লিটনকে নিয়ে আরও নোংরামি করুন!

প্রকাশিত: ৯:৩৩ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০১৮ | আপডেট: ৯:৩৩:অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০১৮

জাদেজার বলটাকে স্কয়ার দিয়ে সীমানাছাড়া করলেন তিনি, স্কোরবোর্ডে তার নামের পাশে তখন জ্বলজ্বল করছে ৫২টা রান। ক্যারিয়ারের প্রথম ওয়ানডে হাফসেঞ্চুরী এটা, এই অর্ধশতকের পেছনে কতটা কষ্ট আর বেদনা জমে আছে, সেটা লিটন দাসই জানেন। ড্রেসিংরুমের দিকে তাকিয়ে মুষ্টিবদ্ধ হাতটা বুকের ওপর এনে কিছু একটা ইঙ্গিত করলেন লিটন, সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন মাশরাফি বিন মুর্তজা। হয়তো অধিনায়ককে একটা ধন্যবাদ দিতে চাইলেন লিটন, তার ওপর ভরসা রাখার জন্যে! লিটনের আজকের ইনিংসটায় তার নিজের যতোটা অবদান, মাশরাফির অবদান কি তারচেয়ে কম?

লিটনের বার্তাটা মাশরাফি পেয়েছিলেন সঙ্গে সঙ্গেই। তিনিও বুক চাপড়ে প্রতিউত্তর দিয়েছেন, সঙ্গে হাতের ইশারায় এটাও জানিয়েছেন, ‘কাজ শেষ হয়নি এখনও। ইনিংস লম্বা কর, দলের সংগ্রহ বাড়াতে থাক।’ লিটন অধিনায়কের কথাটা শুনেছেন। নিজের সংগ্রহ বাড়িয়েছেন বলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে, সেইসঙ্গে সমৃদ্ধ হয়েছে দলের ইনিংসও। সঙ্গীরা একে একে ফিরে গিয়েছেন প্যাভিলিয়নে, লিটন টিকে ছিলেন। রানের চাকা গড়িয়েছে তার হাত ধরে। ক্যারিয়ারের প্রথম হাফসেঞ্চুরী পাবার দিনে তিন অঙ্কের ম্যাজিক্যাল ফিগারটাও স্পর্শ করেছেন তিনি। আজকের দিনটা তো লিটন দাসের!

অথচ আগের ম্যাচগুলোর টানা ব্যর্থতায় লিটনকে কম কথা শুনতে হয়নি। এশিয়া কাপের একটা ইনিংসে ৪১ রান করেছিলেন আফগানিস্তানের বিপক্ষে। বাকি চারটা ইনিংসে একবারও দুই অঙ্ক ছুঁতে পারেননি তিনি। আউট হবার ধরণগুলোও ছিল দৃষ্টিকটু। লিটনের সমালোচনা করাই যায়, তার ব্যাটিং অ্যাপ্রোচ কিংবা দায়িত্বজ্ঞান নিয়েও প্রশ্ন তোলা যায়। আমরা সেটা তুলেছিও। ইনিংসের শুরু থেকেই কেন বলের মেরিট বিবেচনা না করে শট খেলতে হবে, কেন শর্ট বলে পুল করার লোভ তিনি সামলাতে পারবেন না, এসব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্ত লিটনের বাজে ফর্মের সুযোগ নিয়ে প্রচুর মানুষ যেটা করেছে, সেটা হচ্ছে ভয়াবহ রকমের নিন্দা, করেছেন নোংরামি। গঠনমূলক সমালোচনা আর নিন্দা যে এক জিনিস নয়, সেটা আমাদের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষই বোঝে না।

