সেদিন আর রূপকথার এই পাগলটা থাকবে না

টিবিটি টিবিটি

স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২:১৩ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১, ২০১৮ | আপডেট: ১২:১৩:পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১, ২০১৮

সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই টিম হোটেলে ক্যাপ্টেনের রুমে চলে গেলেন মিরাজ। রুমে ঢুকেই মাশরাফিকে জড়িয়ে ধরলেন। ছোটবেলায় লালা পড়ে যেমন স্যান্ডো গেঞ্জির বুক ভিজে থাকতো তেমনি আজও তার টিশার্টের পুরোটা বুক ভিজে আছে। আজ ভিজেছে চোখের পানিতে। নিজের খাটে শুয়ে শুয়ে এতক্ষণ একা একা কেঁদেছেন মিরাজ। আর সহ্য করতে পারছেন না নিজেকেই। দৌঁড়ে এসে বড় ভাইয়ের রুমে ঢুকেই তাকে জড়িয়ে ধরেছেন।

এর আগে সকালের সূর্য ওঠার আগেই এসেছিলেন সারারাত না ঘুমোনো মুশফিক, মাহামুদুল্লাহ। এসেই দুজন বসলেন মাশরাফির দু পাশে। বললেন, ভাই, পারলাম না।

তাদের নত হয়ে থাকা মাথা তুলে দিলেন মাশরাফি। তারা বললেন, ভাই, অন্তত আপনার জন্য হলেও আমাদের পারা উচিত ছিল। আপনার হাতে একটা ট্রফি তুলে দিতে পারলাম না। ইন্ডিয়ার সাথেই বারবার এমন হয়। আর আমরা দুজনেই ডুবাই টিমরে। মনে হয় আমাদের দিয়া হবে না ভাই। সান্ত্বনা দিলেন না মাশরাফি। তিনি জানেন, এদের দিয়েই হবে।

মুশফিক মাহামুদুল্লাহর পর মাশরাফির দেখা হলো লিটনের সঙ্গে। তারা কেউ নাস্তা করতে যাননি। রুম সার্ভিস এসে নাস্তা দিয়ে গেছে সবার রুমে। লিটন এসে বললেন, ভাই খাবেন না? মাশরাফি বললেন, খাবো। তুই যা।

১২১ রান করা লিটন বললেন, ভাই আপনি বড় করতে বলছিলেন। আমি চাইছিলাম বাংলাদেশের সমান বড় করতে। কিন্তু আমি আপনার কথামত বড় করতে পারলাম না ভাই।

রুম থেকে যাওয়ার সময় লিটনের দিকে তাকিয়ে মাশরাফি মনে মনে বললেন, তুই বড় হবি লিটন। অনেক বড় হবি।

সৌম্য, ইমরুল, মিঠুন ওরা লজ্জায় এলো না ভাইয়ের সামনে। রুবেল আর মুস্তাফিজকে পিঠ চাপড়ে দিয়ে মাশরাফি বললেন, তোদের জন্যই তো টিকেছিলাম। মন খারাপ করস কেন?

অন্যকিছু ভাবতে চাচ্ছেন না মাশরাফি। তবুও মানুষ তো, তাই একবার হলেও মনে হচ্ছে তার, আজ যদি আমার তামিম থাকতো, আমার সাকিব থাকতো। আবার নিজের মনকে নিজেই সান্ত্বনা দিচ্ছেন নিজের কথা দিয়েই, যুদ্ধে নামলে পেছনে ফিরে তাকানোর সুযোগ নাই।

এদিকে মিরাজ এখনো পড়ে আছে তার বুকে। বুক থেকে মিরাজকে টেনে তুলে চোখ মুছে দিলেন মাশরাফি। বললেন, তোরে আরও শক্ত হইতে হবে ছোটো। তোরে নেতা হইতে হবে। একদিন এই টিমটারে তুই লিড দিবি।

মিরাজ বললেন, আমার কিছু লাগবে না ভাই। আমি শুধু আপনারে চাই। আপনার জন্য একটা ট্রফি জিততে চাই। বলেই আবার জড়িয়ে ধরলেন মাশরাফিকে। চোখের পানি দিয়ে ভিজিয়ে দিলেন মাশরাফির টিশার্ট।

