লাইপজিগের স্বপ্নযাত্রায় ভেঙ্গে চুরমার সিমিওনের স্বপ্ন

টিবিটি টিবিটি

স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১:৩৮ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১৪, ২০২০ | আপডেট: ১১:৩৮:পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১৪, ২০২০

চ্যাম্পিয়নস লিগে লাইপজিগের স্বপ্নযাত্রা চলছেই। প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বে এসেই সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে ইউলিয়ান নাগেলসম্যানের দল। পোড় খাওয়া দিয়েগো সিমিওনের অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদকে ম্যাচজুড়েই তটস্থ রেখে ৮৮ মিনিটের গোলে জয় তুলে নিয়েছে জার্মান ক্লাব লাইপজিগ। এর সাথেই আরও একবার শেষ হয়ে গেল সিমিওনের চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ট্রফি উঁচিয়ে ধরার স্বপ্ন।

মাত্র ১১ বছর আগে ফুটবলের আঙিনায় পথচলা শুরু করে জার্মান ক্লাব আরবি লাইপজিগ। তাতেই চ্যাম্পিয়নস লিগে বাজিমাত করলেন জার্মান ক্লাবটি।

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাতে পর্তুগালেরি লিসবনে চ্যাম্পিয়নস লিগের দ্বিতীয় কোয়ার্টার-ফাইনালে অ্যাথলেটিকোর মুখোমুখি হয় জার্মান ক্লাব আরবি লাইপজিগ। যেখানে অ্যাটলেটিকোকে ২-১ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালে উঠলো তারা। দলের হয়ে গোল দুইটি করেন দানি ওলমো ও টেইলর অ্যাডামস। আর অ্যাথলেটিকোর হয়ে একমাত্র গোলটি করেন জোয়াও ফেলিক্স।

কোভিড-১৯ পরীক্ষায় পজিটিভ ফল আসায় অ্যানহেল কোরেয়া ও ডিফেন্ডার সিমে ভারসালিকোর না থাকার ধাক্কাটা যেন সামলে উঠতে পারল না অ্যাটলেটিকো।

প্রথমার্ধে প্রভাব বিস্তার করলেও গোলের তেমন একটা সুযোগ তৈরি করতে পারেনি তারা। তবে দ্বিতীয়ার্ধের ৫১ মিনিটে স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড দানি ওলমোর দুর্দান্ত ফিনিশে এগিয়ে যায় লাইপজিগ। বদলি হিসেবে নেমে পেনাল্টি আদায় করে নিয়ে সেখান থেকে গোল করে অ্যাটলেটিকোকে সমতায় ফেরান হোয়াও ফেলিক্স। তবে ম্যাচের নির্ধারিত সময়ের দুই মিনিট বাকি থাকতে বদলি হিসেবে নামা টাইলার অ্যাডামসের বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া ডান পায়ের জোরালো শট ডিফ্লেক্ট হয়ে অ্যাটলেটিকোর জালে প্রবেশ করলে ইতিহাস হাতছানি দিতে থাকে লাইপজিগকে।

বাকি সময়ে আরেকটি ফেরার গল্প লেখা হয়নি অ্যাটলেটিকোর। সিমিওনে বিদায় করে দিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী ম্যানেজার হিসেবে দলকে সেমিতে তোলার রেকর্ড গড়া হয়ে যায় নাগেলসম্যানের। ৩৩ বছর বয়সে এসব তো রুপকথাই!

লাইপজিগ ক্লাবটাই অবশ্য চমক জাগানিয়া। মাত্র দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলতে এসেছিল তারা। দলের সর্বোচ্চ গোলদাতা টিমো ভার্নারও চেলসিতে যোগ দিয়েছেন মাত্র কিছুদিন আগে। অগত্যা তাকে ছাড়াই অ্যাটলেটিকোর বিপক্ষে নামতে হয়েছিল লাইপজিগকে। পরিসংখ্যানের হিসেবে চ্যাম্পিয়নস লিগে অভিজ্ঞ অ্যাটলেটিকোর বিপক্ষে নবীন লাইপজিগের সুযোগ ছিল অল্প। ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া ক্লাবটি সব মিলিয়ে এই ম্যাচের আগ পর্যন্ত ৩৯৪ ম্যাচ খেলেছিল। অথচ অ্যাটলেটিকোর ম্যানেজার হিসেবে সিমিওনে-ই ডাগআউটে দাঁড়িয়েছেন ৪৭৮ ম্যাচে। এছাড়া চ্যাম্পিয়নস লিগে নকআউট পর্বে কখনোই জার্মান প্রতিপক্ষের বিপক্ষে হারেনি অ্যাটলেটিকো। সবমিলিয়ে ম্যাচের আগে পাল্লা ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন লিভারপুলকে বিদায় করে দেওয়া অ্যাটলেটিকোর দিকেই ঝুঁকেছিল।

তবে যারা এই মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগের খেলা নিয়মিত দেখেছেন তারা ভালোই জানতেন, পরিসংখ্যান যাই ইঙ্গিত দিক না কেন লিসবনের এস্তাদিও হোসে আলভালাদে দারুণ একটি ম্যাচ হতে যাচ্ছে। ইউরোপের সবচেয়ে সম্ভাবনায় তরুণ ম্যানেজারদের একজন নাগেলসম্যানের অধীনে লাইপজিগ যে এবারের আসরে রীতিমত উড়ছে। শেষ ষোলয় হোসে মরিনহোর টটেনহামকে দুই লেগে পাত্তা না দিয়েই তারা বুঝিয়ে দিয়েছিল, বড় দলগুলোর সঙ্গে ‘চোখে চোখ রেখে’ লড়াই করতে জানে তারা।

