‘স্যারেরা আমাগো ল্যাকতে দিয়া অন্য কেলাশে পড়ায়’

টিবিটি টিবিটি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ৮:০৮ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৮ | আপডেট: ৮:০৮:পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৮

বরগুনার পাথরঘাটার জ্বীনতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বেলা সাড়ে ১২টা। শিশুদের অনুমতি নিয়ে সালাম দিয়ে প্রবেশ করলাম ৫ম শ্রেণির কক্ষে। দেখা গেলো, ছাত্র-ছাত্রীরা একটি পুরনো প্রশ্নপত্র দেখে খাতায় উত্তর লিখছে।

কোনো শিক্ষক নেই। শিক্ষক নেই কেন জানতে চাইলে কয়েকজন শিক্ষার্থী উত্তর দিলো। তারা বললো, ‘স্যারেরা এক কেলাশে (ক্লাস) ল্যাকতে (লিখতে) দিয়া অন্য কেলাশে পড়ায়’। শিক্ষক কম, তাই এভাবেই তাদের প্রতিদিনের পাঠদান চলছে গত ছয় মাস ধরে।

৩৯ নম্বর জ্বীনতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টির অবস্থান পাথরঘাটা উপজেলার সর্ব দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর তীরের জ্বীনতলা গ্রামের জেলে পল্লীতে। ১৯৯১ সালে স্থানীয় উদ্যোগে বেসরকারি বিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ২০১৩ সাল থেকে সরকারি হয়েছে।

আমাদের দেখে উপস্থিত হন বিদ্যালয়ে কর্মরত দুই শিক্ষক জামাল হোসেন ও তুলি বেগম। তাদের কাছে জানা গেলো, বিদ্যালয়ে বর্তমানে তারা দুইজন সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত ক্লাস নেন। প্রাক-প্রাথমিকসহ ৬টি শ্রেণিতে মোট ১৪১ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ছাত্র ৭২ জন, ছাত্রী ৬৯ জন। শিক্ষক মাত্র দুই জন!

বদলীর পর প্রধান শিক্ষক নেই গত এপ্রিল থেকে। একজন কয়েক মাস আগে এসে যোগদান না করেই ওই যে চলে গেলেন, আর ফেরেননি। মো.জামাল হোসেন ও তুলি বেগম আরো জানালেন, প্রতি শিফটে তিনটি করে ক্লাস হয়। একটি ক্লাসে কিছু পড়া বা লেখার কাজ দিয়ে অন্য দুই ক্লাসে পাঠ দান করা হয়।

তুলি বেগম আক্ষেপ করে বলেন, এভাবে ঘুরে ফিরে তৃতীয়, চতুর্থ অথবা পঞ্চম শ্রেণির কোনো না কোনো ক্লাস বন্ধ থাকছে। প্রথম শিফটেও একই অবস্থা। শিশুরা বঞ্চিত হছে শিক্ষাগ্রহণ থেকে। পিছিয়ে পড়ছে, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীরা দুষ্টুমি করে সময় কাটায়। আমরাও কোনো বিশ্রাম পাই না।

জ্বীনতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. শহীদ খান যৌক্তিকতার প্রশ্ন তুলে বলেন, পাঁচজন শিক্ষকের স্থলে দুই জন দিয়ে কী মানসম্মত শিক্ষাদান সম্ভব? জেলে পল্লীর শিশুরা ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে পড়ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক অভিভাবক অভিযোগ তোলেন, প্রধান শিক্ষককে চক্রান্ত করে সরানো হয়েছে। সাগরতীরের শিক্ষাব্যবস্থা এমনিতেই পশ্চাদপদ। তার ওপর নেই প্রধান শিক্ষক। ভবনটি জীর্ণ, ভেঙে যাচ্ছে।

এলাকার বাসিন্দা মো. জাকির খান বলেন, জোয়ারের সময় পানিতে মাঠ তলিয়ে যায়। আঙিনার একমাত্র টয়লেটটি ভেঙে গেছে। শিক্ষার্থী আর শিক্ষকদের পাশের বাড়িতে গিয়ে বাথরুমের কাজ সারতে হয়। মিনারা নামে এক গ্রামবাসী বলেন, জেলে ও কৃষকদের বিদ্যালয় বলে আমাদের অবহলো করা হচ্ছে।

পাথরঘাটা উপজেলা চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম রিপন বলেন, বিদ্যালয়টির দুরাবস্থার কথা আমি জানি। জীর্ণ ভবন মেরামতের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। টাকা বরাদ্ধ হয়েছে। সাক্ষরতা কর্মসূচিকে বেগবান করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

বরগুনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এসএম মিজানুর রহমান টেলিফোনে বলেন, কয়েকদিন আগে আমি স্কুলটি পরিদর্শন করেছি। প্রধান শিক্ষক দেয়ার মত অবস্থা নেই। তবে শিগগিরই নিয়োগ হলে সহকারি শিক্ষকের শূন্যপদ পূরণ করা হবে। সুত্র: কালের কন্ঠ