মাশরাফি এবার আর মিরাজকে তুললেন না। তাকে কাঁদতে দিলেন। কাঁদলে মন হালকা হয়। মাশরাফির বুকের মধ্যে লেপ্টে থেকে মিরাজ বুঝলো তার মাথার চুল ভিজে উঠছে। তার মাথার উপর থাকা দুটো চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। সে চোখজোড়ার দিকে তাকানোর সাহস তার নাই।

মাশরাফির বুকের মধ্যে মুখ লাগিয়ে সে শুধু বলল, আপনি কাঁদবেন না মাশরাফি ভাই। আপনি কাঁদলে আমাদের মন খারাপ হয়।

সামাজিক যোগযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তানভীর মেহেদীর মতো হাজার হাজার ক্রিকেট পাগল তাদের রূপকথার গল্পগুলো এভাবেই তুলে ধরেছেন নিজেদের বাক্যে। কেউ কেউ বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের জন্য আবেগী শব্দগুলোকে জোড়া লাগিয়েছেন নিজের মতো করে। আবার কেউ বাংলাদেশ দলের ইতিহাস সেরা অধিনায়ক মাশরাফিকে নিয়ে নিজের মনের ভাব ফুটিয়ে তুলেছেন।

কিন্তু কেন মাশরাফিকে নিয়েই এতো কিছু? মাশরাফি কী? মিথ নাকি অসাধারণ কেউ? যিনি না থাকলে আবেগী হতে হবে?

সামান্য এই কটি প্রশ্নে উত্তর খুঁজতে হলে পেছাতে হবে ১৬টি বছর। গুনতে হবে প্রতিটি সুঁতো, যা পরতে পরতে সাজিয়ে আজ পরিপূর্ণ হয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট। সাকিব, তামিম, মুশফিক, রিয়াদ মুস্তাফিজরা হয়ে উঠেছেন অপ্রতুল। যাকে দেখে বড় হচ্ছে আগামীর ভবিষ্যত।

চলুন চলে যাই ৫ অক্টোবর ১৯৮৩ সালে। এদিন পৃথিবীর আলো দেখেছেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের আলো ছড়ানো মাশরাফি বিন মর্তুজা। নড়াইলে নানার বাড়িতে জন্ম নেওয়া ফুটফুটে শিশুটির বাবা গোলাম মর্তুজা ও মা হামিদা মর্তুজা আদর করে তার নাম রাখেন কৌশিক।

শিশু থেকে কিশোর বয়স পর্যন্ত মাশরাফিকে সবাই চিনতো কৌশিক নামেই। নড়াইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র মাশরাফি ছোটবেলা থেকেই ছিলেন খেলা পাগল। বাড়ির পাশেই ছিল স্কুল মাঠ। মাঠে খেলতেন বড়রা। হাতে কাঠের মোটা লাঠি ও স্কচটেপে মোড়া লাল বল দিয়ে খেলাটির প্রতি তার আকর্ষণ বাড়তে লাগল। জানতে পারলেন খেলাটির নাম ক্রিকেট।

মাঠে বড়দের এই খেলা দেখে ক্রিকেটের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয় কৌশিকের। উইকেট কিপারের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন তিনি। কিন্তু আঘাত পাবেন ভেবে বড়রা তাকে সরিয়ে দিত মাঠ থেকে। মন খারাপ করতো কৌশিক। কিন্তু যে বাধা মানে না মন, তাকে বেধে রাখা তো দায়। কৌশিকও সে বাধা মানেনি।

সালটা ১৯৯০। নড়াইলের ক্রিকেট সংগঠক শরীফ মোহাম্মদ হোসেন উঠতি বয়সী তরুণদের নিয়ে একটি ক্যাম্প করছিলেন। কৌশিকের বয়স তখন ১০। শরীফ সাহেব ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ দেখে কৌশিককে তার ক্লাব নড়াইল ক্রিকেট ক্লাবে খেলার সুযোগ করে দেন। সেদিন থেকে শুরু হলো একজন মাশরাফির বেড়ে ওঠার গল্প।

