শিক্ষার্থীদের ‘পতিতা-হকার’ বলা কর্মচারী বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড়, নীরব বেরোবি প্রশাসন

প্রকাশিত: ৫:৫৬ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৭, ২০২০ | আপডেট: ৫:৫৬:অপরাহ্ণ, জুলাই ২৭, ২০২০
সংগৃহীত

নাহিদুজ্জামান নাহিদ, বেরোবি প্রতিনিধি: বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) বর্তমান ভিসির আমলে সদ্য নিয়োগ পাওয়া এক কর্মচারি তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে সংবাদমাধ্যম, সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে “পতিতা, চাটুকার, কুলাঙ্গার, হকার ” লিখে বিকৃত ও আপত্তিকর মন্তব্য করে স্ট্যাটাস দেয়ায় সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এই কর্মচারীর নাম খোরশেদ আলম। তিনি করোনাকালীন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের ব্যক্তিগত সহকারি (পিএ) নিয়োগ পেয়েছেন। গত শুক্রবার রাতে এই কর্মচারী বিশ্ববিদ্যালয়ের চার সাংবাদিককে নিয়ে বাজে মন্তব্য করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলে শিক্ষার্থীরা এ ব্যাপারে চরম সমালোচনা করেন। এরপরই ওই কর্মচারি সংবাদমাধ্যম, সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে “পতিতা, চাটুকার, কুলাঙ্গার, হকার ” লিখে বিকৃত ও আপত্তিকর মন্তব্য করে স্ট্যাটাস দেয়।
কর্মচারীর এমন মন্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন মহলে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করছে। পাশাপাশি সেই কর্মচারীর স্থায়ী বহিষ্কারের দাবি উঠেছে।

এঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতিসহ দেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ সাংবাদিক সঙ্গগঠনগুলো তীব্র নিন্দা জানিয়ে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন। পাশাপাশি সাংবাদিক সমিতিসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সংগঠন এই কর্মচারীকে বয়কট করেছে। এদিকে সেই কর্মচারী আপত্তিকর, মানহানিকর মন্তব্য করায় বিচারের দাবিতে সাংবাদিক সমিতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে অভিযোগ দিয়েছে।

অন্যদিকে সারাদেশে সমালোচনার ঝড় উঠলেও নীরব ভূমিকায় রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলছেন কর্মচারীর করা এরকম অশালীন ও মানহানিকর বক্তব্য প্রদান করায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে দেশবাসীর কাছে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়েছে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী বায়েজিদ আহমেদ বলেন, “শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী সকলেই শিক্ষা ও গবেষণা সহায়ক। যেখানে শিক্ষক কর্তৃক শিক্ষার্থীদের যথাযথা সম্মান করা হয়। সেখানে একজন ৩য় শ্রেণীর কর্মচারী শিক্ষার্থীদের কুলাঙ্গার, হকার গালমন্দ করা যা সম্পূর্ণ অনৈতিক এবং উদ্দেশ্য প্রনোদিত। যিনি শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করতে পারে না শিক্ষার্থীদেও কাছেও তার প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে গেছে। তাই অনতিবিলম্বে শিক্ষার্থী অবমাননার কারণে তাকে ক্যাম্পাস থেকে বহিষ্কার করে ক্যাম্পাসের মান সম্মান বজায় রাখার জোর দাবি করছি।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল শাখার ছাত্রলীগ সভাপতি পোমেল বড়ূয়া বলেন, “আঞ্চলিকের সুযোগ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য নিয়োগ পেয়ে এখনও কর্মস্থলেই আসেননি , অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন তিনি। তার বিরুদ্ধে প্রশাসন ব্যবস্থা না নিলে আমরা তাকে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে দিবো না। বিশ্ববিদ্যালয়ে তাকে অবাঞ্চিত ঘোষণা করা হোক।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি ড. তুহিন ওয়াদুদ তার ফেসবুকে লিখেছেন, “দয়া করে অথবা অনুগ্রহ করে অথবা এসব ছাড়াই-কেউ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় এর শিক্ষার্থীদের সম্পর্কে অহেতুক এমন কোন মন্তব্য করবেন না যাতে তাদের হেয় প্রতিপন্ন করা হয়। এ বিশ্ববিদ্যালয় কারো চাকরি করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি। শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা গবেষণার জন্য হয়েছে। আমরা কেউ বিসিএস এর চাকরি ছেড়ে কেউ আরও উচ্চতর চাকরি ছেড়ে, কেউ অনেক সম্ভাবনাময় ভবিষ্যত ছেড়ে এখানে এসেছি। কেউ এসেছি শিক্ষকতা করতে, কেউ বা কেবলি জীবিকার কথা ভেবে । এখানে অনেক শিক্ষক আছেন যারা বিদেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ নিয়ে এসেছেন। আমরা সকলে না চাইলেও অনেকেই শিক্ষার্থীদের উন্নত শিক্ষা দিতে চান। নিজেদের সম্মান এবং অপরের সম্মান উভয়ই বজায় থাকুক।”

শিক্ষক সমিতির কার্যকরী সদস্য ড. বিজন মোহন চাকী লিখেছেন, “পছন্দ করুক আর নাই করুক, ভালোবাসুক আর নাই বাসুক, প্রশংসা করুক অথবা সমালোচনা করুক – আমার শিক্ষার্থী আমার অহংকার, আমার গর্ব, আমার আশা। বেরোবির শিক্ষার্থীদের নিয়ে মানহানিকর ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যকারী এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকদের শাস্তির দাবি করছি।”

একাউন্টিং এন্ড ইনফরমেশন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক উমর ফারুক লিখেছেন, “একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাণ হলো শিক্ষার্থী। পাঠদানের প্রয়োজনে শিক্ষক। তারপর পুরো কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে সহায়ক সেবা। নির্মম সত্য হলো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল শিক্ষার্থীদের। আমি আবার বলছি, কেবল শিক্ষার্থীদের। অন্যরা সবাই এখানে চাকুরে। শুধুই চাকুরে। শিক্ষার্থীরা তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। লোভ দেখিয়ে কখনো কখনো কেবল চাকুরেদের কেনা যায়, কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে কখনও কোনো শিক্ষার্থীকে কেনা যায়নি। যাবেও না। তারা সবসময় সত্যের পক্ষে। সুন্দরের পক্ষে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষে। প্রণতি পৃথিবীর সকল শিক্ষার্থীর প্রতি। সবসময়।”

এ ব্যাপারে ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা দপ্তরের পরিচালক ড. নুর আলম সিদ্দিক বলেন, শিক্ষার্থীদেরকে এভাবে বলা কথা সমীচীন নয়। যদি সেই কর্মচারী এসব বলে থাকেন অবশ্যই প্রশাসনের যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া উচিত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহকে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।