সবচেয়ে দামি পোশাকটিই কেন সবচেয়ে কম পরি?

প্রকাশিত: ৫:২৯ অপরাহ্ণ, মে ২৪, ২০২১ | আপডেট: ৫:৫০:অপরাহ্ণ, মে ২৪, ২০২১

কাপড় পরি সবাই। নানা ধরণের কাপড় পরি। কিছু কাপড় বছরে একবার পরি। কিছু কাপড় মাসে একবার পরি, কিছু কাপড় সপ্তাহে একবার পরি। কিছু কাপড় প্রতিদিন পরি। কখনো কি ভেবেছেন, যে কাপড়টা যত দামী সেটাই জীবনে কম সময় পরি?

যেমন বিয়ের কাপড় অনেক দাম দিয়ে কেনার পরও জীবনে খুব একটা বেশিবার সেটা পরা হয় না। একটা গেঞ্জি, লুঙ্গি বা শাড়ি দেখা যায় প্রতিদিন ব্যবহার করি।

কয়েক দিন আগে ঈদ গেল। গত কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ থেকে এক বন্ধু বেড়াতে এসেছিল, সে একটি পাঞ্জাবি নিয়ে এসেছিল। এবারের ঈদে ওই পাঞ্জাবিটি কিছুক্ষণের জন্য পরেছি।

কিছু কাপড় অকেশনালি ব্যবহার করা হয়। কিছু কাপড় আলমারিতে শুধু বছরের পর বছর ঝুলতে থাকে কোনো ব্যবহার ছাড়া। আবার এমনও আছে অনেকে কাপড় ব্যবহার করে না তবুও তা অন্য কাউকে দিবে না।

এখন কাপড়ের দাম এবং তার ব্যবহারের দিকগুলো চিন্তা করার পর যদি প্রশ্ন করি কোন কাপড়টা জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং কেন? হাজার রকম বিশ্লেষণ দেয়া যেতে পারে, জানি না সঠিক উত্তর পাওয়া যাবে কিনা!

কাপড়ের মতো আমাদের জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস রয়েছে সেটা কি জানেন? সেটা হচ্ছে বন্ধু। বন্ধুকে কাপড়ের সঙ্গে তুলনা করবে? এতে কি বন্ধুর মান সম্মানের হানি হবে, নাকি তাকে ছোট করা হবে? আমি বেশ ভেবেচিন্তেই কিন্তু উদাহরণটি তুলেছি, তারপরও মত-দ্বিমত হতে পারে। চলুন জানা যাক, বন্ধু কিভাবে কাপড়ের মতো হতে পারে?

বন্ধু একটি চমৎকার শব্দ। বন্ধুর মধ্যে রয়েছে শুধু বন্ধুত্ব। শিশু কালের বন্ধু, গ্রাম বা শহরের বন্ধু, ক্ষণিকের পরিচয়ে বন্ধু, স্কুল বা কলেজের বন্ধু, বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু, কাজের বন্ধু, বিদেশী বন্ধু, ফেসবুকের বন্ধু, আরও কত বন্ধু তার ইয়ত্তা নেই।

কাপড়ের মতো কত প্রকারেরই না বন্ধু রয়েছে! এখন বন্ধুর সবার সঙ্গে কি আমাদের দৈনন্দিন কথাবার্তা, দেখা সাক্ষাত হয়? না। কিছু বন্ধু সময়ের সাথে ঝরে যায়, কিছু বন্ধু হারিয়ে যায়, কিছু বন্ধু পরিবর্তন হয়। এই পরিবর্তনের পেছনে যুক্তি এবং অজুহাত রয়েছে। আবার দেখা যায়, কিছু বন্ধুর সাথে সেই কবে চল্লিশ, পঞ্চাশ বছর বা আরও অনেক আগে শেষ দেখা হয়েছে। হঠাৎ গেট ট্যুগেদারে দেখা, কোনও কোনও বন্ধু বছরে ঈদ উপলক্ষে হয়তো একটি টেক্সটে ঈদ মোবারক জানাল। কয়েকজন বন্ধু মাঝে মধ্যে হাই-বাই বলে। আবার এমনও আছে কিছু বন্ধু প্রতিদিন প্রতিক্ষণ সেই দৈনন্দিন শাড়ি এবং লুঙ্গির মতো হৃদয়ে জড়িয়ে রয়েছে। ভেবেছেন কি প্রতিদিনের ব্যবহার করা শাড়ি ও লুঙ্গি আর সারাক্ষণের বন্ধুর মধ্যে কী ভীষণ মিল? সেটা আবার কী?