১৯৯১-এর দিকে মাগুরায় বিকেএসপির প্রতিভা অন্বেষণ ক্যাম্পের বিকেএসপি কোচ বাপ্পির সান্নিধ্যে এসে বোলিংয়ের অনেক মৌলিক বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত হন। পরের বছর জাতীয় কোচ ওসমান খান নড়াইলে এক প্রশিক্ষণ ক্যাম্প চালাচ্ছিলেন। ওই সময় মাশরাফির আমন্ত্রণ আসে খুলনায় খেলার জন্য। ১১ বছরের কৌশিক তার পরিণত বোলিং গতি ও সুইং দৃষ্টিগ্রাহ্য করে ফেলেন খান সাহেবের। কৌশিক সুযোগ পেলেন খুলনা বিভাগীয় অনূর্ধ্ব-১৭। একই সালে খেলতে এলেন ঢাকায়।

এরপর সুযোগ পেলেন জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৯ দলে। সেদিনই কৌশিক থেকে মাশরাফিতে পরিণত হন তিনি। সে সময় ১৯ দলের বোলিং কোচ ছিলেন অ্যান্ডি রবার্টস। তার পরিচর্যায় একটু একটু করে বাড়তে থাকেন মাশরাফি বিন মর্তুজা।

নজরকাড়া বোলিং ও মারকুটে ব্যাটিংয়ের কল্যাণে জিম্বাবুয়ে দলের বিরুদ্ধে ‘এ’ দলের খেলা সুযোগ পান মাশরাফি। পড়েন সমালোচার মুখে। কারণ ঢাকার কোনো সিনিয়র ডিভিশন লীগে কখনই খেলেননি মাশরাফি। মুচকি হেসেছিলেন সেদিন। সমালোচকদের জবাবটা দিয়েছিলেন বোলিংয়ের মাধ্যমে। সিরিজে একটি ম্যাচে চারটি উইকেট নিয়েছিলেন গোলাম মর্তুজার প্রথম সন্তান।

৮ নভেম্বর ২০০১ বাংলাদেশ জাতীয় দলে সুযোগ পেলেন মাশরাফি বিন মর্তুজা। বাংলাদেশ ক্রিকেটর টেস্ট দলে ১৯ নম্বর ক্যাপ পরে খেলতে নামেন শক্তিশালী জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। মাশরাফির বোলিং কল্যাণে সহসাই উড়ে গেছিল মাসাকাদজারা। মাশরাফি অবশ্য অভিষেকেই তার জাত চিনিয়ে দেন ১০৬ রানে ৪টি উইকেট নিয়ে। গ্র্যান্ট ফ্লাওয়ার ছিলেন তার প্রথম শিকার। তাই ফ্লাওয়ার্স ব্রাদার্সরা বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ অ্যাচিভ অ্যা গুড বোলার ফর দ্য ভেরি ফার্স্ট টাইম। হি মে ক্যান বি এ লিজেন্ড।’

একই বছরের ২৩ নভেম্বর ওয়ানডে ক্রিকেটের ক্যাপ পরেন মাশরাফি। অভিষেক হয়েছিল ওই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেই। সেদিন থেকেই মূলত শুরু হয় একজন রাজকুমারের পথ চলার গল্প। সেবার তিনি ৮ ওভার ২ বলে ২৬ রান দিয়ে বাগিয়ে নেন ২টি উইকেট।

তার পরের সফরটা হয় নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। সেবার থেকে খোলে মাশরাফির ইনজুরির খাতা। সফরের দ্বিতীয় টেস্টে দারুণ সফল হন মাশরাফি। ৬০ রানে ৪ উইকেট নেওয়ার পর হাঁটুতে আঘাত পান তিনি। তারপরও দলের জন্য খেলেন তৃতীয় টেস্ট। আবারও হাঁটুতে আঘাত পান মাশরাফি। ব্যাস…! দুবছরের জন্য চলে যান ক্রিকেটর বাইরে।

ফেরেন ২০০৪ সালে। ভারতের বিরুদ্ধে খেলার সময় রাহুল দ্রাবিড়কে অফ-স্ট্যাম্পের বাইরের একটি বলে আউট করে নিজের ফেরার ঘোষণা দেন বিশ্বকে। সিরিজে পকেটে পোরেন শচিন-সৌরভসহ ভারতের বাঘা বাঘা সব ব্যাটসম্যানের উইকেট। এই সিরিজের একটি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে ভারতের বিরুদ্ধে অবিস্মরণীয় জয়ের নায়ক ছিলেন তিনি।

