শেখ হাসিনার শতকরা ৬৬ ভাগ জনপ্রিয়তা ও একটি অশনি সংকেত

টিবিটি টিবিটি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ৮:৪৯ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৬, ২০১৮ | আপডেট: ৮:৪৯:পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৬, ২০১৮

শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা শতকরা ৬৬ ভাগ। যদিও এসব জরিপের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। বলা হয়ে থাকে, মিথ্যা তিন রকম- মিথ্যা, ডাহা মিথ্যা এবং পরিসংখ্যান! পরিসংখ্যান বা জরিপ পদ্ধতিগত কারণেই সব সময় সঠিক তথ্য প্রকাশ করে না, আবার টার্গেট পিপল সচেতনভাবে বেছে নিয়ে জরিপের ফলাফল নিজের পছন্দমত তৈরি করা সম্ভব।

এসব সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েই সারা বিশ্বে পরিসংখ্যান বা জরিপকে গুরুত্ব দেয়া হয় কারণ এর মাধ্যমে একেবারে সঠিকটা না হলেও, মোটামুটি একটা চিত্র পাওয়া যায়।

জরিপ বাদ দিয়ে এমনিতে চিন্তা করা যেতে পারে। এদেশে পলিটিক্স সব থেকে ভালো বোঝে টকশোজীবী বা ফেসবুকাররা না, আমজনতা। যারা নিজেরা সাধারণ মানুষ, যাদের কাজ কারবার সাধারণ মানুষের সাথে।

কয়েকদিন আগে আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে টাউনহলে এক চায়ের দোকানের সামনে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম, প্রসঙ্গ – সমকালীন রাজনীতি ও আওয়ামীলীগ। আমাদের কথাবার্তা শুনে দোকানদার লোকটি কিছুক্ষণ পর বলে উঠলো- “এইযে রাস্তাঘাট ভালো হইছে, ব্রিজ কালভার্ট হইছে এতে মানুষের উপকার হইছে না? মানুষের ইনকাম বাড়ে নাই? কিন্তু আপনারা কন তো, যদি ফেয়ার ইলেকশন দেয় আওয়ামীলীগ কয়ডা সিটে জিততে পারবো? বেশি সিটে পারবো না। এত কাজ করনের পরও পারবো না। এইবার আপনারা বুইঝা লন।”

ব্যক্তি শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা আর আওয়ামীলীগের জনপ্রিয়তা এক জিনিস নয়। তবে শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তাই আওয়মীলীগকে এখনো টিকিয়ে রেখেছে। এতগুলো আন্দোলনের পরেও সরকারকে খুব বেশি সমস্যা ফেস করতে হয়নি তার কারণ ব্যক্তি শেখ হাসিনা।

তবে এভাবে একক ব্যক্তির উপর চূড়ান্ত নির্ভরতা ঐ ব্যক্তি, তার দল এবং দেশের জন্য ভালো কোন ব্যাপার নয়। এখন দেখা যাচ্ছে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সমস্যা হলেও সেখানে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করা হচ্ছে! এলাকার তুচ্ছ গণ্ডগোল থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত সব কিছু সামলানো যেন একজন ব্যক্তিরই দায়িত্ব। তাহলে এত মন্ত্রী, এত জনপ্রতিনিধি, এত আওয়ামীলীগার- এদের কাজ কী?

সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাবলিতে সরকারের জনপ্রিয়তা নিম্নমুখী বলেই মনে হয়। একটা জেনারেশন আওয়ামীলীগের প্রতি এক ধরণের বিদ্বেষ নিয়ে বেড়ে উঠবে, যার দায় আওয়ামীলীগ কোন ভাবেই এড়াতে পারেনা।

ফলে অবস্থাটা এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে সরকারের প্রতিটা কথাই এখন ট্রল হয়, যেকোন অর্জনই হয় ঠাট্টার বিষয়। ভালো কাজ গুলোকেও মানুষ স্বাভাবিক ভাবে গ্রহণ করতে চায়না। মানুষ যখন স্বাভাবিক রাস্তায় তার রাগ ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারেনা, নিজেকে বদ্ধ- নিরুপায় মনে করে, তখন এভাবে ঠাট্টারছলে অস্বীকার করতে চায় তার সংশ্লিষ্ট সব কিছু।

