সুপার লিগে রিয়াল-বার্সাসহ ১২ ক্লাব, ফুটবল বিশ্বে ঝড়

টিবিটি টিবিটি

বিনোদন ডেস্ক

প্রকাশিত: ৬:৫৮ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৯, ২০২১ | আপডেট: ৬:৫৮:অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৯, ২০২১

নানা গুঞ্জন, সম্ভাবনা-শঙ্কা, সবকিছুকে সত্যি প্রমাণ করে ইউরোপিয়ান সুপার লিগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এসে গেল। রোববার রাতে ইউরোপের ১২টি ক্লাব বিবৃতি দিয়ে জানায়, প্রস্তাবিত এই লিগে তারা যোগ দিতে যাচ্ছে। ফুটবলের নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে তিক্ত এক লড়াইয়ের সূচনা বলে মনে করা হচ্ছে এটিকে।

এই সুপার লিগের জন্য স্পেন থেকে যোগ দিয়েছে রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা ও আতলেতিকো মাদ্রিদ, ইংল্যান্ড থেকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, ম্যানচেস্টার সিটি, লিভারপুল, আর্সেনাল, চেলসি ও টটেনহ্যাম হটস্পার এবং ইতালি থেকে ইউভেন্তুস, এসি মিলান ও ইন্টার মিলান।

প্রাথমিকভাবে, ২৩ বছরের জন্য হয়েছে এই চুক্তি। সুপার লিগের প্রথম চেয়ারম্যান হয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদের প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেস।

জার্মানি ও ফ্রান্সের কোনো ক্লাবের যোগ দেওয়ার খবর এখনও পাওয়া যায়নি। তবে এই ১২ ক্লাবের সঙ্গে আরও তিনটি ক্লাব শিগগিরই যোগ দেবে বলে জানিয়েছে সুপার লিগ কতৃপক্ষ। প্রতিষ্ঠাকালীন এই ১৫ ক্লাবের সঙ্গে প্রতি বছর কোয়ালিফাই করে আসা ৫ ক্লাব, মোট ২০ দল নিয়ে হবে এই টুর্নামেন্ট।

সুপার লিগ কতৃপক্ষ বলছে, ভবিষ্যতে উয়েফা ও ফিফার সঙ্গে আলোচনা করে কাজ করতে চায় তারা।

ইউরোপিয়ান সুপার লিগ কী?

ইউরোপের শীর্ষ ১২টি ক্লাব ঘোষণা দিয়েছে, তারা ইউরোপিয়ান সুপার লিগ নামের নতুন একটা লিগ চালু করেছে। যাতে ইউরোপের ১৫টি ক্লাব সবসময় স্থায়ীভাবে থাকবে। আর সঙ্গে পাঁচটি ক্লাব পালাবদলের ভিত্তিতে থাকবে। সামনের আগস্টে এই ২০ দলকে নিয়ে শুরু হবে এই প্রতিযোগিতা।

কারা থাকবে এই লিগে?

এর মধ্যে ১২টি ক্লাব প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে নাম লিখিয়েছে। সেখানে স্পেন থেকে আছে রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা ও অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ। ইংল্যান্ডে ম্যান ইউনাইটেড, ম্যান সিটি, লিভারপুল, আর্সেনাল, টটেনহাম, চেলসি। আর ইতালি থেকে জুভেন্টাস, ইন্টার মিলান ও এসি মিলান। এর বাইরে আরও আটটি ক্লাব যোগ দেবে। পিএসজি ও বায়ার্ন এখনো যোগ দেয়নি, তবে তাদের সঙ্গে শোনা যাচ্ছে লাইপজিগের নামও।

পিএসজি ও বায়ার্ন যোগ দেয়নি কেন?

পিএজসি বলেছে, তারা এই প্রজেক্টে আগ্রহী নয়। পিএসজির মালিক নেসার আল খেলাইফি উয়েফার বিভিন্ন দায়িত্বে আছেন, সেই হিসেবে তিনি এই লিগের বিরুদ্ধেই। আর জার্মান ক্লাবগুলোর সিংহভাগ শেয়ার যেহেতু ফ্যানদের কাছে, তারা চাইলেই চট করে এই লিগে নাম লেখাতে পারবে না। সেজন্য বায়ার্ন বা ডর্টমুন্ড এখনো কিছু বলেনি। যদিও তারাও আসতে পারে বলে রয়েছে জোর গুঞ্জন।

এই সুপার লিগের ফরম্যাট কী হবে?

২০টি ক্লাব দুইটি গ্রুপে ভাগ হয়ে হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে ভিত্তিতে নিজেদের মধ্যে খেলবে। দুই গ্রুপ থেকে শীর্ষ ছয়টি দল সরাসরি খেলবে কোয়ার্টার ফাইনালে, চতুর্থ ও পঞ্চম দল থেকে দুইটি দল প্লে অফ খেলে যোগ দেবে শেষ আটে। সেখানে দুই লেগের কোয়ার্টার ফাইনাল ও সেমি ফাইনাল শেষে হবে এক লেগের ফাইনাল। খেলা হবে মিডউইকে, যার মানে চ্যাম্পিয়নস লিগের সাথে সাংঘর্ষিক হবে।

এই দলগুলো কি ঘরোয়া লিগে খেলবে?

আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ক্লাবগুলো জানিয়েছে, তারা ঘরোয়া লিগে খেলতে চায়। তবে এখন পর্যন্ত প্রিমিয়ার লিগ, সিরি আ ও লা লিগা আভাস দিয়েছে, তারা এই সুপার লিগে যোগ দেওয়া ক্লাবগুলোকে ঘরোয়া লিগ থেকে বহিষ্কার করতে পারে।

ফিফা ও ইউয়েফার অবস্থান কী?