২০০৬ ক্রিকেট পঞ্জিকাবর্ষে মাশরাফি ছিলেন একদিনের আন্তর্জাতিক খেলায় বিশ্বের সর্বাধিক উইকেট শিকারী। তিনি এ সময় ৪৯টি উইকেট নিয়েছেন। কিন্তু আবারও ইনজুরিতে পড়েন বাংলাদেশের সেরা এই বোলার। এবার এক বছরের জন্য চলে যান মাঠের বাইরে। আবার ফেরেন ২০০৭ সালে। বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে অবিস্মরণীয় জয়ের মূল ভূমিকায় ছিলেন মাশরাফি।

মাশরাফির গল্পটা কঠোর পরিশ্রমের, অক্লান্ত সাধনায় নিজেকে প্রতিনিয়ত ছাড়িয়ে যাওয়ার লড়াইয়ের। খেলার মাঠে আরেকটু ভাল করার জন্য ট্রেনিংয়ে আরও জোর দেওয়া, প্রতি মুহূর্তেই বিগত মুহূর্তের চেয়ে আরেকটু বেশি! অবিশ্বাস্য শৃঙ্খলা, রক্ত জল করা খাটুনি, আর বিন্দু বিন্দু ঘামেই তৈরি ইনজুরি জর্জরিত মাশরাফি নামের কিংবদন্তির!

২০০৯ সালে জাতীয় দলের অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পান মাশরাফি। কিন্তু চোট যে তার আজন্ম বন্ধু তা হয়তো জানা ছিল না মাশরাফির। আবারও চলে গেলেন মাঠের বাইরে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সে ম্যাচের চোটই তাকে টেস্ট থেকে ছুঁড়ে ফেলেছিল। কিন্তু বিদায় দেননি তিনি।

২০১১ সালে দেশে মাটিতে বিশ্বকাপ। চোটের দোহাই দিয়ে মাশরাফিকে বাদ দেওয়া হলো জাতীয় দল থেকে। নিজ মাঠেই সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে কেঁদেছিলেন মাশরাফি। সে সময়টা তারা যাকে বুঝতে পেরেছিলেন তারাও কেঁদেছিলেন মাশরাফির সঙ্গে।

এর মাঝে নানা চড়াই উৎড়াই। চোট, সার্জারি, অনুশীলন। ততদিন পর্যন্ত হাঁটুর ইনজুরিতেই সাতবার ছুরিকাঁচির নিচে শুয়েছেন মাশরাফি। তা ছাড়া শরীরের অন্যান্য অংশে তো চোট আছেই। প্রতিবার মাশরাফি ইনজুরির সাথে লড়াই করে ফেরেন, আর তার ডাক্তার অস্ট্রেলিয়ান ডেভিড ইয়াং চোখ কপালে তুলে বলেন, ‘এ-ও কি সম্ভব! এ ধরনের একটা ইনজুরিই তো শেষ করে দিতে পারে একজন ফাস্ট বোলারের ক্যারিয়ার!’

ঘুম থেকে উঠে বিছানা থেকে মাশরাফির নামতে সময় লাগে ১৫ মিনিট। লিগামেন্ট ছিড়ে যাওয়ার কারণে হাঁটুতে পানি জমে যায়। সিরিঞ্জ দিয়ে সে পানি বের করে নিজেকে প্রস্তুত করেন মাশরাফি। কিন্তু এর মাঝে থেমে ছিল না অনুশীলন। মাঠে বাইরে মাঠে ফেরার যুদ্ধ।

২০১৪ সালে অধিনায়ক হয়েই মাঠে ফেরেন মাশরাফি। শুরু হয় বাংলাদেশ ক্রিকেটের নতুন যুগ। অবশ্য তিনি যে দলকে নিয়ে সামনে এগোবেন তার অর্ধেকই ছিলেন তরুণ। সঙ্গে পেয়েছিলেন চার পাণ্ডবকে। তামিম, সাকিব, মুশফিক ও মামুদউল্লাজকে নিয়ে শুরু করলেন বিশ্ব বধের যাত্রা। একে একে ক্রিকেটের সব পরাশক্তিকে হারাতে শুরু করলেন এ কালের মহানায়ক। ওয়ানডে ক্যারিয়ারের সকল দেশকে নিজের বুদ্ধিদীপ্ত অধিনায়কত্বে হারিয়েছেন মাঠের অগ্রভাগের সেনানী।

