সালমান শাহর মৃত্যু :কী ঘটেছিল সেদিন

টিবিটি টিবিটি

বিনোদন ডেস্ক

প্রকাশিত: ৬:৩৫ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৬, ২০১৮ | আপডেট: ৬:৩৫:পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৬, ২০১৮

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর দিনটি ছিল শুক্রবার। সেদিন সকাল ৭টায় বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরী ছেলে শাহরিয়ার চৌধুরী ইমনের সঙ্গে দেখা করতে ইস্কাটনের বাসায় যান। কিন্তু ছেলের দেখা না পেয়ে তিনি ফিরে আসেন। এই শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন ঢাকার তৎকালীন চলচ্চিত্র জগতের সুপারস্টার সালমান শাহ।

সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী জানান, বাসার নিচে দারোয়ান সালমানের বাবাকে তার ছেলের বাসায় যেতে দিচ্ছিল না। নীলা চৌধুরীর বর্ণনা ছিল এ রকম, ‘দারোয়ান বলেন, স্যার এখন তো ওপরে যেতে পারবেন না। কিছু প্রবলেম আছে।

আগে ম্যাডামকে (সালমানের স্ত্রীকে) জিজ্ঞেস করতে হবে। এক পর্যায়ে তিনি (সালমানের বাবা) জোর করে ওপরে গেছেন। কলিং বেল দেওয়ার পর দরজা খুলল সামিরা (সালমানের স্ত্রী)।

সালমানের বাবা সামিরাকে বললেন, ইমনের সঙ্গে কাজ আছে, ইনকাম ট্যাক্সের সই করাতে হবে। ওকে ডাকো। তখন সামিরা বলল, আব্বা ও ঘুমাচ্ছে। সালমানের বাবা তখন বললেন, আমি তা হলে বেডরুমে গিয়ে সই করিয়ে আনি। কিন্তু সালমানের বাবাকে সেখানে যেতে দেওয়া হয়নি।

তিনি প্রায় দেড় ঘণ্টা সেখানে বসে ছিলেন।’ বেলা ১১টার দিকে একটি ফোন আসে সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর বাসায়। ঐ টেলিফোনে বলা হলো, সালমানকে দেখতে হলে তখনই যেতে হবে।

কেমন ছিল পরিবেশ
টেলিফোন পেয়ে নীলা চৌধুরী দ্রুত ছেলের বাসার দিকে রওনা হয়েছিলেন। বাসায় গিয়ে ছেলেকে বিছানার ওপর দেখতে পান তিনি। নীলা চৌধুরীর ভাষ্য, ‘খাটের মধ্যে যেদিকে মাথা দেওয়ার কথা, সেদিকে পা। আর যেদিকে পা দেওয়ার কথা, সেদিকে মাথা। পাশেই সামিরার এক আত্মীয়ের একটি পার্লার ছিল। সে পার্লারের কিছু মেয়ে সালমানের হাতে-পায়ে শর্ষের তেল দিচ্ছে। আমি তো ভাবছি ফিট হয়ে গেছে। হঠাৎ দেখতে পেলাম আমার ছেলের হাত-পায়ের নখগুলো নীল।

তখন আমি সালমানের বাবাকে বলি, আমার ছেলে তো মরে যাচ্ছে।’ ইস্কাটনের বাসা থেকে সালমান শাহকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানকার ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করে। এর পর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে বলা হয় সালমান আত্মহত্যা করেছেন।

পরিবারের দাবি
সালমান শাহ অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’-এর শেষ দৃশ্যের মতো তার জীবনের রথও থেমে গিয়েছিল ওই ছবি করার ঠিক চার বছর পর। পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, সালমান শাহকে হত্যা করা হয়েছে। নীলা চৌধুরীর অভিযোগ ছিল, তারা হত্যা মামলা করতে গেলে পুলিশ সেটিকে অপমৃত্যুর মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করে।

