শিক্ষার্থীদের বাণিজ্যিক ব্যবহার বনাম ছাত্র রাজনীতি

প্রকাশিত: 9:59 PM, November 10, 2019 | আপডেট: 10:01:PM, November 10, 2019

উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোতে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দলগুলো খাদ্য,বস্ত্র,বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার উন্নয়ন নিয়ে যেমন ক্রিয়াশীল থাকে তেমনি ক্রিয়াশীল থাকে বিভিন্ন এনজিওসহ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও। এক্ষেত্রে বিভিন্ন সংগঠন জনগণের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত হয়ে সার্বিক আর্থ-সামাজিক মানোন্নয়নের চেষ্টা করে।

এই চেষ্টা ইতিবাচক তবে এই চেষ্টার পরিবর্তে কোনো প্রতিষ্ঠান যখন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চক্রান্তে লিপ্ত হয় বা রাষ্ট্রের জনগণের বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু করে তখন সেই প্রতিষ্ঠানকে বাধ্যতামূলক নজরদারির আওতায় এনে লাগাম না দিলে পরিনতি ভয়াবহ হওয়াটাই বাস্তবতা।

সাম্প্রতি সময়ে বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদের মৃত্যুর পর কথা উঠেছিলো ছাত্ররাজনীতির নেতিবাচক দিক নিয়ে,অনেকে নিষিদ্ধের প্রস্তাব দিয়ে বসেছেন সুযোগে। ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের এই প্রস্তাব আসলে ছাত্রলীগের রাজনীতি বন্ধের মনোবাসনা থেকে নাকি রাষ্ট্রের কল্যাণে তা অবশ্য পরিষ্কার না!
বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির জন্মের ইতিহাসের সাথে বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে।

তবে এই ছাত্ররাজনীতি বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে কতটুকু ইতিবাচক বা নেতিবাচক সেটি বিশ্লেষণ করে ছাত্ররাজনীতিকে কীভাবে সর্বোচ্চ ইতিবাচক ভাবে কাজে লাগানো যায় সে পরামর্শ থাকতেই পারে।এই রাষ্ট্রের তরুণ প্রজন্মের বড় একটি অংশ সংঘবদ্ধভাবে ছাত্ররাজনীতির সাথে জড়িত,সংঘবদ্ধ এই গোষ্ঠীকে ইতিবাচক কাজে লাগালে রাষ্ট্রের আগামীদিনের প্রতিচ্ছবি হবে আলোকোজ্জ্বল।

গত পহেলা নভেম্বর প্রথম আলোর সাময়িকী কিশোর আলোর “কি আনন্দ” শিরোনামে অনুষ্ঠান চলাকালে ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল এন্ড কলেজের ছাত্র নাঈমুল আবরার রাহাত বিদ্যুতায়িত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে এবং মৃত্যুর পরবর্তী সময়ে অনুষ্ঠানস্থলটি যে দুর্ঘটনাপ্রবণ সে তথ্য কাউকেই জানানো হয়নি বরং শিশুটির মৃত্যুর পরও “কি আনন্দ শিরোনামের অনুষ্ঠানে কনসার্টের গানে গানে আনন্দে উচ্ছ¡সিত রেখেছে তার সহপাঠীদেরকে!

অভিযোগ উঠেছে শিশু শিক্ষার্থীটি বিদ্যুতায়িত হওয়ার পর তাকে নিকটস্থ হাসপাতালে না নিয়ে পূর্ব নির্ধারিত চুক্তির অযুহাতে ঘটনা নীরবে চাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে দূরবর্তী একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে!

শিক্ষার্থীদের নিয়ে অনুষ্ঠানের আয়োজন, সেই অনুষ্ঠানের দুর্ঘটনা এবং দুর্ঘটনা নীরবে চাপা দিয়ে অনুষ্ঠানের সফলতার পতাকা উড়ানো এগুলো কি কোনভাবে আগামী প্রজন্মের শিশুদের মানবিক হতে শেখায়! নাকি এতে স্পষ্টত বুঝতে কোথাও বাকি থাকে যে এই সব আয়োজন পুরাটাই বাণিজ্যিক এবং কোমলমতি এই শিক্ষার্থীরা বাণিজ্যিক পণ্য মাত্র।

বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, বিভিন্ন সংগঠন সৃষ্টি করে সংঘবদ্ধ হয়ে হাতে হাত রেখে রাষ্ট্রে কল্যাণে কাজ করানোর কথা বলে নিরলসভাবে মাথা ঘামায় বিভিন্ন এনজিও,সংবাদ মাধ্যম,সুশীল সমাজ। প্রথম আলো বন্ধু সভার কথা ধরলে, প্রথম আলো পত্রিকায় এই সংগঠনটির প্রচারণা দেখলে মনে হয় প্রথম আলো কোন রাজনৈতিক দল আর প্রথম আলো বন্ধুসভা তাদের ছাত্র-যুব সংগঠন। কিশোর আলো তাদের শিশু-কিশোর সংগঠন। এরকম বহু সংগঠন বৃক্ষরোপণ, কনসার্ট, রক্তদান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার উছিলায় সংঘবদ্ধ করছে তরুণদের। বৃক্ষরোপণ, রক্তদান, কনসার্ট বা এই পরিচ্ছন্নতা অভিযানের পেছনে রয়েছে দেশি বিদেশি এনজিও ও নানা সুশীল ব্যক্তিগণ।

যে সকল সুশীলগণ, বিশেষ ব্যক্তি বা সংবাদ মাধ্যম ছাত্র রাজনীতির বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লেগেছে, দীর্ঘদিন ধরে তারাই আবার ঐ সকল বৃক্ষরোপণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, রক্তদাতা সংগঠনের পৃষ্ঠপোষক। একদিকে তারা তরুণ প্রজন্মকে সংঘবদ্ধ করার জন্য প্রণোদনা দিচ্ছে শিশু কিশোর তরুণদেরকে বাণিজ্যিক ব্যবহার করে অন্যদিকে সংঘবদ্ধ ছাত্র সংগঠন নিষিদ্ধের জন্য প্রচারণা চালাচ্ছে।

ছাত্রসংগঠনের শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন বা বলতেই পারেন ছাত্র রাজনৈতিক সংগঠনের সব কর্মকাÐ সন্তোষজনক না। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের প্রগতিশীলতার
চর্চা করা যেকোন ছাত্রসংগঠন রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য কতটা ইতিবাচক তা আপনারা না মানলেও অবশ্যই অবগত। আপনাদের কথিত দেশপ্রেম সত্য হলে, ভাবুন তো ছাত্রলীগের মত এমন বৃহৎ ছাত্র সংগঠনকে যদি ভুল-ত্রুটি মুক্ত করে শুদ্ধতার চেষ্টা করার পরামর্শ দেন, মাথা ঘামান, প্রণোদনা দেন তাহলে আপনাদের অক্লান্ত পরিশ্রম করে প্রতিষ্ঠা করতে চাওয়া সংগঠনগুলোর চেয়ে কতটা ইতিবাচক হতে পারে! এই বিশাল তরুণ প্রজন্ম রাষ্ট্রটাকে নতুন করে বদলে দিতে পারে আপনাদের একটু ইতিবাচক মনোভাব থাকলেই।

আমাদের তরুণ প্রজন্ম নিয়ে আপনাদের মাথা ব্যাথা যে রাষ্ট্রের কল্যাণে বা মানবিক উদ্দেশ্যে না তা পুনরায় স্পষ্ট হল নাঈমুল আবরারে মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ঘটনায়। আপনাদের চিন্তাভাবনা যে একদিকে রাজনৈতিক চক্রান্তমূলক অন্যদিকে বাণিজ্যিক তা এখন ভীষণ পরিষ্কার।এমনকি নাঈমুল আবরার মৃত্যুর ঘটনায় অনেকের কলমেরই কালি নেই অথচ আবরার ফাহাদের মৃত্যুতে কালি অঝোরে ঝরেছে।

মূলত আপনাদের উদ্দেশ্যই হল ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করে ছাত্রলীগের মত প্রগতিশীলতার চর্চা করা অসা¤প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের তরুণ প্রজন্মের সংঘবদ্ধতা ভেঙে দিয়ে আপনাদের নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য নতুন করে তরুণ সংগঠন সৃষ্টি করে বাংলাদেশ নিয়ে খেলা করা!

যেখানে এই তরুণ প্রজন্ম আপনাদের কাছে বাণিজ্যিক পণ্য মাত্র। আর ছাত্ররাজনীতি করা সচেতন শিক্ষার্থীদের ভাবনার আকাশ প্রশন্ত হওয়ার তাদেরকে বাণিজ্যিক পণ্য বানানো অসম্ভব বলেই হয়তো আপনাদের ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবী প্রকট।কিন্তু এই চক্রান্তএখন সকলের কাছে পরিষ্কার হওয়ায় দাবী এসেছে ছাত্ররাজনীতি নয় বরং শিক্ষার্থীদের এই বাণিজ্যিক ব্যবহার বন্ধ হোক এবং অবিভাবকগণও ভাবুক,তাদের সন্তানদের জীবনের মূল্য তুচ্ছ করে তাদেকে অন্যের বাণিজ্যিক পণ্য করে তুলতে ‘কি আনন্দে’র মত অনুষ্ঠানে পাঠাবে কিনা!

লেখক : খন্দকার হাবীব আহসান
উপ-বিজ্ঞান বিষয়ক সম্পাদক বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ।


(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ টুডে এবং বাংলাদেশ টুডে-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)