উত্তরবঙ্গের মঙ্গার কথা এখনকার অনেকের জানার কথা নয়। ফলে তুলনাটা তারা করতে পারবে না। দু ঘন্টা লোডশেডিং এর পর এক ঘন্টার জন্য কারেন্ট আসায় এলাকাজুড়ে সবাই মিলে একসাথে চিৎকার করে ওঠার ব্যাপার গুলো এখনকার জেনারেশন বুঝবে না।

নিরবিচ্ছিন্ন, সেশনজটহীন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া এই জেনারেশন বুঝবে না আগে কিভাবে ক্যাম্পাসে অরাজকতার ফলে মাসের পর মাস ক্যাম্পাস বন্ধ থাকতো, কত ছাত্র নিহত হত, কেন ৪ বছরের কোর্স শেষ হতে ৭/৮ বছর লাগতো।

আগের সরকারের সময় দুবার ইনফরমেশন সুপার হাইওয়েতে যোগদানের সুযোগ এলেও ‘দেশের তথ্য বাইরে পাচার হয়ে যাবে’ – এই অযুহাতে সেখানে যোগ দেয়নি বাংলাদেশ, ফলে এই খাতে পিছিয়ে গিয়েছিলাম আমরা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায়।

এখনকার জেনারেশন ফেসবুক, ইউটিউব, হোয়াটস্যাপ আর সহজলভ্য ইন্টারনেটকে জন্মগত সুবিধা হিসেবেই ধরে নেবে এবং ‘এগুলো সরকার দিয়েছে’ বলাতে সেটা নিয়ে ট্রল করবে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে যে সরকার বিশাল পরিবর্তন নিয়ে এসেছে- তাদের কোন অবদান নেই বলে এক কথায় বাতিল করে দেবে।

সমস্যাটা হল কোন জিনিস পেয়ে গেলে, সেটাতে অভ্যস্ত হয়ে গেলে আমরা সেটার উপস্থিতি আলাদা ভাবে সনাক্ত করতে পারিনা। যদিও এসব উন্নয়ন আওয়ামীলীগ সরকারের দয়া নয় বরং তাদের দায়, তাদের কর্তব্য এবং জনগণের অধিকার কিন্তু বাংলাদেশে অবস্থাটা এমন ছিল যে কিছু না থাকাটাই, কিছু না করাটাই স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।

আমরা ধরেই নিয়েছিলাম- সরকারি অফিসার মানেই ঘুষখোর, কেউ ঘুষ না খেলে তিনি ব্যতিক্রম। কোন রাজনীতিবিদের সাদাসিধে জীবনযাপন করাটা পত্রিকার হেডলাইন। তেমনি সরকারের কাজ করাটাই আশ্চর্যের ঘটনা!

এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্যই ২০০৮ এর নির্বাচনে আওয়ামীলীগ এত বিপুল ভোটে জিতে এসেছিল। বিএনপির অবস্থা এমন হয়েছে, সেই দলের প্রধান নেতা জেলে গেলেও দেশের মানুষের সেটা নিয়ে খুব বেশি মাথাব্যথা নেই। সরকার বিরধোদলকে নিয়ে ন্যায় অন্যায় যাই করুক সাধারণ মানুষ তাতে খুব বেশি চিন্তিত হয়নি। কিন্তু সমস্যাটা হয়েছে, যখন সরকার সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেল।

সাধারণ মানুষকে শত্রু বানিয়ে লাভ নেই, ক্ষতি ছাড়া। সাম্প্রতিক সময়ের আন্দোলনগুলোতে এমন অনেকেই ছিল যারা এক সময় আওয়ামীলীগের পক্ষে শ্লোগান দিয়েছে। যারা মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুকে বুকে ধারণ করে। এই মানুষগুলোকে নিজেদের শত্রু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ফলাফল কখনো ভালো হবে না।

বাংলাদেশের জনগণের দুর্ভাগ্য যে এদেশে অন্তত দুটি দল নেই যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে নিজেদের দাবী করবে। এদেশে কার্যকর কোন বিরোধীদল নেই। বিরোধীদল হিসেবেও এদেশে সব থেকে ভালো দল ছিল আওয়ামীলীগ! ফলে এদেশের রাজনীতিতে মূলত দুটি ধারা বিদ্যমান- আওয়ামীলীগ আর এন্টি-আওয়ামীলীগ!