পুলিশ বলেছিল, অপমৃত্যুর মামলা তদন্তের সময় যদি বেরিয়ে আসে যে এটি হত্যাকা-, তা হলে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে হত্যা মামলায় মোড় নেবে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নায়কের আকস্মিক মৃত্যুতে স্তম্ভিত হয়ে যায় পুরো দেশ।

সে সময় দেশজুড়ে সালমানের অসংখ্য ভক্ত তার মৃত্যু মেনে নিতে না পারায় বেশ কয়েকজন তরুণী আত্মহত্যা করেন বলেও খবর আসে পত্রিকায়। প্রিয় অভিনেতার মৃত্যুর সঠিক কারণ জানতে না পারায় ভক্তদের মাঝে তৈরি হয় নানা প্রশ্নের।

আরও প্রশ্ন
সালমান শাহর মৃত্যুকে ঘিরে যখন একের পর এক প্রশ্ন উঠতে থাকে, তখন পরিবারের দাবির মুখে দ্বিতীয়বারের মতো ময়নাতদন্ত করা হয়। মৃত্যুর ৮ দিন পর সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজে তিন সদস্যবিশিষ্ট মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়। সে বোর্ডের প্রধান ছিলেন ডা. নার্গিস বাহার চৌধুরী। দ্বিতীয় ময়নাতদন্তে আত্মহত্যার বিষয়টি নিশ্চিত করা হলে মামলার কাজ সেখানেই থেমে যায়।

অন্যদিকে প্রযোজকরা লোকসান কমিয়ে আনতে সালমানের মতো দেখতে কয়েকজন তরুণকে নিয়ে অসমাপ্ত ছবির কাজ সম্পন্ন করার জন্য উঠে-পড়ে লাগেন। সালমানের মৃত্যুর দুই দশক পরও তাকে নিয়ে দর্শকদের মাঝে আলোচনা থামেনি। কী বিশেষত্ব ছিল সালমানের? কেন এতটা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন তিনি?

চলচ্চিত্র নির্মাতা জাকির হোসেন রাজু মনে করেন, সালমান শাহ যে সময়টিতে অভিনয়ে এসেছিলেন, তখন ছিল বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে পালাবদলের সময়। পর্দায় তার পোশাক-পরিচ্ছদ, সংলাপ বলার ধরন, অভিনয় দক্ষতাÑ সব কিছু মিলিয়ে দর্শকের মনে স্থান করে নিতে সময় লাগেনি।

প্রতিশ্রুতিশীল অভিনেতা
নায়করাজ রাজ্জাক, আলমগীর ও ফারুকের পর সে সময় একদল তরুণ অভিনেতার আবির্ভাব হয়েছিল ঢাকার চলচ্চিত্র জগতে। নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে যত নায়কের আবির্ভাব ঘটেছিল, তাদের মধ্যে সালমান শাহ সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল ছিলেন বলে উল্লেখ করেন জাকির হোসেন রাজু।

এই নির্মাতার বর্ণনায়, ‘সালমানের অভিনয়ের মধ্যে দর্শক একটা ভিন্নধারা খুঁজে পেয়েছিলেন। অনেকে আবার তার মধ্যে বলিউড নায়কদের ছায়াও দেখতেন।’ সালমান শাহকে নিয়ে আলোচনা কখনই থামেনি। মাত্র চার বছরের চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে তিনি নিজের এমন একটি স্থান করে নিয়েছিলেন যে, তার অভাব এখনো অনুভব করেন দর্শক, পরিচালক, প্রযোজক সবাই।

এখনো প্রতিবছর সালমান শাহর মৃত্যু দিবসে ভক্ত-দর্শকরা তাকে স্মরণ করেন ভালোবাসার সঙ্গে। তার ভক্তদের এ ভালোবাসার প্রতি সম্মান রেখে আমরাও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় এই অভিনেতাকে।

দৈনিক আমাদের সময়