‘সীমিত পরিসরে’ পরিবহন চলাচল কতটা বাস্তবসম্মত, যা বললেন বিশেষজ্ঞ

টিবিটি টিবিটি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ৪:২৩ অপরাহ্ণ, মে ৩০, ২০২০ | আপডেট: ৪:২৩:অপরাহ্ণ, মে ৩০, ২০২০

দেশে আগামী ৩১ মে ‘সীমিত পরিসরে স্বল্প সংখ্যক’ যাত্রী নিয়ে সব ধরনের গণপরিবহন চলার অনুমতি দিয়েছে সরকার। এদিন লঞ্চ ও ট্রেন চালু হলেও ৫০ শতাংশ যাত্রী নিয়ে ঢাকাসহ সারা দেশে বাস চলাচল শুরু হবে আগামী ১ জুন সোমবার।

তবে এই ‘সীমিত পরিসরে’ কথাটিই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। কারণ স্বাভাবিক সময়ে যে যাত্রীর চাপ থাকে তা সীমিত আকারে করলে বেড়ে যাবে বহুগুণ। অপরদিকে পরিবহন সেক্টরে কোনো ভালো সিস্টেমই এখন তৈরি হয় নাই বলে ধারণা তাদের। আর এটাই আসলে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

এসব কথা জানিয়েছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞ বুয়েটের শিক্ষক মো. শামসুল হক। তিনি বলেন, ‘নরমাল ( স্বাভাবিক) সময়েই আমরা আসলে যে সিদ্ধান্ত নেই পরিবহনে তা মানাতে পারি না। আমাদের অনেক সময়ই অনেক চমৎকার ডিসিশন হয়। কিন্তু সেটা টেকসই করার মতো এনফোর্সমেন্ট আসলে আমাদের নেই। এই সিস্টেম আমরা তৈরি করতে পারি নাই। এটাই আসলে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা অনেক টাকা খরচ করেছি, অনেক ইনভেস্টমেন্ট করেছি এটা উন্নয়নের জন্য। কিন্তু সিস্টেমটা দাঁড় করাতে পারি নাই। সিস্টেম মানে এই যে গণপরিবহনগুলো যদি সঠিকভাবে নজরদারি করতে হয় তাহলে প্রয়োজনীয় লোকবল লাগবে। যে লোকবল দিয়ে সিস্টেমটাকে ফোর্স করবো সেটা কিন্তু নাই। চারটা ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে কি ঢাকা শহরের ১৫ লাখ গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষা করা যায়, করতে পারবেন। বছরের পর বছর কিন্তু এই ধরনের হঠকারিতা চলে আসতেছে।’

সঠিকভাবে নজরদারি নেই উল্লেখ করে মো. শামসুল হক বলেন, ‘ঢাকার মতো এত বিশাল শহরে চলাচলকারী গাড়িতে ওইভাবে নজরদারি না থাকায় দেখা যায় স্বাভাবিক সময়েই আমরা কোনো কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারি নাই। ডিসিশন ঠিক থাকে, কিন্তু কার্যক্রম দেখতে পাই না। এবারের প্রেক্ষাপট তো আরও ভিন্ন। ডিসিশন যদি এমনভাবে নেওয়া হয়, এটা ফরজ। যেমন- সামাজিক দূরত্ব মেনে বাসে চলাচল করতে হবে, কম যাত্রী নিয়ে বাস চালাতে হবে। কম যাত্রী নিয়ে চালালে তার অতিরিক্ত ভর্তুকিটা কে দিবে, সেটা তো ডিসিশনে নাই।’

বাড়তি খরচের বিষয়ে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘প্রতিটি সিটকে জীবাণূমুক্ত করতে হবে স্যানিটাইজার দিয়ে, কাউকে দিয়ে কাজটা করাতে গেলে খরচের একটা ব্যাপার আছে। যদি বলা হয়, খরচ বহন করবে, আবার যদি বলা হয় অর্ধেক যাত্রী নিবে। তাহলে কীভাবে সিদ্ধান্তে থাকতে পারে। কিন্তু বাস্তবায়ন করতে হলে এই অর্থনৈতিক কস্ট শেয়ারিংটা (খরচ শেয়ার), গাড়িতে যাত্রীরা উঠছে তাদের মাস্ক আছে নাকি নেই, চালকের মাস্ক আছে কি না এসব যে চেক করবে প্রতিটি বাসের মধ্যে সেই লোকবলটাও কিন্তু নাই।’

সীমিত কথাটিই ঝুঁকিপূর্ণ মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, ‘একটা জিনিস খেয়াল রাখবেন সীমিত, এই কথাটিই কিন্তু আমাদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পুরো মাত্রায় চালাইয়া অতিরিক্ত যাত্রী নিয়েও কিন্তু আমরা চাহিদা পূরণ করতে পারি না। সুতরাং চাহিদা থাকবে, কিন্তু আমি সীমিত আকারে পরিবহন চালু করব, এই অতিরিক্ত চাপটাই ঝুঁকি বাড়াবে।’

