শ্যাম না কূল, কোনটা রাখবেন এরদোগান?

টিবিটি টিবিটি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ৬:৫২ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৮ | আপডেট: ৬:৫৩:অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৮

আষাঢ়ের আকাশ কেমন! এই কালো মেঘে ঢাকা। এই লাল রোদে ঝলঝল। আবার চোখের পলকেই ঝরঝর বৃষ্টিতে ভিজিয়ে দিয়ে যায় সবকিছু। সুলতান এরদোগানের আষাঢ় শব্দটার সঙ্গে পরিচয় থাকার কথা না। কিন্তু তার বর্তমান অবস্থাকে বোঝাতে আষাঢ়ের চেয়ে ভালো উপমা মাথায় আসছে না।

টানা ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রতাপশালী নেতা রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোগান এখন ঘরে বাইরে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন। সম্প্রতি সিরিয়ায় বিদ্রোহীদের শেষ অবস্থান ইদলিবে আসাদ-রুশ বাহিনীর যৌথ আক্রমণে নতুন সংকটের মুখোমুখি দেশটি।

সিরিয়ায় ২০১১ সালে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিদ্রোহীদের দখলে থাকা শেষ শহর হচ্ছে ইদলিব। তুরস্কের সীমান্তবর্তী এ শহর দখলে বাশার বাহিনী পূর্ণ সামরিক অভিযান চালালে তুরস্কের দিকে শরাণার্থীর ঢল নামবে। আবার বাশার বাহিনী বিদ্রোহীদের হটিয়ে শহরের দখল নিতে পারলে যুদ্ধটা চলে আসবে তুরস্কের ঘরে।

এমন অবস্থায় কী করবে তুরস্ক? আসাদ আল বাশারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে বিন্দুমাত্র চিন্তা করার কথা ছিল না এরদোগানের। কিন্তু এখানে রুশ বাহিনীর নেতৃত্বে অভিযান চালানো হচ্ছে, সঙ্গে আছে ইরান। ফলে বাশার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা মানে রুশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা।

গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নানা বিবাদে জড়িয়ে সম্পর্ক তলানিতে এসে থেমেছে তুরস্কের।

সম্প্রতি তুরস্কের ওপর অবরোধ আরোপ করলে দেশটির অর্থনীতিতে সংকট তৈরি হয়। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের আরেক ভুক্তভোগী রাশিয়া এসে পাশে দাঁড়ায় তুরস্কের। এখন রাশিয়ার বিরুদ্ধে সিরিয়ায় তুরস্ককে যুদ্ধ করতে হলে কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করবেন এরদোগান সেটাই হচ্ছে প্রশ্ন।

চলমান সংকটে তুরস্ক বেশ দায়িত্বশীলের পরিচয় দিয়েছে এ পর্যন্ত। তেহরানে অনুষ্ঠিত তিন নেতার সংলাপ অসফল হলেও তারা নানাভাবে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে সীমান্ত অঞ্চলে সামনিরক শক্তিও বাড়িয়ে তুলছে।

তুরস্ককে দেখে মনে হচ্ছে, তারা কূটনৈতিক পথেই সমাধান চায়। তবে পূর্ণ যুদ্ধে নামতে হলেই একাই তিন শক্তির (সিরিয়া-রাশিয়া-ইরান) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে তাদের। কথিত মিত্ররা তুরস্কের সঙ্গে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার চেয়ে রং দেখার পথটাই বেছে নেবেন বলে মনে হচ্ছে।

পররাষ্ট্রনীতিতে গত কয়েক বছর ধরে তুরস্কের শ্যাম রাখি না কূল রাখি অবস্থা।

এশিয়ার সঙ্গে ইউরোপ আর আফ্রিকার সঙ্গে এশিয়ার যোগাযোগর মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে দেশটি। ফলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরাজিত হয়ে পরাশক্তির তকমা হারালেও গুরুত্ব হারায়নি তুরস্ক।

ভৌগোলিক কারণেই তাদের ঐতিহাসিকভাবে একটি ভারসাম্যমূলক পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখতে দেখা যায়।

২০০৩ সালে এরদোগান যুগ শুরু হওয়ার পর দেশটিকে দেখা যায়, তার হারানো উসমানীয় খেলাফতের ঐতিহ্য তৎপর হতে। আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে নেওয়া তাদের কর্মসূচি ও উচ্চাভিলাষী পররাষ্ট্রনীতি থেকে বিষয়টি বুঝতে অসুবিধা হয় না। এসময় রাশিয়ার সঙ্গে ব্যাপক বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করে তুরস্ক। তবে পররাষ্ট্রনীতিতে থেকে যায় পশ্চিমা অনুসারী। আর একটু নির্দিষ্ট করে বললে, আমেরিকান ব্লকে।