লিটনের সবচেয়ে বড় অপরাধ এটা নয় যে তিনি রান পাচ্ছিলেন না। একজন ব্যাটসম্যানের বাজে সময় যেতেই পারে, তিনি ভুল করতেই পারেন। তবে লিটনের অপরাধ ছিল, তিনি হিন্দু ধর্মাবলম্বী। এর আগে সৌম্য সরকারের বেলায় যেমন অনেকদিন ধরে বলা হয়েছে, সৌম্য ‘মালু’ কোটায় দলে খেলেন, সেই একই কথাটা একই ব্যক্তিরা বলেছে লিটনকে নিয়েও। হয়তো এসব কথা গায়ে লাগানো উচিত নয়, দুয়েকজন এসব বলে বেড়ালে গায়ে লাগতোও না, কানেও তুলতাম না। কিন্ত যখন আশেপাশে একশো জন মানুষ এসব বলেছে, আরও এক হাজার মানুষ সেসব কথায় হেসে গড়িয়ে পড়েছে, কিংবা মৃদু সায় জানিয়েছে, তখন বুঝেছি তারা ঘৃণার চাষবাস করতে নেমেছে। তাদের সমস্যা লিটনের বাজে ফর্মে নয়, তাদের সমস্যাটা লিটনের ধর্ম নিয়ে।

বাংলাদেশ, এশিয়া কাপ, টপ অর্ডার, ব্যাটিং ব্যর্থতা, লিটন দাস

লিটনের আরেকটা দোষ, তার নাম লিটন। সিনেমার জনপ্রিয় একটা সংলাপ দিয়ে দিনের পর দিন তাকে নিয়ে ব্যাঙ্গ করা হয়েছে, এখনও হচ্ছে, আমরা জানি, ভবিষ্যতেও হবে। দিনের পর দিন লিটনকে ‘ফ্ল্যাট ব্যবসায়ী’ বানানো হয়েছে, তিনি ব্যাটিঙে খারাপ করলেই সেসব নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রল নামের নোংরামি করা হয়েছে। হাসিঠাট্টা বলে এগুলোর কথা পাশ কাটিয়ে যেতে চাইলেও, শেষমেশ ঠিকই আমাদের মন খারাপ হয়েছে এগুলো দেখে। জাতীয় দলের একজন খেলোয়াড়কে নিয়ে এই নোংরামিগুলো হাসিঠাট্টার পর্যায়ে পড়ে না, কোনভাবেই না।

তাকে নিয়ে করা এই নোংরামিগুলো লিটনের চোখে কখনও পড়েছিল কিনা আমরা জানি না। হয়তো পড়েছিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তো এখন সবাই ব্যবহার করেন, ক্রিকেটারেরাও এর বাইরে নন। আজ লিটনের ইনিংসটা দেখে সবাই প্রশংসার বৃষ্টিতে ভাসাচ্ছেন, তালি দিচ্ছেন, বাহবা করছেন, ‘লিটনের ফ্ল্যাট’ বলে নোংরামি করা মানুষগুলোও হাসিমুখে এই দলে যোগ দিয়েছেন, সবাই আজ লিটনের ভক্ত হয়ে গেছেন! একটা সেঞ্চুরি কিভাবে চারপাশটা বদলে দিতে পারে, সেটা হয়তো লিটনের এই ইনিংসটা দেখেই বোঝা যায়।

লিটন দাস, এশিয়া কাপ, লিটনের ফ্ল্যাট, মাল্লু কোটা, লিটনের সেঞ্চুরি

অথচ কি অসীম চাপ মাথায় নিয়ে লিটন আজ নেমেছিলেন, সেটা অনেকেই জানেন না। বাজে ফর্ম, তাকে নিয়ে এসব নিন্দা, কিংবা দল থেকে বাদ পড়ার শঙ্কা, সবকিছুই সঙ্গী ছিল তার। মনের যতো ক্ষোভ ছিল, সব আজ সমানে ঝেড়ে দিয়েছেন ভারতীয় বোলারদের ওপরে। টানা ব্যর্থতার ঝাল মিটিয়েছেন ইনিংসের শুরু থেকেই। দারুণ শট সিলেকশন, দুর্দান্ত টাইমিং, আর উত্তুঙ্গ আত্মবিশ্বাস- এই তিনের কম্বিনেশনে লিটন ছিলেন দুর্ধর্ষ। এই লিটনকেই তো বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে খুঁজে পাওয়া যায় প্রতিনিয়ত, এই লিটনকেই তো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আমরা খুঁজে ফিরেছি এতদিন!

