‘সব ছুটি এক হয় না’

মুজাহিদ হোসেন মুজাহিদ হোসেন

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৪:৪৮ অপরাহ্ণ, মে ২৩, ২০১৯ | আপডেট: ৪:৪৮:অপরাহ্ণ, মে ২৩, ২০১৯
ছবি: টিবিটি

আজ শুভ্রের মন ভালো নেই। বাড়ির কথা মনে পড়ে কেমন জানি ঝিমিয়ে পড়েছে ছেলেটা। বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি হলেও ঘরে ফেরা হয়নি শুভ্রের। ব্যাকুল হৃদয়ে সে ভাবছে কবে ফিরবে মায়ের কোলে। মায়ের আওয়াজ বার বার কানে বাঁজছে কবে ফিরবি খোকা। কত্তদিন হলো তোরে দেখিনা বাবা। তাড়াতাড়ি বাড়িতে চলে আয়। শুভ্রদের অবশ্য ঈদের ঘন্টা না বাঁজানো অবধি বাড়িতে ফিরতে বারণ!

এ যেনো প্রকৃতির এক অলিখিত নিয়ম হয়ে গেছে শুভ্রদের জীবনে। তাইতো ছোটবেলা থেকে জীবনযুদ্ধে এগিয়ে চলা শুভ্রদের নেই কোনে ভ্রক্ষেপ। শৈশব কেটেছে উত্তর জনপদের করতোয়া নদীর কোল ঘেষে চলা এক প্রত্যন্ত গ্রামে। ক্লান্ত শরীরে চোখ মেললেই আপন মনে শুভ্র ভাবে শৈশবের দিনগুলি। একলা মনে বসে সে ভাবছে শৈশবের কাটানো সোনালী দিনগুলি। আজ মাসের ২০ তারিখ। এইতো ক’দিন পড়েই ছুটি মিলবে শুভ্রের।

ক্যাম্পাসের বন্ধুরা তাদের আপন নীড়ে ফিরে গেছে অনেক আগেই। প্রচন্ড তাপদাহকে শান্ত করতে আকাশ থেকে নেমে এসেছে এক পশলা বৃষ্টি। সাহিত্যপ্রেমী শুভ্র তাই উপন্যাস পড়ায় ব্যস্ত। ঘড়িতে চোখ পড়ায় চমকে উঠে শুভ্র। অনেক দেরী হয়ে গেছে। আজ তাড়াতাড়ি যেতে হবে স্টুডেন্ট এর বাসায়। শুভ্র শহরের একটি বাসায় টিউশনি করায়। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া ফুটফুটে ছোট্ট ঈশিতা তার ছাত্রী। আজ ঈশিতার জন্মদিন। যেতেই হবে। তড়িঘড়ি করে নেভী-ব্লু কালারের শার্ট টা পড়ে নিলো। এ কালার টা তার ভীষণ পছন্দের। এইতো ক’দিন আগেই জন্মদিনে প্রিয়তমা অরণী তাকে গিফট করেছে শার্টটি।

সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়েছে। আজ মনে হয় আকাশের মনটা ভালো ছিলো না। সন্ধ্যা থেকে গোমড়া মুখে থাকা আকাশ টা রাত হতে না হতেই কালবৈশাখী ঝড় নিয়ে হাজির হলো। মুহুর্তেই সবকিছু লন্ডভন্ড করে দিয়ে গেছে। বাহিরে ঝড়ে আটকা পড়েছে শুভ্র। রাত অনেক হয়েছে। অতঃপর ঘুটঘুটে অন্ধকারে একলা মনে ফাঁকা ক্যাম্পাসে হলের দিকে ছুটে চলেছে শুভ্র। চারিদিক ফাঁকা, যেনো কোথাও কেউ নেই। ক্লাসের সবচেয়ে শান্ত, ভদ্র, ভীতু ছেলেটা এখন রাত করে রুমে ফিরে। ভীতু ছেলেটার মাঝে চরম বাস্তবতা সকল প্রতিক‚লতায় অদম্য সাহস জুগিয়েছে।

ঈদের সময় যত ঘনিয়ে আসছে। শুভ্রের মনে প্রশান্তির বাতাস ততই দোল খাচ্ছে। ক্যালেন্ডারের তারিখ জানিয়ে দিচ্ছে আজ মাসের ২৯ তারিখ। এইতো আর ক’দিন পড়েই বাসায় ফিরবে শুভ্র। মনে তাই আনন্দের ঢেউ খেলছে।

ঈশিতার বড্ড মন খারাপ আজ। পছন্দের স্যার ছুটিতে চলে যাবে খেলারসাথী ছুটিতে যাবে বলে এত্ত মন খারাপ। ছোট্ট মেয়েটার সাথে বড়ই সখ্যতা গড়ে উঠেছে শুভ্রের।