যারা পরিবর্তনের কথা বলে, যারা দ্বিদলীয় বৃত্তের বাইরে এসে নতুন স্বপ্ন দেখার আহবান জানায় তারা হয় ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারে আসা পুরানো ধান্দাবাজ অথবা রোমান্টিক ভাবধারার ইউটোপিয়ান রাজনীতি করে। এরা এখনো এমন কোন মডেল আমাদের সামনে উপস্থাপন করতে পারেনি যেটা দিয়ে আমরা তাদের বিশ্বাস করতে পারি। এরা ভালো বক্তা বা ভালো লেখক- তাই বক্তৃতায় তালি কিংবা লেখায় যতগুলো লাইক পাবে, ফেয়ার ইলেকশন হলে ততগুলো ভোটও পাবে না। কাজেই দিনশেষে আমরা নিরুপায়।

এ ধরণের একচ্ছত্রবাদ দলকে স্বৈরাচারের দিকে ধাবিত করে। দুনিয়ার সুযোগসন্ধানী, বাটপারেরা নিজেদের আখের গোছাতে দলে এসে যুক্ত হয়। নিজেদের খুব বড় ভক্ত হিসেবে প্রমাণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, করে রাজ্যের আয়োজন। ভুলভ্রান্তি নিয়ে যেহেতু কথাই বলা যায় না, ফলে ভুল ভ্রান্তিগুলোকে শুধরানোর সুযোগ তৈরি হয় না। এতে ধীরে ধীরে নিজেদের একধরণের মিথ্যে ইমেজ তৈরি হয়, মনে হয় সব কিছু ঠিকই আছে। কিন্তু হয়তো ভিতরে ভিতরে সব কিছু ঠিক নেই।

সংখ্যালঘুরা মার খাচ্ছে, মার খাচ্ছে পাহাড়ের মানুষগুলো, গুম হয়ে যাচ্ছে মানুষ, চুনোপুটিরাও ক্ষমতার দাপটে সৃষ্টি করছে অরাজকতা। যা এক সময় জনগণকে সরকারের শত্রু হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেয়।

বর্তমান বাস্তবতায়, অসংখ্য দোষত্রুটি থাকার পরেও, আওয়ামীলীগ ছাড়া বিশেষ করে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব ছাড়া দেশ চালানোর মত অন্য কেউ আছে বলে আমি মনে করি না। আমাদের এখনো দারিদ্র‍্য আছে কিন্তু তা আগের থেকে কম এবং কমানোর চেষ্টা আছে। এখন আমি আপনি আমরা কেউই তো আসলে সুবিধার না, তাই যখন আমি কন্ট্রাক্টর হই- আমি চুরি করি, যখন আমি মেম্বার হই- তখন চুরি করি, যখন অফিসার হই – তখন ফাইল আটকাই, যখন পুলিশ হই- তখন ঘুষ খাই, ফলে কোন পদক্ষেপই আগাতে পারে না ঠিকমত, আর যাবতীয় দায়ভার প্রধানের কাধেই বর্তায়।

আমরা যতটুকু দেখি সেটাই সবটুকু নয়। আমাদের ফেসবুকের গণ্ডির বাইরে বা আমাদের শহুরে আন্দোলনকারীদের বাইরেও দেশের বিরাট একটা অংশ রয়ে গেছে। তারা কিভাবে সব কিছু দেখছে, তারা কী ভাবছে সেটাও জানা গুরুত্বপূর্ণ।

আর আওয়ামীলীগ যদি নিজেদের মাত্রা কতটুকু সেটা বুঝতে না পারে, সময় মত লাগাম টেনে ধরতে না পারে তাহলে এই পাগলা ঘোড়া সবকিছু তছনছ করে ফেলবে। দেশকে এগিয়ে নিতে আওয়ামীলীগ নামক ঘোড়ার উপরেই এখনো দেশের অধিকাংশ মানুষ বাজি লাগাতে রাজি আছে, তাই সেই ঘোড়া যেন পাগল না হয়ে যায় সেদিকে আমরা দৃষ্টি দিতে অনুরোধ করি। ৬৬ ভাগ সমর্থন দেখে আত্মতৃপ্তিতে ভুগে কিংবা গোটা দশেক সংবর্ধনা দিয়ে এই ঘোড়াকে ট্র‍্যাকে ফেরানো যাবে না।
রেসের মাঠে আপনি একা মানেই যে আপনি রেস জিতবেন – তা কিন্তু না। জিততে হলে আপনাকে ট্র‍্যাকে থেকে ফিনিশিং লাইন ক্রস করতে হবে!