২০১৬ সালে এশিয়া কাপে তার বীরত্ব দেখেছিল সারা বাংলাদেশ। ভারতের কাছে হেরে যাত্রা শুরু করেছিল বাংলাদেশ। মাঝে পাকিস্তান, আফগানিস্তান শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে ফাইনাল খেলেছেন তিনি। কিন্তু ১ রানের অফসোস নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয় মাশরাফি ও তার দলকে। কিন্তু নিজের কাছে হার মানেননি দেশের সেরা অধিনায়ক। একে একে পাকিস্তানকে হোয়াইট ওয়াশ। ভারতের বিপক্ষে সিরিজ জয়। এসব তো তারই অবদান।

মাশরাফির টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ার শুরু হয় ২০০৬ সালের ২৮ নভেম্বর জিম্বাবুয়ে বিপক্ষে। কিন্তু ওডিআইয়ের মতো এই ফরম্যাটটাকে পছন্দ করতেন না মাশরাফি। ২০১৭ সালে ৬ এপ্রিল শ্রীলংকা সিরিজের শেষ টি২০ ম্যাচ দিয়ে আন্তর্জাতিক এই প্ল্যাটফর্ম থেকে অবসর নেন তিনি। মাশরাফিই বাংলাদেশের প্রথম ক্রিকেটার যিনি অধিনায়ক থাকা অবস্থায় অবসর নেয়।

২০১৮ সালের কয়েকটি ওয়ানডের পর বহুকাঙ্খিত এশিয়া কাপ খেলতে বাংলাদেশ দল যায় দুবাই। গ্রুপ পর্বে শ্রীলঙ্কাকে উড়িয়ে দিয়ে জয় যাত্রা শুরু করে মাশরাফির দল। কিন্তু মাঝে ভারত ও আফগানিস্তানের বিপক্ষে হেরে ব্যকফুটে চলে যান। কিন্তু সুপার ফোর পর্বে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকে হারিয়ে ফাইনালের টিকিট কাটেন মাশরাফি। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, শত ক্ষতের চিহ্ণ শরীরে বয়ে বেড়ানো মাশরাফি এবারও পারলেন না শ্রেষ্ঠত্বের একটি শিরোপা জয় করতে।

মাশরাফি দলে থাকা অবস্থায় এশিয়া কাপসহ মোট পাঁচটি ফাইনাল খেলেছে। কিন্তু প্রতিটিতেই শিরোপহীন। হয়তো এই ব্যথা নিয়েই শেষ করলেন তার জীবনের এশিয়া কাপ অধ্যায়।

নিজের এই দীর্ঘ ক্যারিয়ারে মাশরাফি কোনোদিন নিজের বলে কিছু নেননি। কোনো কঠিন সময়ে সতীর্থের ঘাড়ে দায় ছেড়ে দেননি। দলের প্রয়োজনে ফিরে এসেছেন বারবার। এমন মাশরাফি হয়তো কালেভদ্রে একবার আসে। কারো ভাগ্যে হয়তো জোটেই না। এই মাশরাফি বাংলাদেশ ক্রিকেটকে নিয়ে গেছেন সম্মানের উচ্চ শিখরে। এই মাশরাফি দলকে করেছেন উজ্জীবিত। তাকে দেখেই মিঠুন, মিরাজ মোসাদ্দেকরা বড় হচ্ছে।

দুনিয়ার কত শত ক্রিকেটার আছেন যারা রিকি পন্টিং হতে চান, হতে চান ধোনি। জয় করতে চান ক্রিকেটীয় সব কিছু। কিন্তু মাশরাফির মতো অন্তর জয় করতে পারবেন কজন। সতীর্থের ঘর্মাক্ত ললাটে চুমু দিতে পারবেন কজন। কজন পারবেন সারা দেহে কষ্ট নিয়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে। কজন পারবেন মিথ হতে?

আমাদের মাশরাফি, আমাদের মিথ। তিনি হয়তো বড় কোনো শিরোপ জেতেননি। কিন্তু বাংলাদেশ একদিন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হবে। অনেক শিরোপা জিতবে। টাইগারদের আরও বড় দল হবে। হয়তো অনেক ক্ষ্যাপাটে আসবে টাইগার দলে। কিন্তু সেদিন আর রূপকথার এই পাগলটা থাকবে না, গুরু থাকবে না।আমাদের সময়