অ্যাটলেটিকোর বিপক্ষেই সেটিই দেখা গেল। ম্যাচের প্রথম বাঁশি থেকেই লাইপজিগের খেলায় যেন আত্মবিশ্বাস ছলকে পড়ছিল। সুন্দর পাসিং ফুটবল, হার্ড প্রেসের মাধ্যমে প্রথমার্ধ জুড়েই বেশ ভুগিয়েছে লাইপজিগ। এরপর ধীরে ধীরে লাইপজিগের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে শুরু করে অ্যাটলেটিকো। কিন্তু দলটির মধ্যমাঠের সঙ্গে আক্রমণভাগের সংযোগ হচ্ছিল না বলেলেই চলে। প্রথমার্ধের প্রায় পুরোটা সময় নিজেদের ছায়া হয়েই থেকেছেন অ্যাটলেটিকোর দুই ফরোয়ার্ড ডিয়েগো কস্তা এবং মার্কোস ইয়োরেন্তে। তবে এক্ষেত্রে লাইপজিগের ২১ বছর বয়সী সেন্টারব্যাক দায়োত উপামেকানোকেও কৃতিত্ব দিতে হবে। দুই ফরোয়ার্ডকে অনেকটা একাই সামলেছেন তিনি, সঙ্গে কখনও উপরে উঠে দলকে আক্রমণেও সাহায্য করেছেন তিনি। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে ইয়ান অবলাক বরাবর হেড না করলে গোলও পেয়ে যেতে পারতেন উপামেকানো।

অবশ্য ম্যাচের ১৩ মিনিটে এই অর্ধে গোলের সেরা সুযোগটি পেয়েছিল অ্যাটলেটিকো। বাম প্রান্ত দিয়ে রেনান লোদি এবং ইয়ানিক কারাসকো ওয়ান-টু খেলে লাইপজিগ বক্সের ভেতর চলে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে কারাসকোর জোরালো শট ডান দিকে ঝাঁপিয়ে ঠেকিয়ে দেন লাইপজিগের হাঙ্গেরিয়ান গোলরক্ষক পিটার গুলাকসি।

প্রথমার্ধে বারবার ফাইনাল থার্ডে গিয়ে লাইপজিগের আক্রমণ বিনষ্ট হলেও দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই সেই গেরো খুলতে সক্ষম হয় তারা। বাম প্রান্ত থেকে মার্সেল সাবিতজারের দারুণ ক্রসে মাথা ছুঁইয়ে বল অ্যাটলেটিকোর জালে পাঠিয়ে দেন লাইপজিগের স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড ওলমো। ১৮ পাসের গোল খাওয়ার পর শেষ ১৮ ম্যাচে অপরাজিত অ্যাটলেটিকো এরপর কিছুটা নড়েচড়ে ওঠে। ৫৫ মিনিটে মিডফিল্ডার হেক্টর হেরেরাকে উঠিয়ে ফেলিক্সকে মাঠে নামান সিমিওনে। ফেলিক্স মাঠে আসার পরই অ্যাটলেটিকোর আক্রমণে ধার বাড়ে।

তিনিই ৬৯ মিনিটে পেনাল্টি আদায় করে নেন। বল নিয়ে ফেলিক্স একা বক্সের ভেতর ঢুঁকে যাওয়ার পরই তাঁকে পেছন থেকে ট্যাকল করেন লুকাস ক্লস্টারম্যান। রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজাতে মোটেও বিলম্ব করেননি। স্পটকিক থেকে গোল করে অ্যাটলেটিকোকে ম্যাচে ফিরিয়ে এনেছিলেন ফেলিক্স নিজেই। এরপর আক্রমণ আরও শাণিত করতে কস্তাকে উঠিয়ে চলতি মৌসুমে দলটির টপ স্কোরার আলভারো মোরাতাকে মাঠে নামান সিমিওনে।

তবে আক্রমণে ধার বাড়লেও লাইপজিগের গোলমুখ আর উন্মুক্ত করতে পারছিল না অ্যাটলেটিকো। তবে ম্যাচের ৮৮ মিনিটে সেই কাজটিই করে দেখিয়েছে লাইপজিগ। মধ্যমাঠ থেকে সাবিতজার বুটের বাইরের দিক দিয়ে করা পাসে বাম পাশ দিয়ে অ্যাঞ্জেলিনোকে উন্মুক্ত করে দেন। বল নিয়ে এরপর সামনে কিছুটা দৌড়ে গিয়ে অ্যাডামসের উদ্দেশ্যে মাপা কাটব্যাক করেন তিনি। বক্সের বাইরে থেকেই অ্যাডামসের জোরালো শট অ্যাটলেটিকো ডিফেন্ডার স্টেফান সাভিচের গায়ে লেগে জালে জড়িয়ে যায়। অ্যাটলেটিকো গোলরক্ষক অবলাকের চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না তখন।

সেমিফাইনালে ফ্রেঞ্চ চ্যাম্পিয়ন পিএসজির বিপক্ষে খেলবে লাইপজিগ। সর্বোপরি নতুন ফাইনালিস্ট পেতে যাচ্ছে এবারের চ্যাম্পিয়নস লিগ, কে জানে হয়ত নতুন চ্যাম্পিয়নও!

-প্যাভিলিয়ন।