শাড়ি-লুঙ্গি ও সারাক্ষণের বন্ধুর উপর তেমন দরদ বা অনুভব হৃদয়ে আসে না। অথচ বহু বছর পরে যখন হঠাৎ এক বন্ধু একটি টেক্সট করে, তখন হৃদয়ে বিরাট আলোড়নের সৃষ্টি হয়, মনে হয় বিরাট কিছু ঘটে গেছে জীবনে। এ বিষয়টি হয়তো আবার আলোচনা হয় সেই বন্ধুর সাথে, যে হৃদয়ে জড়িয়ে রয়েছে লতার মতো। যাই হোক বন্ধু কাপড়ের মতো নাকি কাপড় বন্ধুর মতো – সেটি আরেকটি ভাবনা, তা নিয়ে এখন কিছু লিখতে চাই না।

অন্যবারের মতো এবারও অনেকেই ঈদের শুভেচ্ছা পাঠিয়েছে। আমিও অনেকের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেছি। আমি আমার জীবনসঙ্গিনীর সাথে ভালোবাসার জাল বুনে লতার মতো একে অপরের সুখে-দুঃখে জড়িয়ে আছি। আমরা বলতে গেলে সেই শাড়ি লুঙ্গির মতো প্রতিদিনের সাথী, সারাক্ষণের বন্ধু।

আজ হঠাৎ এক বন্ধুর এক যুগ পর একটি মেসেজ পেয়ে এত আপ্লুত হয়েছি দেখে আমার স্ত্রী মারিয়া কিছু কথা বলল। বলল, ‘মজার ব্যাপার, আমি তোমার প্রতিদিনের সাথী। কিন্তু কই? আমি যখন টেক্সট করি অমন করে আপ্লুত হতে দেখিনি তো?’

কথাটি শোনার পর বেশ লেগেছে মনে; তাই মনে পড়ে গেল –

অলির কথা শুনে বকুল হাসে,
কই, তাহার মতো তুমি আমার কথা শুনে হাসো না তো,
ধরার ধুলিতে যে ফাগুন আসে,
কই, তাহার মতো তুমি আমার কাছে কভু আসো না তো।

গানটি বহু বার গেয়েছি, কিন্তু কখনো ভাবিনি মারিয়া গানটি তার হৃদয়ে এমনভাবে ধরে রাখবে! তাহলে কি জীবনটা সত্যি এমন যে অনেক ভালোবাসার কাছের মানুষটিকে আমরা হয়তো ভুলে যাই?

ভুলে যাই সম্ভবত এই কারণে যে সে সারাক্ষণই সাথে থাকে। এই কাছের মানুষটাকে ভুলে যাওয়া নিয়ে কবি-সাহিত্যিকরা অনেক লেখালেখিও করেছেন। ওই সব কথা আরেক দিন লিখবো। কিন্তু আজ যেটুকু বলতে চাই তা হলো –

এই কাছের মানুষটিকেও আদর সোহাগ করা দরকার, মনে রাখা দরকার। হৃদয় দিয়ে, আবেগ দিয়ে তাকে উপলব্ধি করানো দরকার, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি, হৃদয় দিয়ে ভালোবাসি’।

এবারের ঈদ, এবারের করোনাকাল বয়ে আনুক আমাদের হৃদয়ে ভালোবাসার প্রগাঢ় অনুভূতি, যে অনুভূতির সৃষ্টি হয় যেন শুধুই পরস্পরকে ভালোবাসাবাসির মধ্য দিয়ে।