দু’দিন আগেও লিটনকে নিয়ে আমরা কতজনে কত হতাশা প্রকাশ করেছিলাম, দল থেকে তাকে বাদ দেয়ার দাবী উঠেছিল। বিশেষ করে পাকিস্তানের বিপক্ষে উইকেটের পেছনে আসিফ আলির সহজ ক্যাচটা ছাড়ার পরে তার কত মুণ্ডুপাত হয়েছে, কতজনে তাকে শুলে চড়াতে চেয়েছে! সেই লিটন উইকেটের সামনে দাঁড়িয়ে বুকের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের বারুদ ভরে একটার পর একটা শট খেলে গেলেন, বোলার কে সেটার পরোয়া না করেই সীমানাছাড়া করছেন বলকে। বুমরা-চাহাল-ভূবনেশ্বর, কাউকেই ছেড়ে কথা বলেননি, ওয়ানডে র‍্যাঙ্কিঙের এক নম্বর বোলার বুমরা’কে তো দুই পয়সার পাত্তাও দেননি আজ! সবচেয়ে অবাক করার ব্যাপার, লিটন আজ ফাঁদে পা দেননি একদমই, লোভ সংবরন করে এড়িয়ে গিয়েছেন টোপ। ভালো বলকে প্রাপ্য সম্মানটাও তিনি দিয়েছেন আজ, যেটা পুরো টুর্নামেন্টেই অনুপস্থিত ছিল তার মধ্যে।

মিরাজের সঙ্গে উদ্বোধনী জুটিতে এসেছে ১২০ রান। এশিয়া কাপের ইতিহাসে বাংলাদেশের হয়ে এটা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জুটি। এরমধ্যে মিরাজের অবদান মাত্র ৩২। মিডল অর্ডার লিটনকে একটু সাহায্য করতে পারলে বাংলাদেশের স্কোরটা তিনশো ছুঁয়ে ফেলতো অনায়াসে। মুশফিক-রিয়াদ-মিঠুনদের ভুলে সেটা হয়নি। কিন্ত লিটন তার কাজে গাফেলতি করেননি একটুও। একপ্রান্ত আগলে রেখে তিনি টিকিয়ে রেখেছিলেন বাংলাদেশের সম্মানজনক স্কোরের আশা।

লিটন দাস, এশিয়া কাপ, লিটনের ফ্ল্যাট, মাল্লু কোটা, লিটনের সেঞ্চুরি

কূলদীপ যাদবের বলে স্ট্যাম্পড হয়ে ফিরে গেছেন প্যাভিলিয়নে, থার্ড আম্পায়ারের নেয়া সেই সিদ্ধান্তটা নিয়েও আছে সংশয়। লিটন যখন ড্রেসিংরুমের পথে হাঁটা ধরেছেন, দলের রান তখন ১৮৮, এরমধ্যে লিটনের একার সংগ্রহ ১২১! মাশরাফি লিটনের ওপর ভরসা রেখেছিলেন, আর লিটন রেখেছেন অধিনায়কের কথা। মাশরাফি ইঙ্গিত করেছিলেন ইনিংস বড় করার, সেই চাহিদাটা লিটন পূরণ করেছেন পুরোপুরি। আফসোস শুধু এটুকুই যে, অন্যপাশ থেকে লিটন একটু সাহায্য পেলে আরও কত কিছু হতে পারতো!

আমরা জানি, যারা লিটনকে নিয়ে নোংরামি করেন, তারা এই ইনিংসটার পরেও থামবেন না। লিটন ‘মাল্লু’ কোটায় খেলে কিংবা ‘লিটনের ফ্ল্যাট’ বলে নোংরামিটা চালিয়েই যাবেন। তাতে লিটনের কিছু আসবে যাবে না। সাময়িক একটা খারাপ লাগা কাজ করবে হয়তো, সেই খারাপ লাগাটা লিটন দূর করবেন বোলারদের এভাবে শাসন করে। আপনারা শুধু বুমরা-জাদব-ভূবনেশ্বরের বলে লিটনের দর্শনীয় শটগুলো দেখতে পান, আপনারা এটা দেখতে পান না যে, নিজের পারফরম্যান্স দিয়ে লিটন আসলে আপনাদের মুখেই ঝামা ঘষে দিচ্ছেন। তবে সেটা আপনাদের বোধগম্যের বাইরের বিষয়।