আজ শুভ্র বেতন পেয়েছে। মনটা তার খুশিতে উৎফুল্ল। চোখ মুখে যেনো প্রশান্তির ছাপ। সাদা কাগজে মোড়ানো খাম খুলতেই ছোট্ট একটা চিরকুট চোখে পড়ে শুভ্রের। সেখানে লেখা রয়েছে, তোমার বেতনের সাথে বাড়তি টাকাটা ঈদ বোনাস। টাকা পেয়ে শুভ্র মার্কেট থেকে মায়ের জন্য শাড়ী, বাবার জন্য পাঞ্জাবি, ছোট বোন রিমির জন্য সুন্দর একটা জামা আর প্রিয়তমা অরণীর পছন্দের কাচের চুড়ি কিনেছে।

শরীর বড্ড ক্লান্ত। তবুও ক্লান্তি নেই মনে। রাত পোহালের বাড়ির টানে ছুটবে সে। তড়িঘড়ি করে ব্যাগ গুছিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো শুভ্র। ঘুমে স্বপ্নে সে বিভর। কতই না সে স্বপ্ন। একদিন অনেক বড় হবে। বাবা-মায়ের দুঃখ ঘুচাবে। সকলের মুখে হাসি ফুটাবে। সকাল হয়ে গেছে। কাক ডাকা ভোরে ঘুম ভেঙ্গেছে তার। ফুটফুটে সকাল। আজকের সকাল টা সত্যি অন্যরকম লাগছে তার। হৃদয়ে বইছে আনন্দের জোয়ার। অপেক্ষার প্রহর শেষ। বাস চলে এসেছে।

এখন ছুটে চলা আপন শহরে আপন গ্রামে। শেকড় যেখানে আবদ্ধ। জানালার বাহিরে হাত ইশারা করে এই শহরটাকে বিদায় জানালো সমন। অতঃপর বাস চলেছে তার আপন গতিতে। ঠিক জীবন যেমনটা চলে। শুভ্রের শরীরটা ভালো নেই। শেষ কয়েকদিন ধরে অনেক পরিশ্রম হয়েছে তার। চোখ বন্ধ করে ভাবছে শুভ্র। ভাবনার জগতের অতল গহীনে হারিয়ে গেছে শুভ্র। অধরা স্বপ্ন যেনো ধরা দিয়েছে কল্পনায়।

হঠাৎ বিকট শব্দে ঘুম ভাঙ্গে শুভ্রের। বিপরীত দিক থেকে এগিয়ে আসা বাসটির থাক্কায় দুমড়ে মুচড়ে যায় শুভ্রের বাসটি। দুমড়ে মুচড়ে যায় শুভ্রের শত শত স্বপ্ন। চারিদিকে তখন শুধু আর্তনাদ। কান্নার আহাজারীতে আকাশটা ভারী হয়ে উঠে।

এক্সিডেন্টের পর শুভ্রকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছিলো। কিন্তু হাসপাতালে নেয়ার আগেই শুভ্র এই পার্থিব জগতের সকল ছুটিকে বিদায় জানিয়ে চলে গেছে না ফেরার দেশে। শুধু পড়ে আছে শুভ্রের নিথর দেহ আর তার স্বপ্নগুলো। মুহুর্তে শত স্বপ্ন চিরতরে হারিয়ে গেছে স্বপ্নের ভুবনে।

ঈদের ছুটি শেষ। ক্যাম্পাস খুলেছে। সবকিছু ঠিকঠাক আছে। নেই শুধু শুভ্র। পড়ে আছে তার স্মৃতি বিজড়িত বই, খাতা, বিছানা। দেয়ালে দেয়ালে ছেঁয়ে আছে তার লিখনি , একদিন ছুটি হবে, অনেক দ‚রে যাবো সুমন সত্যি আজ সকল ছুটিকে ছুটি জানিয়ে চলে গেছে বহুদ‚রে। সড়ক দূর্ঘটনা এভাবে কেড়ে নেয় হাজারো স্বপ্ন।
বি:দ্র: গল্পে বিভিন্ন চরিত্রের নাম এবং পুরো গল্পটা কাল্পনিক। মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেদের জীবন সংগ্রামের একটা প্রতিচ্ছবি তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। সেই সাথে ঈদের সময় সহ সারাবছর সড়ক দ‚র্ঘটনায় হাজারো শুভ্রদের স্বপ্ন বিলীন হয়ে যায় সে ঘটনার প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছি। পার্থিব জগতে সকল ছুটি এক হয় না।
জীবনযুদ্ধে হার না মানা শুভ্রদের প্রতি শ্রদ্ধা রইলো হাজারো শ্রদ্ধা-ভালোবাসা।

লেখক: মাহফুজ মুন্না
শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়