যাবেন। এ ছাড়াও গণহত্যায় জড়িতদের বিচার করতে হবে।

না হলে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার কোনো ইচ্ছাই তাদের নেই। প্রয়োজনে এ দেশে আজীবন থাকতে চান। ওই সমাবেশে সবার গায়ে একটি গেঞ্জি ছিল। যাতে লেখা ছিল ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’। অর্থাৎ আমরা ন্যায়বিচার চাই। সমাবেশের প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুন এবং গেঞ্জি এনজিওরা সরবরাহ করেছে। কোনো কোনো এনজিও রোহিঙ্গাদের ধারালো অস্ত্র সরবরাহ করেছে।

এদিকে নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর উদ্যোগে ক্ষুব্ধ এনজিওগুলো। এ ব্যাপারে তারা প্রকাশ্যেই অবস্থান নিয়েছে। ২১ আগস্ট অ্যাকশন এইডের নেতৃত্বে দেশি-বিদেশি ৬১টি এনজিও এ ব্যাপারে একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওই বিবৃতিতে যে দাবি তোলা হয়েছে, তা ৯০ বছরেও পূরণ সম্ভব নয়।

এদিকে সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন সাংবাদিকদের বলেছেন, রোহিঙ্গারা যাতে দেশে ফেরত না যায়, সে ব্যাপারে দেশি-বিদেশি কিছু এনজিও ইন্ধন জোগাচ্ছে। সেখানে তারা রাজনীতি করছে।

মন্ত্রী বলেন, তারা প্ররোচনা দিচ্ছে যে, রোহিঙ্গাদের যাওয়া উচিত নয়। আমরা তাদের ওপর একটু নজরদারি করব। কারণ তারা কাজের শর্ত ভঙ্গ করছে। পাশাপাশি কিছু রোহিঙ্গা নেতার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে। অনেক মাঝি আছেন, যারা ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের নেতা। তাদের অনেকে বিভিন্ন রকম অপকর্মে লিপ্ত। তাদের শাস্তির আওতায় আনা হবে।

জানতে চাইলে অ্যাকশন এইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, এনজিও অনেক আছে, আমি ৬১টির পক্ষে কথা বলছি। আমাদের সঙ্গে সরকারের কোনো বিরোধ নেই।

আমি বিবৃতিতে বলেছি, রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং তাদের মতামত নিয়ে যেন পাঠানো হয়। তিনি বলেন, আমরা পাঠানোর বিরোধিতা করছি না। তবে রোহিঙ্গারা গরু ছাগল নয়, মানুষ। তাদের ঠেলে দেয়া যাবে না। নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই পাঠাতে হবে।

এ ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে রোহিঙ্গাদের বহন করার সক্ষমতা বাংলাদেশের আছে কি না- এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বিষয়টি আমি জানি না। তবে আমরাও যেহেতু শরণার্থী ছিলাম, সেই বিবেচনায়ই শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়া হয়েছে। বিবৃতি দেয়া এনজিওগুলোর কাজের শর্তের মধ্যে পড়ে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিবৃতিতে খারাপ কিছু বলিনি।

জানা গেছে, বর্তমানে দেশে বৈদেশিক অনুদান নিয়ে কাজ করে এমন দেশি-বিদেশি দুই হাজার ৬২৫টি এনজিও রয়েছে। এর মধ্যে বিদেশি এনজিও ২৫৯ এবং দেশি দুই হাজার ৩৬৬। আর রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করছে এমন এনজিও সংখ্যা ১৮৯টি। তবে পরবর্তী সময়ে ৬টির তহবিল বন্ধ হয়ে যায়।

এনজিও ব্যুরো সূত্র বলছে, রোহিঙ্গাদের এখনও শরণার্থী স্বীকৃতি দেয়নি বাংলাদেশ সরকার। কারণ শরণার্থী স্বীকৃতি পেলেই সেটি জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের (ইউএনএইচসিআর) আওতায় চলে যাবে।

ওই সময়ে তাদের থাকা-খাওয়াসহ সব দায়িত্ব জাতিসংঘ বহন করবে। তবে ইউএনএইচসিআরের অনুমতি ছাড়া তাদেরকে কোথাও পাঠানো যাবে না। ফলে রোহিঙ্গাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কোনো তহবিল ছাড় করা হচ্ছে না। বর্তমানে রোহিঙ্গাদের যে প্রকল্পে সহায়তা দেয়া হচ্ছে তাকে বলে এফডি (ফরেন ডোনেশন)।

ট্রিপল আরসির সর্বশেষ তথ্যানুসারে, দেশে মোট নিবন্ধিত রোহিঙ্গা ১১ লাখ ১৮ হাজার ৫৭৬ জন। এর মধ্যে আশ্রয়প্রার্থী ৭ লাখ ৪১ হাজার ৮৪১ জন। এদের মধ্যে ৩৪ হাজার ৩৩৮ জন গর্ভবতী।

রোহিঙ্গাদের জন্য ৬ হাজার ৫০০ একর জমিতে মোট ৩২টি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এখানে ঘরের সংখ্যা ২ লাখ ১২ হাজার ৬০৭টি। দুই প্রক্রিয়ায় ৮ লাখ ৬৭ হাজার ১৯ জনকে খাদ্য সহায়তা দেয়া হচ্ছে।