শরীরের বাড়তি ওজন নিয়ে কোভিড-১৯-এ ভয় কতটা?

প্রকাশিত: ১০:২১ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২৯, ২০২০ | আপডেট: ১০:২১:অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২৯, ২০২০

ডায়াবেটিস, হার্টের অসুখ কিংবা বেশি বয়সের পাশাপাশি বাড়তি ওজন কোভিড-১৯-এর এক অন্যতম রিস্ক ফ্যাক্টর। তাই করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে ওজন ঠিক রাখারই পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।

করোনাভাইরাস আটকাতে মাসাধিক কাল বেশির ভাগ মানুষ বাড়ি থেকে বেরতে পারছেন না। আবার বাড়িতে থাকলে খাবার ইচ্ছেও বেড়ে যায়। মনের চাপ বাড়লে বেড়ে যায় স্ট্রেস ইটিং। ফলে মেদও বাড়তে থাকে। ফলে কোভিড-১৯-এর সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ে।

বিজ্ঞানীদের মতে, ওজন বাড়ার সঙ্গে যদি ডায়াবেটিস-হাই প্রেশার বা হাই কোলেস্টেরল-ট্রাইগ্লিসারাইডের মধ্যে এক বা একাধিক অসুখ থাকে, তা হলে শরীরে প্রদাহের প্রবণতা বেড়ে যায়, দুর্বল হয় শরীরের রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থা। বাড়ে যে কোনও সংক্রমণের শঙ্কা ও জটিলতা। ‘সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রল অ্যান্ড প্রিভেনশন’-এর তরফ থেকে জানানো হয়েছে, যাঁদের ওজন খুব বেশি থাকে, বিএমআই প্রায় ৪০-এর কাছাকাছি বা বেশি, তাঁদের বেশির ভাগের মধ্যেই মেটাবলিক সিনড্রোম থাকে বলে কোভিড ১৯ হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। জটিলতার আশঙ্কাও থাকে অনেক বেশি।

বাড়তি ওজনে কেন ভয়?

• প্রয়োজনের অতিরক্ত মেদ জমলে মেটাবলিক সিনড্রোমের আদর্শ পরিবেশ তৈরি হয়। অর্থাৎ রক্তচাপ বাড়ে, প্যাংক্রিয়াসের কাজ করার ক্ষমতা এলোমেলো হয়ে যায়, রক্তে চর্বি ভেসে বেড়ায়।

• বাড়তি ওজন ফুসফুসের উপরে চাপ সৃষ্টি করে। বিশেষ করে পেটের মেদ বাড়লে মধ্যচ্ছদায় চাপ পড়ে ফুসফুস কিছুটা সঙ্কুচিত হয়ে থাকে। এই কারণে শ্বাস টানার সময় ফুসফুস সম্পূর্ণ ভাবে প্রসারিত হতে পারে না। ফলস্বরূপ এক দিকে শরীরে সব সময়ই অক্সিজেনের পরিমাণ কম থাকে। অন্য দিকে ফুসফুস কিছুটা কমজোরি হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে শ্বাসনালীও কিছুটা সঙ্কুচিত হয়ে থাকে। সব মিলিয়ে কোভিড-১৯ সংক্রমণের জন্যে শরীর একেবারে তৈরি।

• ওজন বেশি হলে শরীরের কিছু হরমোনের তারতম্যের সম্ভাবনা থাকে। এর ফলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা  কমে যেতে পারে। ফলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।

• স্বাভাবিকের থেকে বেশি ওজন হলে এম্বোলাইজেশনের সম্ভাবনা স্বাভাবিক ওজনের মানুষদের থেকে অনেক বেড়ে যায়। এম্বোলাইজেশনের অর্থ রক্তে ভেসে বেড়ানো চর্বির ডেলা কোনও ধমনীতে আটকে যাওয়া। তাই কোনও ভাবে কোভিড-১৯ আক্রান্ত হলে তাঁদের দ্রুত অবস্থার অবনতি হবার ঝুঁকি থাকে।