ফিফা জানিয়েছিল এই লিগে যোগ দেওয়া সব খেলোয়াড়কে জাতীয় দল থেকে বহিষ্কার করা হবে। যদিও পরে তারা সুর নরম করে বলেছে, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। ইউয়েফা সরাসরি এই লিগের বিরুদ্ধে এবং এই লিগের সব দলকে ইউয়েফার সব প্রতিযোগিতা থেকে বহিষ্কার করা হবে বলে জানিয়ে দিয়েছে।

এই সুপার লিগের আইডিয়া কীভাবে এলো?

ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলো মিলে আলাদা একটা লিগের ভাবনা আজকের নয়। সেই ২০০০ সালের আগ থেকেই ক্লাবগুলো এ নিয়ে ভাবছে। চ্যাম্পিয়নস লিগে যথেষ্ট ম্যাচ না থাকায় টিভি স্বত্ব ও অন্যান্য খাত থেকে আয় বাড়ানোর জন্য তারা অনেক দিন ধরেই পরিকল্পনা করছিল। এই সুপার লিগে তারা নিজেরা যথেষ্ট পরিমাণ ম্যাচ খেলবে ও টিভি স্বত্ব থেকে পুরো টাকাটাই যাবে ক্লাবগুলোর পকেটে।

কত টাকা লগ্নি হয়েছে এই প্রজেক্টে?

আমেরিকান ব্যাঙ্ক জেপি মরগ্যান এর মধ্যেই প্রতিষ্ঠাতা ক্লাবগুলোকে কাজ করার জন্য ৩.৫ বিলিয়ন ইউরো দিচ্ছে। আনুষ্ঠানিক বার্তায় ক্লাবগুলো জানিয়েছে, সব মিলিয়ে এই প্রজেক্টে ১০ বিলিয়ন ইউরো লগ্নি হবে।

এই সময়েই কেন এই ঘোষণা?

করোনা ভাইরাসের জন্য সব ক্লাবই আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ছিল। সেখান থেকে উত্তরণের একটা উপায় খুঁজছিল তারা। অন্যদিকে ইউয়েফা ২০২৪ সাল থেকে চ্যাম্পিয়নস লিগ ফরম্যাট বদলের কথা ভাবছিল। সেখানে সুইস মডেলে ৩৬টি দল গ্রুপ পর্বে অন্তত ১০টি করে ম্যাচ খেলবে। মূলত ইউয়েফার এই নতুন এই নিয়ম পাশের আগেই এই নতুন লিগের ঘোষণা এসেছে।

এই লিগের নেপথ্যে কারা আছেন?

জুভেন্টাসের সভাপতি আন্দ্রেয়া আগ্নেলির মস্তিষ্কপ্রসূত এই লিগের মূল কারিগর হিসেবে ধরা হচ্ছে রিয়াল মাদ্রিদ সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজকে। তিনিই এই লিগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। সহ সভাপতি হিসেবে জুভেন্টাসের আগ্নেলির সাথে আরও আছেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সভাপতি জোয়েল গ্লেজার, লিভারপুলের জন ডব্লিউ হেনরি, আর্সেনালের স্ট্যান ক্রোয়েংকে। শোনা যাচ্ছে নতুন বার্নাব্যু স্টেডিয়াম হতে পারে এই লিগের অফিসিয়াল ভেন্যু।

নতুন লিগে খেলোয়াড়দের ধকল কতটা বাড়বে?

বলার অপেক্ষা রাখে না, এই লিগের জন্য আরও বেশি ধকল যাবে ফুটবলারদের ওপর। এমনিতেই ইংল্যান্ডে ৩৮ সপ্তাহের লিগ খেলা হচ্ছে ৩৪ সপ্তাহে। এই লিগের জন্য আরও বাড়তি ৩৪টি ম্যাচ খেলতে হবে। যার মানে বড় ক্লাবগুলোকে স্কোয়াড বাড়াতে হবে অনেক বেশি। এর মধ্যে এফএ কাপ, কোপা ডেল রে-র মতো ঘরোয়া প্রতিযোগিতাও খেলতে হবে দলগুলোকে।

ফুটবলাররা কী বলছেন?

বর্তমান ফুটবলাররা এ নিয়ে নিজেদের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাননি এখনো। তবে সাবেক ফুটবলাররা কমবেশি সবাই এই লিগকে ‘ক্রিমিন্যাল’ বলে মত দিয়েছেন। তাদের মতে, ফুটবলের বৈশ্বিক আবেদন ও মূলনীতির বিরুদ্ধে গিয়ে এই লিগ কিছু অভিজাত ক্লাবের স্বার্থরক্ষা করবে।

ফুটবলে প্রভাব কী হবে?

সহজ হিসেবে, ক্রিকেটে তিন মোড়ল যা চাইছিল, এখানেও তাই চাইছে বড় ক্লাবগুলো। যেন নিজেদের মধ্যে যত বেশি সম্ভব ম্যাচ খেলে আয় বাড়ানো যায়। সেজন্য এই লিগে কোনো রেলিগেশনের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ১৫টি ক্লাব সবসময় নিজেদের মধ্যে খেলবে। সেক্ষেত্রে চ্যাম্পিয়নস লিগ নামের কোনো কিছুর অস্তিত্ব আর নাও থাকতে পারে। সহজ করে বলা যায়, এই লিগ শুরু হলে ফুটবল আর আগের মতো থাকবে না।

সূত্র: প্যাভিলিয়ন।