সরকারি সংস্থার খামখেয়ালিতে আটকা ‘যানজটমুক্তির’ ইউটার্ন প্রকল্প

টিবিটি টিবিটি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ৫:০৯ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৪, ২০১৮ | আপডেট: ৫:০৯:পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৪, ২০১৮

জমি নিয়ে জটিলতায় তেজগাঁও থেকে উত্তরা পর্যন্ত ১১টি ইউটার্ন নির্মাণ প্রকল্প একাধিক সরকারি সংস্থার খামখেয়ালিতে আটকে পড়েছে। অন্তত চারটি সংস্থা তাদের আওতাধীন অব্যবহৃত জমি ছাড়তে রাজি না হওয়ায় শুরুর পরও বন্ধ করে দিতে হয় প্রকল্পের কাজ।

তবে আশার কথা হলো মন্ত্রিসভার উদ্যোগে জমি নিয়ে জটিলতার অবসান হয়েছে। তবে যে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে, তা থেকে মুক্তি মিলছে না। যানজট নিয়ন্ত্রণে কম খরচে কার্যকর সমাধান হিসেবে দেখা এই প্রকল্পটি কবে আলোর মুখ দেখবে তা অনিশ্চিতই হয়ে রইল।

কবে নাগাদ নির্মাণ কাজ শুরু করা যাবে- এ নিয়ে বলতে পারছেন না ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নিয়োগ করা প্রকল্প পরিচালক খন্দকার মাহবুব আলম। চলতি বছরেও কাজ শুরু কোন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে কি না সে বিষয়েও মন্তঅব্য করতে নারাজ তিনি।

ইউটার্ন নির্মাণের প্রকল্প ২০১৫ সালের শেষ দিকে পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব পাঠায় উত্তর সিটি করপোরেশন। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে কাজ শুরু করে ২০১৭ সালের জুনে শেষ করার কথা থাকলেও অনুমোদন পেতেই ওই বছরের ২৭ মার্চ পেরিয়ে যায়। এরপর প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়।

আর প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য গত বছর ২৯ অক্টোবর ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এসএম কনস্ট্রাকশনসকে কার্যাদেশ দেয় নগর কর্তৃপক্ষ। নভেম্বরের মাঝামাঝিতে কাজ শুরু হলেও জমি সংক্রান্ত জটিলতায় কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়।

জমি নিয়ে যে জটিলতা, তার সবই আবার সরকারের বিভিন্ন সংস্থার অধীনে। এর মধ্যে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অধীনে আছে এক দশমিক ৩৬ একর, রেলওয়ের শূন্য দশমিক ২২ একর, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের শূন্য দশমিক ০৯ একর, জাতীয় গৃহায়ণ অধিদপ্তরের শূন্য দশমিক শূন্য ছয় একর জমি রয়েছে। জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে সরকারি সংস্থা জমি বরাদ্দে বাধা হয়ে দাঁড়াবে, সেটি কল্পনাতেও ছিল না সিটি করপোরেশনের। অথচ হয়েছে তাই।

প্রকল্প পরিচালক মাহবুব আলম বলেন, ‘শুধু বেসরকারি জমি অধিগ্রহণ করার নিয়ম তাই আমরা সরকারি সংস্থাগুলোর কাছে তাদের জমি ব্যবহারের অনুমতি চেয়েছি। অধিগ্রহণের কোন বিষয় এখানে নেই। আমরা তাদের সাথে সমঝোতার চেষ্টা করেছিলাম।

তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল আমাদের মন্ত্রণালয় ও তাদের মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিষয়টি সুরাহা করতে।’ তবে নিজেরা সমাধান করতে না পেরে গত মে মাসে নগর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে মন্ত্রিসভাকে বিষয়টি জানানো হলে পরের কয়েকটি বৈঠকেই বিষটির সমাধান হয়ে যায়। সরকারের হস্তক্ষেপে জমি দিতে আর আপত্তি নেই সংস্থাগুলোর।

মাহবুব আলম বলেন, ‘মন্ত্রিসভাতে যখন জানানো হলে বিষয়টির সমাধান হয়েছে। তবে সড়ক ও জনপথসহ সংশ্লিষ্ট জমির মালিকের আমাদের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করে। তবে আমরা সমাধানে এসেছি।’

জমি সমস্যার সমাধান হলেও কবে নাগাদ ইউটার্নগুলোর নির্মাণ কাজে শরু হচ্ছে তা জানেন না প্রকল্প পরিচালক। এ সংক্রান্ত প্রশ্নে বলেন, ‘কবে শুরু হবে বলতে পারি না। আমারা ডিপিপি পাঠাব, তারা অনুমোদন দিলে কাজ করব।’

তবে কবে নাগাদ এই প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে- জানতে চাইলে বিষয়টি এড়িয়ে যান এই কর্মকর্তা। তবে চলতি বছরের শেষের দিকে কাজ শরু করতে পারলে ২০১৯ সালের জুনের মধ্যে সবগুলো ইউটার্ন চলাচলের উপযুক্ত করা সম্ভব বলে তিনি জানান।

প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের পরিকল্পনায় রাজধানীর উত্তরা পর্যন্ত ১২টি এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশন উত্তরা থেকে গাজীপুর পর্যন্ত আরও ১০টি ইউটার্ন নির্মাণের প্রস্তাব ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় উপস্থাপন করা হয়।