• ওজন বেশি হলে যে কোনও সংক্রমণ হলে বাড়াবাড়ি রকমের সাইটোকাইন স্ট্রম শুরু হয়। আমাদের শরীরের পাহারাদার শ্বেত রক্তকণিকা সংক্রমণ তাড়াতে গিয়ে সাইটোকাইন নিঃসরণ করে। ওবেসিটি থাকলে চর্বিতে বাধা পেয়ে এই নিঃসরণ শরীরের মধ্যে সাইটোকাইন ঝড় সৃষ্টি করে। এতে রোগীর অবস্থা দ্রুত গুরুতর হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

ওবেসিটি ও করোনা নিয়ে সমীক্ষা

মেরিল্যান্ডের ‘ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন’ (এনসিবিআই) জানিয়েছে, ফ্রান্সের ১২৪ জন করোনাভাইরাস আক্রান্তকে নিয়ে সমীক্ষা করে দেখা গিয়েছে, এদের মধ্যে যে ৮৫ জনকে ভেন্টিলেটরে রাখতে হয়েছিল, তাঁদের ৬৩ শতাংশই ওবেসিটির শিকার।

গুজরাতের বরোদায় ১৫ এপ্রিল ৩১ বছর বয়সী এক যুবক কোভিড-১৯ নিয়ে ভর্তি হন। ১১১ কেজি ওজনের সেই যুবক কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রবল শ্বাসকষ্টের শিকার হওয়ায় তাঁকে ভেন্টিলেটরে দেওয়া হয়। কিন্তু পরের দিনই তিনি মারা যান। চিকিৎসকদের দাবি, ওবেসিটির শিকার না হলে ওই যুবককে করোনার সামনে এতটা অসহায় আত্মসমর্পন করতে হত না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বেসাল মেটাবলিক রেট বা বিএমআই ৪০-এর বেশি হলে কোভিড-১৯ এর সংক্রমণে মৃত্যুর হার স্বাভাবিক ওজনের মানুষের তুলনায় প্রায় ৩ গুণ (২.৯ গুণ) বেশি।

বাড়তি ওজনের মানুষরা কী করে সাবধান হবেন?

• লকডাউন মেনে চলতে হবে একশো শতাংশ। কোনও মতেই বাড়ির বাইরে যাবেন না। বারে বারে সাবান দিয়ে হাত ধোওয়া উচিত। বাইরে একান্তই এক-আধ বার বেরলে মাস্ক পরুন অবশ্যই।

• দিনে দু’বার মডারেট এক্সারসাইজ করে ক্যালোরি ঝরিয়ে ফেলার চেষ্টা করুন। বিশেষ করে কোমর ও পেটের মেদ কমাতে যোগাসন ও ব্যায়াম করতে হবে।

• ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বাড়াতে নিয়ম করে ব্রিদিং এক্সারসাইজ করতে হবে। আধ ঘণ্টা প্রাণায়াম-সহ অন্যান্য ব্রিদিং এক্সারসাইজ করুন।

• লেবু জাতীয় ফল, শাকসব্জি-সহ লো ক্যালোরি ডায়েট করুন। কার্বোহাইড্রেট ও ভাজা খাবার না খেলেই ভাল।

• থাইরয়েডের সমস্যা, হাই ব্লাড প্রেশার বা ডায়াবেটিস থাকলে অবশ্যই ওষুধের সাহায্যে নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।

• ঠান্ডা লাগাবেন না, কনকনে ঠাণ্ডা ঘরে থাকবেন না। দরজা-জানলা খুলে ঘরে আলো-বাতাস চলাচল করার দিকে নজর রাখুন।

• ভিটামিন সি ও ভিটামিন ডি-যুক্ত খাবার এবং সাপ্লিমেন্ট খেতে হবে।