‘আমরা দেখেছি, বিভিন্ন হরতালের সময় অল্প বাস চলে। তখনি কিন্তু চাপাচাপিটা আরও বেশি হয়’ যোগ করেন এই বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, ‘সার্বিকভাবে আমি বলবো, আমাদের দুর্বলতাই কিন্তু এখানে, আর এটাই কাল হয়ে দাঁড়াবে। আমরা এখন পর্যন্ত ট্রান্সপোর্টেশন একটা সিস্টেম দাঁড় করতে পারি নাই। দায়বদ্ধতার একটা জায়গা তৈরি করতে পারি নাই। যার ওপরে ভরসা করে একটা এনফোর্সমেন্টের কাজ করতে পারব।
আমি মুখে হয়তোবা ভালো ভালো বললাম, প্রত্যেক যাত্রী মাস্ক পড়বে, এই কথাগুলোর মধ্যে কে নজরদারিটা করবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যারা এটাকে মেইনটেইন করবে অর্ধেক যাত্রী নিবে তাদের এই খচরটা কে দিবে। সার্বিকভাবে বলবো আমরা যত ডিসিশনই নেই না কেন বাস্তবতা হলো টান্সপোটেশনটা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এখানেই এমন একটা জাগয়া যেখানে খুবই ক্লোজলি (কাছাকাছি) একজনের কাছে আরেকজন মানুষ চলে আসে। মার্কেটে বা হাটবাজারে কিন্তু মানুষ এত কাছাকাছি যায় না। কিন্তু একটা বাসের মধ্যে ঠেলাঠেলি করে একটা দরজা দিয়ে, এটাও ঠিক করতে পারি নাই। কেন বাসে একটা দরজা থাকবে পৃথিবীর কোথাও রেগুলেটরি অর্থরিটি এটা অ্যালাউ করে না। বাসে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দুটা গেট দিয়ে মানুষ নেমে যাবে। এটা আজীবন চলছে কোনো সিস্টেম নাই। তাহলে এই এক গেট দিয়ে এত মানুষ ওঠানামা করছে এটা যে এত সংক্রমণের ঝুঁকি সেটা হাটবাজারের তুলনায় অনেক বেশি।’

‘কেউ যদি প্রটেকশন নিয়েও আসে, তারপরও এত কাছাকাছি বাসে থাকে যে নিশ্বাস প্রশ্বাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে যাবে ভাইরাস। বাজারে গেলে হয়তোবা কারও শরীরের সঙ্গে স্পর্শ লাগতে পারে। কিন্তু বাসে তো তা নয়। আপনি একজনের নিশ্বাস প্রশ্বাসের একদম কাছাকাছি আছেন’ যোগ করেন বুয়েটের এই শিক্ষক।

করোনাভাইরাস ভ্রাম্যমাণ হয়ে ঘুরবে জানিয়ে মো. শামসুল হক বলেন, ‘আপনার জার্নিটা যদি হয় ৩০ মিনিট বা ৪৫ মিনিট হয়। তাহলে এটা মোবাইলিং (ভ্রাম্যমাণ)। একজন যাত্রী যদি মহাখালী থেকে মতিঝিল যাচ্ছেন, কেউ মিরপুর যাচ্ছেন, কেউ অন্য কোথাও। এটা এক জায়গায় সমস্যা মোবাইলিং (ভ্রাম্যমাণ) এর মাধ্যমে অনেক জায়গায় ছড়িয়ে যাবে। এর ব্যাপকতা অনেক বেশি, কত ঝুঁকির সেটা অনুমান করা যায় না।’

‘সবচেয়ে বড় কথা স্বাস্থ্যবিধির আইনগুলো মানানো যাবে কি না ১০ বার চিন্তা করতে হবে এবং তারা মানাচ্ছেন কি না । তা না হলে কোনভাবেই এটা ঠেকানো যাবে না। বাজার থেকেও এত ছড়াবে না যেটা পরিবহন থেকে ছড়াবে এবং ব্যাপকতা বৃদ্ধি পাবে। এটা বিভিন্ন মেডিকেল রিপোর্ট থেকেও দেখা গেছে পরিবহনের মাধ্যমেই এইচআইভি দেশের এক কোণ থেকে অন্য কোণে চলে গেছে। কারণ বাসটা মোবাইল ট্রাভেল করে। কাজেই কেউ আক্রান্ত হলে সে কিন্তু আরও অন্যকে আক্রান্ত করবে’ বলেন পরিবহন বিশেষজ্ঞ।

তিনি আরও বলেন, ‘একটা বাজারে কিন্তু শুধুমাত্র স্থানীয় লোকজনই যাওয়া আসা করে। কিন্তু একটা বাসের মধ্যে কিন্তু অনেক জায়গায় মানুষ ওঠানামা করে, সেই হিসেবে আমি বলবো। সুতরাং দুর্বলতাগুলো আমরা জানি। ঈদের সময় কত দম্ভ করে বলে ট্রেনের ছাদে আমরা কোন যাত্রী পরিবহন করব না। লঞ্চেও বলে একই কথা। আবার পরে বলে কি করব এত যাত্রীর চাপ। কি করবে, আসলে এটা হলো বাস্তবতা। আর সেই বাস্তবতায় সীমিত সংখ্যক জিনিসটাই আসলে কি?’

পরিবহনে করোনা ব্যক্তি ঝুঁকি নয় জানিয়ে মো. শামসুল হক বলেন, ‘আরেকটা বিষয় হলো কেউ ট্রেনের ছাদে বা বাসে ঝুলে গেলে সেটা ছিল তার ব্যক্তি ঝুঁকি। কিন্তু এই করোনাকালে কিন্তু এটা ব্যক্তি ঝুঁকি নয়, সে কিন্তু অন্যকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। এই জায়গাগুলো সম্পর্কে আমাদের ভাবা উচিত যে আমাদের আসল দুর্বলতা কোথায়। আমরা এখনো পরিবহনটাকে সুশৃঙ্খল করতে পারি নাই।’