পরিবহন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রনালয় ও সংস্থার সাথে আলোচনা, সরেজমিন পরিদর্শন, সভা, সর্বশেষ ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)র ছাড়পত্র/ অনাপত্তি গ্রহণ ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ২৪ অক্টোবর ২০১৬ সালে ৬০১ নম্বর স্মারকের প্রেক্ষিতে ডিপিপি প্রক্রিয়া করা হলে পরিকল্পনা কমিশন ২০১৭ এর ২৮ ফেব্রুয়ারিতে উত্তরা থেকে সাতরাস্তা পর্যন্ত মোট ১১টি ইউটার্ন নির্মাণের অনুমোদন দেয়।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ২৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে এই লুপগুলো তৈরি হলে ডান দিকে মোড় দেয়া গাড়িগুলোর জন্য সোজা পথে চলা গাড়িগুলোকে আটকে থাকতে হতো না সিগনালে। আর এই পথের দুঃসহ যানজট নিয়ন্ত্রণে সে সময় একে সম্ভাবনাময় প্রকল্প হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা।

রাজধানীর রামপুরা ও বাড্ডা এলাকায় দুটি ইউলুপ এরই মধ্যে ওই এলাকার যানজটের অবসান ঘটিয়েছে। আর এই পথে ইউলুপগুলো তৈরি হলে উত্তরা থেকে সাতরাস্তা পর্যন্ত যানবাহনগুলো কোথাও সিগনালে আটকা না পড়ে নির্বিঘ্নে চলে যেতে পারত।

আর সাত রাস্তা থেকে যেহেতু ফ্লাইওভার আছে, সেহেতু গুলিস্তান, মতিঝিল বা মৌচাকমুখী গাড়িগুলোর যাত্রা পথের সময় কমে যেত। আবার উত্তরা থেকে গুলিস্তানমুখী যানবাহন তখন নিশ্চিতভাবেই এই পথ দিয়েই বেশি চলত, ফলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে দিয়ে ফার্মগেট হয়ে সড়কে গাড়ির চাপ কমত। এতে এই প্রকল্পের সুফল দুটি সড়কেই পড়ত।

মেয়র আনিসুল হক দায়িত্বে থাকা অবস্থায় টাকার সংস্থানের পাশাপাশি ইউটার্ন তৈরিতে জমি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল চারটি সরকারি সংস্থা। কাজ শুরুর পর থেকে তারাই জমি ছাড়তে রাজি না হওয়ায় এগুলোর নির্মাণ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।

গত বছরের ৩০ নভেম্বর মেয়রের মৃত্যতে স্থবির হয়ে পড়ে প্রকল্পের কাজ। ডিসেম্বর জুড়ে সাতরাস্তা, তেজগাঁও, মহাখালীতে প্রকল্পের সাইনবোর্ড দেখা গেলেও কাজের অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়নি।

প্রকল্প পরিচালক মাহবুব আলম বলেন, ‘অনুমোদন পাওয়ার পর আমরা কাজ শুরু করি। কিন্তু কাজ ধরার পর থেকে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে সড়ক ও জনপথ বিভাগ নানাভাবে বাধা দিচ্ছিল। তাই ঠিকাদারকে বলে কাজ বন্ধ রেখেছি এতদিন।’

সময়ক্ষেপণ হওয়ায় প্রকল্পের ব্যয়ও বাড়বে বলে জানান প্রকল্প পরিচালক। বলেন, প্রাথমিক বাজেটে ১১ টি ইউটার্নর খরচ ২৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ধরা হলেও নতুন বাজেটে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিপূরণ প্রদানসহ প্রায় ৩০ কোটি টাকার মতো ব্যয় হতে পারে।

ইউটার্নগুলো হবে তিন ধরনের

‘এ’ ক্যাটাগরির মধ্যে থাকছে বাসা ও ট্রাকের মতো বড় বাহন চলাচলের সুযোগ। ‘বি’ ক্যাটাগরি থাকছে ছোট গাড়ি ও ট্যাক্সির জন্য। এখানে শুধু ‘এ’ এবং ‘বি’ ক্যাটাগরিতে একটি লেন থাকছে যেখানে পাশাপাশি দুটি গাড়ি যাওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না। যেমন: আর্মি গলফ ক্লাবের সামনের অংশ (বি), বনানী উড়াল সড়ক সংলগ্ন (এ-বি) এর সমন্বয়, চেয়ারম্যানবাড়ি বনানী (বি), কহিনুর ক্যামিকাল-তেজগাঁও শিল্প এলাকা (বি)।

যেখানে দিয়ে দুই লেনের বা পাশাপাশি দুটি গাড়ি ইউটার্ন নেয়ার সুযোগ থাকছে সেখানে ডাবল বা ‘ডি’ ক্যাটাগরি হিসেবে ধরা হয়েছে। যেখানে ‘এ’, ও ‘বি’ ক্যাটাগরিতে দুটো গাড়ি পাশাপাশি চলতে পারবে।

যেমন: উত্তরার জসিমউদ্দিন, (রাজলক্ষ্মী) (বি-ডি), উত্তরা র‌্যাব-১ কার্যালয় সংলগ্ন (বি-ডি), ফিলিং একাডেমি (এ-ডি), বনানী/কাকলী রেল স্টেশন (বি-ডি), মহাখালী ফ্লাইওভার (এ-ডি), মহাখালী বাস টার্মিনাল (এ-ডি), সাতরাস্তা মোড় (এ-ডি)। সুত্র: ঢাকাটাইমস