তবে গত কয়েক বছরে এতেও পরিবর্তন এসেছে। এর একটা কারণ বোধহয় শত চেষ্টা করেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হতে না পারা। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বন্ধু হিসেবে আর ভরসা করতে পারছে না দেশটি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একক কৃর্তৃত্ব নিশ্চিৎ করতে সবকিছুই করেছে তারা। তবে প্রতিদানে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ।

১৯৭৪ সালে সাইপ্রাস প্রশ্নে গ্রিক-তুর্কি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র শুধু গ্রিসের পক্ষাবলম্বন করেই থেমে থাকেনি। তুরস্কের ওপর নানা অবরোধও আরোপ করে। সে ক্ষত বুকে নিয়েই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পথ চলতে চেয়েছে তারা। তবে কথিত আরব বিপ্লব ও তার পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ছলচাতুরিমূলক আচরণে বীতশ্রদ্ধ হয় তুর্কিরা।

মিশরে কট্টর ইসলামপন্থী সরকার ব্রাদারহুডকে সেনাবাহিনীর ক্ষমতাচ্যুত করার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি হাত ছিল বলে মনে করে সে দেশের জনগণ।

সিরিয়া যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তারা যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাসঘাতকের কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। পশ্চিমারা পেছন থেকে তালি দিয়ে তুরস্ককে সিরিয়া যুদ্ধে নামিয়েছিল। কিন্তু রাশিয়া বাশার সরকারের পক্ষ নিয়ে মাঠে নামলে পশ্চিমারা তুরস্ককে মাঠে একা ফেলে পালিয়ে যায়।আরবরা তুরস্ককে আছি আছি বললেও তারা সেই সংকটের সময় নাই হয়ে যায়। ফলে তুরস্ক তার পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়। যুক্তরাষ্ট্রকে পাশ কাটিয়ে রাশিয়া-ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করে। এতসব তিক্ততা নিয়েই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পথ চলতে চেয়েছিলেন এরদোগান। কিন্তু এটাও অসম্ভব হয়ে যায় ২০১৬ সালে ১৫ জুলাই তুরস্কে ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানের ঘটনায়।

যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের এরদোগান সরকারের পতন ঘটাতে সেনারা অভ্যুত্থানের চেষ্টা চালিয়েছিল বলে দাবি করে এরদোগান সরকার। এর পরের দুই বছরে রাশিয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সম্পর্ক বাড়িয়েছে দেশটি। কিন্তু রাশিয়ার সঙ্গে সে সম্পর্কও ভেঙে পড়ার আশংকায় এখন।

নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ইদলিব শহরটি বাশার সরকারের দখলে যেতে দিতে চাইবে না এরদোগান। আবার রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধেও জড়াতে চাইবে না। তাহলে কী করবে তারা?

পশ্চিমারা সিরিয়া যুদ্ধে তুরস্ককে মাঠে নামিয়ে ‘রঙ’ দেখছিল। এখন ইদলিবে পূর্ণ আক্রমণ করলে আসাদকে দেখে নেওয়ার হুমকি ট্রাম্প সাহেবেরা দিচ্ছেন ঠিকই। কিন্তু সিরিয়ায় রক্তাক্ত তুরস্ককে দেখতে তাদের খুব একটা খারাপ লাগার কথা না। যা যাচ্ছে তার সবটাই তুরস্কের ওপর দিয়ে। দরকার হলে একটা সম্মিলিত পশ্চিমা বিবৃতি দিয়ে তীব্র নিন্দা জানিয়ে দায়িত্ব সারবেন তারা!

দেখা যাক, ইতিহাসে দীর্ঘ বছর ধরে যুদ্ধে-বিগ্রহে জয়ী হয়ে আসা তুর্কিরা এ সংকট কিভাবে কাটিয়ে উঠে। কূটনৈতিকভাবে ইদলিব সমস্যার সমাধান হতে পারে এরদোগানের শাসনামলের সবচেয়ে বড় সফলতার একটি।

লেখক:
সরোজ মেহেদী

তুর্কি স্কলারশিপ ফেলো
শিক্ষক
ভাষা-যোগাযোগ ও সংস্কৃতি বিভাগ
গণ বিশ্ববিদ্যালয়।