লেখক মুশতাকের মৃত্যু ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বাস্তবতা : শাহাজাদা এমরান

শাহজাদা এমরান শাহজাদা এমরান

কুমিল্লা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৫:১৪ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২১ | আপডেট: ৫:১৪:অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২১

শাহজাদা এমরান: দীর্ঘ আড়াই দশকের বেশী সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি,লেখক আর সাংবাদিকরা (কতিপয় মোসাহেব ছাড়া) কখনো কোন সরকারের আমলেই খুব একটা স্বস্তি পায়নি। প্রতিটা সরকারই মুক্তমনা,স্বাধীনচেতা লেখকদের প্রতিপক্ষ মনে করে । আবার বিরোধী দলে গেলে তাদের জন্য মায়া কান্না করে। আমরা সত্যিই এই দূর্ভাগ্যজনক নির্মম ধারাবাহিকতার অবসান চাই।

লেখক মুশতাক আমার কেউ নন,তার সাথে আমার কখনো পরিচয়ও ছিল না। কিন্তু তার এই মৃত্যুতে আমি আপনজন হারানোর ব্যাথা অনুভব করছি। কারণ, তিনি দেশের কোন স্বীকৃত চোর,ডাকাত কিংবা সন্ত্রাসী ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন কলম সৈনিক। শুধু মাত্র লেখার কারণে তাকে বর্তমান সরকার প্রবর্তিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করা হয়েছিল। শুধু মাত্র ভিন্নমত পোষন করে লেখার কারনে ! তিনি বার বার জামিন চেয়েছেন কিন্তু পান নি। যদিও দুষ্ট লোকেরা বলে অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসী ও হত্যা মামলার আসামীরা অনুকম্পা পেয়ে দিব্যি দেশ থেকে বাহিরে চলে যায়। লেখক মুশতাক কি অনুকম্পা পাওয়া ঐ সকল সন্ত্রাসীদের চেয়েও ভয়ংকর ছিল যে, তাকে জামিনেও দেয়া যায় নি। এগুলো কিন্তু আমাদের জন্য ভাল উদাহরণ হয়ে থাকতেছে না।

লেখক ও কাটুর্নিস্ট মুশতাক আহমেদ (৫৩) ২৫ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত সাড়ে আটটার দিকে গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে মৃত্যুবরন করেন।

কাশিমপুর কারা কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, মুশতাক আহমেদ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে কারাগারের ভেতর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ সময় তাঁকে কারা হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে তাঁকে তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করে। । নারায়ণগঞ্জ জেলার আড়াইহাজার উপজেলার ছোট বালাপুর এলাকায় তার বাড়ি। ঢাকার লালমাটিয়ায় স্ত্রী ও বৃদ্ধ মা-বাবার সঙ্গে থাকতেন। তিনি মা-বাবার একমাত্র ছেলে। বাংলাদেশে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে কুমির চাষের উদ্যোক্তা এই মুশতাক আহমেদ। ২০২০ সালের মে মাসে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে তাকে গ্রেফতার করে কারাবন্দী করা হয়। সেই থেকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি কারাবন্দী ছিলেন। জীবিত অবস্থায় পরিবারের পক্ষ থেকে বার বার জামিনের আবেদন করা হলেও তিনি জামিন পাননি ।

একটি পত্রিকায় প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী কমিটির মহাসচিব নূর খান লিটন বলেছেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে কারাবন্দী লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর তদন্ত হওয়া উচিত। যে আইনে মুশতাক আহমেদে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এবং যে আইনে তাঁকে কারাগারে রাখা হয়েছিল, একজন মানবাধিকারকর্মী হিসেবে বলতে পারি, এই আইনটি হয়রানিমূলক, কালো আইন, এর পরিবর্তন হওয়া উচিত।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধুর কণ্যা শেখ হাসিনার কাছে সবিনয়ে বলতে চাই,লেখক মুশতাক সাহেব হয়তো আর ফিরে আসবে না। তার জমিনও আর প্রয়োজন হবে ন্ া। তিনি নিজেই বৃহস্পতিবার জীবন থেকে জামিন নিয়ে চলে গেছেন। তার মৃত্যু নিয়ে অনেকের সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। দেশের সচেতন মহল তার এই মৃত্যুকে ভিন্ন চোখে দেখছে। দেশের অভিভাবক হিসেবে আপনার উচিত সঠিক এবং বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত করে জনগনকে জানিয়ে দেওয়া, সত্যিকার ভাবে কি কারণে লেখক মুশতাকের মৃত্যু হয়েছে। কোন অতিউৎসাহী মোসাহেবী কর্মকর্তার অপরাধের দায় কেন আপনাকে বহন করতে হবে ?

মুশতাকের মৃত্যুর সঠিক তদন্ত ও একই আইনে গ্রেফতার কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোরের দ্রুত মুক্তি চেয়ে সরকার প্রধানকে আবারো বিনয়ের সাথে বলতে চাই,অনেক হয়েছে, এবার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করে আমাদের মুক্ত করেন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন মুক্ত সাংবাদিকতার জন্যও এক বিশাল হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে । আমরা লিখতে চাই,বলতে চাই খোলা মনে এবং মুক্ত বিহঙ্গের ন্যায়।তবে দেশের স্বার্থ সমুন্নত রেখেই। আর যেন লেখক মুশতাকের মত কাউকে এভাবে চলে যেতে না হয় সেই প্রত্যাশা করাটাকি খুব বেশী চাওয়া হয়ে গেল না তো ?

লেখক : ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ,দৈনিক আমাদের কুমিল্লা ও সাধারণ সম্পাদক,বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি কুমিল্লা জেলা।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ টুডে এবং বাংলাদেশ টুডে-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)